মানব ধর্ম- সুমনের কলাম

সুমন দেঃ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। বাংলার মধ্যযুগের এক কবি বড়ু চণ্ডীদাস উচ্চারণ করেছিলেন মানব-ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক বাণী। সমগ্র বিশ্ব যখন হিংসায় উন্মত্ত, রক্ত ঝরছে যখন পৃথিবীর নরম শরীর থেকে, তখন এই বাংলার এক কবি বিশ্বকে শুনিয়ে ছিলেন মানবতার অমর কবিতা।
আমরা তাঁরই উত্তরাধিকার। আমরা উত্তরাধিকার ‘চর্যাপদ’ থেকে ‘গীতাঞ্জলি’। পদ্মা, গঙ্গা, বঙ্গোপসাগরের কূলে কূলে সহস্র বছর ধরে যে মানুষের বসবাস, তাদের সংগ্রামী জীবনের উত্তরাধিকার আমরা। সে জীবন অবিভাজ্য মানুষের। সে জীবন শ্রম ও আনন্দের। শান্তি ও সমন্বয়ের। প্রকৃতি ও পুরানের সংশ্লেষে গঠিত। সেই জীবনের সংস্কৃতি সততই প্রেমের জয়গান গায়। জীবনের জয়গান গায়। যুগে যুগে মানবের কল্যাণ কামনায় গীত হয় সাম্যের গান। জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সংস্কৃতি হয়ে ওঠে মানুষের জীবন ও জাতিসত্তা নির্মাণের প্রধানতম নিয়ামক। সম্প্রদায় ও সাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা বিলুপ্ত হয় মানবজীবন থেকে উৎসারিত ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কাছে। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ধর্মীয় বিভাজন অনুমোদন করে না। আর তাই এই অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ অনেক মানবিক ও শান্তি মুখাপেক্ষী।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক – কি আশ্চর্য শক্তিশালী ধরনের নব চেতনার ধারক একটি কথা! জগতের সকল প্রাণী, কেবলমাত্র মানুষ নয়, সমস্ত প্রাণীকুলের সুখী হবার অধিকার নিয়ে কথা বলা হয়েছে এইখানে। সেই আঁধার যুগে শোনালেন সাম্যবাদের গান, কে তিনি? সিদ্ধার্থ নামের এক যুবরাজ, যিনি পরিচিত সারা বিশ্বের কাছে গৌতম বুদ্ধ হিসেবে। তিনিই বিশ্বে প্রথম সঙ্ঘ শব্দটি ব্যবহার করেন, যে কারণে অনেকেই তাকে কমিউনিজমের আদি গুরু বলে থাকেন, সেই সাথে সকলের সম অধিকারের ব্যাপারটি তো আছেই।
আমরা মূলত প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতি কখনো জাত-পাত, ধর্ম তৈরি করেনি। প্রকৃতির সৃষ্টির সেরা জী্ব মানব জাতির কল্যাণে আজ জাত-পাত, ধর্ম, ধর্মান্ধতা ইত্যাদির সৃষ্টি। পাহাড়ের কোলে যাদের জন্ম তাঁদের প্রতি আমার মানসিক এক ধরণের ঈর্ষা রয়েছে । আমি পাহাড়ের ভাষা বুঝি না, আমি পাহাড়ি জনগণের ভাষা জানিনা। আমি সেখানকার কোন গাছপালা চিনি না। আমি জুম চাষ জানি না। প্রকৃতি মায়ের সন্তান হিসেবে আমি এগুলো শিখতে চাই, ভালোবেসে বুঝতে চাই ।
সমতলের মানুষ বলে আমার পাহাড়ের প্রতি সীমাহীন আকর্ষণ । শুধু পাহাড় কেন, সমতলে আমাদের যেসব আদিবাসীরা রয়েছেন, তাঁদের প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ততা দেখে আমি বরাবরই মুগ্ধ হই । ওদের ভাষা, সংস্কৃতি ভিন্নতায় আমাকে ভীষণ টানে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে আমরা পুরো মানবজাতিকে ধ্বংসের মুখো-মুখি হচ্ছি । প্রকৃতিকে ভালোবাসা, তাকে বুঝতে পারার শিক্ষা আমরা আমাদের আদিবাসী বন্ধু, স্বজনদের কাছ থেকে শিখতে পারি কী?
