প্যান্ডোরার বাক্স

– জেসমিন মুন্নী

০১.
বোহেমিয়ান শব্দটা মাথায় খেলে গেলে গুগলে সার্স করতে যাব এই সময় মোবাইলটা বেজে আবার থেমে যায়। কিছুটা মনোসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় তাতে। আবার ট্রাই করি। ওয়াই-ফাই ভীষন স্লো। ইদানীং আমার এমন হয়। কোনো একটি শব্দ কোথাও দেখলে বা শুনলে আমার ব্রেনের সামনের অংশে নাড়া দিতে থাকে বিষয়টি সম্পর্কে বিষদ জানা হয়ে গেলেও। কয়েকদিন আগে টিভিতে না জানি পেপারে বোহেমিয়ান শব্দটা দেখার পর থেকে কয়েকজনকে এ বিষয়ে কিছু জানে কিনা প্রশ্ন করতে থাকি। বোহেমিয়ানের ভাষাগত অর্থ যাযাবর মানুষ, যারা স্থান থেকে স্থানতরে ঘুরে বেড়ায় এমনটাই আমার জানা। উনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপিয় শহরগুলোতে উন্নত মানের নয় এমন গরিব শিল্পী, লেখক, সঙ্গীতঙ্গ, অভিনেতা ও সংস্কৃতি কর্মীর অপ্রচলিত বাউন্ডেলে টাইপের জীবন বোঝাতে বোহেমিয়ান শব্দটার প্রচলন শুরু হয় । তারা শিল্প-সাহিত্য কিংবা জীবনযাপনে প্রচলিত রীতিনীতিকে ছাপিয়ে নিজস্ব ঢঙের জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাদের দেখলে মানুষের ধারনা জন্মাবে, জীবন সম্পর্কে অসচেতন একজন মানুষ।
গুগলে ট্রাই করতে থাকলে আবারও মোবাইল বাজে। প্রায় দুপুরে মোবাইলে আননোন নাম্বার থেকে কল আসে। মোবাইল আসার সময়টাতে দুপুরে ভাত খেয়ে ভাতঘুম না যেয়ে ক¤িপউটার নিয়ে বসা। মেইল চেক, গুগল ব্রাউজ অথবা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে ফেসবুকে চেটিং করা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মোবাইলটা ধরি।
-হ্যালো!
– ডিসটার্ব করলাম!’
-পরিচিত কন্ঠ স্বরটি শুনে বিরক্তি লাগলেও বিরক্তিবোধ প্রকাশ না করে বলি, আর ডিসটার্ব! কেন ফোন করেছিস বল, সর্টকাটে বলবি।
-সর্টকাট, যেদিন একদম কাট হয়ে যাবো সেদিন আফসোস করলেও কোনো কাজ হবে না।
-তোকে দিয়ে আবার কিসের কাজ!
– ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলাই খোঁজে কুল বধুরা, তা কি করছিলা ?
– কি আর করব! নাই কাজ তো খই ভাজ! সুখÑদুখের বাক্সের ভেতর চোখ দিয়ে বসে আছি। যদি অভাবনীয় কিছু তথ্য খুঁজে পাই।
– বেশী কিছু খুঁজতে যাইও না শেষে দেখবা কেঁচো খুঁজতে সাপ বের হইয়া গেছে। ইদানীং একটা ব্যাপার উপলব্ধি করলাম, মানুষ আজকাল বাক্সবন্ধী হইয়া যাইতাছে! বিশেষ কইরা নারীরা! আবার রাগ কইরো না। তুমিই ভাইবা দেখ, এক সময় তোমরা বাইরে বাইর হওয়ার জন্য কতো আন্দোলন করছ। আর এখন তোমরা সারাদিন বইসা হিন্দি সিরিয়াল দেখ, কম্পিউটারে চ্যাটিং কর, মোবাইলে গেম খেল। এমন কী ঘরে বইসা ই-মার্কেটিং এর মাধ্যমে মাসের বাজার পর্যন্ত কইরা ফেল। বুঝলা পৃথিবী যতই উন্নতির দিকে যাইতাছে মানুষ ততই নিজেরে চার দেয়ালের মাঝে বন্ধী কইরা ফেলছেতে। তুমি নিজেই বল কতদিন হইছে তুমি বাহিরে বাইর হও না। তোমারে দেখি না ছয় মাসের অধিক!
– শোন, সংখ্যা গরিষ্ঠতা কখনো উদাহরন হতে পারে না। বর্তমানে সংসারে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের রেক্সপন্সসিবিলিটি অনেক বেশী। তুই বোহেমিয়ান এসবের কী বুঝবি! বাজে কথা রেখে বল কেন ফোন করেছিস! বোহেমিয়ান শব্দটা যথাস্থানে প্রয়োগ করতে পেরে এক প্রকার আত্মপ্রশান্তি অনূভব করি।
– কী বললা! বোহেমিয়ান!! যথার্থ একজামপল দিলা। কোন অজপাড়া গ্রাম দিয়া আইসা এখন আমি এক যাযাবর..। ভুপেন হাজারিকার সেই গানটা মনে পইড়া গেল- পৃথিবী আমারে আপন করেছে আপন করেছে পর.. আমি এক যাযাবর..।
-আহা সিরিয়াসলি বলতো কেন ফোন করছিস!
