প্রকৃতি নাচে রুদ্ররোষে

রোকসানা লেইস 
বর্ষণ মুখর দিনগুলি বড় আনন্দমুখর। ভালোবাসা মগ্ন, রোমান্টিক। কিন্তু বর্ষণ হতে হতে যখন সব ভেসে যায়। ডুবে যায়, পথ, উঠান থেকে ঘর। পানির শক্তির কাছে হারিয়ে যায় অনেক কিছু। তখন অসহায় হয়ে দেখা ছাড় আর কোন উপায় থাকে না।
পৃথিবীর তাপমাত্র বাড়ছে এর জন্য সারা বিশ্ব জুড়ে হচ্ছে অনেক বৃষ্টি এ বছর। বরফ গলে গেছে মেরু এলাকায়। বৃষ্টি কি ভাবে হয়। তাপে নদী সাগর পৃথিবীর তাবদ জলাধার থেকে উষ্ণ জল বাষ্প হয়ে আকাশে হানা দেয় মেঘদল হয়ে ভাসে এবং বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসে পৃথিবীর বুকে বাতাসের চেয়ে ভাড়ি হয়ে আর বাতাসে ভেসে থাকতে না পেরে ।
গাছ পৃথিবীর তাপকে নিয়ন্ত্রন করে।
বিশ্ব জুড়ে নগরায়নের ঢেউয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে গাছ । ভরাট করা হচ্ছে খাল নালা মাঠ। আগে যেসব জায়গায় বৃষ্টির পানি বন্যার পানি পথ খুঁজে পেত, সব এখন আমাদের বাসা বড়ি থাকার জায়গা। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আমাদের দালান কোঠাগুলো সুন্দর করার সাথে আশেপাশের দিকে নজর দেই না আমরা। বাড়ি বানানোর সাথে আর কোন বিষয়ে নজর থাকে না নিজের বাড়িতে সুন্দর সাজানো থাকার সাথে পাশে রাস্তা। আমাদের বর্জ্য ফেলার জন্য জায়গা তার রিসাইকেল। পানি নিস্কাসন এবং সিটির পানি বা গ্যাস বিদ্যুৎ পাওয়া এত সব বিষয়ে খুব একটা আমরা ভাবি না।
নগরায়নের অফিসগুলো যে শহর উন্নয়নের ভালো পরিকল্পনা করে তেমন নয়। গতানুগতিক ধারার এক নিয়ম সব সময় চলছে। এবং যদিও বা কিছু নতুন স্ংস্করনে কিছু কাজ আপনি করতে পরবেন না বলে, নিয়ম জানায় অফিস থেকে সে নিয়মকে আমরা থোরাই তোয়াক্কা করি। টেবিলের নিচ দিয়ে টাকা পায়সার লেনদেন সেরে আমাদের দালান কোঠা উঠে যায় শহরের রাস্তার পরে। অথবা নিয়ম না মেনে চারতলার জায়গায় আট দশতলা। অথবা পরিমানের অতিরিক্ত পানি বিদ্যাৎ গ্যাসের চাহিদার কথা কেমন করে তা আসবে এসব না ভেবেই চলে ইমারত নির্মাণ। এবং যে দু চারটা সবুজ ছিল তা কেটে সাফ হয়। নিঃশ্বাসের সুস্থতার জন্য কোন সবুজ বনভূমি থাকে না।
সবুজ মাঠ জুড়ে মানুষের বসবাস। গাড়ির আনাগোনা শুরু হয় সাথে ব্যবহৃত উচ্ছিষ্ট, পলিথিন ব্যাগে ভর্তি করে ফেলে দেই যত্রতত্র। পলিথিন অনেক বছরেও নষ্ট হয় না। শহরের ড্রেনগুলোর খোলা মুখে ঢুকে পরে এই সব পলিথিন, বন্ধ করে দেয় নর্দমার পানি যাতায়াতের পথ। উপচে উঠে নোংরা যা আমরাই ছূড়ে দিয়েছি , দখল করে নেয় রাস্তা। প্রতিদিন আধুনিক শহরের রাস্তাগুলো পেরুতে হয় এই নোংরা মাড়িয়ে বৃষ্টির দিনে।
অামরা তখন ক্রমাগত সরকারকে গালিগালাজ করতে থাকি। মেয়রকে বকাঝকা করি।
নিজেরা সচেতন না হয়ে শুধু অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে এই সব বিপদ থেকে পার পাওয়া যাবে না। যতদিন প্রতেকে নিজের জায়গায় সঠিক কাজটি না করবে।
