কিন্তু কী ছিল ওই নারীর লেখা চিঠিতে ?

বিতর্কিত ‘ধর্মগুরু’ গুরমিত রাম রহিম সিংকে ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছে গতকাল। আদালতের রায় ঘোষণার পরপরই হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে গুরমিতের সমর্থকদের সাথে পুলিশের দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়, মুহূর্তের মধ্যেই এ দুটি রাজ্য অনেকটা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এখন পর্যন্ত দেশজুড়ে এ কথিত ধর্মগুরুর সমর্থকদের সহিংসতায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর আগে অর্থাৎ ২০০২ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও হরিয়ানার প্রধান বিচারপতিকে লেখা এক বেনামি চিঠিতে গুরমিতের ডেরা সাচ্চা সৌদার একজন নারীকর্মী তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগের তদন্তভার যায় সিবিআই’র কাঁধে। ভারতের সুপ্রিমকোর্টও এ মামলা গুরুত্ব সহকারে তদন্তের নির্দেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেশটির আইন অনুযায়ী গতকাল তাকে ধর্ষণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
কিন্তু কী ছিল ওই নারীর লেখা চিঠিতে পাঠকদের জন্য সেই চিঠিটির অনুবাদ তুলে ধরা হলো-
আমি পঞ্জাব থেকে আসা মেয়ে। সিরসা (হরিয়ানা)-এর ডেরা সচ্চা সৌদায় একজন সাধ্বী হিসেবে সেবা করে চলেছি গত ৫ বছর ধরে। আমার মতো আরও কয়েকশো মেয়ে এখানে রয়েছেন, যারা প্রতি দিন ১৮ ঘণ্টা করে সেবা করে চলেছেন।
কিন্তু এখানে আমরা যৌন নির্যাতনের শিকার। ডেরায় মেয়েদের ধর্ষণ করেন ডেরা মহারাজ (গুরমিত সিংহ)। আমি একজন স্নাতক। ডেরা মহারাজের ওপরে আমার পরিবারের অন্ধ বিশ্বাস। পরিবারের সেই অন্ধবিশ্বাসের জেরেই আজ আমি একজন সাধ্বী। সাধ্বী হওয়ার বছর দুয়েক পর একদিন রাত ১০টা নাগাদ হঠাৎ এক নারীভক্ত আমার ঘরে আসেন। জানান, মহারাজ আমাকে ডেকেছেন। মহারাজ স্বয়ং ডেকে পাঠিয়েছেন শুনে খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছিলাম। সাধ্বী হওয়ার পর সেটাই তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে তার ঘরে ঢুকি। দেখলাম ওনার হাতে একটা রিমোট এবং টিভিতে তিনি ব্লু ফিল্ম দেখছেন। বিছানায় তার বালিশের পাশে একটা পিস্তল রাখা ছিল। এ সব দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। এরপর মহারাজ টিভিটা বন্ধ করে দেন। আমাকে ঠিক তার পাশে নিয়ে গিয়ে বসান। খাওয়ার জন্য এক গ্লাস জল দেন। তারপর খুব আস্তে করে বলেন, ডেকে পাঠানোর কারণ আমাকে তিনি নিজের খুব কাছের বলে মনে করেন। এটাই ছিল আমার প্রথম অভিজ্ঞতা।
