তরিকত ফেডারেশন ১০টি আসন চাইবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে

তরিকত ফেডারেশন ১০টি আসন চাইবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে
এম এ আউয়াল
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম একটি বড় ইস্যু। ধর্মকে ব্যবহার করে এদেশে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে দেখা গেছে বিভিন্ন সরকারের শাসনামলে একটি গোষ্ঠিকে। তার মাঝে জামাত-ই-ইসলাম একটি রাজনৈতিক দল যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ। এই রাজনৈতিক দলটি রাষ্ট্রে সংঘর্ষ ও সন্ত্রাস কায়েম করে গণসমর্থন হারিয়েছে। তবে প্রকৃত ধর্মের অনুসারী এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ বিশ্বাস করে একটি স্থীতিশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থা। সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন মাননীয় সংসদ সদস্য ও তরিকত ফেডারেশন এর সাধারণ সম্পাদক জনাব এম এ আউয়ালের সঙ্গে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ও উদ্দেশ্র এবং উন্নয়ন-গণতন্ত্র ও আগামী নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যু নিয়ে দু’জনের আলাপচারিতার উল্লেখিত অংশ এখানে প্রকাশ করা হলো।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ নীর একাদশ নির্বাচন নিয়ে আপনার ভাবনা কি?

