দেশে চলমান বন্যায় প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত

দেশে চলমান বন্যায় প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সচিবের চলতি দায়িত্বে থাকা গোলাম মোস্তফা ১৬ জুলাই বুধবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান। বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
গোলাম মোস্তফা জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার পরিবার আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে ৩৭ জন। এখন পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১ হাজার ৫৯৯টি। এগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা ৪ লাখ ১১ হাজার।
গত ৯ আগস্ট থেকে বন্যায় ত্রাণ হিসেবে তিন হাজার ২৫০ মে. টন চাল দেয়া হয়েছে। এক কোটি ৩২ লাখ নগদ টাকা দেয়া হয়েছে। ১৬ হাজার শুকনো খাবার প্যাকেট দেয়া হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে সচিবের দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা বলেন, ‘কেউ সরকারের ত্রাণ না পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেন ইউপি চেয়ারম্যান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন’।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্ককরণ কেন্দ্রের শঙ্কার পর স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ এবারের বন্যায় ডুবতে বসেছে দেশের এক তৃতীয়াংশ অঞ্চল। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার পর ডুবছে দেশের মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। এরইমধ্যে মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, রাজবাড়ী ও টাঙ্গাইল জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এছাড়াও মাদারীপুর, শরীয়তপুর, চাঁদপুরসহ মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা সতর্ককরণ কেন্দ্র বলছে, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা নদীর পানিবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত বিপদসীমার নিচে থাকা এসব নদীর পানি গত ২৪ ঘন্টায় ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বিপদসীমার উপরে গেলে প্লাবিত হতে পারে নতুন এলাকা।
১৬ আগস্ট বুধবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. গোলাম মোস্তফা জানিয়েছেন, বন্যায় এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৩৭ জনের। ইতোমধ্যে পানিতে ডুবে গেছে দেশের ২১টি জেলার অন্তত ৭০ উপজেলার তিন লাখ হেক্টরের বেশি জমির ফসল। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ।
তবে একই দিন সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত বন্যায় ১০৭ জন মারা গেছেন।
উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্ককরণ কেন্দ্র।

গত কয়েকদিনে পানি বৃদ্ধি পেয়ে যমুনা নদীর আরিচা পয়েন্টে সোমবার বিপদ সীমা অতিক্রম করে। বুধবার বিকেল তিনটায় ওই পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬৩ সে.মি. উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে পদ্মা-যমুনার তীরবর্তী চারটি উপজেলার অভ্যন্তরে খাল-নদী-নালা বেয়ে দ্রুত পানি প্রবেশ করছে। বন্যার পানির চাপে আরিচা-পাটুরিয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের এলাচিপুর এলাকায় ফাটল দেখা দিয়েছে, অন্বয়পুর এলাকায় বাধ উপচিয়ে ভিতরে পানি প্রবেশ করছে।

মুন্সীগঞ্জে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে শ্রীনগর, লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলার কয়েক হাজার পরিবার। পদ্মা তীরের বাড়িঘর জলমগ্ন হয়ে বহু ফসলি জমি তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে।
পদ্মার পানি ভাগ্যকুল পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় টঙ্গীবাড়ি উপজেলার হাসাইল, বানারী, পাচনখোলা, নগর যোয়ার, পাঁচগাঁও, কামারখাড়া, লৌহজং উপজেলার কনকশার, যসলদিয়া, মাওয়া শ্রীনগর উপজেলার কবুতর খোলাসহ ৬ দশমিক ৩০ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার অতিক্রম করে। পরে দুপুর একটার দিকে ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৬ দশমিক ৪০ সেন্টিমিটার। ভাগ্যকুল এলাকার আরও কয়েকটি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।

বন্যার এই সর্বগ্রাসী রূপে এরই মধ্যে ডুবে গেছে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম শহর দিনাজপুর। রেল লাইন ভেঙে আর সড়কপথ ডুবে এই জেলা এখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বন্যার কবলে পড়েছে নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রাজবাড়ী, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা। বানভাসী মানুষ আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে উঁচু এলাকায়।

