কোনো বিচারপতির রায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসেনি

হাসানুল হক ইনু

১৯৭২ সালের সংবিধান আমাদের মূল সংবিধান। এই মূল সংবিধানের ওপরই পরবর্তীতে অনেকবার হাত দেয়া হয়। বিশেষ করে সামরিক শাসন আমলে একে কাটছাঁট ও বহু অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সামরিক শাসনের চাপিয়ে দেয়া আবর্জনা থেকে সংবিধানকে মুক্ত করা শুরু হয়। তারই প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ১৫তম সংশোধনী। পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ সংশোধনী-সবই মূল সংবিধানে ফেরত যাওয়ার জন্যই। এই ১৬শ সংশোধনীও মূল সংবিধানে প্রত্যাবর্তনেরই আরেকটি পদক্ষেপ। কার্যত এটি সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করার নতুন কোনো বিধান নয়, মূল সংবিধানে প্রত্যাবর্তনের একটি বিধান মাত্র। কিন্তু শুধু এবারই প্রথম মূল সংবিধানের অনুচ্ছেদ বাদ দিয়ে সামরিক শাসনের অনুচ্ছেদ গ্রহণ করার রায় হলো-এ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

রায় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অধিকার স্বীকৃত। রায়ের পরও রাজনৈতিক উস্কানীমূলক বক্তব্য, রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে বলেই রায় দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মাত্রা কিছুটা তীব্র। পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে এনে উনি নিজেই উত্তেজনা বাড়িয়েছেন।

তবে এ রায়, কোনো সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেনি, সরকার ও বিচার বিভাগকে মুখোমুখিও করেনি। এ রায়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও কিছু নেই। সরকার পরিচালনায় কোনো প্রভাবও ফেলবেনা, কোনো অচলাবস্থাও তৈরি হবে না।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অর্থ কি ?

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এক বিষয়, আর দায়বদ্ধতা আরেক বিষয়। বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়টি দায়বদ্ধতার সঙ্গে জড়িত। সুতরাং ষোড়শ সংশোধনী সংবিধান প্রদত্ত বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতার ওপর কোনো হস্তক্ষেপ নয়, মূল সংবিধান অনুযায়ী দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া মাত্র। অধস্তন আদালতের বিচারকের অপসারণ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে। ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়ে এ রায় এ ব্যাপারে রহস্যজনক নিরবতা পালন করেছে, শুধু উচ্চতর আদালতের বিচারকদের কথাই বলেছে। মনে রাখতে হবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে এই, বিচার কাজ ও প্রক্রিয়ায় সরকার বা বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ বা প্রভাব না ঘটা। সংবিধান প্রদত্ত এই স্বাধীনতা সরকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। আপনারা দেখেছেন এ রায়ের পর থেকে আপিল নিস্পত্তি পর্যন্ত সরকারের কেউই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের ব্যক্তিবর্গের রায় সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ সরকারকে বিচার বিভাগের মুখোমুখি দাঁড়ও করায়নি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও ক্ষুণœ হয়নি। এ রায়ে যারা উল্লসিত হয়ে মিষ্টি বিতরণ করছেন এবং কাল্পনিক সাংঘর্ষিক অবস্থা খুঁজে পাচ্ছেন তারা মূলত চক্রান্তের রাজনীতির পাঁয়তারা করছেন।

বিতর্কের সূচনা কে করেছেন ?

আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, সরকার রায়ের জায়গাটুকু ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি বা রায়ের প্রক্রিয়া কোনো হস্তক্ষেপও করেনি। রায়ের বিষয়বর্হিভূত প্রসঙ্গে মাননীয় প্রধান বিচারপতি যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন, তা-ই বিতর্কের সূচনা করেছে, সরকার কোনো বিতর্কের সূচনা করেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের ব্যক্তিবর্গ মাননীয় প্রধান বিচারপতির অপ্রাসংগিক বক্তব্যের উত্তর দিয়েছেন মাত্র।

১৬শ সংশোধনীর বিষয়ে হাইকোর্টের যে সার্টিফিকেটেড রায় সুপ্রীম কোর্টে উপস্থাপন করা হয়, সেখানে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ, সংসদের ক্ষমতা, দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানাদিসহ যে বিষয়গুলোর উল্লেখ নেই, সেই বিষয়গুলো টেনে এনে মাননীয় প্রধান বিচারপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা বিভ্রান্তিকর। তিনি সংসদকে খাটো করেছেন, মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করেছেন। মনে রাখতে হবে, রায়ের ভেতরে দেয়া পর্যবেক্ষণ রায়ের অংশ হিসেবেই পরিগণিত হয়। মাননীয় প্রধান বিচারপতি নিজস্ব বক্তব্যকে রায়ের অংশ বানিয়ে ফেলেছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ যথা, নির্বাহী, আইন ও বিচারবিভাগ-এই অংশগুলোর মর্যাদারক্ষা বিচার বিভাগেরও দায়িত্ব। এ অঙ্গগুলো সম্পর্কে তীর্যক মন্তব্য করে তিনি তাদের বিতর্কিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। কিন্তু রেওয়াজ হলো, যাদের বিরুদ্ধে তিনি তীর্যক মন্তব্য করতে চান, সেই অঙ্গগুলোর বক্তব্যও তাকে আগে শুনতে হয়। বিচারপতিদের শপথ অনুসারে কোনো অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হওয়া চলে না। আমাদের দেখতে হবে-

১। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ সম্পর্কে তীর্যক মন্তব্য করলে তাতে শপথ ভঙ্গ হয় কি না ?

২। তিনি সংসদকে কোনো নির্দেশ দিতে পারেন কি না ?

৩। রায় পর্যবেক্ষণে ’৭১ এর শান্তি কমিটি দিনের রাজাকারি ও রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারি-এই মন্তব্য দিয়ে তিনি রাজাকারদের হালাল করার সুদূর প্রসারি পরিকল্পনার ফাঁদ পাতছেন কি না ?

৪। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদে বলা আছে সুপ্রীম কোর্টের রায় অধস্তন আদালতের অবশ্যই পালনীয়। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ হাইকোর্টে বিচারাধীন অবস্থায় এ বিষয়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ কি সেই বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যহত বা প্রভাবান্বিত করলো না ?

 

আমরা মনে করি, এ রায় যুক্তিনির্ভর নয়, অগ্রহণযোগ্য। সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিলও ত্র“টিমুক্ত (Full-proof) নয়।

১। আমরা বিচারপতি অপসারণের তিনস্তর প্রস্তাব দিয়েছিলাম। বিচারপতিদের বিষয়ে অভিযোগের সকল তদন্ত অন্য কেউ নয় বিচারপতিদের কমিটিই করবেন। সংসদ সেই তদন্তে পর্যবেক্ষণ করবে এবং রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু রায়ে একস্তর অর্থাৎ সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলই বহাল রাখা হয়েছে।

২। আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, যে সকল বিচারপতিরা অবৈধ সামরিক শাসনকে বৈধতা দিয়েছেন, জাল সার্টিফিকেট দিয়েছেন, দুর্নীতি করেছেন, আজ পর্যন্ত তাদের বিষয়ে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

৩। মূল সংবিধানের ৯৪(৪) অনুচ্ছেদে বিচারপতিদের অপ্রসারণের ক্ষমতা সংসদে দেয়া ছিল। তখন ১১৬(ক) এ বর্ণিত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণœ হয়নি। এখন কেন তা ক্ষুণœ হয়েছে বলে রায় দেয়া হলো ? ১৯৭২ সংসদ পরিপক্ক ও কার্যকর ছিল। এখন সংসদ অপরিপক্ক ও অকার্যকর বলা হচ্ছে-কোন মাপকাঠিতে ? পরিপক্কতা ও কার্যকারিতার সংজ্ঞা কি ? মূল সংবিধানের কি রিভিউ হয় ?