মানব জাতির কল্যাণে যে সকল গ্রন্থ রয়েছে, হোক তা ধর্মীয় কিংবা বহুল প্রচলিত অভিধান/পুথি/বই, তাতে তো প্রকৃতি ধ্বংসের কোন কিছুই কোন লেখক বা ধর্মীয় ঈশ্বর প্রদত্ত বাণী নেই ! তবে কেন আমরা প্রকৃতির বাইরে কাজ করি? প্রকৃতি যখন আমাদের সন্তান রুপে লালন করছে; আর সেই প্রকৃতিকেই আমরা ক্ষেপানোর জন্যে দিন দিন তৈরি হচ্ছি ! প্রকৃতির বিচার বড়ই নিষ্ঠুর। সেই নিষ্ঠুর প্রলয় রোধ করার ক্ষমতা আমাদের বিশ্বের বিজ্ঞানীদেরও নেই, সেই সাথে আমাদের মত সাধারণ তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোর নির্বাক হয়ে পরকালেরও অস্তিত্ব থাকবে কিনা সন্ধেহ রয়েছে।
বুদ্ধদেব আমার কাছে এক পরম আশ্চর্যের মানুষ, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে আমাদেরই অঞ্চলের এই পাহাড়ি রাজ্যে জন্ম নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে কোন অলৌকিক বলে সত্যজ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে অলৌকিকতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বাণী দিলেন- ধর্মকে বিশ্বাস করো না – অন্ধভাবে ভুল জিনিস শিখতে পার, সংস্কৃতিকে অনুকরণ করো না – অন্যের ভুল ধারণা তোমাকে প্রভাবিত করতে পারে, নিজে যাচাই-বাছাই করে যুক্তিসিদ্ধ মনে হলেই তবে সেই তথ্য গ্রহণ করতে পার। সেই সাথে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা লক্ষ কোটি দেবতাদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, আমাদের বিপদে তো দেবতারা এগিয়ে আসেন না, নিজেদেরই সামলাতে হয়! তাদের কি দরকার আমাদের ? কিন্তু তাহলে যে দেবতা জ্ঞানে বুদ্ধ দেবের মূর্তিতে সারা বিশ্ব জুড়ে পুজো করা হয়! ব্যপক তথ্যসমৃদ্ধ বইটি লেখা হয়েছে বাংলা ভাষাতেই, লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বুদ্ধদেব নামের শীর্ণ বইটি মূলত রবিঠাকুরের বিভিন্ন সময়ে বুদ্ধদেব নিয়ে লেখার সংকলন, বইটির প্রথম লাইন হচ্ছে- আমি যাকে অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমায় তার জন্মোৎসবে আমার প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি।
‘আমি যতটুকু বুঝতে পারি, তার বেশি বুঝবার ভান ক’রে যেন কারুর শ্রদ্ধা প্রশংসা পাবার লোভ না করি। তা সে মহাত্মা গান্ধীরই মত্ হোক আর মহাকবি রবীন্দ্রনাথেরই মত্ হোক কিংবা ঋষি অরবিন্দেরই মত্ হোক, আমি সত্যিকার প্রাণ থেকে যেটুকু সারা পাই রবীন্দ্র, অরবিন্দ বা গান্ধীর বাণীর আহ্বান ঠিক ততটুকু মানবো। তাঁদের বাণীর আহ্বান যদি আমার প্রাণে প্রতিধ্বনি না তোলে, তবে তাঁদের মানব না।’-(ধূমকেতু’র পথ)। ‘আজ সাগর-ভূধর-সংসার-কানন-মরু দলিত-মথিত করে আসা চাই মহাপ্রলয়ের মহা আলোড়ন। ভারতের জীবনের অণু-পরমাণু আজ পচাগলা বিষবিষ্ঠার বাসা হয়েছে; আজ পরিপূর্ণ সৃষ্টির আয়োজনের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই আমূল ধ্বংসের প্রয়োজন হবে। এই সত্যযজ্ঞে সকল মিথ্যা অত্যাচারকে পুড়িয়ে ভষ্ম না করতে পারলে যজ্ঞ পূর্ণ হবে না।’