গাইবান্ধার পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, ব্রহ্মপুত্রের পানি ফুলছড়ি ও ঘাঘটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমার ১০৩ থেকে ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য নদীর পানি বৃদ্ধিও অব্যাহত রয়েছে। ফলে চর এলাকার মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বন্যার পানির স্রোতে ভেঙে গেছে কাঁচা ঘরবাড়ি। আশ্রয় হারিয়ে বন্যায় আক্রান্ত মানুষ এখন দৈনন্দিন কাজ সারছেন নৌকায় আর উঁচু স্থানগুলোয়। আক্রান্তরা বলছেন, এবারে বন্যার ভয়াবহতা ১৯৮৮ এর বন্যার চেয়েও বেশি।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন অপ্রতুল ত্রাণের কথা স্বীকার করছেন। তাদের দাবি নতুন বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে পেলেই তা কবলিতদের মধ্যে সরবরাহ করা হবে।

তবে নতুন শঙ্কার কথা বলছেন বন্যা কবলিতরা। পানিবন্দি অবস্থায় ডাকাত উপদ্রবের কথা বলছেন দুর্গতরা। বন্যায় সবকিছু ডুবে থাকায় আর যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত থাকায় এসময় ডাকাতির আশঙ্কা বেড়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। যদিও পুলিশ প্রশাসন বলছে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে টহল বাড়ানো ছাড়াও তারাও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

বন্যার কবলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে গাইবান্ধার ১২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এছাড়া অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় চলছে ভয়াবহ খাবার পানির সংকট। টিউবওয়েলগুলো তলিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেকেই নদীর পানি বা অর্ধনিমজ্জিত টিউবওয়েলের পানি পানে বাধ্য হচ্ছেন।

 

শহর তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি জেলার ৩৫৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে প্রায় দুই লাখ মানুষ। তলিয়ে গেছে প্রায় সোয়া লাখ হেক্টর জমির ফসল। গত শনিবার থেকে প্রায় পুরো শহর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। শহরের অলিগলিতে পানি ওঠায় অনেকে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে।

 

পানির তোড়ে রেল সেতুর গার্ডার ভেঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া রেল যোগাযোগ এখনও স্বাভাবিক হয়নি। কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সড়কের চারটি স্থান ভেঙ্গে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সোনাহাট স্থলবন্দরসহ নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থাও।

এবারের বন্যায় জেলার সাত উপজেলার তিন শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এসব গ্রামের ৩১ হাজার পরিবারের প্রায় সোয়া লাখ মানুষ। ফসলের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে জেলায়। ছয় হাজার হেক্টরের বেশি ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় আড়াইশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

জেলার প্রধান দুই নদীর পানি আরও বৃদ্ধি হওয়ায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। একটি সড়ক ভেঙ্গে যাওয়ায় আত্রাই উপজেলার সাথে জেলা সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নওগাঁ শহরের হাসপাতাল সড়ক, মুক্তিরমোড় থেকে কাজির মোড় পর্যন্ত প্রধান সড়ক জলমগ্ন হয়ে পড়েছে।

এসব জেলার পাশাপাশি বগুড়া, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়েও বিপুল সংখ্যক মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। পাশাপাশি এসব জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

 

মধ্য আগস্টে দেশজুড়ে এই ভয়াবহ বন্যার বিষয়ে বেশ কয়েকবছর আগে থেকেই সতর্ক করে আসছিল তিনটি সংস্থা। তিন বছর আগে এক গবেষণায় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকারি প্যানেল (আইপিসিসি) সতর্ক করে দিয়ে বলেছিল বর্ষা মৌসুমে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা (জিবিএম) অংশে বৃষ্টির ধরনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসবে। এতে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়বে।
আলাদা এক গবেষণায় দুই বছর আগে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে দিয়েছিল রাজধানীতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অস্বাভাকিভাবে বাড়বে। আগামী দিনগুলোতে রাজধানীতে দিনে ২০০ থেকে ৩০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের বিষয়ে সতর্ক করেছিল তারা।
আর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্ককরণ কেন্দ্র আগাম বৃষ্টিপাত আর পাহাড়ি ঢলের ধরণ দেখে মধ্য আগস্টে বন্যার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিল। দেশজুড়ে এই বন্যা এখন ওই সংস্থাগুলোর সতর্কতাকে বাস্তবে পরিণত করেছে।



এই প্রতিবেদন টি 384 বার পঠিত.