৪। রায় পর্যবেক্ষণের ২৪৬ পাতায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন, বিচারপতিদের জবাবদিহিতা উচ্চতর আদালতে, মানুষের কাছে, গণমাধ্যম, গবেষণাকারি, একাডেমিশিয়ানদের কাছে। তাহলে সবার কাছেই জবাবদিহিতা, কেবলমাত্র সংসদের কাছেই নয় ? কেন ? দেখুন, বিচারপতিদের নিয়োগ দেয় জনগণ, রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে। তাদের জবাবদিহিতাও তাই জনগণের কাছেই থাকা উচিত। আর জনগণের প্রতিনিধি হচ্ছে সংসদ। তাহলে সংসদে জবাবদিহিতা করতে বাধা কোথায় ?

৫। মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন, রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে, ব্যবসায়িরা সংসদে। কোথায় লেখা আছে ব্যবসায়িরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারবেন না ?

৬। মাননীয় প্রধান বিচারপতি বলেছেন, স্বাস্থ্যখাত খারাপ, প্রশাসন নিম্নমানের কাজ করে, অবাধ দুর্নীতি চলছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ। আমিতো দেখছি, জঙ্গি দমনে আমরা সফল হচ্ছি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জনসেবা-প্রশাসনের মান বাড়ছে। তিনি ঝেড়ে সব খারাপ বলছেন, ব্যাখ্যা দেননি। কোন কোন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি এই ঢালাও মন্তব্য করেছেন-তা বলেননি বা রাষ্ট্রের কোন অঙ্গ সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করলে তাদের মন্তব্যও নিতে হয়, তা নেননি।

৭। মাননীয় প্রধান বিচারপতিসহ ছয় বিচারপতির ভিন্ন ভিন্ন মত আছে, পর্যবেক্ষণ আছে। রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুসরণীয় কর্তব্য। তাহলে কোন অংশ ব্যক্তিগত মতামত আর কোন অংশ অনুসরণীয় কর্তব্য হবে ?

 

এ সকল কারণেই এ রায় গ্রহণযোগ্য নয়। কিভাবে আমরা সামনে এগুতে পারি-

১। আমরা পুঙ্খাণুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করছি, কিভাবে একে আইনি প্রক্রিয়ায় অপ্রাসঙ্গিক সকল পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহারসহ রায় পুণর্বিবেচনা করা যায়।

২। সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিও ভূমিকা রাখতে পারেন।

৩। সংসদ রায়ের ওপর আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে।

৪। সেই সাথে মাননীয় প্রধান বিচারপতি শপথ ভঙ্গ করেছেন কি না, তাও বিচার্য। মাননীয় প্রধান বিচারপতি যেখানে নিজেই অনভিপ্রেত মন্তব্য দিয়ে বিতর্কের সূচনা করে জনমনে নিজেকে এবং বিচার বিভাগের ভাবমূর্তিকে একটি বিতর্কিত অবস্থানে নিয়ে গেছেন, এই ভাবমূর্তি রক্ষার্থে তিনি নিজেই স্বত:প্রণোদিত হয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের অবসান ও বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি অক্ষুণœ রাখবেন কি না তাকে ভেবে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।

 

পরিশেষে বলবো, আদালতের বারান্দায় কোনো বিচারপতি রায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসেনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবিসংবাদিত নেতৃত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রসঙ্গে খন্ডিত-বিকৃত-উদ্দেশ্যমূলক কোনো রায়ের নামে ইতিহাসের ভ্রান্তচর্চার মাধ্যমে জাতির ইতিহাস বিকৃতিও ঘটানো সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে স্বাধীন বাংলাদেশ তার নিজস্ব পথেই চলবে।



এই প্রতিবেদন টি 374 বার পঠিত.