এরপরই তিনি এক হাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে তার আরও কাছে টেনে নেন। কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলেন, আমাকে তিনি হৃদয়ের গভীর থেকে ভালবাসেন। আমার সঙ্গে সহবাস করতে চান। বলেন, তার শিষ্যা হওয়ার সময়ই আমার সমস্ত সম্পদ, আমার শরীর এবং আত্মা তার কাছে উৎসর্গ করেছি এবং তিনি তা গ্রহণও করেছেন। আমি বাধা দিলে তিনি বলেন, ‘আমি ঈশ্বর, এতে তো কোনও সন্দেহ নেই’। আমি তাকে বলি, ঈশ্বর কখনও এ রকম করেন না। আমাকে বাধা দিয়ে তিনি বলেন, ১) শ্রীকৃষ্ণও ঈশ্বর। তার ৩৬০ জন গোপী ছিলেন। যাদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ প্রেমলীলা করতেন। আমাকেও সবাই ঈশ্বর বলে মানে। এতে এত অবাক হওয়ার কিছু নেই।
২) আমি তোমাকে এখনই এই পিস্তল দিয়ে খুন করতে পারি। তোমার লাশ এখানেই পুঁতে দেব। তোমার পরিবারের প্রতিটা সদস্য আমার অন্ধ ভক্ত। তুমি খুব ভালো করেই জানো, তারা কখনই আমার বিপক্ষে যাবেন না।
৩) সরকারের ওপরেও আমার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। পঞ্জাব, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী এবং অনেক কেন্দ্রের মন্ত্রীরাও আমার কাছে আসেন। আমার প্রতি তাদের ভক্তি দেখান। রাজনীতিবিদরা আমার কাছ থেকে সাহায্য নিতে থাকেন। সুতরাং তারাও আমার বিরুদ্ধে কোনো রকম পদক্ষেপ করবে না। আমি তোমার পরিবারের সদস্যদের সরকারি চাকরি কেড়ে নেব এবং তাদের সেবাদার দিয়ে খুন করাব। আর সেই খুনের কোনো প্রমাণ থাকবে না। তুমি খুব ভাল করেই জানো, ডেরা ম্যানেজার ফকিরচাঁদকেও আমি গুণ্ডা দিয়ে খুন করিয়েছি। এখনও সেই খুনের কিনারা হয়নি। ডেরার দৈনিক আয় এক কোটি। এই টাকা দিয়ে আমরা রাজনীতিক নেতা, পুলিশ এমনকি বিচারক সকলকেই কিনে ফেলতে পারি।
ঠিক এরপরই মহারাজ আমাকে ধর্ষণ করেন। গত তিন বছর ধরেই মহারাজ এ ভাবে আমাকে ধর্ষণ করে আসছেন। প্রতি ২৫ থেকে ৩০ দিন অন্তর আমার পালা আসে। আমি জানতে পেরেছি, আমার মতো যত জন সাধ্বীকে তিনি তলব করেছেন, তাদের সকলকেই ধর্ষণ করেছেন। বেশিরভাগেরই বয়স এখন ৩০ থেকে ৪০। বিয়ের বয়স পেরিয়ে গিয়েছে। তাদের কাছে এখন ডেরার এই আশ্রয় ছাড়া আর কোনো অবলম্বন নেই।
এই সমস্ত নারীদের বেশিরভাগই শিক্ষিত। কারও স্নাতক তো কারও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। কিন্তু তারা তা সত্ত্বেও এই নরকবাস করছেন। কারণ একটাই, মহারাজের ওপরে তাদের পরিবারের অন্ধ বিশ্বাস। আমরা সাদা পোশাক পরি, মাথায় স্কার্ফ বাঁধি, পুরুষদের দিকে চেয়ে দেখি না। পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হলে ৫-১০ ফুট দূরত্ব বজায় রাখি। কারণ এ সবই মহারাজের ইচ্ছা। তার কথা মতোই আমরা এখানে চলাফেরা করি। সাধারণ মানুষ আমাদের দেবী গণ্য করেন। কিন্তু তারা জানেন না, ডেরাতে আমরা আসলে