উন্নয়নের সবটুকু শুধু বড়বড় দালান কোঠার মাঝে সীমিত না। এর সাথে পারিপার্শিক অনেক সচেতনতা জড়িত। পরিবেশ সম্পর্কে কতটা শিক্ষা লাভ করি আমরা ছোটবেলা থেকে এবং তা পালন করি যথাযথ ভাবে নিজেদের ক্ষেত্রে। কিছুদিন আগে কিছু ছবি দেখছিলাম।
জাপানের কিছু মানুষ বাংলাদেশের পথঘাট সাফ করছে। আর তাদের দেখে হাসাহাসি করছে বাংলাদেশের মানুষ তাদের সাথে কাজে না লেগে এবং কাজ না শিখে। বিকৃত ভাবে ছবি আপলোড করছে ফেসবুকে। যদি এসব মানুষ জাপানে একবার ঘুরে আসার সুযোগ পেত জানত কি ভাবে তারা দেশটাকে পরিচ্ছন্ন রাখে। উত্তর আমেরিকার দেশ থেকে জাপানে বেড়াতে গিয়ে আমি লজ্জিত হয়েছিলাম ওদের পরিচ্ছন্নতা ঝকঝকে তকতকে জীবন যাপন দেখে। উত্তর আমেরিকায় যখন নানা দেশের অধিবাসী এসে নিজেদের মতন জীবন যাপন করে অনেক কিছু আগের মতন সরকার নিয়ন্ত্রন করতে পারে না। ব্যাক্তি মানুষের জীবন যাপন তাদেরকে শোধরাতে হয়। জাপানে প্রতিটি শিশু স্কুলে শিখে পরিচ্ছন্নতা। উত্তর আমেরিকায়ও প্রতিটি শিশু শিখে পরিচ্ছন্নতা। কাজেই যারা এসব দেশে লেখাপড়া করে বড় হয় তারা কখনো রাস্তায় যেতে যেতে ছূড়ে দেয় না খাবারের বক্স রাস্তায়। কিন্তু অধিবাসীরা নিয়ম না মেনে অনেকেই, অনুন্নত দেশের মতন ব্যবহার, করে এসব উন্নত দেশগুলোতেও।
যখন একটা সমস্যা হয় তখন হুমড়ি খেয়ে তাকে নিয়ে পরা হয়েছে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল মানুষের স্বভাব। কিন্তু সুদূর প্রসারি চিন্তা ভাবনা। নিয়ে কোন পরিকল্পনা করা তাদের দ্বারা হয় না। খাপছাড়া ভাবে দুচার জনের চিন্তা ভাবনা সবার কাছে প্রাণ পায় না। প্রাণ পেত যদি কোন জন প্রতিনিধি এই আহ্বান করত উন্নয়নের জন্য। সরকারি ভাবে বাধ্যতা মূলক হতো নিয়ম কানুন। যেমন হয় উন্নত দেশগুলোতে।
যখন শীত অসে প্রচণ্ড, বন্যায় ভেসে যায় সব কিছু বা প্রচণ্ড গরম পরে তখন শুরু হয় উদ্যোগ কিছু সংস্থার বা ব্যাক্তিগত উদ্যোগে টাকা তুলে সাহায্য করার। এবং সব আয়োজন করতে করতে শীত শেষ হয়ে যায়, বন্যর পানি নেমে যায়। গরমের তীব্রতা কমে যায়। এসব অর্জিত সাহায্য তখন কোথায় কার কাছে যায় কে জানে। তবু মানবিক ভাবে যাদের খুব একটা সামর্থ নেই তারা মানুষের দূর্দশা দেখে এগিয়ে আসে। কিন্তু যারা নেতা হওয়ার জন্য ব্যস্ত তাদের খুব একটা দেখা যায় না ততপরতায়। সরকার এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত অফিসের কর্মিদের ঘুম ভাঙ্গে সবার পরে।
এই দূর্যোগগুলো আসার আগে কেউ কথা বলে না। শহরের মেয়রদের বলে না পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য আগে থেকে প্রস্তুত হতে। নদীগুলোর নাব্যতা কমিয়ে গভীর করার কথা যেন জল বয়ে যাওয়ার জায়গা পায়। শীতে পথে থাকা মানুষের জন্য আবাসন দেয়ার চিন্তাবা গরম কাপরের ব্যবস্থা কেউ করে না আগে ভাগে। খাখা বিরান গাছপালাহীন দালান কোঠা কলকারখানা রাস্তার পাশে অনেক গাছ লাগিয়ে অক্সিজেন বাড়ানোর বিষয়ে কতজন ভাবে।