-রক্ত লাগবে।
-রক্ত!!
-আমার এক কলিগের বৌর ডেঙ্গু হইছে, রক্ত লাগবে, রক্তের ‘ও’ নেগেটিভ। ভার্সিটিতে তো দেখছিলাম সন্ধানীর ডোনার ছিলা।
-তুই অফিস কবে জয়েন করলি কবে?
– আগে পার্মানেন্ট হোক তারপর সব জানাব। তাছাড়া চাকরিটা বিশেষ সুবিধার মনে হইতেছে না। প্রতিষ্ঠানটাতে একটা অশুভ শক্তি ঘুর ঘুর করতাছে । মনে হয় বিশাল এক সমস্যায় পরব। সময় হইলে তোমারে সব জানাব। এখন বল, রক্ত দিতে পারবা!
– না। বাচ্চা এখনো ব্রেস্ট ফিডিং করছে। তোর মাথা থেকে এসব পরোপকারী ভুত কবে যাবে!
– না পারলে রাখি।

 

০২.
ছেলেটি থাকতো বোনের বাসায়। বোনের জামাই ছিল চট্টগ্রাম ইনকামট্যাক্সের কমিশনার। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে বহুতলা কলোনিতে ছিল তাদের সরকারি কোয়ার্টার। চরম বিস্ময় নিয়ে চট্টগ্রাম আসার সময় তার বয়স ছিল তের- চৌদ্দ। গ্রামের প্রাইমারি শেষ করে শহরে এসে কলেজিয়েট স্কুলের মতো স্কুলে টেস্ট দিয়ে এ্যালাও হলে সবাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল। গ্রামের ছেলে বলে মর্নিং সিফটে যেতে তেমন কোনো অসুবিধা হত না। খুব ভোরে উঠে নিজে গোসল করে, কাপড় ধুয়ে, ভাগনী হৃদী এবং ভাইগ্না শাতিলকে উঠিয়ে ওদেরকে রেডি করিয়ে নাস্তা খাইয়ে এক সঙ্গে বেরিয়ে ওদেরকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে শেষে স্কুলে যেত। স্কুল থেকে এসে বোনকে ঘরের কাজে সাহায্য করতো। মাছ কুটে দিত, মুরগি জবাই করে দিত এমন কি ঘর ঝার পর্যন্ত! ছুটির দিনে ভাগ্নীদের আর্ট স্কুল, গানের স্কুল ও বন্ধুদের বাসায় নিয়ে যেত। বিকালে কলোনীর পাশে জাম্বুরা ফিল্ডে খেলতে নিয়ে যেত। কলোনির সব অফিসারদের ছেলে-মেয়েরা হৃদি ও শাতিলের দেখাদেখি তাকেও মামা বলে সম্মোধন করত। এভাবে ছেলেটি সবার কমন মামা হয়ে গেল। কলোনির কোয়ার্টারের উপড়ে-নীচে কেউ কোনো সমস্যায় পরলে মামাকে তলব করতো। ছেলেটিও প্রাণ দিয়ে সবার আর্জি পূরণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করত। ঠিক সেই সময় পাশের কোয়ার্টারে খালাত বোনের মেয়ের বিয়ের কথা শুরু হয়ে দিন তারিখ ফিক্সড হলে একটা সম্পর্কের সূচনা। প্রথম পরিচয়ে অনেক পুরোনো সম্পর্ককে ছাড়িয়ে আপনার চেয়ে আপন হয়েছিল। বিয়ের আণুসঙ্গিক কাজের মধ্যে তাদের সম্পর্কের সূত্রপাত হয়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেটা আরো গাঢ় হয়েছিল। কয়েকদিন ধরে ছেলেটি মেয়েটির বিয়ের কার্ডে হেডিং লিখে দিল,কার্ড বিলিতে সাহায্য করল। হলুদসন্ধ্যার স্টেজ বানাতে সাহায্য করল। হলুদপর্ব শেষে সারারাত গানের সঙ্গে নাচের নেশায় মেয়েটি ছেলেটিকে প্রথম স্পর্শ করলে সে শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। উৎসবে মাতোয়ারা সেই রাতে নাচের উন্মাদনায় কিছুটা ক্লান্তি এলে তারা ছাদে এসে দাঁড়ালে তিনতলা ছাদের দিকে চাঁদের চোখ আটকে ছিল। সময় মন্থর হলে সাহস আসে পাশে ঘুর ঘুর করলে উৎসুক রাতের উত্তেজনা বেড়েছিল। সেদিকে খেয়াল ছিল না তাদের, তারা দাঁড়িয়ে ছিল ক্লান্তিহীন ভাবে। এদিকে রাত শেষ হওয়ার পথে। ক্যামোফ্লেজ মেঘেরা চাঁদকে এখন আড়াল করলেও হয়তো এক সময় দিনের আলোয় সত্যি অদৃশ্য হয়ে যাবে। অজানা এক আকর্ষনে স্থিরছিল তারা। এভাবে রাত ছোট হয়ে ঘুম থেকে সবচেয়ে আগে ঘুম ভাঙ্গা কাকেরা তাদের দেখে অবাক হলে ছেলেটি প্রথম মুখ খুলেছিল, এখন যাওয়া উচিত।’
মেয়েটি নিঃশব্দে নেমে রুমে গেল। বাসন্তী রঙের শাড়ির ভাঁজের ভেতর মেয়েটির গোপন সৌন্দর্য গোপন রেখে সেদিন সূর্য উঠেছিল। ছেলেটি মেয়েটি মেহেদির লাল আভায় উদ্ভাসিত হয়ে পথে নামল। এবং সন্ধ্যায় সানাইয়ের করুণ সুর বাজিয়ে মেয়েটি শশুর বাড়ি গেল।