-(প্রবন্ধ : আজ চাই কি)। ইতোপূর্বে আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল দুরকমের ব্রত। কিছু শাস্ত্রীয় ব্রত আর কিছু শাস্ত্র কথিত যোষিৎপ্রচলিত বা মেয়েলি ব্রত। কিন্তু নজরুল এসে সম্প্রদায়, স্বদেশ ও সত্য-সাধনের মাধ্যমে স্থাপন করলেন নতুন এক তপস্যা যাকে বলা যায় ‘নজরুল-ব্রত’। আমাদের লৌকিক ব্রতগুলো ধর্মীয় প্রসাধনে এমনভাবে আচ্ছাদিত করা হয়েছে যে তাদের আর কর্মের সাথে, উদ্দেশ্য সাধনের সাথে কোনো সংযোগই খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমন দশাবিপর্যয় ঘটতে ঘটতে বাঙালি তার কর্ম-ব্রতকে হারিয়ে ফেলেছে। নজরুল বাঙালির কর্ম-ব্রতের বাস্তব প্রতিভূ। নজরুলের সমকালেই গুরুসদয় দত্তের তদারকিতে তৈরি হয় ব্রতচারী আন্দোলন। ব্রতচারীতে নারী-পুরুষ, জাতি-ধর্ম, শ্রেণি-বয়সের কোনো বিধিনিষেধ নেই, এর মূল লক্ষ্য আত্মিক ও শারীরিক উন্নতি। পাঁচটি ব্রতে দীক্ষিত হতে হতো ব্রতচারীদের চরিত্রগঠন ও দেশসেবায় আত্মোৎসর্গ করার জন্য, এই পঞ্চব্রত হলো জ্ঞান, শ্রম, সত্য, ঐক্য ও আনন্দ। প্রতিজ্ঞা করতে হতো ষোলটি, আমি বাংলাকে ভালোবাসি, আমি বাংলার সেবা করব, আমি ব্রতচারী হবো থেকে জ্ঞানের সীমা প্রসারণ পর্যন্ত। নজরুল-ব্রতকেও আমরা এভাবে চিহ্নিত করতে পারি। নজরুল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপাদমস্তক একজন পরিপূর্ণ বাঙালি যার জীবনের প্রতিটি কর্মই সাধিত হয়েছে দেশ, জাতি, সত্যের প্রতিষ্ঠার স্বার্থে। নজরুল-ব্রত বাঙালির সাধারণ সম্পত্তি। কোনো বিশেষ ধর্ম অথবা বিশেষ শ্রেণির একার নয়। স্বদেশপ্রেম, স্বজাতিপ্রীতি ও জাতীয়তাবোধ এগুলো মানবিক গুণ, সমস্যা হলো এসবের অপব্যবহারে।
ফকির লালন সাঁইয়ের ধর্মীয় মতবাদ গুরুবাদী মানব ধর্ম। তার মূল বৈশিষ্ট হচ্ছে গুরুকে বিশ্বাস করা। গুরুবাক্য বলবান, আর সব বাহ্যজ্ঞান- গুরুবাক্যই শিষ্য ভক্তের আরাধনা। গুরুবাদী মানব ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভ। যথা : সত্য কথা, সৎ উদ্দেশ্য, মানুষকে ভালোবাসা এবং জীবের প্রতি সদয় হওয়া। গুরুর প্রতি নিষ্ঠাই হচ্ছে সকল সাধনার শ্রেষ্ঠ সাধনা। এই গুরু হচ্ছেন মানব গুরু। তাইতো তিনি লিখেছেন : ‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার/সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার।’আউল, বাউল, দরবেশ, সাঁই এবং ফকির হচ্ছে সাধন স্তরের পাঁচটি পর্যায়ের নাম। আউল হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বাউল হচ্ছে দীক্ষাপ্রাপ্ত মুরিদ। দরবেশ হচ্ছেন একজন আত্মসংযমী আদর্শ মানব। আধ্যাত্মজ্ঞানে যিনি শিক্ষিত তিনি সাঁই। আত্মতত্ত্বে যিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছেন তিনি ফকির। ফকির লালন সাঁইয়ের ভাষায় : ‘এলমে লাদুন্নী হয় যার/ সর্বভেদ মালুম হয় তার।’ লালন দর্শনের অন্যতম দিক হলো গুরুবাদ। গুরুর প্রতি ভক্তি নিষ্ঠাই হলো তাদের শ্রেষ্ঠ সাধনা। ধ্যান ছাড়া যেমন গুরুকে ধারন করা যায় না, তেমনি গুরুর প্রতি অসামান্য ভক্তি ছাড়া অন্তরাত্মা পরিশুদ্ধ হয় না। লালন অসংখ্য গানে পরিশুদ্ধ আত্মার অনুসন্ধান করেছেন, তার গানে ও ভাবাদর্শে সুফিবাদের ভাবধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লালনের ভাবশিষ্যরা বিশ্বাস করেন যে, শারীরিক প্রেম-ভালোবাসার মধ্যে প্রকৃত শান্তি নেই; প্রকৃত শান্তি আছে স্বর্গীয় ভালোবাসায়।

 



এই প্রতিবেদন টি 508 বার পঠিত.