বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

সৌমিত্র দেব

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু একজন গণমাধ্যমবান্ধব রাজনীতিবিদ ছিলেন । তার জীবন ইতিহাস বিস্লেষন করলে দেখা যায় সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পেছনে গণমাধ্যম এক বড় ভুমিকা রেখছে। তিনি নিজেও সাংবাদিকদের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক রাখতেন । স্বাধীনতা উত্তরকালে তার ক্ষমতাসীন সময়ে তিনি গনমাধ্যম ও তার কর্মীদের মান উন্নয়নে অনেক ভুমিকা রেখেছেন। এ ব্যাপারে গণমাধ্যম গবেষক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেছেন,বঙ্গবন্ধু যে কথাগুলো বলছেন সভা-সমাবেশে সেগুলো যেমন পত্রপত্রিকায় এসেছে, বঙ্গবন্ধু যে কথাগুলো হয়তো সভা-সমাবেশে বলেননি, কিন্তু খুবই ঘনিষ্ঠ দু’চারজনের সাথে মতবিনিময় করার সময় বলেছেন, সেগুলোও পত্রপত্রিকায় আসত। বঙ্গবন্ধু যে কথাগুলো বলেছিলেন, সেগুলোর একটা বিশাল সংবাদ মূল্য ছিল এবং সেই সংবাদ মূল্যের কারণেই সেগুলো গণমাধ্যমে সবসময় প্রকাশ হতো, প্রচারিত হতো, সম্প্রচারিত হতো।
স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি খুব অল্প সময় পেয়েছেন শাসন পরিচালনায়। কিন্তু যতটুকু সময় পেয়েছেন আমার দেখেছি তিনি সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়ন‒এই সব বিষয়ে সবসময় আলাদাভাবে দৃষ্টি রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত ছিলেন, তখনো তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়নের জন্য তাদের বিদেশে পাঠিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন। এই সার্বিক বিষয়গুলো প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধু গণমাধ্যমের মানোন্নয়ন এবং সাংবাদিকদের পেশাগত উন্নয়নে সবসময় আন্তরিক ছিলেন।
শুধুমাত্র দেশের সাংবাদিকদের প্রতি নয়, বিদেশি সাংবাদিকদের প্রতিও এমন দৃষ্টি ছিল। যখন কোনো বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে বাংলাদেশে এসেছেন অথবা বঙ্গবন্ধু যখন বিদেশে যেতেন তখন বিদেশে সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেছেন, বঙ্গবন্ধু সবসময় তাদের অগ্রাধিকার দিতেন, তাদের সময় দিতেন।
আমরা মনে করতে পারি, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির পুনর্গঠনের জন্য বঙ্গবন্ধু যখন অতি ব্যস্ত, তখন বিবিসির প্রখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট ঢাকায় এলেন, বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার চাইলেন। বঙ্গবন্ধু তখন এত ব্যস্ত, এক জায়গায় বসে যে সাক্ষাৎকার দেবেন সেই সময় দেওয়াটাও খুব দুঃসাধ্য ছিল। সে কারণে বঙ্গবন্ধু বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার সময় ডেভিড ফ্রস্টকে নিয়ে গাড়িতে বসে কথা বলেছেন। অফিসে বসে কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা বলেছেন। আবার অফিস থেকে অন্য কোথাও যাচ্ছেন, তখন ডেভিড ফ্রস্টকে নিয়ে যাচ্ছেন তার সাথে কথা বলছেন বঙ্গবন্ধু। এভাবে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ একটি সাক্ষাৎকার ডেভিড ফ্রস্ট গ্রহণ করলেন। পরবর্তীতে সেটা বিবিসিতে প্রচার করা হয়। আমরা সেখান থেকেও বঙ্গবন্ধুর যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, চিন্তাভাবনা, যে স্বপ্ন, যে আশা-আকাঙ্খা‒সেগুলোর একটি দিক নির্দেশনা পাই।
ডেভিড ফ্রস্ট সেই বিখ্যাত সাক্ষাৎকারেই বঙ্গবন্ধুকে যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা কী? বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন, আমি আমার মানুষকে ভালোবাসি। তার পরবর্তী প্রশ্নটাই ছিল আপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী? সেই প্রশ্নের উত্তরেও বঙ্গবন্ধু একই কথা একটু ভিন্নভাবে প্রকাশ করেছিলেন, আমি আমার মানুষকে বেশি ভালোবাসি।