ছেলেটির দুলাভাই প্রথম প্রথম তাকে তেমন কেয়ার করতো না। তবুও নির্লজ্জের মতো দুলাভাইয়ের সঙ্গে খাতির জমাতে চেষ্টা করতো। পোষ্যপ্রানীর মতো প্রভুভক্ত চোখ নিয়ে বারবার তাকালে ব্যাপরাটি দুলাভাইয়ের কাছে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে এক সময় সহজ হয়ে গিয়েছিল। এবং এক পর্যায়ে শালা দুলাভাইয়ের সম্পর্ক হয়েছিল বাবা- ছেলের মতো, ব্যপারটা যারা এ বাসায় নিয়মিত আসা যাওয়া করতো তারা স্পস্ট ভাবে অনুমান করেছিল। কিন্তু যারা অন্যদের মতো শুধু নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য বসে থাকতো, তারা ছেলেটিকে চিনেছিল কী! এভাবে সময় অতিবাহিত হলে বছর কয়েক পরে মেয়েটির সঙ্গে ছেলেটির আবার দেখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে আদও কোন সম্পর্ক ছিল কিনা ব্যপারটি না বুঝলেও তাদের গোপন সম্পর্ক পুনরায় শুরু হয়েছিল! এভাবে ছেলেটি তুলি-মিলি-রিতা-মিতা অনেকের সঙ্গে তার গোপন সম্পর্কের সূত্র গড়ে তুলেছিল হয়তো, যেটা মেয়েটি ওর চোখ দেখে বুঝতে পারতো। তবে ছেলেটি মেয়েদের দিকে তেমন তাকাতে সাহস করত না। ছেলেটি যখন অনার্স ফাস্ট ইয়ার মেয়েটি তখন শেষ বর্ষের ছাত্রী। ছেলেটি ভার্সিটি যেত একা কিংবা রিতা-মিতার সঙ্গে। আড় চোখে অন্যান্য মেয়েদের দিকে তাকালেও ট্রেনে ক্রসদৃষ্টি বিনিময় করত মেয়েটির সঙ্গে এবং সব সময় দৃষ্টির সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। চট্টগ্রামের সাটল ট্রেনের বগিতে বগিতে গানের ঝড় উঠতোÑলালন, হাসনরাজা, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জেমস, ম্যাডোনা, জর্জ মাইকেল, ব্যাক স্ট্রিট বয়েজ, স্বরচিত কিছুই বাদ থাকতো না। কোনো বগিতে তীব্র রাজনীতির গন্ধ ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে বের হয়ে যেত। কেউ মার্কসবাদের তীব্র গন্ধে- কেউ রাজতন্ত্রের গন্ধে- কেউবা আমেরিকার আধুনিক গণতন্ত্র চর্চায় নিজেদের আপ্লুত করে রাখত। ছেলেটি তখন নিজেকে কনট্রোল করতে না পেরে রুগ্ন সমাজতন্ত্রের অবস্থা, আমেরিকার গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠাত। বলতো, আমেরিকা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে পারমানবিক বোমা ফালাইয়া একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষ না মাইরা একটা নির্দিষ্ট হারে প্রতিদিন খুন করতাছে, না খাওয়াইয়া মারতেছে। তুলি-মিলি ছেলেটির কথায় সায় দিলে সে তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলতো- আমেরিকাতো গণতন্ত্রের নামে গণহত্যা চালাইতাছে সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রক্ত চুইষা নিয়া দেশের পর দেশ ধ্বংশ কইরা চলছে..। ছেলেটির কথায় মেয়েটির চেতনার দরজা খুলে যেত। ভাবত, পৃথিবীর সৃষ্টি লগ্ন থেকেই বহু জাতি আমেরিকার মতো এ রকম মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল আবার মানব সভ্যতার নিয়মেই তাদের পতন হয়েছিল। আমেরিকার পতনও নির্ধারিত হয়ে গেছে। এখন সেটা সময়ের ব্যাপার । ছেলেটি আবার যখন বলতো, বাংলাদেশে গণতন্ত্র নামে যা হইতেছে তা পুরাটাই প্রহশন। বন্ধুরা তার কথায় অট্টহাসি দিয়ে তাকে থামিয়ে বলতো, আর নেতাগিরি করতে হবে না। মেয়েটিও চোখ ইশারা করত। টে্েরনর জানালার বাইরের বাতাস হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়ার হুমকি দিত- ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গে ফেনিয়ে ওঠা ছেলেটির রক্তের গতিও থেমে যেত।
