তথ্য অধিকার আইন ও তথ্যের অধিকার

 

সৌমিত্র দেব

অন্য মৌলিক চাহিদার মতো তথ্যের অধিকারও এখন স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ অনেক দিক দিয়ে পিছিয়ে ছিল। স্বাধীনতার পর একের পর এক সামরিক শাসন তাকে ঠেলে নিয়ে গেছে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে। সেই অন্ধকারে আলোর ঝলক নিয়ে এসেছে রূপকল্প ২০২১। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্থবায়নের স্বপ্ন নিয়ে যারা কাজ শুরু করেছিলেন তারাই এদেশে প্রণয়ন করেছেন তথ্য অধিকার আইন। পৃথিবীর অনেক দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এই তথ্য অধিকার আইনকে বাস্থবায়নের চেষ্টা করছে। ২০০৯ সালে গঠিত হয়েছে তথ্য কমিশন।
তথ্য কমিশনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানে ৩৯ (১) ও ৩৯ (২) (ক) অনুচ্ছেদে নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। তদুপরি সংবিধানের ৭(১) উপানুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ, আর কেবলমাত্র তথ্যের অবাধ প্রবাহই জনগণকে প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতায়িত করতে পারে। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করার লক্ষ্যে জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তাবিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূলত তথ্য অধিকার আইন/২০০৯ একটি দীর্ঘপ্রক্রিয়ার ফসল। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথ্য অধিকার আইনের খসড়া প্রণয়নের লক্ষ্যে ৬ জানুয়ারী, ২০০৮ তারিখে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি আইন কমিশনের খসড়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিদ্যমান তথ্য অধিকার আইনসমূহ পর্যালোচনা করে আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করে। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে গত ২০ অক্টোবর, ২০০৮ তারিখে ‘তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ, ২০০৮’ জারি করা হয়। বর্তমান মহাজোট সরকার ‘তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ, ২০০৮’ কে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেয় এবং ৯ম জাতীয় সংসদের ১ম অধিবেশনে যে কয়েটি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হয় তার মধ্যে ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’ অন্যতম।
তথ্য অধিকার আইন/২০০৯ কার্যকর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের আরো ৮৮টি দেশের সাথে তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার যাত্রায় শামিল হয়েছে। তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারী ও বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত বেসরকারী সংস্থাসহ সরকারের সাথে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক সরকারী কার্যক্রম পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন বেসরকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, ফলে দুর্নীতি হ্রাস পাবে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। তথ্য অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘‘তথ্যের স্বাধীনতা একটি মৌলিক মানবাধিকার এবং যেসব অধিকারের প্রতি জাতিসংঘ প্রতিশ্র্রুতিবদ্ধ তার সবগুলো যাচাইয়ের একটি পরশপাথর’’ মর্মে উল্লেখ করে প্রস্থাব গ্রহণ করা হয়। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সংরক্ষিত, যাকে একটি আইনগত অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের বহুদেশে আইনের মাধ্যমে মানুষের এ অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, নেপালে ২০০৭ সালে ’আরটিআই’ আইন প্রণীত হয়েছে এবং নেপালের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তথ্য অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। ভুটানে ২০০৭ সাল থেকে তথ্য অধিকার বিষয়ে কার্যক্রম শুরুহলেও এখন পর্যন্ত তথ্য অধিকার আইন প্রণীত হয়নি। সদ্য সার্কভুক্ত দেশ আফগানিস্থানে সার্বক্ষণিক যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করায় এখন পর্যন্ত আরটিআই আইন প্রণীত হয়নি। এছাড়া মালদ্বীপ এ বিষয়ে নির্লিপ্ত।
সার্কভুক্ত দেশসমূহের মধ্যে ভারত ২০০২ সালে তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ এবং পরবর্তীকালে ২০০৫ সালে তথ্য অধিকার আইন জারী করে। বাংলাদেশ ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সর্বসম্মতিক্রমে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ পাস করে বিশ্ব দরবারে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই আইন সুশীল সমাজ, মানবাধিকার কর্মী, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকসহ সকল মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।-১