বঙ্গবন্ধুর এই চরিত্রের দিকগুলো আমরা সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানতে পারি। গণমাধ্যম যেভাবে সাধারণ মানুষের সাথে বঙ্গবন্ধুকে যুক্ত রেখেছিল, তা আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও দেখি। মুক্তিযুদ্ধে অনন্য সাধারণ নেতৃত্বের জন্য ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত সাময়িকী নিউজউইক একটি প্রচ্ছদ নিবন্ধ প্রকাশ করে, যেখানে বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। সেই প্রচ্ছদ নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুর আন্দোলনের পটভূমি, বঙ্গবন্ধু একজন মানুষ হিসেবে কেমন, বঙ্গবন্ধু একজন বাঙালি নেতা হিসেবে কেমন, বঙ্গবন্ধু কীভাবে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন,এই সার্বিক বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রকাশ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই প্রচ্ছদ নিবন্ধ শুধু বাঙালিদের অনুপ্রাণিত করেছে তা নয়, সারা পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এনেছে।
বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীন বাংলাদেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন, তখনও তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যম নিয়ে চিন্তা করেন। রামপুরা টেলিভিশন স্টুডিও যেটার কাজ পাকিস্তান আমলে শুরু হয়, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশে দ্রুত যাতে টেলিভিশনের সম্প্রচার শুরু করা যায়, ডিআইটির অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরের টেলিভিশন স্টুডিও থেকে যাতে রামপুরায় অত্যন্ত বৃহৎ পরিসরে স্টুডিওতে স্থানান্তর করা যায় সে নির্দেশ দিয়েছেন। অতিদ্রুত কাজ সম্পূর্ণ করে সেখানে নিজেই রামপুরা টেলিভিশন স্টুডিওর শুভ উদ্বোধনও করে গেছেন।
পরে সেখানে টেলিভিশনের স্থানান্তর হয়। টেলিভিশনের ক্রমান্বয়ে পরিধি বাড়তে থাকে। কারণ বঙ্গবন্ধু জানতেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটা গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। যেহেতু এ দেশের স্বাক্ষরতার হার কম, মানুষের আর্থিক স্বচ্ছলতা কম, প্রতিদিন পত্রিকা কিনে পড়া অনেকের পক্ষে আর্থিক কারণে সম্ভব হয় না; আবার স্বাক্ষরতার অভাবেও পত্রিকা পাঠ করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে টেলিভিশন ও বেতার‒এগুলো সবচেয়ে বেশি দ্রুততার সাথে কার্যকরভাবে মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
স্বাধীন বাংলাদেশের বেতার ও টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বঙ্গবন্ধু কাজ শুরু করে দিয়ে গেছেন। বেতবুনিয়া স্যাটেলাইট স্টেশন, বেতবুনিয়া উপগ্রহ, ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন। সে সময় বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর সাথে বাংলাদেশের যে টেলি ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ সেগুলোর সূত্রপাত বঙ্গবন্ধু করেন। অর্থাৎ আমি যেটা বলতে চাই, বঙ্গবন্ধু একেবারেই সীমিত শাসনকালে বাংলাদেশের উন্নয়নে এমন কোনো বিভাগ এবং এমন কোনো ক্ষেত্রকে বাদ রাখেননি, যেখানে তিনি কাজ না করেছেন। সব ক্ষেত্রে তিনি দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।”
বঙ্গবন্ধু গনমাধ্যমের প্রতি যে উদার নীতি প্রদর্শন করেছেন তার সুফল যেমন পেয়েছেন, তেমনই অপসাংবাদিকেরা এর সুযোগ নিয়েছে । তারা উদ্দেশ্য মুলক ভাবে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের সমস্যাগুলোকে অতিরঞ্জিত ভাষায় প্রকাশ করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চেয়েছে। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নশট করতে চেয়েছে। অনেকের ধারণা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল কয়েকটি গণমাধ্যমের কতিপয় সংবাদ কর্মী।