সালমান শাহ মৃত্যুর রহস্য নিয়ে আবার তোলপাড়

জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ মৃত্যুর মৃত্যু রহস্য নিয়ে আবার তোলপাড় । কীভাবে এই হত্যা ,নাকী আত্মহত্যা , ২১ বছরেও এর ঘোর কাটছে না। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার নিউ ইস্কাটনের নিজ বাসা থেকে সালমানের লাশ উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে এখন পর্যন্ত কম জল ঘোলা হয়নি। তবুও পরিষ্কার হচ্ছে না প্রয়াত এই অভিনেতার মৃত্যু রহস্য। সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরী দাবি করেন, সালমানের মৃত্যুর পরপরই তার ঘরে যেসব আলামত পাওয়া গেছে তাতেই প্রমাণ হয় সালামান শাহকে হত্যা করা হয়েছে। সালমানের মা বলেন, ‘যেদিন মারা গেল সেদিনও সে শুটিং করে গেছে। তার টেবিলের ওপর আমি কন্টিনিউটি ড্রেসের ফটো পেয়েছি। তার ড্রেস পেয়েসি রেডি করা। একজন মানুষ আত্মহত্যা করতে হলে ড্রেস রেডি করে, সব রেডি করে আত্মহত্যা করবে না।’
২০১৫ সালে র‌্যাবকে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে আইনি জটিলতায় তাও বন্ধ থাকে। ২০১৬ সালে মামলাটি নিম্ম আদালতে পাঠানো হলে তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)।
সম্প্রতি ফেসবুকে মামলার সাত নম্বর আসামি রুবি সুলতানার দেওয়া ভিডিও ঘিরে দেশব্যাপী নতুন করে সালমান হত্যার বিচারের দাবিতে তোলপাড় হচ্ছে। তবে সালমানকে হত্যার পরিকল্পনা জানার বিষয়টি যে আগে থেকেই রুবি জানতেন তা বোঝা যায় রিজভির জবানবন্দীতে। এদিকে রুবি সুলতানার বক্তব্য প্রমাণ হিসেবে মামলার নথিতে সংযুক্ত করার আবেদন করা হবে জানিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, প্রয়োজনে রুবিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোল এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সহযোগিতা চাওয়া হবে।
আসামিদের ধরতে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে বলেও জানান তিনি।
১১/বি নিউ ইস্কাটনের বাসার নিজ কক্ষে ফ্যানের মধ্যে ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায় সালমান শাহ’র। সেদিন সকাল ৭টার দিকে সালমানের সঙ্গে দেখা করতে তার বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী সেখানে যান। কিন্তু ছেলের দেখা করতে না পেরেই ফিরে আসতে হয়েছে তাকে। এমনটাই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরী।
শুরুতেই সেদিন সালমানের বাবাকে বাসায় ঢুকতে বাধা দেন দারোয়ান জানিয়ে নীলা চৌধুরী বলেন, ‘বলেছে স্যার এখনতো উপরে যেতে পারবেন না। কিছু প্রবলেম আছে। আগে ম্যাডামকে (সালমান শাহ’র স্ত্রীকে) জিজ্ঞেস করতে হবে। এক পর্যায়ে উনি (সালমান শাহ’র বাবা) জোর করে উপরে গেছেন। কলিং বেল দেবার পর দরজা খুলে সামিরা (সালমান শাহ’র স্ত্রী)’।
তিনি আরও বলেন, ‘উনি (সালমান শাহ’র বাবা) সামিরাকে বললেন ইমনের (সালমান শাহ’র ডাক নাম) সাথে কাজ আছে, ইনকাম ট্যাক্সের সই করাতে হবে। ওকে ডাকো। তখন সামিরা বলল, আব্বা ও তো ঘুমে। তখন উনি বললেন, ঠিক আছে আমি বেডরুমে গিয়ে সই করিয়ে আনি। কিন্তু যেতে দেয় নাই। আমার হাজব্যান্ড প্রায় ঘণ্টা দেড়েক বসে ছিল ওখানে।’
এরপর বেলা ১১টার দিকে তাকে টেলিফোন করে জানানো হয়, সালমান শাহকে দেখতে হলে তখনই যেতে হবে। এরপর দ্রুত তিনি ছুটে গিয়ে সালমানকে বিছানায় দেখতে পান। নীলা চৌধুরী বলেন, ‘খাটের মধ্যে যেদিকে মাথা দেবার কথা সেদিকে পা। আর যেদিকে পা দেবার কথা সেদিকে মাথা। পাশেই সামিরার (সালমান শাহ’র স্ত্রী) এক আত্মীয়ের একটি পার্লার ছিল। সে পার্লারের কিছু মেয়ে ইমনের হাতে-পায়ে সর্ষের তেল দিচ্ছে। আমি তো ভাবছি ফিট হয়ে গেছে।’
