দরগাহ-ই-শাহজালাল: এক সর্বজনীন পাঠশালা

বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষে ইসলামের প্রচার-প্রকাশ-বিকাশ লাভের পেছনে সুফিদের প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। বাংলায় ইসলাম প্রচারে সুফি-দরবেশদের ভূমিকা সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখাও সম্ভব নয়।

বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক এনামুল হক-এর ‘বঙ্গে সুফি প্রভাব’ নামের গবেষণা গ্রন্থে বাংলায় ইসলামের প্রসার লাভের জন্য সুফিদের অবদানকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি এদেশের মুসলমান সমাজের মন-মননে ইসলামের যে ধারাটির সন্ধান পেয়েছেন তা সুফিবাদের আদর্শে বিকশিত। বাংলায় রাজনৈতিক ইসলামের বিজয় কেতন উড্ডয়নের বহু পূর্বেই অষ্টম শতক থেকেই সুফিরা মানবতাবাদী ইসলাম নিয়ে বিভিন্ন সামন্ত রাজ্যে উপস্থিত হয়েছিলেন।

তৎকালীন বাংলার ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল বর্ণবাদী নিগ্রহ ও সামন্তবাদী অত্যাচার-নির্যাতনে জর্জরিত। শাসকশ্রেণি ও ধর্মনেতাদের মানবতাবিরোধী নানা নিপীড়নে সমাজচ্যুত ও সংক্ষুব্ধ আমজনতা সুফিদের উদারপন্থী ও মানবিক আচরণ দেখে সহজেই মুগ্ধ হয়েছেন। তারা সুফিদের মাধ্যমে ইসলামের উদার ও কল্যাণমুখী আহবানের মধ্যে হাজার বছরের অচলায়তন ভাঙার সম্ভাবনা দেখে। তারা সুফিদের সহজিয়া জীবনে মুগ্ধ হয়।

সুফিদের মাধ্যমে ইসলামের সাথে স্থানীয়দের চেনাজানায় তের শতকে রাজনৈতিক ইসলামের বিজয়ের পথ সহজ হয়ে ওঠে। বঙ্গদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয় ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক গৌড় বিজয়ের মাধ্যমে। রাজনৈতিক ইসলামের পতাকা উড্ডয়ন হলে আরব-তুর্কি-পারস্য-ইয়েমেন থেকে আগত সুফিরা বাংলার প্রায় প্রতিটি লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়েন।

বরেণ্য ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবদুল করিম এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলার বড়-ছোট সব শহর এমন কী গ্রামেও দরবেশরা পদার্পণ করেছিলেন, এবং স্থায়ীভাবে থেকে গিয়েছিলেন।’ কাজেই বাংলার সমগ্র ভূখণ্ড জুড়েই তাঁরা ইসলাম প্রচার করেছিলেন। মুসলমান রাজশক্তি ইসলাম প্রচারে সুফিদের সহায়ক হয়েছিল, কিন্তু এমন শক্তির প্রভাবে ইসলাম বিস্তৃত হয়নি। বাংলায় ইসলামের আলো ছড়িয়েছিলেন সুফিরাই।

বিশিষ্ট দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ‘সিলেটে ইসলাম’ গ্রন্থের ভূমিকা পর্বে লিখেছেন- এদেশে সুফি-দরবেশরা যে ইসলাম প্রচার করেছেন, তাঁদের সে বাণীতে মুগ্ধ হয়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তাঁদের জীবনেই সত্যিকারের ইসলামের প্রতিফলন হয়েছে। রাজা, বাদশাহ, আমীর ওমরাহদের সহবতে বাস করে রাজকীয় শান শওকতের মোহে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাঁদের জীবনে সে শান-শওকতের মোহ দীর্ঘকাল ক্রিয়াশীল ছিল। কালের গতিতে তাঁরা ইসলামের মূলনীতি থেকে বিচ্যুত হলেও সুফি-দরবেশদের কাছ থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত মুসলিমদের জীবনে ইসলাম হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী।