এর মধ্যে ছিল বাংলা পত্রিকা দৈনিক গণকন্ঠ । জাসদের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন কবি আল মাহমুদ। এ ছাড়া মওলানা ভাসানীর ‘হক কথা’ পত্রিকাও বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে অতিরঞ্জিত প্রচার চালিয়েছিল। ইংরেজী পত্রিকার মধ্যে ছিল এনায়েত উল্লাহ খান সম্পাদিত হলিডে। আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এর ভাষায় ,বঙ্গবন্ধু সব ক্ষেত্রকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন। সেখানে গণমাধ্যম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা‒এ বিষয়গুলো সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন। গণমাধ্যমকে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা দিয়েছেন। সেই সুযোগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্নে এবং বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় কোনো কোনো গণমাধ্যম এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করেছে। বঙ্গবন্ধুর প্রশাসনকে নানাভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনভাবে অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তখন দেশে একটি হঠকারী রাজনৈতিক প্রবণতা ছিল। সেই হঠকারী রাজনীতির সঙ্গে গণমাধ্যমের একাংশ যুক্ত হয়ে নানা অপসাংবাদিকতা করেছে। ওই সময় আমরা দেখেছি, বাসন্তী নামের এক মহিলাকে গায়ে জাল জড়িয়ে তার ছবি প্রকাশ করে সেই সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাধ্য হয়ে বঙ্গবন্ধুকেও কঠোর হতে হয়েছিল। উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ছিল গনমাধ্যমকে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা।ইতিবাচক নিয়ন্ত্রণের ।এ ব্যাপারে পি য়াইবির বর্তমান মহাপরিচালক শাহ আলমগীর বলেছেন,আসলে স্বাধীনতার পরপর বাংলাদেশে নানা ঘতনা শুরু হয়ে গিয়েছিল।বিদেশের টাকায় রাতারাতি সংবাদপত্র বের করার ঘটনাও ঘটেছিল।আর সেসব কাগজের প্রধান কাজ ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিজ বপন করা।বঙ্গবন্ধুর কাছে এ সব তথ্য ছিল।তিনি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন,পাকিস্তানের জেনারেল আইয়ুব খানের দৈনিক পয়গাম যিনি চালাতেন,তিনি সবাধীন বাংলাদেশে রাতারাতি
দৈনিক কাগজ বের করে সদ্য স্বাধীন দেশের নতুন সরকারকে অস্থিতিশিল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত আছেন।’ সে সময় ব্যাঙের ছাতার মতো সংবাদপত্রে এ দেশ ছেয়ে গিয়েছিল।কিন্তু পাঠক ছিল কম।তখন শিক্ষিতের হার ছিল মাত্র ১৭% । শাহ আলমগীর সাহেবের মতে,বঙ্গবন্ধু এ জগতটাকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চেয়েছিলেন । এ জন্য তিনি সাংবাদিকদের দিয়েই একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন।এই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন এনায়েতুল্লাহ খান।তাদের সুপারিশেই ছিল চারটি পত্রিকা রেখে অন্যগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।যদিও বঙ্গবন্ধু সরকার সাপ্তাহিক ও অন্যান্য মিলে আরো ১২২ টি পত্রিকা রেখে দিয়েছিলেন। (বঙ্গবন্ধু ও গণমাধ্যম।পি আই বি)
১৯৭৫ ুৃদড ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু যে রাতে নিহত হন তখন বাংলাদেসে ছিল মাত্র চারটি দৈনিক পত্রিকা।দুটো বাংলা আর দুটো ইংরেজি।বাংলা পত্রিকার মধ্যে ছিল ইত্তেফাক ও দৈনিক বাংলা । ইংরেজি দুটোর মধ্যে ছিল অব্জারভার ও টাইমস । বংবন্ধু হতাকান্ডের পর পর ই এই চারটি গনমাধ্যম সরকারি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটিয়েছে ।গণ্মাধ্যম হিসেবে তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারে নি।বাংলা একাডেমি ও জাতীয় আর্কাইভ অনুসন্ধান করেও ১৫ আগস্ট প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা দুটি পাওয়া যায় নি। ইংরেজি পত্রিকাতে বংগবন্ধুর মৃত্যু সংবাদ ছিল না। ছিল তার ঢাকা বিসব্বিদ্যালরের অনুস্ষ্ঠান নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন। ১৬ আগস্ট দৈনিক বাংলার লীড নিউজ ছিল- শেখ মুজিব নিহত,সামরিক আইন ও সান্ধ্য আইন জারি;সশস্ত্র বাহিনীর আনুগত্য প্রকাশ।জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার খবরটি পরদিন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনামেও আসেনি; একই চিত্র ছিল তখন বাংলাদেশের অন্য সংবাদপত্রগুলোতেও।