‘আমি দেখলাম আমার ছেলের হাতে পায়ের নখগুলো নীল। তখন আমি আমার হাজব্যান্ডকে বলেছি, আমার ছেলে তো মরে যাচ্ছে,’ বলেন সালমানের মা। এরপর সালমান শাহকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরে এ ঘটনায় সালমান শাহ’র বাবা কমর উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেন। পরে ১৯৯৭ সালের ১৯ জুলাই সালমানের বাবার বাসায় রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ নামের এক যুবক মিথ্যা পরিচয়ে ঢুকতে চেষ্টা করলে তাকে ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে আরও একটি মামলা করা হয়।
ওই মামলায় রিজভীকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে সালমান শাহ হত্যার কথা স্বীকার করে তার সহযোগী হিসেবে ডন, ডেভিড, ফারুক, আজিজ মোহাম্মাদ ভাই, সাত্তার, সাজু, সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা, সামিরার মা লতিফা হক লুসি ও জনৈক রুবির নাম প্রকাশ করে।
১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে রিজভী বলেন, ‘সালমানকে হত্যা করতে সামিরার মা লাতিফা হক ডন, ডেভিড, ফারুক, জাভেদের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি করেন। সালমানকে শেষ করতে কাজের আগে ৬ লাখ ও কাজের পরে ৬ লাখ দেয়া হবে।’
হত্যার ঘটনার বর্ণনায় রিজভী বলেন, ‘সালমানকে ঘুমাতে দেখে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে, ফারুক পকেট থেকে ক্লোরোফোমের শিশি বের করে এবং সামিরা তা রুমালে দিয়ে সালমানের নাকে চেপে ধরে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মামলার তিন নম্বর আসামি আজিজ মোহাম্মদ এসে সালমানের পা বাধে এবং খালি ইনজেকশন পুশ করে।’
এতে সামিরার মা ও সামিরা সহায়তা করে। পরে ড্রেসিং রুমে থাকা মই নিয়ে এসে, ডনের সাথে আগে থেকেই নিয়ে আসা প্লাস্টিকের দড়ি আজিজ মোহাম্মদ ভাই সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলায়। এ ছাড়া জবানবন্দিতে ডন, ডেভিড, ফারুক, জাভেদ ও আসামি রিজভি ছাড়াও ছাত্তার ও সাজু নামে আরও দু’জনের নাম উল্লেখ করা হয়।
পরে ১৯৯৭ সালের ২২ জুলাই আদালতের তার স্বীকারোক্তি রেকর্ড করা হয়। এরপর বাদী সালমানের বাবা কমর উদ্দিন অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন। এতে সালমানের স্ত্রী সামিরা হক, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, চলচ্চিত্রের খল চরিত্রের অভিনেতা ও সালমানের বন্ধু আশরাফুল হক ওরফে ডন, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মাদ ভাই, রুবি সুলতানা, রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ, সহকারী নৃত্যপরিচালক নজরুল শেখ, ডেভিড, মোস্তাক ওয়াহিদ, আবুল হোসেন খান ও গৃহকর্মী মনোয়ারা জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়।
হত্যার এক বছর পর সিআইডির রিপোর্টে বলা হয়, এটি আত্মহত্যা। ১২ বছর পর দেওয়া জুডিশিয়াল ইনকোয়ারির রিপোর্টে একই কারণ দেখানো হয়। কিন্তু কোনো আসামি বা সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের কোনো অস্তিত্ব নেই রিপোর্টগুলোতে। দু’বারই নারাজি দেন সালমানের পরিবার।



এই প্রতিবেদন টি 471 বার পঠিত.