সুফি-দরবেশদের দরবারে জাত-পাত-ধনি-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল মানুষের ছিল অবাধ যাতায়াত। সকলের প্রতি ছিল তাঁদের সমান দৃষ্টিপাত। তাঁরা সমাজে ন্যায়-বিচারের জন্য ছিলেন সদা-সতর্ক। তাই সুফি-দরবেশরা যেখানেই গিয়েছেন সাধারণ মানুষের সাথে সেখানেই হয়েছে তাঁদের সহজিয়া বন্ধন। সুফিবাদি ইসলামের দুটো মৌল বক্তব্য বা ধারণা আছে। এক, ইন্নামাল আমানু বিন নিয়্যাত; অর্থাৎ মনোবাঞ্ছার ওপর ধার্মিকতা বা ঈমান নির্ভরশীল। আরও উল্লেখ্য, এমন ইসলামে অন্তরের শুচিতা বড়; এবং তার সঙ্গে সংযোজিত হবে আবশ্যকীয় আচার-আনুষ্ঠানিকতা, তবে যা কখনই আচার-অনুষ্ঠান সর্বস্বতায় পর্যবসিত হবে না। দুই, মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু- নিজকে জানলে স্রষ্টাকে চেনা হয়।

সুফিরা অঞ্চলের পর অঞ্চল জয় করেছেন বিনা রক্তপাতে। তাঁদের এ জয়গাঁথার অন্যতম কৌশল ছিল মানুষের হৃদয় সিংহাসনে স্থান করে নেয়া। তাই তাঁদের বিজয় কৌশলে পরাজয় হয়েছে রাজতন্ত্র-সামন্ততন্ত্রের। জয় হয়েছে মানবতা ও সাম্যবাদের। তাই এ দেশে সুফি-দরবেশদের দরগাহ-খানকা-মাজার সকল ধর্মের মানুষের কাছেই তীর্থ। এখানে এসে মানুষ ধ্যানস্থ হয়, আপন আপন বিশ্বাসে পুণ্যাত্মাদের উছিলায় স্রস্টার কাছে প্রার্থনা করে। আত্মার বিশুদ্ধি, জীবনের ব্যাখ্যাহীন অসংলগ্নতা এবং সৎকর্মের প্রেরণার জন্য নানা ধর্ম ও নানা মতের মানুষের এ ধ্যান-প্রার্থনা অতুলনীয়।

সুফি-দরবেশদের আখ্যান ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত না হলেও লোকগাথার ইতিহাসে মানুষের মুখে মুখে নিত্য হয় উচ্চারিত। শতাব্দীর সীমানা পেরিয়ে লোকায়ত সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রশাখায় সুফি-দরবেশদের শৌর্য-বীর্য ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতার আখ্যান মানুষের কণ্ঠে, লেখনিতে নানাভাবে প্রচারিত হয়েছে, যা তৎকালীন ঐতিহাসিকদের দ্বারা অস্বীকৃতও হয়নি। বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস ও সুফি-দরবেশদের ইতিহাস একই ধারায় বহমান। ঐতিহাসিকরা শাসন ব্যবস্থায় মুসলিম শাসকদের কালপঞ্জি লিপিবদ্ধ করেছেন আর লোকগাথায় সাধারণ মানুষ মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার নেপথ্যচারী সুফি-দরবেশদের ঘটনাবহুল জীবনের আখ্যান বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে মুখে মুখে বর্ণনা করে গেছেন।

বাংলাদেশে ইসলাম ও সুফিদের ইতিহাসে উজ্জ্বলতর মহামানব হযরত শাহজালাল (র)। আধ্যাত্মিক সাধনার উৎকর্ষে স্বীয় মুর্শিদ সৈয়দ আহমদ কবিরকে মুগ্ধ করে তিনি ধর্মপ্রচার ও পরিব্রাজক হয়ে পবিত্র নগরী মক্কা থেকে অজানার পথে যাত্রা করেন।
মুর্শিদের তুলে দেয়া মক্কা নগরীর এক মুষ্টি মাটি সম্বল করে অনুরূপ মাটির অন্বেষণে শুরু হয় হাজার মাইল পথ পাড়ি দেয়া এক ক্লান্তিহীন যাত্রা। এই যাত্রা পথে তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজ্যের বিভিন্ন নগর ও জনপদ তিনি অতিক্রম করেন। ঘটনাবহুল যাত্রায় তাঁর সহযাত্রীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। তাঁর সফরসঙ্গীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো অপ্রকাশিত। রাজকুমার, সমরবিদ, তত্ত্বদর্শী, নৃবিজ্ঞানী, উপাত্ত সংগ্রাহক, ধর্ম বিশারদ, কোরআন হাজিফ, শাস্ত্রবিদ, প্রশাসকসহ মুসলিম সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের তৎকালীন সুফি-দরবেশদের সম্মিলনে তাঁর সঙ্গী সংখ্যা তিনশত ষাট জনে উন্নীত হয় বলে জনশ্রুতি আছে। তাঁর পরিভ্রমণকালে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা মিথ হয়ে লোকগাথার ইতিহাসে আজও মানুষের মুখে মুখে কিংবদন্তি হয়ে ফেরে।