ট্রেনে চড়ার আকঙ্খা ছিল ছেলেটির ছোটবেলা থেকে । পিরোজপুর- চট্টগ্রাম রুটে কোনো ট্রেন ছিল না। এ জন্যই তার ট্রেনে ওঠার ইচ্ছেটা প্রকট হয়ে উঠেছিল। প্রথম সে যখন তার বড়আপার সঙ্গে ট্রেনে চড়ে চট্টগাম থেকে ঢাকায় বড় মামার বাসায় যাবে শুনেছিল তখন চোখ থেকে তার ঘুম চলে গিয়েছিল। সে শুনেছিল ট্রেনের জানালা দিয়ে চলন্ত দৃশ্যগুলো খুব সুন্দর দেখায়। প্রথমে শহরের পর শহর, রাস্তার পর রাস্তা, পাহাড়ের পর পাহাড়, নদীর পর নদী, গ্রামের পর গ্রাম আস্তে আস্তে একসময় ফাস্ট ক্লাস রুমে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেশে চলে গিয়েছিল। একমাত্র ট্রেনে চড়ার প্রবল ইচ্ছাটাই তাকে চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে পড়তে বাধ্য করেছিল। ছেলেটির সরকারি কর্মকর্তা বড়মামা অবশ্য বলেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। ঢাকা ছেলেটির ভালো লাগতো না- পুরো ঢাকা শহরকে তার প্যান্ডোরার বাক্সর মতো মনে হত। ছেলেটির বাবা তাকে অনেক গল্প শোনাত। তার মধ্যে প্যান্ডোরার সেই বাক্সের গল্পও ছিল। ..প্যান্ডোরা ছিল গ্রিক পুরাণের প্রথম নারী যাকে পৃথিবীর মাটি দিয়ে বানান হয়েছিল। স্বর্গিয়যুগে দেবতারা যখন যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মত্ত তখনকার ঘটনা। অলিম্পাসের দেবতারা যখন টাইটানদের কাছ থেকে স্বর্গ ছিনিয়ে নেয়, তার কিছুকাল পরে তারা পৃথিবীতে নতুন প্রাণী সৃষ্টি করার কথা ভাবে। এবং সে দায়িত্ব দেয়া হয় এপিমেথেউস ও প্রমিথিউস নামে দুই ভাইকে। এপিমেথেউস পৃথিবীতে মানুষ নামে নতুন প্রাণীর সৃষ্টি করলেন এবং তাদের ভালো ভালো গুণ দিয়ে দিলেন। এক সময় প্রমিথিউস দেখেন মানুষকে দেয়ার মত কোন বিশেষ গুণই আর বাকি নেই। সে তখন স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে এনে মরনশীল মানুষের হাতে তুলে দিলেন। এদিকে আগুন চুরি করায় দেবরাজ জিউস প্রচন্ড ক্ষেপে গেলেন। তাই দেবরাজ জিউস প্রমিথিউস ও মানব জাতিকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি দেয়ার জন্য, হেফেথাসকে দিয়ে একটি মাটির তৈরি নারী বানিয়ে নেন এবং যার নাম দেয়া হয় প্যান্ডোরা। প্যান্ডোরাকে তৈরি করার জন্য ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতিকে বেছে নেয়া হয় মডেল হিসিবে। প্রত্যেক দেবতাই অবদান রেখেছে প্যান্ডোরাকে গড়ে তুলতে, সবাই কিছু না কিছু উপহার দিয়েছে প্যান্ডোরাকে। আফ্রোদিতি তাকে দেয় সৌন্দর্য-লাবন্য-আকাঙ্খা। হামিস তাকে দেয় চাতুর্য ও দৃঢ়তা, এ্যাপোলো নিজে তাকে সংগিত শেখায় এভাবে প্রত্যেক দেবতাই তাদের নিজেদের সেরাটা দিয়ে সাজিয়ে তোলে প্যান্ডোরাকে। সবশেষে দেবরাজ জিউসের স্ত্রী হেরা প্যান্ডোরাকে উপহার দেয় হেরার অনন্য বৈশিষ্ট্য কৌতুহল। সবাকিছু দিয়ে সাজাবার পর প্যান্ডোরাকে দেবতাদের তরফ থেকে উপহার হিসেবে পাঠানো হয় এপিমেথেউসের কাছে। তাকে বলা হয় তার ভাই এর কৃতকর্মের জন্য তার ওপর কোন রাগ নেই সেটা প্রমাণ করার জন্য জিউস এই উপহার পাঠিয়েছে। এপিমেথেউসের ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ভাই প্রমিথিউস তাকে নিষেধ করেছিল দেবতাদের কোন উপহার গ্রহণ করতে। কিন্তু প্যান্ডোরাকে দেখামাত্র তার প্রেমে পড়ে যান এপিমেথেউস। এপিমেথেউস-প্যান্ডোরার বিয়েতে প্যান্ডোরাকে দেবরাজ জিউস উপহার দেন এক অপূর্ব বাক্স কিন্তু নিষেধ করে দেন এটি খুলতে। যতদিন এটি বন্ধ থাকবে ততদিনই সুখে-শান্তিতে এপিমেথেউস ঘর করতে পারবে