সকল বিষয়ের শেষ আশ্রয় দুই মলাটে

বাংলাদেশ এর একজন খ্যাতিমান কবি সৌমিত্র দেব। ২৭ জুলাই তার জন্মদিনে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শিরিন  ওসমান

 

শিরিন:  সৌমিত্র, আজ তোমার জন্মদিন।কখনো  এই দিনটিকে নিয়ে কিছু লিখেছ?

সৌমিত্র:মনে পড়ে বাইস বছরে পা দিয়ে একবার একটা সনেট লিখেছিলাম ।ছাপা হয়েছিল আমার কাব্যগ্রন্থ “আকাশের রঙ বদলায়”এ ।তবে এখন কবিতা খুব কম লিখছি।

শিরিন: কম লেখার কারন কি?
সৌমিত্র: তেমন কোন কারন নয়।লেখার তাড়না যেমন ভেতর থেকে আসে তেমনি একটি ভাল লেখা একটি ভাল পত্রিকা লিখিয়ে নেয়।কিন্তু ভাল পত্রিকা কই? সমকাল এর মত পত্রিকা এ দেশে এখন একটাও নেই ।

শিরিন: সমকাল’ সাহিত্য পত্রিকার কথা তুমি প্রায়ই উল্লেখ করো।

সৌমিত্র: সমকাল একটি সাহিত্য পত্রিকা ।একে প্রবাদতুল্য করেছেন এর সম্পাদক সিকান্দর আবু জাফর ।তিনি যেভাবে বাংলা সাহিত্যর তরুন লেখকদের খুজে বের করেছেন এখন সে রকম কোন সম্পাদক দেখা যায় না।আমরা সম্পাদক নামধারী কিছু লেখা সংগ্রাহক ও সংকলক চিনি । ‘সমকাল’ পত্রিকায় তিনি প্রতিভাবানদের চিহ্নিত করেছেন, তাদেরকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন । তার সঙ্গে তুলনা করা যায় একজন কেই। হাসান হাফিজুর রহমান।তিনি অনেক ঝুঁকি নিয়ে একুশের প্রথম সংকলন বের করেছিলেন।আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতার বই “সাত নরী হার” প্রকাশ করতে গিয়ে নিজের জমি বিক্রি করেছেন ।

শিরিন: সৌমিত্র, তুমি একজন লেখক একি সাথে পেশা হিসাবে সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছো। তুমি আমাকে দু একটি ছোট্ট অভিজ্ঞতা জানাও, যেগুলো তোমার মনে বিশেষভাবে দাগ কেটেছে।

সৌমিত্র: ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের সাথে একবার একটি আলোচনা সভায় আমার কথা হয়। সেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমরা পাশাপাশি বসেছিলাম । মতিন সাহেব অত্যন্ত প্রাজ্ঞ মানুষ। আমি তখন নেহাৎ যুবক। আমার অনেক আলাপ করার সুযোগ হয়েছে তার সাথে। এক পর্যায়ে তিনি বলছিলেন, আপনি তো সব জানেন দেখছি, আপনি এত মনে রেখেছেন কী করে।মনে হচ্ছে আমরা এক ই সময়ের লোক ।
আর একটি প্রসংগ মনে পড়লো, আব্দুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে একবার বিশবসাহিত্যকেন্দ্রে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আমি তাঁর লেখা পড়েছি। তাঁর লেখা নিয়ে আলোচনায় যেতে চাইলাম, তিনি হাত দিয়ে থামার ইঙ্গিত করলেন, অনেকটা বুরোক্রেটিক কায়দায়। বললেন, ‘আপনি বয়সে অনেক নবীন আপনার সাথে এই আলোচনায় আমি যেতে চাই না।’ আমি একটু থমকে গেলেও বিষয়টা হজম করতে পেরেছি। একই কথা সৈয়দ শামসুল হকের বেলায় প্রযোজ্য। তিনিও কাউকে পাত্তা দিতে চাইতেন না । এই ক্ষেত্রে সাহিত্য জগতের দুই সৈয়দের মধ্যে খুব মিল ছিল। তারা পরিশ্রমী ছিলেন।কিন্তু মানুষ হিসেবে তারা ছিলেন জটিল প্রকৃতির ।এ দেশে কবি হিসেবে যারা পরিচিতি পেয়েছেন,মানুষ যাদেরকে কবি হিসেবে সম্মানিত করেছে,তারা সবাই সহজ-সরল জীবন ধারন করে গেছেন।সৈয়দ রা সে রকম কবি হতে পারেন নি।

 

শিরিন: সৌমিত্র, তোমার গদ্য আমার কাছে খুব সিম্পল লাগে। প্রবন্ধে যদিও
অনেক তথ্য উপাত্ত আছে। আমার মনে হয় তুমি মূলত কবি। তোমার অনেক কবিতা আমি পড়ে আনন্দ পেয়েছি। যেমন সংঘমিত্রা কবিতাটি তোমার কন্ঠে আবৃত্তি শুনেছি। কবিতাটি বিপ্লবী চেতনার। কিন্তু অনেকের কাছে এটি রোমান্টিক মনে হতে পারে। তুমি যে এক সময় বাম রাজনীতি করতে সেই চেতনা তোমার সাহিত্য এসে পড়েছে।

