জনগণের কাছে লজ্জায় আমাদের মাথা হেট হয়ে গেল. !

খায়রুল আহসান খান
১৪ আগষ্ট ১৯৭৫ রাতে খবর পেলাম কারা যেনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বোমা ফাটিয়ছে ! শহর থম থমে ! নানা গুজবে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে ! অজানা এক শংকার কথা ভাবতে ভাবতে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলাম ! ঘুম আসে আবার চলে যায় ! পরের দিন ১৫ আগষ্ট খুব ভোরে উঠতে হবে তাই রাতে ভাল ঘুম হয় নি ! সকাল ৮ টার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌছতে হবে ! চামেলীবাগের ছাত্র কর্মীরা শান্তিনগর মোড়ে এক সাথে জড়ো হয়ে মিছিল করে যাবো ! বাসা থেকে বের হয়ে শান্তিনগর মোড়ে আবু ভাইয়ের দোকানে গিয়েছি সিগারেট আর চা খাবো বলে ! আবু ভাইয়ের নেশা ছিল রেডিও শোনার. ! সারাক্ষন রেডিওর কাটা ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে দেশ বিদেশের খবর আর গান শুনতেন. ! বিবিসি বাংলা খবর শোনার জন্য তার ছোট দোকানে ভীড় লেগে যেতো !আবু ভাইয়ের দোকানে যাওয়ার সাথে সাথেই দেখলাম আবু ভাই মাথা ন্যুয়ে ট্রাঞ্জিস্টার শুনছেন ” আমি মেজর ডালিম বলছি শেখ মুজিব কে হত্যা করা হয়েছে ! ” মনে হলো একটা কসাই এর কন্ঠ শুনছি ! বারবার একই ঘোষণা রেডিও বাংলাদেশ থেকে ” আমি মেজর ডালিম বলছি . . . . .” এই ঘোষণার পুর্ব মুহুর্তেও যা ছিল বাংলাদেশ বেতার !
আবু ভাইয়ের দোকানের আশে পাশের লোকজন জড়ো হতে শুরু করেছে ! সবাই আমার রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে সম্যক অবহিত ! আমি ছাত্র ইউনিয়ন. ও সিপিবির রাজনীতি করি ! তাই হয়তো কেউ আমার উপস্থিতিতে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করছে না ! সবাই হতবিহবল ! হতবাক ! আমি সেখান থেকে নিরবে কেটে পড়লাম ! ভাবলাম বাসায় যেয়ে আব্বা আর বড় ভাই মঞ্জুরুল আহসান খান কে খবর টা দেই. ! আব্বা এই মানসিক আঘাত সহ্য করতে পারবেন না এই ভেবে আব্বাকে আচমকাই খবর দিতে যেযেও খবর না দিয়ে শুধু বললাম ” রেডিও ধরেন তাড়াতাড়ি ” ! আব্বা জিজ্ঞেস করলেন “কি হয়েছে ” আমি প্রশ্ন না শোনার ভান করে চলে গেলাম বড় ভাই মঞ্জুরুল আহসান খানের শোবার ঘরে ! দরজা ভেড়ানো পেলাম তারপরেও দরজা আস্তে করে খুলে ঘরে ঢুকলাম ! দেখি বড়ভাই নিবিষ্ঠ মনে বিছানায় বসে আছেন ! পাশে রাখা চেয়ারে বসলাম. ! দেখি বড় ভাইয়ের দু ‘চোখ বেয়ে পানি ! বুঝলাম বড় ভাই বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার খবর পেয়ে গেছেন. ! একদিকে চোখের পানি পড়ছে আর একদিকে বিছানার পাশে রাখা টি এন্ড টি ফোনে কোথায় কোথায় যেনো একটার পর একটা ফোন দিলেন ! বুঝলাম অপরদিক থেকে তেমন কোন সাড়া শব্দ পাচ্ছেন না ! এতে বড় ভাই হতাশ ও বিক্ষুপ্ত হয়ে শুধু বললেন “মনে হয় কিছু করা গেল না . . . .” আমাকে নির্দেশের সূরে বললেন ” তোমরা চামেলীবাগের কর্মীরা এক সাথে জড়ো হয়ে তৈরী থাকো প্রতিবাদ মিছিল বের করতে হবে ” এ কথা বলে বড় ভাই ঘর থেকে দ্রুত বেড়িয়ে গেলেন পোস্তগোলা স্রমিক এলাকায় ! আব্বা – আম্মা কান্নাজড়িত কন্ঠে বড় ভাই কে “সাবধানে থাকো ” এই বলে বিদায় দিলেন. ! আমরা ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী সিদ্দিক পিয়ার নওশাদ দানিয়াল শাহজামাল মাহবুব ছাত্তার সহ প্রায় ২০/২৫ জন এক সাথে চামেলীবাগ মোড়ে জড়ো হতে থাকলাম ! সাবেক ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা আসলেও সাবেক ছাত্র লীগের কর্মীদের আসতে দেখা গেল না ! তাদের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হল প্রতিবাদ মিছিলের কোন নির্দেশ তাদের কাছে আসে নি ! এর মধ্যে সময় যত বাড়তে থাকে ঘর থেকে মানুষ রাস্তায় বের হতে থাকে ! জাসদের কর্মীরা প্রকাশ্যে আনন্দ প্রকাশ করা শুরু করে !
