ঈদের ছুটিতে  

মোঃ ওসমান ফারহান আল হারুনঃ  ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় রবী ঠাকুরের ছড়া, জাতীয় কবি নজরুলের সাহিত্য পড়ে বড়বেলায় জানলাম স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, অমর্ত্য সেন আর সৌরভ গাঙ্গুলীদের মত ব্যক্তিত্বের কথা। নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলা ভিনদেশের “দাদারা” আসলে কেমন, তা জানতে প্রায় দু’তিন ধাক্কায় ভিসা পাওয়ার পর ইচ্ছে ছিল দার্জিলিং দিয়ে ভারত সফর শুরু করার, শেষ ঈদের ছুটিতে। কিন্তু বিধি বাম; জাতিগত গন্ডগোলের কারনে ইউ এস বাংলার বিমানটি আমাদের প্রথমে নিয়ে এল কলকাতার বিশাল এয়ারপোর্টে যেখানে বিদেশ সফরে সর্বপ্রথম উপলদ্ধি করলাম আমাদের আবেগ “বাংলার” ব্যবহার। এই সেই “কলকাতা”যেখানে রয়েছে কবিগুরুর শান্তিনিকেতন, আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম সেই শান্তির সুবাতাস পাওয়ার জন্য ৬ দিনের ভারত সফরে এসে।

যোগাযোগের জন্য একটা সিম কার্ডের প্রয়োজনীয়তা ছিল সর্বপ্রথমে। কলকাতায় এসেই আমরা অপেক্ষা করছিলাম দ্বিতীয় আরেকটা বিমানে দিল্লী যাওয়ার জন্যে। আশায় বুক বেঁধে সিমের জন্য এয়ারপোর্টে যখন ঘোরাঘুরি করছিলাম, খোদার দয়ার পেয়ে গেলাম এক বাংলাদেশী যাত্রীকে। বিনা সংকোচে তার “দুস্প্রাপ্য” মোবাইল সিমখানা আমাকে দিয়ে দিলেন; কৃতজ্ঞচিত্তে দেশী ভাইকে মনে মনে অনেক দোয়া দিলাম; কেননা, এই “সিম” খানা ভারতে সহজেই মেলে না বাংলাদেশের মত। আমরা বাংলাদেশীরা মনের দিক থেকে যে অনেক বড়, পুরো ভারত সফরে তা ভালভাবে উপলদ্ধি করতে পেরেছি বিভিন্নভাবে প্রথম যা অনুধাবন করেছি US-Bangla-র ফ্লাইটে সাজ্জাদ বিন ও তার সহকর্মীদের আতীথেয়তায়।