প্যান্ডোরাকে এটাও বলেন তিনি। দেবরাজ জিউসের নিষেধাজ্ঞা পরাস্ত হয় দেবরাণী হেরার দেয়া উপহার কৌতুহল এর কাছে। বিয়ের উপহার একবার দেখতে প্যান্ডোরা বাক্সটি খোলামাত্র বাক্সবন্দী রোগ-জরা-হিংসা- দ্বেষ- লোভ-মিথ্যা ইত্যাদি সব স্বর্গীয় নীচুতা ছড়িয়ে পরে মানুষের পৃথিবীতে, প্যান্ডোরা যখন বাক্সটা বন্ধ করতে পারে তখন শুধু আশা রয়ে যায় সেই বাক্সে। এইভাবেই পৃথিবীর প্রথম ও একমাত্র সর্বগুণে গুণান্বিত স্বর্গীয় মানবী পৃথিবীর জন্য নিয়ে আসে নারকীয় দুর্ভোগ..। বাবার বলা গল্পটির সঙ্গে ছেলেটি ঢাকা শহরকে তুলনা করে। তার কাছে মনে হয় সব ভাল কিছু দিয়ে গড়ে ওঠা এই ঢাকা শহর নিজেই খুলে দেয় অথবা প্রতিদিন সকালে অদৃশ্য কেউ একজন খুলে দেয় প্যান্ডোরার সেই বাক্সের মুখ- আর বেরিয়ে আসে অশুভ সব ছায়ারা। বিষাক্ত সাপের মতো লকলকে জ্বিভ বের করে গ্রাস করে প্রতিটি মানুষকে। মানুষের আত্মাকে। এই বিষ দংশনে দংশিত হয় প্রতিটা মানুষ। ছেলেটি মনে করে প্রতিটি মানুষের ভেতরেও আছে একটি করে প্যান্ডোরার মতো বাক্স। তবে ছেলেটি কখনো সেই বাক্সের মুখ খোলে নি। কেননা ছেলেটি ছিল কবিতার মুগ্ধ শ্রোতা। গান গাইত গলা ছেড়ে। সকলের জন্য ছিল তার নিবেদিত প্রাণ তবুও স্টেশনে অপেক্ষামান চোখ বসে থাকত। কোনো দিন মেয়েটির পোশাক বিন্যাস দেখে বুঝে ফেলত আজ স্বামীর সঙ্গে মনোমানিল্য হয়েছে কিনা- কোনো দিন না দেখেও বুঝতে পারত শাশুড়ির সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে বলে রাগ করে আজ ভার্সিটি মুখো হবে না। সারাদিন বাড়িতে একা একা মনের আকাশে অভিমানের মেঘেরা ঘনীভূত হবে। দুপুরের গোসল হবে না, খাওয়া হবে না, চুলে খোঁপা করা হবে না, পরীক্ষার প্রস্তুতি হবে না- এভাবে সারাদিন চতুর্ভূজ টিভি বাক্সে চোখ আটকে থাকবে অথবা জানালা বাক্স দিয়ে মন ছুটে যাবে আকাশের সান্ন্যিধ্যে। ছেলেটিও সেদিন একা হত। ট্রেনে উঠত ঠিকই কিন্তু পরবর্তী স্টেশন হালিশহর নেমে যেত- রিকশা নিয়ে পুরোনো জায়গা- ওয়ার সেমিট্রি, ফয়েজ লেক, পতেঙ্গা, কফি ইনে কফি খেয়ে কিছু মধুর মুহূর্ত রোমান্থন করে স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফিরত। মাঝে মধ্যে ছেলেটির মন ফেরারী হতে ইচ্ছে করত- গুনগুন করে সেদিন গাইত.. আমায় ডেকো না ফেরানো যাবে না,ফেরারী পাখিরা কুলায় ফেরে না..।

০৩.
আজ সকালে প্রচন্ড ট্রেনের হুইসালে ঘুম ভেঙ্গে গেলে মাথা ধরে যায় আমার। সাতটায় ট্রেনগুলো বিমান বন্দর স্টেশন ছেড়ে যাবার আগে এরকম হুইসাল দেয়। উত্তরায় রেললাইন ঘেষা সেক্টরগুলোতে বসবাসকারীদের মাঝে মধ্যে প্রচন্ড শব্দের অত্যাচার সহ্য করতে হয়। অবশ্য চার বছর আগে স্বামীর ব্যবসার কারণে ঢাকায় আসার পর ট্রেনের হুইসালে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আজ খারাপ লাগছিল গত রাতে ঘুমের ডিসটার্ব হওয়ার জন্য। মেয়েটা জ্বরে কষ্ট পাচ্ছে যেদিন স্বাধীন ফোন করেছিল সেদিন থেকে। শুনলাম সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে স্বাধীন নাকি বাসায় ফেরে নি। ভাবলাম, বোধয় রক্তের সন্ধানে নেমেছে! রক্ত না দেয়ার জন্য মনটা খুত খুত করছিল। মায়ের মন সন্তানের অমঙ্গলের আশঙ্কায় দুর্বল হয়ে পড়ছিল। বার বার মনে হচ্ছিল মেয়েরও যদি ডেঙ্গু হয়! গত ৫ দিন ধরে জ্বর একশ তিন চারের নিচে নামছিল না। ডাক্তার বলেছে, রক্ত টেস্ট করার আগে কিছু বলা যাবে না। সকালে রক্তের টেষ্ট করাতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে মনটা যখন ভারাক্রান্ত তখনই বাসার ফোনটা বেজে ওঠে- স্বাধীনকে পাওয়া গেছে!!