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে। রূপকল্প ২০২১ ঘোষণা করা হয়েছে। তারই সূত্র ধরে প্রণীত হয়েছে তথ্য অধিকার আইন। গঠিত হয়েছে তথ্য কমিশন। কমিশনে একজন প্রধান তথ্য কমিশনার ও দুই জন তথ্য কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়। কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় আগারগাঁওয়ে। বাংলাদেশের প্রথম নারী তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড.সাদেকা হালিম বলেছেন, তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বহু রাষ্ট্রে ‘তথ্য অধিকার আইন’ আছে। তথ্য অধিকার মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত। জনগণের তথ্য অধিকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সংবিধানে মৌলিক অধিকার রূপে স্বীকৃত চিন্তা, বিবেক ও বাক স্বাধীনতার অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে তথ্য প্রাপ্তির অধিকারকে সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫ এপ্রিল, ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন বাংলাদেশ গেজেট প্রজ্ঞাপন আকারে জারী করা হয়। আইনে ‘তথ্য কমিশন’ নামে একটি সংবিধিবদ্ধ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়েছে। তথ্য কমিশনের একজন প্রধান তথ্য কমিশনারসহ দুইজন তথ্য কমিশনার রয়েছেন। তথ্য কমিশনের তথ্য কমিশনার হিসাবে জুলাই, ২০০৯-এ নিয়োগ পাবার পর কিছু অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে এই নিবন্ধটিতে মূলত কমিশনের এ যাবৎকালীন তথ্য অধিকার আইন বাস্থবায়নে বিভিন্ন দিকসমূহ সীমিত পরিসরে আলোচনা করার প্রয়াস পেয়েছি। তথ্য কমিশনের কাজ তথ্য নিয়ন্ত্রণমূলক নয় বরং জনগণের নিকট তথ্য সহজলভ্য করার পরিবেশ সৃষ্টি। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ জাতীয় সংসদে গৃহীত হয় এবং তার প্রেক্ষাপট বিশেস্নষণে অবশ্যই কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, যেমন- ১৯৮৩ সালে প্রেস কমিশনের সুপারিশ ও ২০০২ সালে আইন কমিশনের কার্যপত্রের সূত্র ধরে বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে তথ্য অধিকার আইনের দাবী জোরদার হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় আইন কমিশন বিভিন্ন দেশের আইন পর্যালোচনা করে ২০০৩ সালে তথ্য অধিকার আইনের একটি খসড়া সরকারের নিকট পেশ করে। নাগরিক সমাজ এই আইনটিকে বাস্থবায়নের জন্য সোচ্চার হয় এবং বিভিন্ন ডায়ালগ ও এ্যাডভোকেসি করে, ফলশ্রুতিতে ৪০টি বেসরকারী সংগঠন যেমন- মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ১৯, নাগরিক উদ্যোগ ইত্যাদির সমন্বয়ে গঠিত হয়। পরবর্তীকালে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ-২০০৮ জারী করে এবং ২০০৯ সালে নির্বাচিত সরকার জাতীয় সংসদে এই তথ্য অধিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশকে তথ্য অধিকার আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায় যে, বর্তমান নির্বাচিত সরকার বিশ্বাস করে জনগণের জন্য তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
তথ্য অধিকার আইন নাগরিকের ক্ষমতায়নের সাথে জড়িত এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র এবং তার অঙ্গসংগঠন, রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব, প্রশাসন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করে। উক্ত আইনের (ধারা ৪)-এ উলেস্নখ আছে, ‘প্রত্যেক নাগরিকের কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ ও একজন নাগরিককে তথ্য প্রদানে বাধ্য থাকিবে’। সুতরাং এই আইন ক্ষমতাবানদের উপর তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আবেদনকারীর আইনগত ভিত্তি (ধারা-৯) হচ্ছে তথ্য প্রদানের অনীহা, আইনের লংঘন এবং তথ্য প্রার্থী আইনি প্রতিকার নিতে পারে। এই বক্তব্য তুলে ধরে যে তথ্য জনগণের, সরকারের নয়। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। জনগণের রায়ে সরকার নির্বাচিত হয় এবং জনগণের প্রদত্ত করের টাকায় সরকার চলে। তাই জনগণের চাহিদাকৃত তথ্য দিতে সরকার বাধ্য।
এছাড়া গবেষণায় পরিলক্ষিত যে, তথ্যের অবাধ সরবরাহের সাথে দুর্নীতি হ্রাসের সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ দুর্নীতির ধারণা সূচকের ভিত্তিতে দেখা যায় যে সমস্থ দেশ (বিশেষ করে স্কেন্ডেনেভিয়ান দেশগুলোর মধ্যে ফিনল্যান্ড) তথ্য অধিকার আইন গ্রহণ ও বাস্থবায়ন করেছে তারাই সর্বনিম্ন দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। যদিও সিঙ্গাপুর এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম যা তথ্য অধিকার আইন ছাড়াই কম দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে যা দুর্নীতির ধারণাসূচক এবং তথ্য অধিকারের মধ্যকার চূড়ান্ত সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জ করে। বস্থুত দুর্নীতি এবং তথ্য অধিকারকে সুনির্দিষ্টভাবে সম্পর্কিত করা যায় না কারণ তা অন্যান্য আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সর্বময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত।
