জীবনের সমান বন্ধু

শোয়াইব জিবরান 
আমি আর মুজিব একসাথে যাত্রা শুরু করেছিলাম জীবনের, সাহিত্যের। আমাদের প্রথম যোগাযোগ হয়েছিল পত্র যোগাযোগের মাধ্যমে। মুজিব তখন কামালপুর বাজার থেকে ‘কল্পতরু’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করতো। আর আমি মৌলভীবাজার শহরের সেন্ট্রাল রোড থেকে ‘ঊর্মি’। ঊর্মি তখন ওই জেলার একমাত্র নিয়মিত সাহিত্যপত্রিকা। আমরা একজন আরেকজনের পত্রিকায় লেখা পাঠাতাম ডাকযোগে তার সঙ্গে থাকতো চিঠি। এ সূত্রে আমরা পত্রবন্ধুতেও রূপান্তরিত হয়েছিলাম। আমরা পরস্পর দেখতে কেমন জানতাম না, ভাবিওনি, তবে পরস্পরের হাতের লেখাকে চিনতাম। একই বংশের হয়া গেছিলাম। আমাদের প্রথম দেখা হয় কলেজ জীবনে। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আমরা দুজনই ওই অঞ্চলের সেরা কলেজ সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজে ইন্টারে ভর্তি হই। সাইন্স গ্রুপে এবং একই সেকশনে। কিন্তু ক্লাশে আমাদের প্রথম কথা হয়নি। প্রথম কথা হয় কলেজ হোস্টেলে সিট পেতে গিয়ে। কলেজ হোস্টেলে সিট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এসএসসির নম্বর ও মৌখিক পরীক্ষা বিবেচনায় নেয়া হত। যেদিন মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হবে সেদিন সকালে হোস্টেল সুপারের অফিসের সামনে আমরা জড়ো হই। সেখানে মোটাসোটা একটি সহপাঠি আমার চোখে পড়ে, শীর্ণ আমাকেও হয়ত তার নজরে পড়ে। অথবা আমরা অদৃশ্যটানেই নিজেদের দিকে এগিয়ে আসি। নাম জিজ্ঞাসা করলে সে বলে, আমার নাম মুজিব। আমি বলি মুজিবুর রহমান মুজিব? হ্যাঁ সূচক উত্তর পেলে বলি, আমি শোয়াইব আহমেদ শোয়েব! তারপর আমরা সম্ভবত হ্যান্ডশেক না করে শরমিন্দা. শরমিন্দা হই।
আমাদের মৌখিক পরীক্ষা হয়। আমাদের দু’জনের সিট হয়। সুপার অধ্যাপক বাকীবিল্লাহ্ রসায়নের হলেও ছিলেন সুফিবাদী ফলত খানিকটা সাহিত্যমনা। তিনি আমাদের দু’জনকেই ভীষণ পছন্দ করেন এবং ৫ নম্বর হোস্টেলের পাশাপাশি রুম ৫০১ ও ৫০২ বরাদ্দ করেন। আমরা প্রতিবেশী হই। আমাদের হোস্টেল স্মৃতি খুবই রঙিন। রসালো। সে সব এখানে লিখবো না। আত্মজীবনীর জন্য তোলা থাকলো। জাস্ট দুষ্টুমীর একটা উদাহরণ দিই- কলেজ হোস্টেলের টিভি রুম ছিল আলাদা হলঘরে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দাঁড়িয়ে এক সময় বক্তৃতা করেছিলেন। সে টিভিরুম থেকে আমরা ফিরছি। আমি সামনের দলে। হঠাৎ মনে হল পেছনে পায়ের দিকে গরম কিছু পড়ছে। ফিরে দেখি, মুজিব আমাদের দিকে মুতু করতে করতে এগুচ্ছে। তারপর স্বাভাবিভাবেই তাকে দৌঁড়ানি দেয়ার পালা। বেচারাকে এত বড় দেহখানা নিয়ে রাতের অন্ধকারে হোস্টেল মাঠ পাড়ি দিতে হল। মুজিব দেখতে দৈত্যাকৃতির হলেও স্বভাবে ছিল শান্ত। এদিক থেকে আমি ছিলাম হ্যাংলা-পাতলা