প্রতিদিন পেপারে কিংবা টিভিতে দেখি পৃথিবী থেকে অসংখ্য মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে, অপহরণ ও গুম হয়ে যাচ্ছে। এদের কাউকে উদ্ধার করা যাচ্ছে, কারো লাশ পাওয়া যাচ্ছে, কেউ বেওয়ারিশ লাশ হয়ে আঞ্জুমানে মুফিদুলে। ইদানীং ঢাকা শহরে অনেক ঘটনার মধ্যে অপহরণ একটি অতি সাধারণ ঘটনায় পরিনত হয়েছে। সংঘটিত ঘটনার একটা ক্ষুদ্রাংশ শুধু আমরা জানতে পারি- অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপহরণকারিরা চলে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
অনেক সময় হারিয়ে যাওয়া ব্যাপারটা আমার কাছে নির্বাসনে যাওয়ার সমতুল্য বলে মনে হয়। হারিয়ে গিয়ে অনেকে নতুন জীবন পায় আবার অনেকে মৃত্যুকে বেছে নেয় আবার অনেকে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যায়। উন্নত দেশগুলোতেও প্রতিদিন অনেক মানুষ উধাও হয়ে যাচ্ছে। শুনেছি কানাডায় দিনে দুপুরে মানুষ গায়েব হয়ে যায়- জাপানে অপহৃত ব্যক্তির লাশও পর্যন্ত পাওয়া যায় নাÑ চীনে সরকার বিরোধী লোকরাও প্রতিনিয়ত গায়েব হয়ে যাচ্ছে- তেমনি ইন্ডিয়াও। বাংলাদেশেও প্রতিদিন ফুসমন্তরের মতো উধাও হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। গুম হয়ে যাওয়া মানুষের মধ্যে যারা লাশ হয়ে যাচ্ছে মিডিয়াগুলোতে তাদের প্রদর্শন নিয়মিত হয়ে গেছে। পরিবেশনার গুণে এই মৃত্যু দৃশ্যগুলো অগুরুত্বপূর্ণ সংবাদে পরিনত হচ্ছে। অথচ মানবিকতার বিচারে এ মৃত্যুগুলো মোটেই গুরুত্বহীন রুটিন সংবাদ নয়। প্রতিদিন নানান র্দুঘটনায় নিহত উন্মুক্ত মৃতদেহগুলো প্রদর্শনে করে একই কাহিনীর পূনরাবৃত্তি করে চ্যানেলগুলো বাহবা পেলেও ব্যপারটা অমানবিক। স্বাধীনের লাশও বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত হলো। উহ! কী বীভৎস।
কী অদ্ভূত সুন্দর ছিল স্বাধীন! মডেল তারকা নভেলের মতো দেখতে ছিল বলে অনেকে ওকে নভেল বলে ভুল করতো। এ কী পরিনতি ওর! শুরু হলো ওকে নিয়ে নানান কাহিনী। বাচ্চার অসুখ নিয়ে ব্যাস্ত থাকায় দুনিয়ার খবর থেকে দূরে ছিলাম। স্বাধীন যেদিন রক্তের জন্য ফোন করেছিল সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। পরদিন অফিস বন্ধ থাকায় সে বন্ধুর বাসায় যাবে বলে বের হয়ে তিনদিনেও বাসায় ফিরে না। মোবাইল বন্ধ পেয়ে ওর দুলাভাই পেপারে স্বাধীনের ছবিসহ ‘ফিরে আসো’ শিরোনামে নিখোঁজ সংবাদ দেয়। কোনো কোনো পত্রিকার ব্যাকপেজে ছবিসহ নিখোঁজসংবাদ দেয়.. নাম-স্বাধীন হাওলাদার, বাবা- আব্দুর রাজ্জাক হাওলাদার, থানা- নাজিরপুর, জেলা-পিরোজপুর, বয়স-৩৩, উচ্চতা-৫-৭, গায়ের রঙ ফর্সা, মাঝারি গড়ন, গত ১৩ জুন থেকে নিখোঁজ। কেউ তার কোনো খোঁজ পেলে নি¤েœর নম্বরসমূহে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।..