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করে মনে হলো মানুষ এই পরিবর্তন কে প্রত্যাখান করে নি ! অনেক কে আকারে ইঙ্গিতে স্বস্থি প্রকাশ করতে দেখলাম.! রাস্তায় কোন আর্মী মুভমেন্ট চোখে পড়লো না ! পুলিশকেও ততপর মনে হয় নি ! প্রতিবাদ মিছিলের জন্য জড়ো হয়েছি যে কোন মূহুর্তে আমরা মিছিল বের করার জন্য প্রস্তুত. ! এমন সময় খবর আসলো “Wait & See অপেক্ষা কর এবং দেখ ” বুঝলাম পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে বা চলে গেছে ! আমরা এক সাথে জড়ো হয়ে থাকা নিরাপদ মনে করলাম না ! বিষন্ন মনে যার যার ঘরে ফিরে গেলাম !
সেই সময় মোবাইল বা ডিশ লাইনের বিদেশী টিভি থেকে খবর পাওয়ার কোন সুযোগ ছিল না ! রেডিও ছিল প্রধান খবর পাওয়ার মাধ্যম. ! এটা লজ্জাস্কর হলেও সত্য মানতে হবে যে সে সময় রাস্তা ছেড়ে আমরা বাসায় রেডিও এর পাশে বসে থাকলাম. ! অপেক্ষায় থাকলাম কখন ঘোষণা আসে ডালিমদের গ্রেফতার করা হয়েছে বা বঙ্গবন্ধু এখনও জীবিত আছেন এবং তিনি যে কোন সময় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবেন ! এক সময় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষাণ ঠিকই. শোনা গেল তবে তা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নয় খুনী মোস্তাকের ভাষণ ! অপেক্ষায় থাকলাম সেনাবাহিনীর মধ্যে একজন সাহসী অফিসার রুখে দিবেন সব ষড়যন্ত্র. ! অনেকে রেডিও ‘র কাটা ডান দিক থেকে বাম দিকে ঘোড়াতে থাকলেন এই আশায় কেউ একজন ২৬/২৭ মার্চ ১৯৭১ এর মত গোপন কোন রেডিও স্টেশন থেকে ঘোষনা করবেন “আমি . . . . .বলছি খুনীদের গ্রেফতার করা হয়েছে !” ষড়যন্ত্র রুখে দিতে পারে এমন সাহসী অফিসারদের মধ্যে জিয়া ওখালেদ মোশাররফ এর নাম বাতাসে ভেসে বেড়াতে থাকলো ! রক্ষীবাহিনী সাভারের ক্যাম্প থেকে বেড়িয়ে এসে রেডিও দখলে নিবে হত্যাকারীদের খতম করবে এমন আশায় যখন প্রতিটি ক্ষণ পার করছি তখন অপ্রত্যাশিত ভাবে এমন আশায় গুড়ে বালি দিয়ে সকল বাহিনী প্রধানগন রেডিওতে আনুষ্ঠানিক ভাবে খুনী মোস্তাক সরকারের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করলেন ! বঙ্গবন্ধু মন্ত্রীসভার প্রায় সব সদস্য বঙ্গবন্ধুর রক্ত পেড়িয়ে খুনী মোস্তাকের মন্ত্রী সভায় শপথ নিলেন. ! জনগনের কাছে লজ্জায় আমাদের মাথা হেট হয়ে গেল. ! মিছিল তো দূরে থাক রাস্তা জনমানব হীন ফাকা পড়ে থাকলো !
সন্ধ্যায় বিবিসি বাংলা অনুষ্ঠানে সময় হোটেল দোকানের. সামনে মানুষের ভীড় ! সবার জানার আগ্রহ বিবিসি কি বলে ? মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে শুনছে বিবিসি সংবাদ ! পুরো শহর নিস্তব্ধ ! বঙ্গবন্ধু তার পরিবার পরিজন সহ ৩২ নং রোডের বাসায় নিহত বিবিসি সংবাদে তা নিশ্চিত হওয়ার পর সান্ধ্য আইনের নিস্তব্ধতায় ঘুমে ঢলে পরলো বঙ্গবন্ধু বিহীন বাংলাদেশ. !



এই প্রতিবেদন টি 546 বার পঠিত.