কিন্তু মারকুটে। সে কারণে এর পা্র্শ্ব প্রতিক্রিয়া তাকে সহ্য করতে হতো। হোস্টেলের খাওয়া-দাওয়ার মান ছিল খুবই খারাপ। আমি দুই বছর খাওয়া-দাওয়ার খুবই কষ্ট পেয়েছি। মুজিব নিশ্চিয়ই বেশি। তবে সে ক্ষতি আমরা পুষিয়ে নিতাম অধ্যাপক ড. সফিউদ্দিন আহমদ স্যার আর কবি দিলওয়ারের বাসায় গিয়ে। এ দুজন ছিলেন আমাদের ডবল সক্রেটিস। সফিউদ্দিন স্যার আমাদের সমাজতন্ত্রের দীক্ষা দিয়েছিলেন আর কবি দিলওয়ার তো আমাদের নাম পাল্টেই দিয়েছিলেন। মুজিব ইরম আর শোয়াইব জিবরান রেখেছিলেন।
বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনার উদ্দেশ্যে আমরা একই সাথে ঢাকা গিয়েছিলাম। সফিউদ্দিন স্যারের তদবিরপত্র নিয়ে হাজির হয়েছিলাম আব্দুল্লাহ্ আবু সায়ীদ স্যারের কাছে। ঢাকা কলেজে। সায়ীদ স্যার আমাদের নানাভাবে চেষ্ঠা করেছিলেন যাতে আমরা ঢাকা কলেজে বাংলায় না পড়ি। কিন্তু আমরা ভর্তি হয়েছিলাম ঢাকা কলেজেই। সেখানে অনেক উজ্জ্বল বন্ধুদের পেয়েছিলাম। কবির হুমায়ূন, রবিশঙ্কর মৈত্রীসহ অনেককে। আমরা মেস ভাড়া নিয়েছিলাম ১৮৪, ফকিরাপুল দারোগা বাড়িতে। পরে সে মেসে এসে যোগ দিয়েছিল স্বাতন্ত্র সম্পাদক আতিক রহমান। তারপর শাহবাগ, টিএসসি, হাকিম চত্বর, সিলভানা, সাকুরা সব একাকার হয়ে গিয়েছিল। আমরা এক সাথে অনেকগুলো লিটলম্যাগাজিন বের করতাম। শব্দপাঠ, স্বাতন্ত্র্য, কিউপিড, মঙ্গলসন্ধ্যা, সূচক, উত্তর আধুনিক। শব্দপাঠের সম্পাদক হিসেবে আমার নাম ছাপা হলেও অন্তরালে কাজ করতো মুজিব। অন্যান্য পত্রিকাগুলোর বিষয়ে একই কথা। আমরা একটি সাহিত্যবৃত্ত রচনা করেছিলাম। পরে সরকার আমিন তাঁর জীবনের মাছগুলোতে লিখছিলেন, আমরা এই শহর তখন শাসন করতাম।
বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের প্রথম ব্যাচে আমরা একই সাথে মূলত টাকার লোভে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে জেনিস মাহমুন, চঞ্চল আশরাফ, মুজিব ইরম, কবির হুমায়ূন ও আমাকে একত্রে ডাকা হতো পঞ্চপাণ্ডব । শারীরিক গঠনের কারণেই ভীম চরিত্রটি পেয়েছিল মুজিব। আর যে কোনো মারামারিতেও আমরা মুজিবকে সামনে রাখতাম। সেটা সিলেটেও করে এসেছি। শিবগঞ্জ এক মেসে কবি ইকবাল বাল্কিমীর সাথে প্রতিপক্ষের মারামারিতে মুজিবকে দেখে ওরা অগেই পালিয়ে গিয়েছিল।
ঢাকা শহরে আমরা মানিকজোড় হিসেবে সারাজীবন কাটিয়েছি। পরে আমি জাহাঙ্গীরনগরে চলে গেলেও সে বন্ধন ছিন্ন হয়নি। আমরা প্রায় নিয়মিতই একসাথ হয়েছি, আড্ডা দিয়েছি। কর্মজীবনেও মুজিব প্রবাসী হলেও আমাদের যোগাযোগ হয় নিয়মিত। আমরা জীবনের যে কোনো বেদনায় বা আনন্দ-উৎসবে মিলিত হই একই বৃন্তে। আমাদের স্মৃতি আছে আরও আরও। নিশ্চয় বিস্তারিত লিখবো শিঘ্রই অন্য কোনো দিন, অন্য কোনোখানে।



এই প্রতিবেদন টি 143 বার পঠিত.