পরপর দু’দিন একই সংবাদ দিলে সকালে বিমান বন্দরের কাছে কাউলা রেলক্রসিংয়ের কাছে মুখে মুখে গল্প রচিত হয়, রেললাইনের ওপর বসে অনেকে নাকি পেপারে দেয়া ছবির মতো একজন মাানুষকে পেপার পড়তে দেখেছে। সেখানটায় ট্রেনের ক্রসিং জেনেও সদা কৌতুহল বাঙ্গলীরা তাকে বাঁধা দেয়নি। এ সময় সিলেটগামী পারাবাত ট্রেন এসে পড়লে হঠাৎ মানুষটা সামনের দিকে জাম্প করলে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বিপরীত দিকে ট্রেনটি দ্রুত চলে যায়। ট্রেনের গতির চেয়ে মানুষটার গতি কম হওয়ায় মাথায় প্রচন্ড আঘাত লেগে পড়ে গেলে হাত ও পা কাটা যায়। উপস্থিত এক রিক্সাওয়ালা ঘটনা স্থানে দৌড়ে এসে পা ও হাতের খন্ডিত অংশসহ তাকে রিক্সায় ওঠায়। মেইন রোডে এসে ট্যাক্সি ক্যাবে করে পঙ্গু হসপিটালে নিয়ে যায়। যেতে যেতে মানুষটি নাকি বলেছিল, আমার নাম স্বাধীন। আমার বোনের নম্বর.. পঙ্গুতে নেবার পরে শেষবার বলেছিল, আমি বাঁচতে চাই…
স্বাধীনের দুলাভাই ট্রান্সফার হয়ে উত্তরায় পাঁচকাঠা জায়গার উপর তৈরী বাড়ি কিনে পরিবারসহ ঢাকায় চলে আসেন বছরখানেক আগে। ততদিনে স্বাধীনের মাস্টাস-এর রেজাল্টও হয়েগিয়েছিল। বিসিএস দেয়ার পাশাপাশি গাজীপুর একটি বায়িং হাউজে মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে জয়েন করেছিল যার ডাইরেক্টর ছিল একজন মহিলা। চাকরিটিতে স্বাধীন সাচ্ছন্দবোধ করছিল না। সে ভেবেছিল তার দুলাভাই অন্তত তাকে ইনকামটেক্সে একটা চাকরি পাইয়ে দেবে! এবং এ ব্যপারটা নিয়ে সে প্রায় বিষন্ন থাকতো। কেননা সে জানতো সমাজের রাঘব- বোয়ালদের কারণে বিসিএস-এ তার চাকরি হবে না।
পঙ্গুতে পৌছে ক্যাব চালক উত্তরায় ফোন করে। সবাই পৌছাতে পৌছাতে সব শেষ। স্বাধীন তখন লাশ। পঙ্গু থেকে লাশ ঢাকা মেডিকেলে আনা হয় পোস্ট মোর্টেমের জন্য। সঙ্গে মিডিয়ার লোকেরাও প্রবেশ করে। শুরু করে অবাস্তব সব প্রশ্ন!
অফিসের কিছু ডকুমেন্টস কলিগের বাসায় পৌছে দেবে, এটাই ছিল বড়বোনকে বলা শেষ কথা। সেই ডকুমেন্টে আসলে কী ছিল? ভিরের মধ্যে অনেকে অভিযোগ তুলেছিল নেশাযুক্ত খাবার খাইয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। বায়িং হাউজের মালিক পপি ম্যাডামের সঙ্গে পরকিয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েছিল বলে তার হাসবেন্ড গুন্ডা দিয়ে তাকে হত্যা করিয়েছে, এমনটাও ভাবা অস্বাভাবিক কিছু না। ততক্ষণে ঢাকা মেডিকেলে দায়িত্বরত স্বাধীনের মামাত বোনের জামাই ডাক্তার সাবেরের পরামর্শে ব্যাপারটা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার পায়তারা চলছিল। কারণ আত্মহত্যা ব্যপারটা নাকি জেনেটিকাল। স্বাধীনের বড়ভাইও নাকি আত্মহত্যা করেছিল। ডাক্তার আরো জানায় আত্মহত্যার একশ ভাগ কারণই মানসিক। তার মধ্যে শতকরা সত্তর ভাগ আত্মহত্যা করে বিষন্নতা রোগের কারণে এবং বিষন্নতার কারণে যেসব আত্মহত্যা করে তার বেশীরভাগই ঘটে ভোর চারটা থেকে বেলা ২টার মধ্যে। অনেকে প্রশ্ন করে তাহলে এই পাঁচদিন স্বাধীন কোথায় ছিল? ডাক্তার জানায়,অবশেসন রোগে রোগীর মনের ভেতর থেকে একটি তাড়না আসে যখন রোগীর ইচ্ছা হয় দশতলা থেকে লাফ দেই, সারা শরীরে আগুন লাগিয়ে দেই, গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ি, রেললাইনে ট্রেনের নীচে শুয়ে পড়ি ইত্যাদি।