কিন্তু বিশ্ব জুড়ে পরিবেশ নিয়ন্ত্রন বর্তমানের তাপমাত্র বৃদ্ধি নিয়ে কথা হচ্ছে অনেক আগে থেকে। কতটা সম্পৃক্ত এ সচেতনাতার সাথে বাংলাদেশের মানুষ। শিক্ষা ক্ষেত্রে বাচ্চাদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করায়। গৃহে কাজ করা মানুষদের জ্ঞান দেয়ায়।
তবু ভালো এক শ্রেণীর মানুষ, বাঁচার তাগিদে রাস্তার পাশের ডাস্টবিন থেকে বোতল, শিশি, প্লাস্টিক টিন কৌটা ইত্যাদি কুড়িয়ে কিছুটা হালকা করে পরিবেশের ভাড়।
এ শ্রেণীর মানুষ আবার মহা ব্যস্ত হয়ে যায় দেশের বন্যার কারণে ভারতকে দোষ দেয়ার জন্য। প্রবল বর্ষনে নিজেদের দেশ ভেসে যেতে থাকলে বাঁধ খুলে পানি ছেড়ে নিজেদের বাঁচার ব্যবস্থা তারা করবে। আপনার ঘরে পানি জমলে আপনি কি সেটা আটকে নিয়ে বসে থাকবেন না বের করে দেবার চেষ্টা করবেন কোথায় যাচ্ছে সেটা না ভেবে?
যেহেতু ভৌগলিক ভাবে বাংলাদেশের অবস্থান পানি প্রবাহের দিকে। তাই এ সমস্যা কাটানোর জন্য ব্যবস্থা নিজেদেরকে নিতে হবে। সরকারের দায় এখানে অনেক বেশী, পরিবেশ রক্ষা করার। মানুষকে সচেতন করার। জনসাধারনের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে পরিবেশ সচেতনতা। এবং পরিবেশ অনুয়ায়ী প্রাকৃতির ভয়াবহ দূর্যোগ মোকাবেলার জন্য আগে থেকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
প্রকৃতি আপন খেয়ালে নিজেকে সংশোধন করে চলে। আমরা আমাদের আবাস ভূমিকে নানা ভাবে ক্ষতবিক্ষত করছি।
প্রায় দশ বছর আগে একটা লেখা লিখেছিলাম বিপর্যস্ত পৃথিবী নামে । গ্লোবাল ওর্য়ামিং আর আধুনিকতার বিপর্যস্ত অবস্থা আমাদের কতটা ক্ষতির সম্মুখিন করছে। এখনও অনেকে তা অনুধাবন করতে পারেন না। অনেক আগেই সাবধান করেছে পরিবেশবাদীরা পৃথিবীতে পানির পরিমাণ বাড়ছে। উত্তরের মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাবে। মেরু অঞ্চলের শ্বেত ভালুক হারিয়ে যাবে। তাতে তাদের তেমন অসুবিধা হবে না স্বল্প সময়ে।
বাংলাদেশ তলিয়ে যাবার আশাংকা করেছে তারা সাগরের জলে। আরো অনেক দেশ ডুবে যাবে। সাগরের জলে।
এত যে ধনাঢ্য জীবন যাপন মায়ামী, ফ্লোরিডার কিছু মানুষের, তাদের বাড়ির সামনে শুধু গাড়ি পার্ক করা থাকে না থাকে প্রাইভেট প্লেনও। তাদের মিলিয়ন ডলারের বাড়ির আনাচে কানাচে পানির থৈ থৈ অবস্থান হয় সময়ে সময়ে। পরিবেশের কাছে সবাই অসহায়। নিজেরা যদি আমরা সচেতন হয়ে কিছুটা রক্ষা করার চেষ্টা না করি তা হলে তাড়িৎ হবে এই ডুবে যাওয়া। উন্নত বিশ্বের গ্রীনহাউস এ্যাফেক্টের প্রভাব কাটাতে কানাডার সতেরটি শহর পরিবেশ বান্ধব শহরে নাম লিখিয়েছে। এই শহরগুলো সবুজ শহর এবং নিয়ন্ত্রন করছে পরিবেশ যথাযথ ভাবে।