রক্ষিতা। ডেরা এবং মহারাজের আসল সত্যিটা আমি আমার পরিবারকে জানানোর চেষ্টা করেছিলাম। তাতে তারা আমাকেই বকাবকি করেন। জানান, ডেরায় স্বয়ং ঈশ্বরের (মহারাজ) বাস। সুতরাং এর থেকে ভালো জায়গা আর নেই। ডেরা সম্পর্কে যেহেতু আমার মনে খারাপ ধারণা জন্মেছে, তাই আমার উচিত ‘সতগুরু’-র নাম করা। শেষ পর্যন্ত আমাকে মহারাজের সমস্ত আদেশ পালন করতেই হয়, কারণ আমি সব মিলিয়ে অসহায়।
এখানে কাউকেই অন্যদের সঙ্গে বেশি কথা বলতে দেওয়া হয় না। পাছে ডেরার সত্য ফাঁস হয়ে যায়, তাই টেলিফোনেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় না। কোনো সাধ্বী যদি মহারাজের এই আচরণ ফাঁস করে দেন, তাহলে মহারাজের আদেশ মতো তাকে শাস্তি দেওয়া হয়। কিছু দিন আগে, ভাতিন্দার এক তরুণী মহারাজের এই সমস্ত নির্যাতনের কথা পরিবারকে জানান। মহারাজের নির্দেশে সমস্ত সাধ্বী মিলে তাকে বেধড়ক পেটান। মেরুদণ্ডে গুরুতর চোট নিয়ে তিনি এখন শয্যাশায়ী। তার বাবা ডেরায় কাজ করতেন। কাজে ইস্তফা দিয়ে বাড়ি ফিরে যান। মহারাজের ভয়ে এবং আত্মসম্মানের কথা ভেবে মুখ খোলেননি।
একই ভাবে এই নির্যাতনের শিকার হন কুরুক্ষেত্রের এক তরুণীও। ডেরা ছেড়ে বাড়ি চলে যান তিনি। তার কাছ থেকে এ সব কথা জানার পর তার ভাইও ডেরার কাজ থেকে ইস্তফা দিয়ে চলে যান। পঞ্জাবের সঙ্গরুর এক তরুণী সাহস করে বাড়ি ফিরে ডেরার ভয়ঙ্কর দিকটা সবাইকে জানিয়েছিলেন। পরদিনই ডেরার অস্ত্রধারী সেবাদার বা গুন্ডারা তার বাড়িতে পৌঁছে যান। মুখ খুললে তাকে খুনের হুমকি দেন।
একইভাবে মানসা, ফিরোজপুর, পাতিয়ালা এবং লুধিয়ানা থেকে এখানে আসা তরুণীরাও ভয়ে ডেরা নিয়ে কিছু জানাতে চাননি। তারা ডেরা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু তারপরও খুন হওয়ার ভয়ে মুখ বন্ধ করে আছেন। সিরসা, হিসার, ফতেয়াবাদ, হনুমানগড় এবং মিরাটের তরুণীরাও মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন।
আমিও যদি আমার নাম জানাই, তাহলে আমাকে এবং আমার পরিবারকে খুন করা হবে। সাধারণ মানুষের স্বার্থেই এই সত্য আমি সামনে আনতে চাই। এই মানসিক চাপ আর নির্যাতন সহ্য করতে পারছি না। খুব বিপদে রয়েছি। সংবাদমাধ্যম বা সরকারি কোনো সংস্থা যদি তদন্ত চালায়, তা হলে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন সাধ্বী এগিয়ে এসে এই সত্য জানাবেন আমি নিশ্চিত। আমাদের ডাক্তারি পরীক্ষা করা হোক। আমরা আদৌ সাধ্বী কি না তা জানা হোক। পরীক্ষায় যদি প্রমাণ হয় যে আমদের কুমারিত্ব নেই, তাহলে তদন্ত করে জানা হোক, কে আমাদের সতিত্ব হরণ করেছেন।
তাহলেই সত্য বাইরে আসবে। মহারাজ গুরমিত রাম রহিম সিংহই যে আমাদের জীবন নষ্ট করেছেন তার প্রমাণ মিলবে।



এই প্রতিবেদন টি 996 বার পঠিত.