তথ্য অধিকার আইন বাস্থবায়নে বর্তমানে বেশ কিছুসংখ্যক বেসরকারী সংগঠন কাজ করছে। পাশাপাশি তথ্য কমিশন তথ্য অধিকার আইন বাস্থবায়নে উদ্যোগী হয়েছে। তথ্য কমিশন সীমিত জনবল নিয়ে তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কিত সচেতনতায় বিভিন্ন ফোরামে ডায়ালগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডাটাবেজ তৈরি, ওয়েবপোর্টাল হালনাগাদকরণ এবং নিয়মিত প্রকাশনা সংক্রান্ত কাজ করছে। এ ব্যতীত তথ্য কমিশন প্রাপ্ত অভিযোগপত্রগুলো গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। ৬৪টি জেলার মধ্যে মোট ২৫টি জেলায় তথ্য কমিশন তথ্য অধিকার আইন জনঅবহিতকরণ করেছে। এর মধ্যে ২৩টি জেলায় তথ্য কমিশনের পক্ষ থেকে তথ্য কমিশনার হিসেবে আমি তথ্য আইন সম্পর্কে সভায় জনঅবহিতকরণ করেছি। এছাড়াও তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর বিধানাবলির উপর বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও এনজিওবিষয়ক প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলোতে প্রশিক্ষণার্থীগণের সঙ্গে মতবিনিময় হচ্ছে। যেমন গণমাধ্যমের মধ্যে প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, সমকাল, যুগান্তর, জনকণ্ঠ, আমাদের সময়, ডেইলি স্টার, দি ইন্ডিপেনডেন্ট এবং বিটিভি, ইটিভি, আরটিভি, দেশ টিভি, এনটিভি, চ্যানেল আই প্রভৃতি। এছাড়াও বিপিটিসিএতে ফাউন্ডেশন কোর্স এবং এসিএডি কোর্স, ডিটেকটিভ ট্্েরনিং স্কুলে পুলিশ ইন্সপেক্টরদের ট্রেনিং কোর্স, এনডিসি, জাতীয় পর্যায়ে প্রতিবন্ধীদের জন্য ফোরামে আইন সম্পর্কে অবহিতকরণ করা হচ্ছে। প্রতিটি জনঅবহিতকরণ সভা ও প্রশিক্ষণে আমন্ত্রিত অংশগ্রহণকারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইনটি বাস্থবায়ন ও বাস্থবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে বিশদ আলোচনা করে। অংশগ্রহণকারীদের তথ্য অধিকার আইন বাস্থবায়ন সংক্রান্ত মতামত তথ্য কমিশনকে আইনের প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সাহায্য করছে। অংশগ্রহণকারীদের সাথে আলোচনায় আইনটির সবল ও দুর্বল দিক বিশদভাবে আলোচিত হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীগণ আইনের কিছু ধারার সংশোধন দাবি করেছেন। যেমন- বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এবং ইউনিয়ন পরিষদ কেন আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি? কেন তথ্য অধিকার আইনে নারী ও শিশুদের তথ্য অধিকারকে সুনির্দিষ্ট করা হয়নি? তা জানতে চেয়েছেন। তথ্য আইন সংক্রান্ত সুচিন্তিত এই সুপারিশগুলো তথ্য কমিশন পর্যায়ক্রমে গ্রহণ করে তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয়কে অবহিত করছে এবং আশা করা যায় বস্থুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় উত্থাপিত পরামর্শগুলো পরবর্তীকালে আইনটির সংশোধনের সুযোগ আসলে সংশোধিত আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এ-যাবৎকাল তথ্য অধিকার আইনটি উপস্থাপনকালে আইন সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সবার কাছ থেকে উত্থাপিত হয়েছে। যেমন-তথ্য বলতে কি বুঝায়? যে কোন পর্যায়ে যে কোন উপাদান যেমন- নথি, দলিল, স্মারক, ই-মেইল, মতামত, উপদেশ, সংবাদপত্রের বিবৃতি, বিজ্ঞপ্তি, আদেশ, মূল্যায়ন বই, চুক্তি, প্রতিবেদন, কাগজ, নমুনা, নকশা, ইলেকট্রনিক তথ্য উপাদান ইত্যাদি এবং সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অন্য যে কোন আইনের ক্ষমতা বলে যে কোন ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে [২ (৮) অনুচ্ছেদ]। এখানে উল্লেখ্য যে দাপ্তরিক নোট শিট বা তার অনুলিপি তথ্য বলে গণ্য হবে না। এরপরে এসেছে তথ্য প্রদান ইউনিট, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকতার দায়িত্বসমূহ কি? সরকারের কোন মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কার্যালয়ের সাথে সংযুক্ত বা অধীনস্থ কোন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর বা দপ্তরের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয়, জেলা কার্যালয় বা উপজেলা কার্যালয় তথ্য প্রদান ইউনিট হিসেবে কাজ করবে [ধারা- ২ (ক ও খ)]। উদাহরণস্বরূপ একজন কলেজ অধ্যক্ষ জানতে চেয়েছিলেন, কাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হবে? এক্ষেত্রে বলা হয় কলেজের অধ্যক্ষ যে কোন বিভাগের একজন শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ প্রদান করতে পারেন। আর কলেজের অধ্যক্ষ হবেন আপীল কর্তৃপক্ষ। তথ্য অধিকার আইন অনুসারে তথ্য জানার জন্য লিখিত আবেদন করতে হবে। যাঁরা লেখাপড়া জানে না তারা কিভাবে আবেদন করবেন? এক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহযোগিতা প্রদান করবেন এবং আবেদনে টিপসহি নিয়ে দাখিল করতে পারবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে তথ্য প্রদান না করলে ধারা- ২৪ অনুসারে তথ্য প্রদানের সময়সীমা অতিক্রান্ত হবার পরবর্তী ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে আপীল কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধকারী আপীল করতে পারবেন। আবেদনকারী আপীল কর্তৃপক্ষের নিকট আইন মোতাবেক সুবিচার না পেলে তথ্য কমিশনের নিকট অভিযোগ পাঠাতে পারবেন। এখানে উলেস্নখ্য যে, অনেকে এ ভুল ধারণা পোষণ করেন যে, তথ্য কমিশন হচ্ছে আপিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তথ্য কমিশনের কাজ হচ্ছে মূলত অভিযোগ গ্রহণ করা ও সে অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া (ধারা- ২৫ ও ২৬)। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ১৩ (ঙ) অনুসারে বিভ্রান্তমূলক তথ্য প্রদান করার জন্য সংশিস্নষ্ট কর্মকর্তাকে ধারা- ২৭ (ঘ) ও (ঙ) অনুযায়ী তথ্য কমিশন জরিমানা ছাড়াও ধারা ২৭ (৩) বলে অসদাচরণ গণ্য করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্থিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সংশিস্নষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর সুপারিশ প্রদান করতে পারবে। ধারা-৭ এ কিছু তথ্য প্রদান বা প্রদানে বাধ্যতামূলক নয় প্রসঙ্গে মূল যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে আলোচনায় আসে তা হচ্ছে বিচারাধীন মামলা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের জন্য পাওয়া যাবে কিনা? এই আইনের ধারা ৭ (ট) ও (ঠ) অনুযায়ী আদালতে বিচারাধীন কোন বিষয় যা প্রকাশে আদালত বা ট্রাইব্যুনালের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে অথবা যার প্রকাশ আদালত অবমাননার শামিল এবং তদন্তাধীন কোন বিষয় যার প্রকাশ তদন্ত কাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এইরূপ তথ্য প্রকাশের জন্য প্রদান বাধ্যতামূলক নয়। রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যাদি (যেমন, এইচআইভি, এইড্স প্রভৃতি) জানানো যাবে কিনা? এই আইনের ধারা ৭ (জ) ও (ঝ) অনুসারে ব্যক্তিগত তথ্যাদি প্রদান করা বাধ্যতামূলক নয়। পুলিশ এবং র্যাবের নিকট তথ্য চাওয়া যাবে কিনা? এ প্রসঙ্গে উলেস্নখ করা হয় যে, এই আইনের ধারা- ৩২-এর তফসিল অনুযায়ী ৮টি নিরাপত্তা সংস্থার (যা ভারতেও বিদ্যমান) ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইন প্রযোজ্য হবে না। তবে উক্ত ৮টি নিরাপত্তা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কোন তথ্য দুর্নীতি বা মানবাধিকার লংঘনের ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে তথ্য কমিশনের অনুমোদন গ্রহণপূর্বক উক্ত তথ্য সরবরাহ করতে হবে। তবে এই সকল সংস্থা জনস্বার্থে প্রয়োজনবোধে স্বেচ্ছায় তথ্যের অবমুক্তকরণ করতে পারে। উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ভারতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ তথ্য সরবরাহ করার জন্য বিভিন্ন নাগরিক সমাজ ও তথ্য অধিকার কর্মিগণ অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে।

তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা (ধারা- ৯) একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তাঁকে তথ্যের সংরক্ষক/ভান্ডার হয়ে উঠতে হবে। তাঁর প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানানো, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য প্রাপ্তির সুবিধা সৃষ্টি, তথ্যের উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ, তথ্য সরবরাহে ব্যর্থতা নির্ধারণ। সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ অজঞওঈখঊ ১৯ ও তথ্য কমিশনের যৌথ প্রশিক্ষণে তথ্য অধিকার আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তাদের মতামত প্রকাশ করেছেন। দাপ্তরিক বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তাদেরকে তথ্য প্রদানে বিরত রাখছে। উপরন্তু তারা তাদের ঊধ্র্বতন কর্তৃপক্ষকেও এ আইন সম্পর্কে অবহিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। যেহেতু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ ঊধ্র্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন। তাই ঊর্ধবতন কর্তৃপক্ষের না থাকলে তথ্য সরবরাহে বিঘœ হবে। যেমন- একজন সরকারি কর্মকর্তা যিনি ইতিমধ্যে কোন না কোন দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন, তাঁর উপর বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে তথ্য প্রদানের দায়িত্ব আরোপ করা হবে। তখন তিনি কেন তা গ্রহণ করতে উৎসাহবোধ করবেন? তাছাড়া তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মোবাইল ফোন প্রয়োজন। এছাড়া একজন বিকল্প কর্মকর্তা থাকা জরুরী যাতে একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যজন কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ সরকারি/বেসরকারি বিভাগ/অধিদপ্তরে তথ্য ইউনিট স্থাপনের প্রস্থাব দিয়েছেন যাতে করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে তথ্য ভান্ডার তৈরি হয় এবং জনগণ চাওয়া মাত্র