এম এ আউয়ালঃ প্রতি পাঁচ বছর পর পর একটি সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হয়। দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসে। সেসময় একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সাংবিধানিক শর্ত পূরণের মধ্য দিয়ে। সেই বিচারে নির্বাচন আসতে আর মাত্র দেড় বছর বাকী রয়েছে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সামাজিক অঙ্গনে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন আলাপ আলোচনা ও যুক্তি-তর্ক শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। একাদশ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য ও দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং নির্বাচন। প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। আগামী নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষজন। গণমানুষের আগ্রহ বাড়ছে নির্বাচনকে ঘিরে নানা যুক্তি-তর্কের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। সরকারে থাকা অবস্থায় সবসময়ই আমরা জনগণের পাশে ছিলাম। রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। গণমানুষের সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত থেকেছি। সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কগুলো আরো সমৃদ্ধশালী ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা কাজ করছি। আগামী নির্বাচনে ১৪ দলের জোট নির্বাচনের সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আবারও সরকার গঠন করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ ইলেকশান কমিশন কিছুদিন আগে নির্বাচনের রোড ম্যাপ প্রকাশিত করেছে। তাদের ভূমিকা ও পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে আপনার অভিমত প্রকাশ করবেন কি?
এম এ আউয়ালঃ আজ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন যে সকল ভূমিকা ও পদক্ষেপ নিয়েছে তা সঠিক। কারণ নির্বাচন কমিশন চেষ্টা করছে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে জনগণের আকাঙ্খা পূরণ করতে। তাদের সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগি ও সঠিক।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ ‘জনসমর্থন’ শব্দটি রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের উপর কৌশলে চাপ প্রয়োগ করার জন্য। তবে জনসমর্থনকে আপনারা কিভাবে উপলব্ধি করছেন?
এম এ আউয়ালঃ এই শব্দের ব্যবহার একটি কৌশল ও রাজনৈতিক হাতিয়ার। তবে প্রকৃত জনসমর্থন কোন না কোন রাজনৈতিক দল উপলব্ধি করে থাকেই। ক্ষমতায় থেকে আমাদের ধারণা খুব স্পষ্ট যে জনসমর্থন বর্তমান সরকারের পক্ষেই রয়েছে। জনগোষ্ঠির আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও কল্যাণের জন্যই সরকার কাজ করে চলেছে। জনগণ সেটা যখন উপলব্ধি করে তখন আমরাও উপলব্ধি করতে পারি যে জনসমর্থন আমাদের পক্ষে রয়েছে। জনগণ সমর্থন দিয়েছে বলেই দেশে কোন আন্দোলন-সংগ্রাম নেই। দেশে মিছিল-মিটিং নেই। রাষ্ট্রের মূল বিষয় হচ্ছে দারিদ্রতা হ্রাস করা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সফলতা। সামাজিক স্থিতিশীলতার কারণেই বাংলাদেশের জনসমষ্টি পূর্বের থেকে বর্তমান সরকারের সময় ভালো রয়েছে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ অর্থ বছর ২০১৭-২০১৮ বাজেটের পর অবকাঠামোগত উন্নয়নে আপনার অঞ্চলের পরিকল্পনা কি?
এম এ আউয়ালঃ রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ও বিদ্যুৎতের কাজ বরাবরের মতই চলমান একটি প্রক্রিয়া। পাশাপাশি স্কুল-কলেজ-মসজিদ-মাদ্রাসার জন্য বরাদ্দ থাকছেই চলতি বাজেটে। রামগঞ্জ দ্রুত অগ্রসর অঞ্চল হিসেবে সাফল্য লাভ করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন চলমান রয়েছে। চলমান অর্থ বছরে যে সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড সংগঠিত হবে সেটা জনগণের কাছে দৃশ্যমান হবে।
আমার নির্বাচনি অঞ্চল হবে সন্ত্রাসমুক্ত-মাদকমুক্ত এলাকা। এই অঞ্চলের প্রতিটি প্রশাসনিক কার্যালয়ে ডিজিটাল সুযোগ সুবিধা থাকবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই কাজ চলছে। নির্বাচনের পূর্বে রামগঞ্জ আরো অনেক অগ্রগতি হবে। আগামী নির্বাচনে নির্বাচিত হলে শতভাগ আধুনিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে আমার পক্ষে এই অঞ্চলে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ মন্ত্রী পরিষদের রদবদল সম্পর্কে আপনি কতটা অবহিত?
এম এ আউয়ালঃ মন্ত্রীসভায় রদবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইচ্ছা করলেই মন্ত্রী পরিষদে পরিবর্তন আনতে পারেন। মন্ত্রী পরিষদে যোগ্য ব্যক্তিরাই আসবেন।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ আপনার নির্বাচনি প্রস্তুতি সম্পর্কে কিছু জানাবেন কি?
এম এ আউয়ালঃ নির্বাচনের প্রস্তুতির বিভিন্ন দিক রয়েছে। উন্নয়ন কর্মকান্ড একটি প্রধান ইস্যু। উন্নয়নের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। গত বছর ১৪ দলের শরিক তরিকত ফেডারেশন দুটো আসনে নির্বাচিত হয়েছে নৌকা প্রতীক নিয়ে। আমাদের দলের চেয়ারম্যান জনাব নজিবুল বাসার মাইজভান্ডারী সাহেব। আগামী দিনের রাজনীতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই আদর্শিক জোট আরো ঐক্যবদ্ধ হবে। বাংলাদেশে আদর্শের রাজনীতি বাস্তবায়িত হবে। বাংলাদেশ আজ যেভাবে উন্নয়নের মহাসড়কে উঠেছে সেটাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে যোগ্য ও আদর্শিক নেতৃত্ব দিয়ে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নিজ নিজ দলের জন্য আগামী নির্বাচনে নির্দিষ্ট আসনের দাবি তুলেছে। যেমন রাশেদ খান মেনন ১৪টি, হোসেইন মোঃ এরশাদ ১০০টি আসন চেয়েছেন। এক্ষেত্রে আপনারা কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?
এম এ আউয়ালঃ তরিকত ফেডারেশন এর নেতা-কর্মীরা সারা বাংলাদেশের গ্রাম-ইউনিয়ন-থানা-জেলায় রয়েছেন। আমাদের দল ছোট কোন রাজনৈতিক দল নয়। সেই দিক বিবেচনা করে অনেক প্রার্থী আমরা আগামী নির্বাচনে মনোনিত করতে পারি। সেই শক্তি ও প্রস্তুতিও আমাদের রয়েছে। ১৪ দলের প্রধান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তরিকত ফেডারেশন আগামী নির্বাচনে ১০টি আসন চাইবে। আমাদের অন্তত দশজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে নিজ নিজ আসনে জয়লাভ করতে পারবেন। জোটের কাছে আমাদের একটাই দাবি আগামী নির্বাচনে। আমাদের যেন ১০টি আসন দেয়া হয় নির্বাচনে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ নির্বাচনে ধর্মীয় ইস্যুকে আপনারা কিভাবে কাজে লাগাবেন?
এম এ আউয়ালঃ ভোটের সময় ধর্মীয় ভাবধারা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে একটি ইস্যু হয়ে যায় কোন কোন ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই বিষয়টি আমরা লক্ষ্য করেছি। তরিকত ফেডারেশন ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়। তরিকত ফেডারেশন আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাস করে। মদিনা সনদ এর আলোকে আমাদের দল পরিচালিত হয়। এসব বিষয় নিশ্চয়ই এদেশের সাধারণ মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে গুরুত্ব পাবে।