সৌমিত্র: শিরিন আপা, আপনি আমার লেখা পড়েছেন। পাঠক যদি আমার লেখা পড়ে, তারপর কিছু হয় নাই বলে ছুডে ফেলে দেয়, সেখানেও আমি বলবো লেখক হিসাবে আমি সার্থক। শরৎচন্দ্র, হুমায়ুন আহমদ সেই অর্থে বিদগ্ধ জনের লেখক নন। কিন্তু তারা পাঠকের হৃদয় ছুঁতে পেরেছেন। হ্যাঁ বাম রাজনীতিতে একসময় সক্রিয় ছিলাম। আমি এখনো এই রাজনীতির ওপর দুর্বল।

শিরিন: হুমায়ুন সর্বসাধারনের লেখক হয়ে উঠতে পেরেছেন। বিশেষ করে যুব সমাজের কাছে।

সৌমিত্র: হুমায়ুন আহমেদ কিন্তু শুরুতে এতো জনপ্রিয় ছিলেন না। তার প্রথম বই ‘নন্দিত নরকে’ র জন্য প্রকাশক খুঁজে দিতে আহমদ শরীফ বিশেষ সাহায্য করেছিলেন। তারপর তার শঙ্খনীল কারাগার।বহুবছর পর বিটিভি তে তাঁর ধারাবাহিক নাটক এইসব দিনরাত্রি যখন জনপ্রিয়তা পেল তার বই ও তখন জনপ্রিয় হল।

শিরিন: আসলেই নাটক ও সিনেমা দর্শকদের কাছে যাবার শক্তিশালী মাধ্যম।

সৌমিত্র:চলচ্চিত্র শক্তিশালী মাধ্যম হলেও আমি মনে করি তার অনেক সীমাবদ্ধতাও আছে ।দর্শন বলেন, রাজনীতি বলেন আর বিজ্ঞান বলেন,সকল বিষয়ের শেষ আশ্রয় দুই মলাটের ভেতর। অর্থাৎ বইয়ের চেয়ে শক্তিশালী কিছু নেই। সেটা বই হোক আর ইন্টারনেট বুক হোক তাকে গ্রন্থিত হতেই হবে।

শিরিন: আমাদের দেশে সাহিত্যে কার কার কাজ তোমার ভাল লাগে?

সৌমিত্র: আব্দুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দ দাশ নিয়ে ভাল কাজ করেছেন। হুমায়ুন আজাদের গদ্য আমার ভাল লাগে।

শিরিন:কোন বিশিষ্ট সাহিত্যিক তোমার লেখার প্রশংসা বা উৎসাহ দিয়েছেন?

সৌমিত্র: শামসুর রহমান আল মাহমুদ,নির্মলেন্দু গুন, রফিক আজাদ থেকে শুরু করে অনেক সিনিয়র কবি ব্যক্তিগত ভাবে আমার লেখার প্রশংসা করেছেন,কিন্তু কোথাও কোন সাক্ষাতকারে কখনো আমার নাম উচ্চারন করেন নি । এতে আমি ব্যথিত নই। অচেনা কেউ যখন আমার কবিতা পড়ে আলোড়িত হন,বিনম্র ভাবে জানান, তাদের ভাল লাগার কথা, আমি মনে করি সত্যিকার বিচারক বাস করেন সেই পাঠকের মগ্ন চৈতন্যে।

শিরিন: নবীন লেখকদের কার কার লেখা তোমার ভাল লাগে?

সৌমিত্র: আমি নবীনদের লেখা পড়ি। অনেকেই ভাল লেখছেন। আগামীতে আশাকরি আমরা বেশ ক’জন শক্তিশালী সাহিত্যিকে পাবো। কিন্তু এই মুহুর্তে আমি কারো নাম বলবো না।

শিরিন: বাংলাদেশের প্রিয় লেখকদের ক’জনের নাম বলো?

সৌমিত্র: শামসুর রাহমান,আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুন,আবুল হাসান, ফরিদ কবির, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ সহএই মুহুরতে যে তরুন আমার মন ছুয়ে যাবার মত একটি পঙক্তি রচনা করেছে তাকেও আমার প্রিয় কবি মনে করি।
শিরিন: ধন্যবাদ কবি সৌমিত্র। অনেক অকবিও বিপুল প্রশংসা পায়।আবার অনেক বড় কবির সত্যিকার মুল্যায়ন হয় না। আমি তোমার কবিতার একজন মুগ্ধ পাঠক।না হলে তোমার সাক্ষাতকার নেবার আগ্রহ বোধ করতাম না।

সৌমিত্র: ধন্যবাদ শিরিন আপা আপনাকেও।

এক নজরে

সৌমিত্র দেব

জন্ম তারিখ ও স্থানঃ ২৭ জুলাই,১৯৭০, মৌলভীবাজার
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাঃ সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা
পেশা;সাংবাদিকতা
প্রকাশিত বই ঃ৪০টি ।উল্লেখযোগ্যঃ আমি সেই মাতাল যুবক (১৯৮৯ উৎসর্গ প্রকাশন), শময়িতাদের বাড়ি (বাংলা একাদেমি) ,বন পর্যটক (স্বর ব্যাঞ্জন),অজবীথি (অন্যপ্রকাশ),জঙ্গিবাদের উৎস সন্ধানে (মুক্তচিন্তা) মরমী কবি হাছন রাজা ও তার জীবন দর্শন (আল আমিন প্রকাশন)জলে স্থলে অন্তরীক্ষে (উৎস প্রকাশন )পাথরের চোখ (নান্দনিক ),নীল কৃষ্ণচূড়া (জয়তী )প্রভৃতি ।



এই প্রতিবেদন টি 586 বার পঠিত.