 

১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্ট ভোরে বাজারে আসা ওই সময়কার সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক ইত্তেফাকের ৬ কলামের শিরোনাম ছিল- ‘খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসনক্ষমতা গ্রহণ’।

এই প্রতিবেদনের ‘ইন্ট্রো’ বা সংবাদ সূচনাতেও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের খবর ছাপিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও সেনাবাহিনীর ক্ষমতা ‘গ্রহণ’ই প্রাধান্য পেয়েছিল।

সংবাদপত্রটির প্রতিবেদনের শুরুটা হয়েছিল এভাবে, “রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী বৃহত্তর স্বার্থে গতকাল প্রত্যুষে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া দেশের শাসনভার গ্রহণ করিয়াছেন।”

এরপর লেখা হয়েছিল, “শাসনভার গ্রহণকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বীয় বাসভবনে নিহত হইয়াছেন।”

ছয় কলামের এই সংবাদটির পাশেই দৈনিক ইত্তেফাক দুই কলামে ‘ঐতিহাসিক’ নবযাত্রা’ নামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে।

ওই সময় পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী; বার্তা সম্পাদক ছিলেন আসাফউদ্দৌলা রেজা।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাককে স্বাধীনতার আগে আওয়ামী লীগের মুখপত্র হিসেবেই মনে করতেন পাঠকরা।

১৬ অগাস্ট ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় ১৬ অগাস্ট ইত্তেফাকের সম্পাদকীয়
১৬ অগাস্টের ইত্তেফাকে প্রথম পাতায় আরও কয়েকটি খবরের শিরোনাম ছিল, ‘উপরাষ্ট্রপতি, ১০ জন মন্ত্রী ও ৬ জন প্রতিমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ’, ‘অচল নোটের ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ফেরত’, ‘জাতির বৃহত্তর স্বার্থে শাসনভার গ্রহণ’, ‘যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিক কূটনৈতিক কাজকর্ম চালাইয়া যাইবে’, ‘জনসাধারণের স্বস্তির নিঃশ্বাস’, ‘বিভিন্ন মহলের অভিনন্দন’, ‘বিদেশি দূতাবাসের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকিবে’, ‘বি এ সিদ্দিকী রেডক্রসের চেয়ারম্যান’ ইত্যাদি।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধন এনে বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর ইত্তেফাকসহ চারটি দৈনিক পত্রিকাই তখন প্রকাশ হচ্ছিল।

এহতেশাম হায়দার চৌধুরী সম্পাদিত ১৬ অগাস্টের দৈনিক বাংলার আট কলামের শিরোনাম ছিল- “খোন্দকার মুশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি।”

প্রধান এই শিরোনামের শোল্ডারে লেখা হয়েছে, “শেখ মুজিব নিহত: সামরিক আইন ও সান্ধ্য আইন জারি: সশস্ত্র বাহিনীসমূহের আনুগত্য প্রকাশ”

প্রথম পৃষ্ঠাতেই ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ নামে একটি সম্পাদকীয় ছাপা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্ট দৈনিক বাংলা ১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্ট দৈনিক বাংলা
শীর্ষ দৈনিকটির প্রথম পাতার অন্যান্য সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘দুর্নীতির সঙ্গে আপোস নেই’, ‘জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করা হবে: রাষ্ট্রপতি’, ‘দশজন মন্ত্রী ও ছয়জন প্রতিমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ’, ‘নয়া সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে’, ‘অচল শতকী নোটের ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্য ফেরত দেয়া হবে’, ‘পাকিস্তানের স্বীকৃতি দানের সিদ্ধান্ত’।

ইত্তেফাকের মতোই দৈনিক বাংলাতেও প্রধান সংবাদের সঙ্গে মোশতাকের শপথের ছবি ছাপা হয়েছিল।

দ্য বাংলাদেশ টাইমসের আট কলামের প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘মুসতাক অ্যাসিউমস প্রেসিডেন্সি’।

এই শিরোনামের শোল্ডারে লেখা ছিল, ‘মার্শাল ল প্রক্লেইমড ইন দ্য কান্ট্রি: মুজিব কিলড’।