জনশ্রুতি, লোক কাহিনী এবং জন বিশ্বাস নির্ভর কাহিনীগুলোর সাথে বাস্তবতার যোগসূত্র খুঁজে নেন ভক্তরা। সিলেটে গৌড় গোবিন্দের সেনাপতি মনারায়ের টিলা, নিপীড়িত বোরহানুদ্দিন ও শিশুপুত্রের সমাধি, চাষনী পীরের মাজার, পেঁচাগড় দুর্গ, জালালী কবুতর, গজার মাছ, সাতশত বছর ধরে প্রবহমান ঝর্না এসব জনশ্রুতিকে বেগবান করে।

হযরত শাহজালাল সম্পর্কে লোকগাথার ইতিহাসের বাইরে সবচেয়ে তথ্যবহুল উৎস সুহেল-ই-ইয়েমেন। যা শাহজালালের জীবনীমূলক আধুনিক গ্রন্থ। ১৮৫৯ সালে সিলেটের মুন্সেফ নাসির-উদ-দীন-হায়দার ফারসি ভাষায় গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। তিনি সুহেল-ই-ইয়েমেন গ্রন্থটি রচনার সময় মুহী-উদ-দীন খাদিমের সিরালা ও অজ্ঞাত লেখকের লেখা রওজাত-উস-সালাতীন নামের দুটি ফারসি গ্রন্থ থেকে সাহায্য নিয়েছেন। সুহেল-ই-ইয়েমেন থেকে হযরত শাহজালালের (র) সম্পর্কে জানা যায়— তিনি ইয়েমেন অধিবাসী ছিলেন। তাঁর পিতার নাম মুহাম্মদ। শৈশবেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে মক্কা নগরীতে মাতুলালয়ে চলে আসেন। মামা হযরত সৈয়দ আহমদ কবীর সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একজন উচ্চস্তরের সুফি। মামার নিকটেই তিনি লালিত-পালিত হন। ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন শেষে তাঁর মামার তত্ত্বাবধানে আধ্যাত্মিক সাধনার দীক্ষা গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে আধ্যাত্মিক সাধনার উচ্চশিখরে উপনীত হন।

হযরত শাহজালাল সম্পর্কে ১৮৭৩ সালে সিলেটে আবিষ্কৃত একটি আরবি শিলালিপি ইতিহাসের অমূল্য এক সাক্ষ্য। এ শিলালিপিতে বলা হয়, শাহজালালের আদেশে দার-উল-ইহসান নামক একটি পবিত্র ইমারত নির্মিত হয়। শিলালিপিটি সুলতান আলা-উদ-দীন হুসেন শাহর সময় ৯১১ হিজরি বা ১৫০৫-১৫০৬ সালে উৎকীর্ণ হয়। এ শিলালিপিতে শাহজালালকে ‘শায়খ জালাল মুজররদ কুনিয়ারি’ বলে উল্লেখ করা করা হয়। এতে বোঝা যায় তিনি কুনিয়ার (বর্তমান তুরস্কের একটি শহর) অধিবাসী ছিলেন।