প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা যায়। এ লক্ষ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণই উপনিবেশিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে আগ্রহী এবং উলেস্নখ করেন যে সমস্থ সরকারি অফিস এবং সরকার কর্তৃক নিবন্ধনপ্রাপ্ত বেসরকারী সংগঠন তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পড়ে তাদের সম্পূর্ণ নতুন বাজেট এবং তথ্য সরবরাহের লক্ষ্যে নতুন একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এই কাজগুলো অত্যন্ত সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। এ লক্ষ্যে তথ্য অধিকার আইন বিষয়ক গবেষক এসএম শামীম রেজা বলেন, “তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর বাস্থবায়নের জন্য দরকার প্রক্রিয়া এবং সক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ, তথ্য প্রাপ্তির জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো এবং সর্বোপরি সরকারি কর্মকর্তাদের মানস কাঠামোর পরিবর্তন”। এই দায়িত্বসমূহ পালনে তথ্য কমিশন সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, কিন্তু সামগ্রিক বাস্থবায়ন সরকারের উপরই বর্তায়।
তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে কোন কোন ক্ষেত্রে দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে। তথ্য কমিশনের কাছে অভিযোগ আসছে কিছু উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তা বা খাদ্য কর্মকর্তা তথ্য সরবরাহে অপারগতা প্রকাশ করেন। এর মূল কারণ এ সকল প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনে দীক্ষিত এবং পরিচালিত। কিন্তু উলেস্নখ্য যে, প্রচলিত যে কোন সরকারি গোপনীয় আইনের বিধানাবলীকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা এই আইনে রয়েছে (ধারা-৩)। যেমন- অফিসিয়াল সিক্রেট্স এ্যাক্ট ১৯২৩-এর ৫ (১) অনুচ্ছেদটি সামরিক এবং কৌশলগত গোপনীয়তা রক্ষার নিমিত্তে তৈরি করা হয়েছে। তথ্য প্রদান না করার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাগণ এই অনুচ্ছেদটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেন। ৫ (১) অনুচ্ছেদে আরও উলেস্নখ আছে যে, যদি কোন ব্যক্তি তাঁর অধীন বা নিয়ন্ত্রণে কোন গোপন বিষয় (তথ্য) থাকা অবস্থায় (ক) স্বেচ্ছায় বিনিময় করে, (খ) তথ্য ব্যবহার করে (গ) তথ্য বিক্রি করে (ঘ) যৌক্তিক যতœ নিতে ব্যর্থ হয়- তাহলে ঐ ব্যক্তি উক্ত ধারা মোতাবেক অপরাধী বলে গণ্য হবে। ১৩৮ বছরের পুরনো এভিডেন্স এ্যাক্টের ১২৩, ১২৪ ও ১২৫ উপধারা মতে কোন সরকারি অঙ্গসংগঠনের বিভাগীয় প্রধানই শুধুমাত্র তথ্য প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখেন। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ ধারা ৯৯ অনুযায়ী তথ্য দেয়া যাবে না। রুলস অব বিজনেস (১৯৯৬) সংবাদকর্মীদের কাছে তথ্য প্রকাশে সরকারি কর্মকর্তাগণের উপর সুনির্দিষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এখন পর্যন্ত এটা নিশ্চিত যে, সরকারি কর্মচারীগণ তাদের শপথনামা এবং চাকরি বিধিমালা উভয়ের কারণেই তথ্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকেন। যাহোক, তথ্য অধিকার আইনের আশ্রয় নিয়ে কোন তথ্য চেয়ে আবেদন করলে ৩ উপধারা অনুযায়ী উপরোলেস্নখিত এ সকল নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না এবং এ সমস্থ সকল নিষেধাজ্ঞাকে অগ্রাহ্য করা হবে। নাগরিকগণ তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে এভাবেই তথ্য অধিকার আইনের শক্তি দ্বারা ক্ষমতায়িত হবে এবং ঐ সমস্থ প্রাতিষ্ঠানিক বাধাঁসমূহ অপসারণ করতে সক্ষম হবে যা এখন পর্যন্ত সরকারি এবং বেসরকারি খাতকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই বলা যায় তথ্য অধিকার আইন রাষ্ট্রের কাছ থেকে জনগণের কাছে নিয়ন্ত্রণের চাবি পৌঁছে দেয়।
তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্র সুসংহত করার সাথে সাথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে তথ্য অধিকার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্য কমিশনের তথ্য বাতায়ন উদ্বোধনকালে বলেন যে, তথ্য অধিকার দরিদ্র, প্রান্তিক এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। তিনি বিশেষ করে এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আইনটি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এ লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য আ.আ.ম.স. আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “এখন সবকিছুই তথ্য প্রাপ্তির উপর নির্ভর করে, সুতরাং আমাদের প্রথমেই তথ্য অধিকার কি এবং কিভাবে তথ্য অধিকার জনগণের উপকারে আসবে তা তাদেরকে জানাতে হবে”। তিনি আরও উলেস্নখ করেন যে, ৭০% থেকে ৮০% লোক তাদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয় এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা নিঃসঙ্গ। সমাজের সর্বস্থরে তথ্য অধিকার এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা অবশ্যই পৌঁছাতে হবে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে যেমন বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কায় অধিকাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কিভাবে তাদের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়া যায়। এখানে স্মরণ রাখতে হবে যে, বাংলাদেশে অধিকাংশ লোকের ইন্টারনেটে প্রবেশগম্যতা নেই। বাংলাদেশে আনুমানিক ৪% লোকের ইন্টারনেট সুবিধা আছে যেখানে ভারতে ১০% এবং পাকিস্থানে ৭%। এই বাস্থবতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্বাক্ষরতার কথা বিবেচনায় তথ্য কমিশনকে বিভিন্ন মাধ্যম যেমন- রেডিও, টিভি, সংবাদপত্র প্রকাশনা, নাগরিক সনদ, বিলবোর্ড, জনপ্রিয় থিয়েটারের মাধ্যমে আরও বৃহৎ পরিসরে সচেতনতামূলক ভূমিকা নিতে হবে।

বাংলাদেশে তথ্য অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে গণমাধ্যম এখন পর্যন্ত আশানুরূপ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। জনসাধারণ বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের জন্য বিদ্যমান তথ্য তৈরিতে এবং এই আইনের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টিতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কিছু বেসরকারী সংগঠন গণসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে কিন্তু সেটাও সীমিত আকারে। সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- জনগণকে তথ্য অধিকার আইনের উপযোগিতা সম্পর্কে অবহিতকরণ করা। এক্ষেত্রে তথ্য কমিশন সীমিত অবকাঠামো ও জনবল নিয়ে যথার্থ ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করছে।
তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ডিজিটাল এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আর্থিক এবং মৌল মানবিক চাহিদা পূরণে এই দুইটি আইন মূল অনুঘটক। আঞ্চলিক ই-উন্নয়নের মাধ্যমে ই-গভর্নেন্সের কাঠামো সৃষ্টির লক্ষ্যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের প্রেক্ষিতে এই দুইটি আইনের সমন্বয় সাধন জরুরী। তথ্য অধিকারের অনুশীলন এবং ব্যবহারসহ এই অঞ্চলের ই-গভর্নেন্স রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়নে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দান করতে পারে। তথ্য অধিকারকে একটি কৌশলগত এবং নির্দিষ্ট সময় ছকে বেঁধে দেয়া দরকার। জনগণের উপর তথ্য অধিকার আইনের বাস্থবায়ন এবং প্রভাব নিয়ে গবেষণা অতীব প্রয়োজনীয়।
তথ্য অধিকার আইন বাস্থবায়নে এ সমস্থ সমস্যা ও চ্যালেঞ্জসমূহের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সরকার এবং বেসরকারী সংগঠনসমূহকে ভিতর এবং বাইরে জবাবদিহি করার ক্ষেত্রে তথ্য কমিশন অন্যতম ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সকল নাগরিক সমাজ ও সংগঠন তাদের নিজেদের মধ্যকার অশোভনীয় প্রতিযোগিতা ও অনৈক্যের কারণে কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হতে পারে। তথ্য অধিকার আইনের উন্মুক্ততার কারণে সরকারি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন খাতে তথ্য অধিকারকে দমিয়ে রাখার ঝুঁকি রয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষমতার অযাচিত ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাই তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় আইনের ব্যবহারকে কার্যকর করতে হবে। চূড়ান্তভাবে আমরা বাংলাদেশে তথ্য কমিশনকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এমন একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন তথ্য কমিশন হিসেবে দেখতে চাই যা সর্বাত্মক সমর্থন নিয়ে জনগণের তথ্যের অধিকার বাস্থবায়নে কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।-২
কেন তথ্য অধিকার প্রয়োজন তা নিয়ে অভিজ্ঞজনেরা নানা মতামত দিয়েছেন। তথ্য যে কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস লিখেছেন- ‘তথ্য’ হলো তা যা মানুষের ‘এনট্রোপি’ বা ‘অনিশ্চয়তা’ দূর করে; তথ্য প্রাণ Ñ আধুনিক রাষ্ট্রের; তথ্য অক্সিজেন Ñ গণতন্ত্রের; তথ্যহীন থাকা মানে সন্দেহে থাকা; বসবাস অনিশ্চয়তায়; তথ্য শব্দের উৎসশব্দ ‘তথা’ Ñ যার অর্থ ‘যা তা-ই’ বা ‘ যেমনটা তেমনই’; তথ্য শব্দের আরেক অর্থ তাই ‘সত্য’; তথ্য তাই আলোও বটে Ñ সরিয়ে দেয় দোলাচাল, সন্দেহ আর দ্বিধাজাত অন্ধকার। তথ্যের আরেক নাম তাই জ্ঞান; আর জ্ঞানের অপর নাম যে ক্ষমতা, ফুকোর কল্যাণে তা আমরা অনেক আগেই জেনেবুঝে গেছি। সত্যজিৎ রায়ের সেই যে বিখ্যাত ছবি ‘হীরক রাজার দেশে’, যেখানে বন্ধ করা হচ্ছে পাঠশালা; কেন পাঠশালা বন্ধ? রাজা বলছেন, “ যত জানবে, তত কম মানবে”। কী সাংঘাতিক কথা। তাইতেই তো সে কালের রাজা আর এ কালের সরকার বাহাদুর জনগণকে জানাতে ভয় পায়, পাছে না তারা কম মানে, পাছে না তারা রাজা/সরকারের অবিচার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা ক’য়ে উঠে।