মূল শিরোনামের নিচে পত্রিকাটির প্রথম কলামে ‘আওয়ার কমেন্টস’ নাম দিয়ে একটি সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছিল; যার শিরোনাম ছিল, ‘অন দ্য থ্রেসহোল্ড অব দ্য নিউ এরা’।

১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্ট প্রকাশিত বাংলাদেশ টাইমস ১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্ট প্রকাশিত বাংলাদেশ টাইমস
আব্দুল গনি হাজারি সম্পাদিত পত্রিকাটির প্রথম পাতার অন্যান্য শিরোনামগুলো ছিল, “পিপল থ্যাঙ্ক আর্মড ফোর্সেস’, ‘মুজিবস পিকচার রিমুভড’, ‘ইউএস রেডি ফর নরমাল টাই’, “ভাইস প্রেসিডেন্ট, টেন মিনিস্টার, সিক্স স্টেট মিনিস্টার সোয়ার্ন ইন’, ‘ভ্যালুজ হ্যাভ টু বি রিহ্যাবিলিটেটেড’, ‘হেল্প মেক বাংলাদেশ এ প্রসপরাস কান্ট্রি’।

প্রধান খবরে সঙ্গে মোশতাকের শপথের ছবি ছাপা হয়েছিল।

ওবায়দুল হক সম্পাদিত সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ অবজারভারের ১৬ অগাস্টের প্রধান শিরোনাম ছিল- ‘মুশতাক বিকামস প্রেসিডেন্ট’।

শিরোনামের শোল্ডার ছিল- ‘আর্মড ফোর্সেস টেক ওভার: মার্শাল ল প্রোক্লেইমড: কারফিউ ইমপোজড’। কিকারে লেখা ছিল, ‘মুজিব কিলড: সিচুয়েশন রিমেইনস কাম’।আট কলামের প্রধান শিরোনামের সঙ্গে মোশতাকের শপথের ছবি ছিল।

 

১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্টের ডেইলি অবজারভার ১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্টের ডেইলি অবজারভার
প্রধান সংবাদের নিচে ‘হিস্টরিক্যাল নেসেসিটি’ শিরোনামে সম্পাদকীয়। তার পাশের দুটি সংবাদের শিরোনাম, ‘স্পেশাল প্রেয়ার্স’, ‘মুশতাক কলস ফর কো-অপারেশন’।

পত্রিকাটির প্রথম পাতার অন্য শিরোনামগুলো ছিল, ‘পিপল হেইল টেক-ওভার’, ‘পাকিস্তান অ্যাকর্ডস রেকগনিশন’, ‘ইনভায়োবিলিটি অব ফরেন মিশনস অ্যাশিউরড’, ‘জাস্টিস মাস্ট বি এসটাব্লিস্টড: প্রেসিডেন্ট, ওয়ার্ক হার্ড টু ইমপ্রুভ কনডিশন কুইসকলি’, ‘ইউএস রেডি টু কনডাক্ট নরম্যাল ডিপ্লোম্যাটিক বিজনেস’, ‘কারফিউ রিল্যাক্সড ফর জুম্মা প্রেয়ার্স’।

আট কলামের প্রধান শিরোনামের সঙ্গে মোশতাকের শপথের ছবি ছিল।

১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্টের ডেইলি অবজারভার ১৯৭৫ সালের ১৬ অগাস্টের ডেইলি অবজারভার
প্রধান সংবাদের নিচে ‘হিস্টরিক্যাল নেসেসিটি’ শিরোনামে সম্পাদকীয়। তার পাশের দুটি সংবাদের শিরোনাম, ‘স্পেশাল প্রেয়ার্স’, ‘মুশতাক কলস ফর কো-অপারেশন’।

পত্রিকাটির প্রথম পাতার অন্য শিরোনামগুলো ছিল, ‘পিপল হেইল টেক-ওভার’, ‘পাকিস্তান অ্যাকর্ডস রেকগনিশন’, ‘ইনভায়োবিলিটি অব ফরেন মিশনস অ্যাশিউরড’, ‘জাস্টিস মাস্ট বি এসটাব্লিস্টড: প্রেসিডেন্ট, ওয়ার্ক হার্ড টু ইমপ্রুভ কনডিশন কুইসকলি’, ‘ইউএস রেডি টু কনডাক্ট নরম্যাল ডিপ্লোম্যাটিক বিজনেস’, ‘কারফিউ রিল্যাক্সড ফর জুম্মা প্রেয়ার্স’।



এই প্রতিবেদন টি 629 বার পঠিত.