ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হোয়াইট ও ব্লুরা শেকলবন্দী করেছে মুক্তচিন্তা


লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ সকলেই আমার শিক্ষক। আমি তাদের পরম প্রিয় শিষ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সকল শিক্ষকই হয় হোয়াইট অথবা ব্লু। সাদা অথবা নীল। নব্বইর দশকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি। আমার প্রসঙ্গটি দিয়েই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ও মুক্তচিন্তা বিষয়ে অগ্রসর হতে চেষ্টা করেছি।
দুই দশকের অধীক সময় পূর্বে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করেছিলাম দর্শন বিভাগে। সেসময় থেকেই আমি ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশনস এ সাংবাদিক। পড়াশুনা করা ছাড়াও একটি নির্দিষ্ট সময় কেটে যেত সাংবাদিকতায় পেশায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অতটা মনোযোগ দেয়ার ফুসরত ছিল না সেসময়। শিক্ষকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ক্লাসরুমের গন্ডিতেই। কিছুদিন মাষ্টারদা সূর্যসেন হলে থেকেছি। কিছুদিন বাসে চড়েছি। উত্তরা-বনানী-গুলশানগামী ক্ষনিকায়। দ্বিতীয় বর্ষে সব ছেড়ে ছুড়ে হাতিরপুলে বাসা নিয়েছিলাম। হলে থাকা-খাওয়া অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চড়ার আর কোন অভিজ্ঞতা আমার নেই। সেসব আমার ভাল লাগেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো যাওয়া হয়। কথা হয় ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে। মধুর ক্যান্টিনে গিয়েছিলাম কয়েকবছর পূর্বে ছেলেকে নিয়ে। তবে ডিপার্টমেন্টগুলো ও প্রকৃতির মাঝে লক্ষ্য করেছি পরিবর্তন। নতুন নতুন বিভাগ সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাজুয়েশন শেষ করতে বেশ কিছু বছরই চার বছর সময়সীমা করা হয়েছে। সেটাই চলমান। বাংলাদেশে চলতি শতাব্দীতে শিক্ষার হার বেড়েছে। মান বাড়েনি। গড়ে উঠেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এরপরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব কমেনি সারা দেশের মানুষের কাছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রচুর কথা শোনা যায় চারপাশেই।
পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই শিক্ষার মান অপরিবর্তিত নেই। সেজন্য পর্যাপ্ত তথ্য উপস্থাপন করা যেতে পারে। প্রায় প্রতিটি দেশেই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার মান বৃদ্ধি হচ্ছে প্রতিবছর। সেখানে যুক্ত হচ্ছে সমকালিন ভাবনা। শিক্ষা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন সম্পর্কে আমরা কম বেশী জানতে পারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। শিক্ষার মান বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিনে দিনে উদারনীতি থেকে পশ্চাদপদ হয়েছে। এখানের হলগুলো জরাজীর্ণ। থাকার ও খাবারের মান খুবই নাজুক। বিনোদন এর বিষয়টি নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এগিয়ে চলা শিক্ষাঙ্গনটি তার ধারাবাহিকতায় সংস্কৃতি চর্চা ও ক্রীড়াক্ষেত্রে তেমন উৎকর্ষ লাভ করতে বরাবরই ব্যর্থ। এখানের শিক্ষার্থী অথবা শিক্ষকদের কখনোই বুকার পুরস্কার, নোবেল পুরস্কার, কান চলচিত্র পুরস্কার, গ্রেমি পুরস্কার ও এ্যামি এওয়ার্ড পেতে দেখেনি কেউ কোনকালে। ছাত্র রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকছে প্রচুর সংখ্যক ছাত্র। অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি একেবারেই লক্ষ্য করা যায় না। ছাত্র দ্বারা শিক্ষক ও শিক্ষক দ্বারা ছাত্রী লাঞ্চনার ঘটনাও ঘটেছে বেশকিছু। জাতীয় উৎসবগুলো যেমন একুশে ফেব্রুয়ারী, একুশের গ্রন্থমেলা, পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস থেকে শুরু করে টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরির সাড়া জাগানো ভ্যালেন্টাইন ফেস্টিভ্যালের কেন্দ্রভূমি প্রায় হাজার হাজার একর জুড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি নিয়ে আমরা অনেক ভেবেছি। জনমহল থেকে শুরু করে নিরাপত্তা রক্ষাকারী মহল সকলেই। চুরি-ছিনতাইসহ গঞ্জিকা চত্বর হিসেবেও কিছু জায়গা বেশ প্রসিদ্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে। পতিতাবৃত্তির একট্রেস ও ভবঘুরে শ্রেণীর অভয়াঞ্চল বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের কিছু স্থান। ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র অপরিচিত কোন ছাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করলে অথবা কথা বললে ৫০ পয়সা জরিমানা করার নিয়ম ছিল। সেই আইনটি পরিবর্তীতে বাতিল করা হয়েছে। উদার সম্পর্কনীতিকেই নীতিনির্ধারকরা প্রাধান্য দিয়েছিলেন। যার মূল কারণ ছিল মুক্ত চিন্তার বিকাশলাভ। ছাত্রীদের জন্য দুটো নতুন বৃহৎ মাপের হল ও ছাত্রদের জন্য একটি হল নির্মাণ করা হলেও আবাসিক ব্যবস্থা বরাবরই নাজুক আজও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্নিহিত সত্য রাজনীতি। গণঅভ্যুত্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে। তবে শিক্ষা ও রাজনীতি দুটোই সমভাবে পাশাপাশি অগ্রসর হতে পারত এখানে। শিক্ষা ও রাজনীতির ভারসাম্য বজায় রেখে সমকালিন যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান হতে পারত সম্পূর্ণ বিশ্বতাত্ত্বিক। অথচ চরম পিতৃতুল্য শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রায় সকলেই সাদা অথবা নীল। হোয়াইট অথবা ব্লু। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। চিন্তা ও আদর্শগতভাবে বিভক্ত। সংস্কৃতি ও বিশ্বাসে বিভক্ত। শিক্ষা ও গবেষণায় বিভক্ত। তত্ত্ব ও ধারণায় বিভক্ত। এমনকি হাসি ও দুঃখেও বিভক্ত। যখন হোয়াইট টিচাররা হাসছেন তখন ব্লুরা ভাবাবেগে মত্ব। যখন ব্লুরা দুঃখে ভারাক্রান্ত তখন হোয়াইটরা ভাবাবেগে মত্ব। এই সরলদোলক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পেন্ডুলামের মত দুলাচ্ছে বহু যুগ ধরে। যা কখনো কখনো রূপ নিয়েছে শিক্ষা-সংস্কৃতিকে পাশ কাটিয়ে অদ্ভুত এক নিয়মের মাধ্যমে যোগ বিয়োগ করার মতই। সম্প্রতি আমার কৈশরের বন্ধুর প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আচরণ ও সিদ্ধান্ত আজ আমার চরম মনোযন্ত্রণার সৃষ্টি করেছে। তিনি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রুশাদ ফরিদি। তিনি ক্যাডেট কলেজে পড়াশুনা করেছেন। সেখানেই তাঁর সাথে আমার পরিচয়। তিনি অত্যন্ত সাধারণ সাদামাটা মানুষ। সম্প্রতি তিনি অভিমানে অথবা আক্রোসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একটি জাতীয় দৈনিকে একটি আর্টিক্যাল ছাপিয়েছেন। আর্টিক্যালটির শিরোনাম ছিল ‘উল্টো পথে কি শুধুই বাস?’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুশাদ ফরিদি কোন কালেই প্রখ্যাত সাংবাদিক অথবা কলামিষ্ট নয়। পত্রিকায় তার লেখা ছাপানও হয়না। কিন্তু ‘উল্টো পথে কি শুধুই বাস?’ কলামটি মন্দ ছিল না। তিনি ভালই লিখেছেন। ছাপানোও হলো। অতঃপর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হলো। কিছুদিনের মধ্যেই তদন্ত কমিটি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সামর্থ্য লাভ করল। বিষয়টি এমন যে রুশাদ ফরিদি সকলের ‘অপ্রিয়’। এজন্য অর্থনীতি বিভাগের এই শিক্ষককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জোরপূর্বক ছুটি দেয়া হলো। তিনি এখন বাধ্যতামূলক ছুটিতে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ৩১ জন শিক্ষক অভিযোগ তুলেছেন। অভিযোগকারী শিক্ষকরা রুশাদ ফরিদির সঙ্গে কাজ করবেন না। সিন্ডিকেট সভায় রুশাদ ফরিদির উপর আনিত অভিযোগ ও সিদ্ধান্তটির মধ্যেও ভারসাম্যতা লক্ষ্য করা যায় না। রুশাদ ফরিদির হাতে সিন্ডিকেট থেকে যে চিঠি দেয়া হয়েছে সেখানে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে সিন্ডিকেট সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাধ্যতামূলক ছুটি কার্যকর হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-গবেষণা-মুক্তচিন্তাকে প্রাধান্য না দিয়ে হোয়াইট এন্ড ব্লু ইমোশনকে প্রাধান্য দিলে কি বিশ্ববিদ্যালয় সোজা পথে এগুবে? কোন মুক্তচিন্তার শিক্ষক যদি উল্টো পথের উল্টো পথের পথযাত্রি ও পরিবহনগুলোর সামনে ট্রাফিক মত দু’হাত বৃস্তিত করে দাড়ান তাহলে কি তার প্রতি বাধ্যতামূলক হয়ে দাড়াবে ‘ছুটি’। আমি একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক। একটি পত্রিকার হয়ে সংসদে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। ক্যাডেট কলেজে পড়াশুনা করছি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করেছি। হোয়াইট ও ব্লু ইমোশন তাহলে আমার বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তার অভিযোগ তুলে কি সিদ্ধান্ত নিতে পারবে আজ এবং কি শাস্তি বরাদ্দ রাখছে ভবিষ্যতে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের পরিবর্তন চাই, গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগকারীদের অভাবনীয় সুযোগ চাই, মুক্তচিন্তার বিকাশ চাই, হলগুলোতে খাদ্য ও আবাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন চাই এবং ছাত্র-শিক্ষকদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হোক সেটা চাই। ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষ উদযাপন করবে। সবকিছু তদন্তের পর তার পূর্বেই চাই। এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্যা শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামান্য চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদের অনুকূলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্তবর্ষকে মুক্তিযুদ্ধের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছিয়ে স্বার্থক করার আশাবাদ ব্যক্ত করা যায় কিনা সেই নিশ্চয়তার দাবি করছি।
লেখকঃ সাংবাদিক, গবেষক, সংসদে বিশেষ প্রতিনিধি।



এই প্রতিবেদন টি 754 বার পঠিত.