বন্যার অবস্থা এখন আরো ভয়াবহ

বন্যার অবস্থা এখন আরো ভয়াবহ ।বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে । ১৩ আগস্ট রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনাজপুরে বন্যায় ১৩ জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে চার শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নীলফামারীতে পানি ডুবে একজন নিহত এবং আরও তিনজন নিখোঁজ রয়েছে।বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করবে বৃষ্টিপাতের ওপর। ইতিমধ্যে পানি বৃদ্ধির পরিমাণ কমে আসছে। গত দুই দিনে যেখানে ৫০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার বেড়েছিল, আজ সেখানে বেড়েছ ৪০ সেন্টিমিটার।
মো. সাজ্জাদ হোসেন আরও জানান আগামী তিন দিনে লাগাতার বৃষ্টিপাত কমে আসবে।
এদিকে বন্যা সম্পর্কে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের কার্যালয় (ইউএনআরসিও) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ গবেষণা কেন্দ্রের (জেআরসি) বৈশ্বিক বন্যা সতর্কতা পদ্ধতির (গ্লো-এফএএস) বিশ্লেষণ করে এই সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অঞ্চলগুলোতে ১১ আগস্ট শুক্রবার থেকে পানি বাড়ছে এবং ১৯ আগস্ট পর্যন্ত এই পানি ভাটির দিকে প্রবাহিত হবে। গত ২০০ বছরের বেশি সময়ের ইতিহাসে ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার উজানে বন্যার মাত্রা সবচেয়ে ভয়াবহ হবে।
দ্য ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের (ইসিএমডব্লিউএফ) পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে হিমালয়ের দক্ষিণাঞ্চলে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে করে ব্রহ্মপুত্রের ভারত ও বাংলাদেশ অংশে পানি বাড়বে।

দিনাজপুরে এক পরিবারের তিন সদস্যসহ ১৩ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। রোববার রাত নয়টার দিকে দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম প্রিয়.কম-কে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘কাহারোলে পাঁচ, বিরলে পাঁচ ও সদরে তিন জন বন্যার কবলে পড়ে মারা গেছেন। রোববার দিন শেষে নিহতের সংখ্যা ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে’
এদিকে দিনাজপুরে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। জেলার সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভেঙে গেছে
দিনাজপুরে প্রবল বর্ষণ ও ভারতের বাঁধ খুলে দেওয়ায় শহর রক্ষা বাঁধ বেঙে পানি শহরের বাসা বাড়িতে প্রবেশ করে। ছবি: প্রিয়.কম
বাঁধ রক্ষায় ও বানভাসী মানুষকে উদ্ধারের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে। বাড়িঘর ডুবে গিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়েছে জেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ।
ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দিনাজপুর জেলায় ১২ আগস্ট শনিবার থেকে শুরু হয় বন্যা। ইতোমধ্যেই দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুর সদর, বিরল, কাহারোল, বীরগঞ্জ, খানসামা, চিরিরবন্দর ও পার্বতীপুর উপজেলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পানিবন্দি ও গৃহহীন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাঁধ এলাকায়। জেলার দুই হাজার ৯৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই বানভাসী মানুষের আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্ধ রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম।

দিনাজপুর সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুজ্জামান বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা না হলেও বন্যাদুর্গত এলাকায় বানভাসী মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আশ্রয় নেয়ায় সেগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।‘
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার সব নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শহরের তুঁতবাগান এলাকায় দিনাজপুর শহর রক্ষা বাধের ৫০ মিটার ভেঙে গেছে। এছাড়াও দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে নদীর বাধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নে ধরলা নদীর পানিতে কলার ভেলা ডুবে চার জন নিখোঁজ হয়েছে। রোববার বিকালে ওই ইউনিয়নের পুর্ব বরুয়া গ্রামে এ দুঘর্টনা ঘটেছে।
স্থানীয় জানান, ওই এলাকায় ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চার দিন ধরে বন্যা দেখা দিয়েছে। ফলে অনেকেই বসত বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাচ্ছে। বিকালে ওই এলাকার আলিফ হোসেন ও নাছমা বেগম, মোজাম উদিন ও নাদিমসহ চার জন মিলে কলার ভেলায় নিরাপদ স্থানে যাচ্ছিল। ধরলা নদীর প্রচন্ড পানির স্রোতে কলার ভেলা পানিতে ডুবে গেলে ৪ জনেই নিখোঁজ হয়। পরে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় শিশু নাদিমের লাশ উদ্ধার করা হলেও এখন পর্যন্ত বাকি ৩ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
এদিকে ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা, ধরলা, বুড়ি তিস্তা ও সানিয়াজান নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরো জেলায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ।

অন্যদিকে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির অারও অবণতি হয়েছে। কুুড়িগ্রামের চিলমারী উপেজেলায় বন্যায় হাজারো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার তিস্তা তীরবর্তী এলাকাগুলোতে এ বন্যা দেখা দেয়।
দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের দোয়ানী পয়েন্টে ১৩ আগস্ট রোববার সকালে বিপদ সীমার ৬৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

 

গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও উত্তরের পানি ঢলে গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। প্রথম দফার বন্যার কবল থেকে উঠতে না উঠতেই ফের পানি বৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী পরিবারগুলো।
আকস্মিক পানি বৃদ্ধির কারণে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর রোপা আমন ধান। গাইবান্ধা জেলার সাত উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গত পাঁচ দিনের টানা বর্ষণে ব্যবসা বাণিজ্যসহ জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ছে। নিত্যপণ্য ব্যবসায়ীদের দোকানপাট খোলা থাকলে লোকজনে উপস্থিতি ছিল কম।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান জানান, ‘গত বুধবার থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত জেলায় ২৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া, ঘাঘট, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে।’

গত কয়েকদিনের অব্যাহত ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে ধেয়ে আসা ঢলে নীলফামারী, সৈয়দপুর ও ডোমার উপজেলায় প্রায় ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে অনেক ফসলি জমি। এ ছাড়াও গোটা জেলার ১৭টি নদী তীরবর্তী এলাকাসহ পুরো নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এ সব এলাকার বসত বাড়িতে হাটু পানি থৈ থৈ করছে।
বন্যা কবলিত পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। বন্যা কবলিত মানুষজনের আশ্রয়ের জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগনদের নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খালেদ রহীম।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিলিপ কুমার বণিক বলেন, এ পর্যন্ত সদর উপজেলায় ২শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করেছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
এদিকে বন্যা সম্পর্কে জেআরসির বৈশ্বিক বন্যা সতর্কতা পদ্ধতির (গ্লো-এফএএস) গত ১০ আগস্টের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পুরো অববাহিকা এবং গঙ্গার ভাটিতে গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। আর ব্রহ্মপুত্রের উজানে গত ২০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের শিক্ষক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, বর্তমানে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে ২১ আগস্ট অমাবস্যা। অপর দিকে আসামে বড় ধরনের বন্যা হচ্ছে। এই পানি নেমে আসতে তিন-চার দিন সময় লাগবে। আবার আমাদের ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মা অববাহিকায় পানি বাড়ছে। পদ্মার পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে ১৯ তারিখের মধ্যে এ সীমা অতিক্রম করতে পারে।



এই প্রতিবেদন টি 464 বার পঠিত.