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ বাংলাদেশের জনসমষ্টি অভ্যস্ত আওমামী লীগ ও বিএনপির মত বৃহৎ দুটো রাজনৈতিক দলের সমর্থন করে। মানুষ চায় নৌকা অথবা ধানের শীষে ভোট দিতে। তবে তরিকত ফেডারেশন এর রাজনীতি যে গণতন্ত্রের কথা বলে, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বলে, মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে এবং পাশাপাশি ইসলাম ধর্মের কথাও বলে সেই বিষয়টি বাংলাদেশে কতটা আস্থা সৃষ্টি করতে পেরেছে?
এম এ আউয়ালঃ এদেশে এক সময় মানুষজন ভাবতো জামাত-ই-ইসলাম হচ্ছে এদেশের একমাত্র ইসলাম এর ধারক ও বাহক। পরবর্তীতে ধর্মপ্রাণ মানুষ বুঝতে পেরেছে বিষয়টি তা নয়। আমরা যারা সুফি মতাদর্শে বিশ্বাস করি, আমরা যারা মদিনা সনদের আলোকে বিশ্বাস করি, আমরা যারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করি তারাই তরিকত ফেডারেশন এর কর্মী। মডারেট ইসলাম ধারন করার মধ্য দিয়েই আমরা রাজনীতিতে ধর্মের সম্পর্ক খুঁজে পাই। মানুষের জীবন-ধর্ম ও রাজনীতি একটির সঙ্গে আরেকটির সুসম্পর্ক রয়েছে। তার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ও মানুষের কল্যাণ সাধন করা সম্ভব। উগ্রবাদ আমাদের লক্ষ্য বা আদর্শ নয়। ইসলাম গণতন্ত্রের কথা বিশ্বাস করে। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে না। জামাত থেকে তরিকত অনেক পার্থক্য ও ব্যবধানের সৃষ্টি করেছে। জামাত কোন ইসলামিক দল নয়। ইসলামকে তারা ব্যবহার করেছে। ইসলামের ধারণা শুধুমাত্র তরিকত ফেডারেশন এর মধ্য দিয়েই আত্মপ্রকাশিত হয় এদেশে। সেজন্যই মানুষও তরিকত ফেডারেশনকে সমর্থন করে।

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ মানুষের কাছে আপনাদের ম্যাসেজ কি আজকের বিশ্বে?
এম এ আউয়ালঃ বাংলাদেশ একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র। সত্যিকারের ইসলাম এর সবকিছু আমাদের শেষ প্রফেট হযরত মোঃ (সাঃ) এর মাধ্যমে সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়েছে। আমরা তাই অনুসরণ করি। রাষ্ট্রও সেটা অনুসরণ করবে। আমাদের নবী হযরত মোঃ (সাঃ) গণতন্ত্র ও নির্বাচন বিশ্বাস করেছেন। সাম্য ও মানবতার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তরিকত ফেডারেশন নারী-পুরুষের সম অধিকার থেকে সাম্য-মানবতা-শান্তি সব কিছুতেই বিশ্বাস করে ও তা বাস্তবায়ন এর জন্য কাজ করে। মানুষ আজকে সেটাই উপলব্ধি করে। তাই সংঘাত-অপশাসন থেকে মানুষ মুক্তির লক্ষ্যে তার মুক্তির পথ খুঁজে নিতে চাইছে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ আপনাকে ধন্যবাদ এই বর্ষার দুপুরে। দেশবাসির জন্য আপনার কাছে দোয়া চাই।
এম এ আউয়ালঃ ধন্যবাদ আপনাকে।



এই প্রতিবেদন টি 743 বার পঠিত.