দিল্লীর উদ্দেশ্যে ভারতের বিমান Indigo কলকাতা বিমানবন্দর ছেড়ে যেতে তখনও বেশ খানিকটা সময় বাকি। ভাবছিলাম, সুপরিসর বিমানবন্দরে মনোরম রেস্তোরায় দুপুরের খাবার সরবো প্রথম স্থানীয় খাবারের স্বাদে। পেমেন্ট কাউন্টারে এক বাঙ্গালীর সাথে কথা বলার পরই হুশ হল ইতিমধ্যে ফ্লাইট ডিপার্চারের সময় হয়ে গেল বলে। সেদিন পরিকল্পনা ছিল মুরগী বা সবজির বিরিয়ানী দিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়া। এটি খেতে যেয়ে কলকাতাতেই আমাদের শেষ পর্যন্ত থেকে যেতে হত হয়ত, বাকী সব পরিকল্পনা বাদ দিয়ে ফ্লাইটে আর দিল্লী যেতে হত না। ধন্যবাদ সেই কলকাতার দাদাকে অন্তর থেকে যিনি আমাকে সময় সম্পর্কে সজাগ করে দিয়েছিলেন। এখানে এসে সবচেয়ে ভাল লেগেছিল Women empowerment এবং নারী স্বাধীনতার অনুকুল পরিবেশ দেখতে পেয়ে। দিল্লীর ফ্লাইটে সেই জন্যই কিনা বিমানবালাদের বাহুতে লেখা ছিল Girl’s Power. সফরসূচী অনুযায়ী দিল্লী, আগ্রা ঘুরে এসে দ্বিতীয়বার কলকাতায় প্রবেশ করি সুদীর্ঘ ২০ ঘন্টার ট্রেন যাত্রার পর। দুর্ভাগ্যবশত, যে সময় আমরা কলকাতা সফরে এসেছিলাম, ভ্রমনের জন্য সেটি অনুকুলে সময় ছিল না। রোদ, বৃষ্টি আর বাতাসের প্রচন্ড আদ্রতায় কখনও ভিজে একাকার। তবে “শিয়ালাদহ্ রাজধানী” ট্রেনে ভ্রমনের সুখস্মৃতি স্মরণ করব আমৃত্যু হয়ত। ভোজনরসিক বাঙ্গালীদের এ রকম একটি ভ্রমনের জন্য হলেও একবার কলকাতায় যাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। হরেক রকম খাবার ট্রেন যাত্রার শুরু থেকে আসতে শুরু করল রাত অবধি। খাবারের মধ্যে পার্থক্য একটিই-আমিষ নতুবা নিরামিষ। ভারতীয়রা বেশী সবজিভোজী বিধায় একজন বাংলাদেশী হিসেবে ভারত সফরে গেলে যে কেউ এই প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন- Veg নাকিNon-Veg? সুদীর্ঘ সেই ট্রেন যাত্রার আগে রেলষ্টেশনে অপেক্ষার সময় তৃতীয় বিশ্বের জনবহুল একটি দেশের কিছু সাধারন চিত্র চোখে পড়ল যেখানে মুসলমান এবং অন্য ধর্মবলম্বীরা পাশাপাশি অবস্থান করছে। বিমান সফরের চেয়ে ট্রেন যাত্রা সুখকর ছিল বিশ্রামের জন্যেও। বিরামহীন ট্রেন যাত্রায় আমাদের আশেপাশের কম্পার্টমেন্টে অবস্থানরত বাংলাদেশী পর্যটকরা মজার গল্পে যখন মশগুল, জানালা দিয়ে তখন আমি অবলোকন করছিলাম গ্রাম-বাংলার দৃশ্য, ঠিক বাংলাদেশেরই অনুরূপ।

ভারত সফরে এসে একমাত্র কলকাতাতেই দেখলাম রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পোষ্টার, নগরের সর্বত্র। বাংলাদেশীরা ছুটিতে এখানে আসছেন ঝাঁকে ঝাঁকে, সপরিবারে। হোটেল “ডি-এম্প্রেসা” তে পা রাখতেই বুঝতে পারলাম দেশী ভাইরা সব আশেপাশে। দুপুরের খাবার খেতে বের হলে আবিস্কার করলাম এ তো পুরোই ঢাকা শহর ! বাংলাদেশীরা সর্বত্র বিরাজ করছে সুদুর কলকাতায়, যার একটি বড় অংশ আসে বাসে চেপে। ইচ্ছে করে সে বেলায় ভর্তা, সবজি আর মাছ দিয়ে ভাত খেতে বসলাম হৈ চৈ মুখরিত পরিবেশে। রেষ্টুরেন্টের বেয়াড়া জানাল রেস্তোরা থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল “ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল” এর দূরত্ব বেশী নয়। তার ভুল দিক নির্দেশনায় ১৫-২০ মিনিট হাঁটার পর ট্যাক্সিতে চেপে গন্তব্যস্থলে পৌছলাম।তবে শহর হিসেবে কলকাতা অনেক যে পুরনো এবং ঐতিহ্যবাহী, তা আবিস্কার করলাম সহজেই। হিন্দী ছেড়ে বাংলাতে সবার সাথে কথা বলার সুবিধা কলকাতা সফরের একটি আর্শীবাদ বৈকি !

“ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল” এ এসে আমার ফ্রান্স সফরের কথা মনে পড়ছিল, স্কুল জীবনে যেখানে অনেক বেড়িয়েছিলাম এক সময়। পুরোপুরি একটা রাজপ্রাসাদ, যার ভেতর এক সময়ে নামকরা বৃটিশ শাসকদের কতগুলো মুর্তি এবং পেইন্টিং দ্বারা সাজানো। মেমোরিয়ালে সে সময় চলছিল বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের আলোকেচিত্র প্রদর্শনী। সুদর্শন এ চলচ্চিত্রকারের অসাধারন ব্যক্তিত্ব এবং কার্যাবলীর কিছু ছবি অবলোকনের পর সংলগ্ন বাগানে আমরা সুন্দর সময় কাটালাম। এরপর ট্যাক্সিতে চেপে নিউমার্কেটে যেতে যেতে জানতে পরালাম বাংলাদেশীরা এই এলাকাতে বেশী থাকেন বা উঠেন যদিও এ একটি রুম ভাড়া পাওয়া অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার। নামে “নিউ” হলেও এই মার্কেটটাকে আমাদের গাউসিয়া মার্কেটের চেয়ে বেশী কিছ মনে হয়নি। তবে দামে সস্তা বিধায় এই জায়গার কদর বেশী বলে মনে হয়েছে। সফরের শেষ বেলায় এরপর গেলাম নতুন ও পুরনো “হাওড়া ব্রিজে”, পথে চোখে পড়ল বিশ্ববিখ্যাত ইডেন গার্ডেন স্টেডিয়াম ও কলকাতার নামকরা ক্লাবের সুন্দর মাঠগুলো। পুরো ভারত সফরে “ইকোনমিক” টার্মটা আক্ষরিক অর্থে টের পেলাম কলকতাতে এসে, বিশেষ করে রাতে পিৎজা, পাস্তা খেতে একটা রেষ্টুরেন্টে যেয়ে। মজা পেয়েছিলাম প্রাত:রাশে অল্প তেলে কিভাবে ডিম ভাজা যায়, তা দেখে।

নিরামিষভোজী ভারতবাসীদের মত মিতব্যয়ী হওয়া আমাদের দেশের বাঙালীদের জন্যে হয়ত দুস্কর, তবে নিজ শহরকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, রাস্তায় এবং সর্বত্র একটা সিস্টেমে চলা, জিনিষপত্রের  দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা এই সফরের শিক্ষনীয় বিষয় বৈকি। সর্বোপরি, ভারতীয় ও বিদেশী পর্যটকদের মাঝে দর্শনীয় স্থানের টিকেটের প্রবেশমূল্যের আকাশপাতাল ব্যবধান ভারত সরকারের কাছে পুন:বির্বেচনার দাবী রাখে, নিঃসন্দেহে। সার্ক দেশগুলোর পর্যটক, বিশেষত বাংলাদেশীদের জন্য নমনীয় নীতি অনুসরন করলে তাদের রাজস্ব ও বাড়বে; কেননা, প্রতিনিয়ত ভারতে বাংলাদেশী পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে। রবী ঠাকুরের দেশে এসে আরেকটি শিক্ষনীয় বিষয় হল পেশাদার ফটোগ্রাফার ও ট্যুরিষ্ট গাইড সার্ভিস যা বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানগুলোতেও সহজে চাল করা যায়, বিশেষত পর্যটন মৌসুমে। ইতিহাসের সঠিক জ্ঞান এবং ইংরেজী ভাষায় দক্ষতা থাকলে বাংলাদেশের কিছু বেকার যুবক ট্যুরিষ্ট গাইড হিসেবে ভাল অর্থ উপার্জন করতে পারবে অনায়সেই। সবার আগে আমাদের প্রফেশনাল ট্যাক্সি ড্রাইভারদের ইংরেজী শেখানো দরকার (সরকারের তরফ থেকে) বিদেশীদের সাথে কমিউনিকেশনের সুবিধার্থে। কারণ, নতুন
একজন বিদেশী পর্যটকের জন্যে একজন ড্রাইভার ভাল ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করে অনেক সময়।

কলকাতায় আরেকটি দিন বেশী অতিবাহিত করতে পারলে রবী ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে ঠিকই যাওয়ার চেষ্টা করতাম। সাথে যদি “প্রিন্স অফ কলকাতা” সৌরভ গাঙ্গুলীর সাথে দেখা করার সুযোগ হত, তবে তো সোনায় সোহাগা! ভবিষ্যতে তা করবার আশায় বৃষ্টিমুখর দিনে কলকাতাকে এইবারের জন্য বিদায় জানালাম।



এই প্রতিবেদন টি 700 বার পঠিত.