অন্যদিকে পুলিশও জানায় ট্রেনে কাটা লাশের নাকি পোস্টমোর্টেম হয় না। শেষমেষ লাশের পোস্টমোর্টেম হয় না। মনেমনে ভাবি, স্বাধীন বিসন্নরোগে আক্রান্ত ছিল কিনা জানি না তবে সব সময় অস্থির থাকতো। কী যেন এক ব্যস্ততা তাকে তাড়া করে বেড়াতো। চায়ের দোকানে, কফি হাউজে, পার্কে কোথাও ২-৩মিনিটের বেশী বসতে পারতো না। স্বাধীন নিজেকে হয়ত অপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিল। শুধুমাত্র আমাদের সম্পর্ক ছাড়া প্রচলিত সব ব্যাবস্থাই তার কাছে আরোপিত বলে মনে হতো। তাই ওর বিয়ের কথা ঠিক হয়ে গেলেও সে সবাইকে এড়িয়ে চলতো। আমাকে ভালবাসতো বলেই কি বিয়ে করতে চায় না বলে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল? নিজেকে অপরাধী মনে হয়।
বিকেলে লাশ বাসায় জানাজার জন্য উত্তরায় আনা হলে সবার সঙ্গে আমিও যাই। দুঃখে নুয়ে ছিল বাড়িটি। শোকে স্বাধীনের বড় বোন বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিল। বেচারি বোন ছোটবেলা থেকে মাতৃ¯েœহে লালন করেছে। ভাইয়ের মৃত্যুতে আজ সে অসহায় নির্বাক। কার কাছে বিচার চাইবে? তবে স্বাধীনের বোন ছাড়া আর কারো চেহারায় শোকের ছায়া স্পস্ট ছিল না। বড় মামার ম্যাজিস্ট্রেট ছেলে ও মেয়ের মাত্রাতিরিক্ত মাতুব্বরিভাব উপস্থিত সবাইকে বিস্মিত করছিল! তারা দু’জনে মোবাইলে এমন ভাবে মৃত্যুর খবরটা প্রকাশ করছিল যেন কাউকে তার বিয়ের খবর দিচ্ছিল। তারাই জানায়, নারায়নগঞ্জের একজন পুলিশ নাকি ফোন করে বলেছিল, গতকাল আমরা পেপারের ছবির মতো হুবহু চেহারার মিল একজনকে স্টেশনের কাছে আনমনা ভাবে সিগারেট খেতে দেখেছিলাম। যথেষ্ট প্রমান না থাকায় আমরা তাকে ধরতে পারিনি। শুনে সবাই বলে, হারামজাদা পুলিশের বাচ্চা! দেশের প্রশাসনও পারল না স্বাধীনকে উদ্ধার করতে।
অন্যদিকে দুলাভায়ের রহস্যজনক আচরন অনেকের নজর এড়িয়ে যাচ্ছিল। তিনি বাদি হয়ে আত্মহত্যা নয় হত্যা বলে কেস করতে চাইলে, অদৃশ্য এক হাত তাকে বাঁধা দিতে থাকে। ক’দিন আগে জমি সংক্রান্ত ব্যপারে তার একমাত্র ছেলে শাতিলকে তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা! শাতিল মনে করে তারা স্বাধীনকে কিডনাপ করেনি তো! তাছাড়া সরকারি চাকরী করে বিশাল সম্পদের খবর পাছে ফাঁস হয়ে যায় ভেবে দুলাভাই চুপসে যায়।
ফুফাতো বোন ডাক্তার রুমির উক্তি- স্টুপিড আত্মহত্যা যখন করবিই যেদিন বের হইছিলি সেদিনই করতি! খামাখা এই কয়দিন মানুষরে হয়রানি করলি কেন! পোলিওতে আক্রান্ত স্বাধীনের মামাত বোন মিলি যার ক্রাস ছিল স্বাধীন সে বলে, আহারে এই স্বাধীনতার মাসে তোর জন্ম এই স্বাধীনতার মাসেই তুই মরলি। মামাতো ভাই রনজুর মোবাইলে বারবার একটি পরিচিত নাম্বার থেকে মিস কল আসছিল দেখেও সে নিরবে তসবিহ টিপছিল।
নিঁখোজ হবার আগে পর্যন্ত যে মানুষের উপকারের কথা ভাবত, পুরো মাসের খরচের টাকা কোনো গরিব ছাত্রের হাতে তুলে দিয়ে নিজে সেচ্ছায় দারিদ্রকে আপন করে নিতো সে আজ এতো অপ্রিয় হয়ে গেল! কেন? স্বাধীনের যাযাবর প্রবনতা পরিবারের সদস্যরা মেনে নিতে পারেনি! তাই পরিবারের মধ্যে থেকেও পরিবার থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছিল সেটা আজ উপলব্ধি করলাম। আহা ওর চেহারা চেনা যাচ্ছিল না, পাঁচ দিন বোধয় নাওয়া খাওয়া হয়নি, দাড়ি গোঁফ দেখে অনেকে বলছিল, এ অন্য কারো লাশ!
যদি তাই হতো তাহলে কী হতো! মনের গভীরে কেমন হু হু করে ওঠে। সবার সামনে নিজেকে আড়াল করতে পারব না ভেবে বেরিয়ে আসি। স্বাধীনের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পোঁড়া দাগ। মনে হচ্ছিল সিগেরেট দিয়ে কেউ ছ্যাকা দিয়েছে। মাথার পিছনটায় ট্রেনের ধাক্কায় থেতলে গিয়েছিল বলে রক্তক্ষরণে মারা গেছে, ডাক্তাররা এমনটাই বলছিল। মৃত্যুর রহস্য নানান প্রশ্নের জন্ম দিয়ে স্বাধীন শায়িত হয়ে যাবে মায়ের কবরের পাশে। এক সময় সবাই গন্তব্যে চলে গেলে ভুলে যাবে স্বাধীন নামে কেউ ছিল। কিন্তু আমার ব্রেনের সেন্ট্রাল লোবে বোহেমিয়ান শব্দটা স্থায়ী হয়ে যাবে চিরদিনের জন্য।



এই প্রতিবেদন টি 584 বার পঠিত.