আবার ৯১৮ হিজরিতে বা ১৫১২-১৩ সালে একই সুলতানের আমলে উৎকীর্ণ আরেকটি শিলালিপিতে উল্লেখ আছে যে, মুহাম্মদের পুত্র শয়খ উল মশায়েখ মখদুম শয়খ জালাল মুজররদের সম্মানে এটি লিখিত। এটি তথ্য দেয় যে, ৭০৩ হিজরি বা ১৩০৩-০৪ খ্রিস্টাব্দে সুলতান ফিরুজ শাহ দেলভির সময় সিকান্দার খান গাজির হাতে শহর ও আরছা শ্রীহট্টে (সিলেটে) প্রথম ইসলামের বিজয় অর্জিত হয়।

শাহজালাল সম্পর্কে আরেকটি আলোচিত গ্রন্থ ‘গওসীর গুলজার-ই-আররার’। এখানে উল্লেখ আছে, শাহজালাল তুর্কিস্তানে জন্মগ্রহণকারী বাঙালি ছিলেন (তুর্কিস্তানে জন্মগ্রহণ করলেও বাংলায় বসতি স্থাপন করেন)। তিনি সুলতান সৈয়দ আহমদ ইয়েসভির খলিফা ছিলেন। গুলজার-ই-আররার গ্রন্থে শাহজালালের নাম লেখা হয়েছে শয়খ জালাল-উদ-দীন-মুজররদ।

বিশ্ব বরেণ্য পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণ বিবরণিতে হযরত শাহজালাল সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। ইবনে বতুতা তাঁর সফরনামায় শায়খ জালাল-উদ-দীনকে অত্যন্ত বড়মাপের সুফি হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি হযরত শাহজালাল (র)-এর আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পর্কে উচ্চধারণা প্রদান করেন। যা লোকগাথার ইতিহাসে প্রচলিত আখ্যানগুলোর ভিত মজবুত করে।

হযরত শাহজালাল (র)-এর সিলেট বিজয়ের পর এ অঞ্চল মুসলিম সংস্কৃতির এক তীর্থে পরিণত হয়। তাঁর সহচর দরবেশরা বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। বর্তমান সিলেট বিভাগের সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল সহ ভারতের আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জ, বদরপুর ও কাছাড়, পশ্চিম বাংলার চব্বিশ পরগনা জেলা সহ বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলায় ইসলাম প্রচার ও প্রসারে এসব দরবেশদের ভূমিকা অগ্রগণ্য।

হযরত শাহজালাল (র) ও তাঁর সঙ্গীয় সুফি-দরবেশদের প্রভাবে ইসলামের সুফিবাদি ভাবধারা সাধারণে চর্চিত হওয়ায় লোকায়ত সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ধর্ম বিশ্বাস, সমাজনীতি, স্থাপত্যরীতি, দর্শন, কৃষ্টি, আচার, প্রতিষ্ঠান সব কিছুতেই বৈচিত্র্যময়তা কোনরূপ জটিলতা ব্যতিতই বাংলার প্রাচীন সংস্কৃতির সাথে সমন্বয় সাধন করে। নানান বিশ্বাস ও লোকাচারে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য সাধন করে। সুফি ভাবধারার প্রভাবে এ অঞ্চলে ভাববাদ-মরমীবাদ লোকায়ত সংস্কৃতিতে উর্বরতা এনে সমৃদ্ধশালী এক সাংস্কৃতিক পাটাতন প্রতিষ্ঠা করে। হযরত শাহজালাল ও তার সঙ্গী সুফি দরবেশদের দরগা-খানকা-মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে চিশতিয়া-সোরওয়ার্দীয়া-নকশবন্দিয়া-কলন্দরিয়া-নিজামিয়া ইত্যাদি সুফি মতবাদের পাঠশালা।