কিন্তু তথ্য চাওয়ার, পাওয়ার ও প্রকাশের বিষয়টি প্রত্যেক ব্যক্তির নাগরিক অধিকার। জানার অধিকার তো মানবাধিকার। তথ্য না জানানো হলে তা হবে মানবাধিকারের লঙ্ঘন; তথ্য গোপন করে রাখা তাই সামাজিক অপরাধ।
অমর্ত্য সেন বলেছেন, রাষ্ট্রে তথ্যের প্রবহ অবাধ হলে, গণতন্ত্রের পূবশর্ত যা, ঠেকানো যায় এমনকি দুর্ভিক্ষও। কেবল তো অমর্ত্য নয়, বিশ্বখ্যাত আরেক অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটস তার নোবেল পুরস্কারটিই পেয়েছেন তথ্যের উপর কাজ করে। ‘অ্যাসিমেট্রিক ইনফরমেশন’ বা ‘তথ্যের অ-সমানতার’ তত্ত্বে তিনি ও তার সহযোগী তাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন, ‘যারা শাসন করে এবং যাদের শাসন করা হয়, এই দুপক্ষের মধ্যে তথ্যের যে অ-সমানতা থাকে, তাই কিন্তু প্রশাসকদের হাতে তুলে দেয় বিশাল ক্ষমতা।’
ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যেতে-চাওয়ারা তাই সাধারণ মানুষকে কখনই কিছু জানতে দিতে চায় না। মানুষকে অন্ধকারে রেখেই তারা ফুলবাড়ির কয়লার চেয়েও কালো চুক্তি করে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে, আদিবাসীদের না জানিয়েই মধূপুরে ইকোপার্কের মাস্টারপ্ল্যান করে; হানা করে, সোফা করে।
মুশকিল তাই হয়ে উঠে তখন, তথ্যের একচ্ছত্র মালিকানা যখন থাকে কেবল সরকার, মন্ত্রী আমলা পুলিশের হাতে; মালিকানার তৈরি করা এই ‘কৃত্রিম সিন্ডিকেঁটি’ ভাঙা দরকার। দরকার মালিকানায় পরিবর্তন আনা। রাষ্ট্রের মালিক কে ? জনগণ। তথ্যের অবাধ মালিকানাও তাহলে জনগণের কাছে ন্যস্থ করতে হবে। তথ্য যাবে কৃষক শ্রমীক জনতার হাতে, তবেই রাষ্ট্রের মালিক যে জনগণ সত্যিকার অর্থে সমাজে তখন এ বোধ তৈরি হবে। একজন কৃষকের উন্নত বীজ বা সারের তথ্য, গ্রেপ্তার করতে এলে তার কারণ ও আইনি ধারা জানার কিংবা নির্যাতিত নারীর আইনি সহায়তা পাওয়ার তথ্য Ñ সবই কিন্তু তথ্য অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তাই বিদ্যমান অসম ও অমানবিক ক্ষমতা বিন্যাসকেও অনেকখানি বদলে ফেলা সম্ভব। আর কেবল সরকারি নয় তথ্য পেতে হবে বেসরকারি সংস্থা থেকেও Ñ যাদের কাজের সঙ্গে নাগরিক স্বার্থ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।
আর তথ্য জানানো তো নিছক তথ্য জানানোর জন্য নয় বরং তথ্যের রয়েছে বিরাট এক সামাজিক উপযোগিতা। এর বিজড়ন তাই বিচিত্র ও বহুবিধ। ক্রেতা হিসেবে আমার যেমন অধিকার রয়েছে খাবারের প্যাকেটে খাদ্য উপকরণ, খাদ্যগুণ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানা। রোগী হিসেবে তেমনি রোগের তথ্য জানার এক শ ভাগ অধিকার আমার রয়েছে। যিনি কিনবেন কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব তাকে জানানো যে, তথাকথিত রঙ ফর্সাকারী প্রসাধনীর উপাদান কী, ব্যবহারে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে ইত্যাদি। আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সঙ্গে সরকারগুলো কী শর্তে চুক্তি করে জানাতে হবে তাও। আধুনিক রাষ্ট্রে তথ্য জানা ও তা প্রকাশেরর প্রভাব যে কতো গুরুত্বপূর্ণ তার প্রমাণ মার্কিন মুল্লুকের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিক্সনের পতন।
কাজেই তথ্য জানার গুরুত্ব রাষ্ট্রজীবন, সমাজজীবন এবং ব্যক্তিগত জীবনেও পরিব্যপ্ত। এইডস, আর্সেনিক, বন্যা, সাইক্লোন, সুনামি এসবের আগাম সতর্ক জানানো গেলে বাঁচানো সম্ভব অনেক প্রাণ, কমানো সম্ভব হতাহতের সংখ্যা। তবে তথ্য কেবল সরবারহ করলেই চলবে না, সরবরাহকৃত তথ্যকে সঠিক ও যথার্থ হতে হবে, নইলে সমাজে তা গুজব আর নৈরাজ্যের জন্ম দেবে। খেয়ালে রাখতে হবে ভেকধারী অবান্তর আর নিছক সংখ্যার ভীড়ে যেন জরুরি তথ্যগুলো হারিয়ে না যায়।

সমাজের সবস্থরে যথার্থ তথ্যের প্রকাশ ও তা প্রচারের চর্চা থাকা তাই বাঞ্ছনীয়। বলা হয় এ ধরনের চর্চার মাধ্যমেই সমাজ ও রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক চেতনা তৈরি হয়; বিকশিত হয় গণতান্ত্রিক জনক্ষমতা। গণতন্ত্র খোলা দেশ। কার্ল পপারের ‘ওপেন সোসাইটি’ বা ‘খোলামুখ সমাজ’।

মানুষের অন্য অধিকার অর্জনের সাফল্য নির্ভর করে তথ্য অধিকার নিশ্চিত হওয়ার ওপর। ধরা যাক নাগরিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের নিশ্চয়তা দেয়। এখন জনগণ যদি না-ই জানে যে সংবিধানে কোন কোন নাগরিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে, যদি তাদের জানানো না হয়, তাদের যদি জানার সুযোগ না থাকে, তাহলে নাগরিক অধিকার কোথায় কখন কাদের দ্বারা কেমন করে লংঘিত হচ্ছে, মানুষ তা বুঝবে কীভাবে ? এর প্রতিকারই বা চাইবে কীভাবে ? গরিব নিরক্ষর আদিবাসীদের যদি তাদের ভূমি অধিকার সম্পর্কে সচেতন না করা যায়, তাহলে প্রতি পদে পদে তাদের সেই ভূমি অধিকার ক্ষুণœ হতে থাকবে। এই যে বক্তব্য, এর নিহিতার্থ হচ্ছে, তথ্য জানার অধিকার মানুষের অন্য অধিকার প্রয়োগের ভিত।