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানি না মানুষের জীবনের দূর্বিসহ দূর্ভোগ নিয়ন্ত্রেন করতে। ঋতু ভিত্তিক দূর্যোগ শুধু নয় মানুষ অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে নানা রকম অস্বাভাবিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হচ্ছে। পরিবেশ ক্ষতি করা পরিমানের অধিক ব্যবহারকৃত সার দেয়া ফসল খেয়ে। পরিবেশ সুস্বাস্থ, সুস্থতা অনেক বিষয় জড়িত যা শুধু একটা দিক দেখলে চলে না। প্রাথমিক ভাবে দরকার সাধারন জ্ঞান প্রতিটি মানুষের। এক সময় মানুষ নদীর পানি পান করত। যত্রতত্র প্রাকৃতিক কাজ মল মূত্র ত্যাগ করত। এসব নিয়ন্ত্রন হয়েছে কিছুটা প্রচার দিয়ে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে কাজ করতে হবে সবাইকে। পরিচ্ছন্নতা শুধু ঘরে নয় বাইরের বিষয়ে অরো বেশী নজর রাখতে হবে । সমস্যা আসার আগে তা নিয়ন্ত্রনের জন্য ব্যবস্থা রাখতে হবে।
ক্যালিফর্নিয়ার বাড়িগুলোতে বড় বড় বক্সে শুকনা খাবার,বোতলে পানি, র্টচ লইট ব্যাটারি এমন কিছু জিনিস জরুরী প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য রাখা হয় সব সময়। কারণ এই জায়গা ভুমিকম্পের আওতাভূক্ত। যদিও অনেক বছরে কখনো ভূমিকম্প হয়নি তবু তারা সব সময় জরুরী অবস্থার এই প্রয়োজনীয় সামুগ্রী ঘরে রাখে একটা সময়ের পরে পরিবর্তন করে নতুন করে রাখা হয়।প্রয়োজনে বিপদে খাবার পানি পাওয়ার জন্য।
বন্যা এসে ঘরবাড়ি ডুবায় না শুধু। সাথে নিয়ে যায়। সারা জীবনের সঞ্চয়। বছর মেয়াদি খাবার, শস্যদানা কোথায় নিয়ে যাবে মানুষ যখন সব তলিয়ে যায়।
অনেকে চাল ডাল ত্রান দেন। কিন্তু কি ভাবে রান্না হবে। শুকনা খড়ি কোথায় পাওয়া যায় বন্যায় ডুবে যাওয়া জায়গায়। রান্না করার শুকনো জায়গাই বা কোথায়। পূর্ব দক্ষিণ অঞ্চলের পর ঢাকা ডুবে গেল জমা বৃষ্টির পানিতে। উত্তর অঞ্চল সব সময় শুকনো সেখানেও বন্যার ভয়াবহতা এবার।
মানুষের জীবন যাপন কঠিন। বন্যা পরবর্তি সময় হবে আরো নিদারুণ। যারা এখনো শুকনোয় বসে আনন্দ করছেন হয়তো বন্যার পানি তাদের ছূঁবে না। কিন্তু ফসলের অভাব, প্রাণীর অভাব অনেক কিছুর অভাব এবং রোগ বালাইর প্রভাব তাদের ছূঁয়ে ফেলবে নানা ভাবে। বিদেশে দেখিছি বন্যার পানিতে বাড়ি ডুবে গেলে প্রটেক্টেড ড্রেস, মাস্ক পরে উদ্ধার কর্মিরা সব জিনিস পরিচ্ছন্ন করে। বাড়ির কিছুই আর ব্যবহার করা যায় না। ইনসরেন্স থেকে টাকা পাওয়া যায় নতুন আসবাব বা বাড়ি ঠিক করার। কিন্তু মানুষের সারা জীবনের অনেক সঞ্চয় স্মৃতি হারিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ বড় অসহায় যা হারায় তা হারায়। এছাড়া বন্যার নোংরা জল ঘেটে চলতে হয় পথ জীবনের তাগিদে। পরিচ্ছন্ন হওয়ার বিশুদ্ধ পানিও পাওয়া যায় না অনেক ক্ষেত্রে। রোগ এসে বাসা বাঁধে এই পানির সংস্পর্শে।
পৃথিবী জুড়ে বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি। নতুন নতুন পরিবর্তনের সাথে নতুন ভাবে বাঁচার পথ খুঁজতে হবে। মানুষের কান্না থামুক। দূর্ভোগ দূর হোক প্রকৃতি তুমি সবুজ সুস্থতা দাও।



এই প্রতিবেদন টি 345 বার পঠিত.