তিনশত ষাট আউলিয়া ও তাঁদের বংশধারায় পরবর্তীতে আরও অনেক প্রসিদ্ধ সুফি-দরবেশের আগমন ঘটে। এসব সুফি-দরবেশ ও তাঁদের ভাবশিষ্যদের প্রতিষ্ঠিত দরগাহ-খানকা-মাজার-মোকাম-আসনকে কেন্দ্র করে লোকায়ত সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে। চর্চা হতে থাকে মরমীবাদ। মুর্শিদি, মারফতি, দেহতত্ত্ব গানের পাশাপাশি পুঁথিপাঠ ও কাব্যচর্চা চলতে থাকে। এ অঞ্চলে জন্ম হয় দীনভবানন্দ, শেখ ভানু, শিতালং ফকির, সৈয়দ শাহনুর, গোঁসাই লালক চান্দ, দীনহীন, ইছহাক, ভেলাশাহ, আয়াতশাহ, রাধারমণ, হাছন রাজা, মেহের আলী, ফকির গোলাম আলী, আরকুম শাহ, গিয়াস উদ্দিন, রকিব শাহ, শাহ আব্দুল করিম’সহ হাজার মরমী সাধকের। তাদের সৃষ্টিশীলতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এ অঞ্চলের লোক-সাহিত্য ভাণ্ডারের উত্তরাধিকারী করেছে।

হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মরমী সাধকদের সৃষ্টিশীলতার প্রেরণা এসেছে সুফিদর্শন থেকে। এ অঞ্চলে তাই জয়ী মুসলমান ও পরাজিত হিন্দুদের মধ্যে বৈরিতা না হয়ে ভাবের আদান-প্রদান ও মিলনের অসাম্প্রদায়িক পরিমণ্ডল প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

অচ্যুত চরণ তত্ত্বনিধির শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তে বলেছেন ‘…ধর্মকর্ম ও দেশ হিতকর কার্যে হযরত দেশের মধ্যে যথার্থই দেবতার মত পূজিত হইতে লাগিলেন।’ ১৯১৭ সালে সম্পাদিত এ গ্রন্থে হযরত শাহজালালকে দেবতার মত ভক্তি করার যে কথা তিনি উল্লেখ করেছেন তা শাহজালাল (র)-এর সিলেট বিজয়কালেও যেমন সত্য ছিল, আজও তা সত্য বলে প্রতিয়মান হয়।

দরগাহ-ই-শাহজালাল সর্বধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। এ দরগাহ সর্বজনীন এক পাঠশালা। প্রতিদিন তার দরগায় অসংখ্য হিন্দু নর-নারী আসেন। তাহাকে হিন্দু সম্প্রদায় সাতশ বছর পূর্বে যেভাবে ভক্তি করতো এখনো সেভাবেই ভক্তি করে। তিনি বিনা রক্তপাতে সিলেট বিজয় করে নগরে প্রবেশ করলে পরাজিত রাজা ও রাজন্যবর্গ প্রাণ ভয়ে ভিত ছিলেন। ইসলামের নবী মহামানব হযরত মোহাম্মদ (সা) মক্কা বিজয়ের পর যেভাবে পরাজিতদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন একইভাবে শাহজালাল অত্যাচারী রাজা গৌড়গোবিন্দ ও অন্যান্য সাথীদের ক্ষমা করে দিয়ে সসম্মানে নগর পরিত্যাগের সুযোগ করে দেন। যা স্থানীয় মানুষদের কাছে অবিশ্বাস্য ছিল।

তিনি এ অঞ্চলের মানুষের কাছে নতুন ধর্মমত প্রচার করেছেন সত্য কিন্তু কারও উপর সে ধর্মমত চাপিয়ে দেন নাই। তাঁর এই শিক্ষা সঙ্গীয় অন্যান্য দরবেশরাও অনুসরণ করেছিলেন। প্রত্যেক মানুষকে স্ব স্ব ধর্ম পালনের স্বাধীনতা প্রদান করায় হযরত শাহজালাল ও সঙ্গীয় তিনশত ষাট আউলিয়াদের নিয়ে ইতিহাসে কোন বিতর্ক নেই। তাই হযরত শাহজালাল ও সঙ্গীয় ৩৬০ আউলিয়া আজও সর্বজনীনভাবে সম্মানিত। তাই তাদের দরবারে সর্বধর্মের মানুষের জন্য অবারিত।

সিলেটে তাই মসজিদ-মন্দির-আখড়া-মাজার পাশাপাশি অবস্থান করে উদার ধর্মীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য সংরক্ষণ করছে।

আব্দুল করিম কিম, সমন্বয়ক, সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও প্রকৃতি রক্ষা পরিষদ।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।



এই প্রতিবেদন টি 237 বার পঠিত.