আবার ধরা যাক দুর্নীতি। আমাদের উন্নয়নের সবথেকে বড় শত্রু। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের যুদ্ধ ঘোষণার কথা আমরা হামেশাই শুনি। ‘তথ্যের স্বাধীনতা’ কিন্তু, ঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে, সেই যুদ্ধের সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তথ্যের প্রবাহ স্বচ্ছ না হলেই তো দুর্নীতি বেড়ে যায়, শক্তির অপপ্রয়োগ ঘটে এবং জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতার জায়গাটি আলগা হয়ে যায়। রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক যে জনগণ জনগণের মাঝে এ বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয়; তাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে সত্যিই তারা প্রজাতন্ত্রের মালিক! আজ তাই এধারণা ঠিকভাবেই গড়ে উঠেছে যে গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চার জন্য তথ্যকে জনগণের সম্পত্তি হিসেবে ভাবতে হবে। সরকার যদি সত্যিই দুর্নীতি দমনে আন্তরিক হয় তবে তার উচিত হবে ‘সরকারি গোপন তথ্যের’ জুজুভয় থেকে বেরিয়ে আসা। শুধু সরকারি আয়-ব্যয়ই নয় বরং দাতা দেশগুলোর সাহায্য এবং ঋণদাতাদের সঙ্গে সরকারের চুক্তিসহ যাবতীয় বিষয়েও জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা দরকার। তথ্যের প্রাপ্তি হবে এমন, ‘যেখানে সরকার চাহিবামাত্র জনগণকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানাইতে বাধ্য থাকবে’।

তো তথ্য অধিকার কাকে বলবো ? এটা কি কেবল তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার ? আমার বিবেচনায় তথ্য অধিকারের ক্যানভাস অনেক বড়। তথ্য অধিকার বিষয়ে আমার যে প্রতীতি তাহলো এটা তথ্য জানা ও জানানো, তথ্য উৎপাদন ও উৎপাদিত তথ্যের বিষয় হওয়ার অধিকার, তথ্য ব্যবহার এবং তথ্যের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার। এর তাত্ত্বিক, নৈতিক, ব্যবহারিক ও আইনি দিক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনা হওয়া দরকার।

বিশ্বের ৬০ টিরও বেশি দেশে তথ্য অধিকার আইন রয়েছে। তবে আমাদের মতো দেশে এ আইন পাশ করাই কেবল যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশসহ তৃতীয় দুনিয়ার অনেক সৎ উদ্যোগই, আমরা খেয়াল করি, প্রস্থুতির অভাবে ব্যর্থ হয়। তাই আইন বড় নয় আইনের প্রয়োগটাই বড়। এ আইন বাস্থবায়নের ক্ষেত্রে, আমার বিবেচনায়, তিন ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। এক. অবকাঠামোগত সমস্যা দুই. মানসিক/সাংস্কৃতিক সমস্যা তিন. প্রশাসনিক/কাঠামোগত সমস্যা। তাই আইন পাশ হলে তা হবে তথ্য অধিকারের প্রাতিষ্ঠানিক দিকের স্বীকৃতি; কিন্তু মানসিক আর সাংস্কৃতিক যে বাধা তা দূর হতে আরো সময় লাগবে; কেননা এটি বললে নিশ্চয়ই যে অত্যুক্তি হবে না যে তথ্য গোপন রাখা বা কোনো তথ্য রেখে-ঢেকে বলার বিষয়টি এখন বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। ডাইনিং টেবিলে সন্তানের কাছ থেকে মা-বাবা যেমন তথ্য লুকাচ্ছেন, উল্টো দিক থেকে মা-বাবার কাছ থেকে তথ্য লুকাচ্ছেন আপন সন্তান। সর্বত্রই বিকশিত হচ্ছে ক্লাসিফাইড ফিসফাস কালচার। আর এ দেশে তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও পদ্ধতি যারপরনাই পুরনো এবং তা বিজ্ঞানসম্মত নয় একেবারেই। তাই তথ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য একটি কার্যকর পরিকাঠামো গড়ে তুলতেও বেশ সময় লাগবে। তথ্য অধিকার আইনে তাই অতি অবশ্যই তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টিকে যুক্ত করতে হবে। এ এক বৃহৎ কর্মযজ্ঞ; এ উদ্যোগে সরকারের সদিচ্ছা আর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাই খুবই জরুরি।

কিন্তু দুঃখজনক যে ব্রিটিশ পাকিস্থানের রাজনৈতিক বাস্থবতা পেরিয়ে এলেও প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারত তথা উপমহাদেশের কোনো সরকারই তাদের ‘কলোনিয়াল হ্যাঙওভার’ বা ‘ঔপনিবেশিক ঘোর’ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হননি। সরকারগুলো এই সত্য ভুলে যায় যে, দ্রুত পরিবর্তশীল এই বিশ্বগ্রামে তথ্য গোপন করে রাখা বা আটকে রাখার ধারণা নিতান্তই হাস্যকর। তথ্য আটকে রাখা মানে তথ্যের উপযোগিতা নষ্ট করে ফেলা। কারণ বর্তমান বাস্থবতায় আজকের তথ্য কালকেই তার উপযোগিতা হারিয়ে ফেলে।

এটা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সরকারের কাজকর্ম সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত হলে গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণ তাদের উপর ন্যস্থ ভূমিকা অধিক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পালন করতে পারে। অন্যদিকে, তথ্য গোপন করা হলে সরকার ও জনগণের মধ্যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, মানুষের কর্মদক্ষতা কমে যায় এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় গুণগত বিবেচনার অভাব দেখা দেয়। তবে গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য শহর ও ধনীক অভিমুখী এবং বহুলাংশে পুরুষতান্ত্রিক পক্ষপাতদুষ্ট। কাজেই অবাধে তথ্য জানার অধিকার নিয়ে যখন কথা বলা হবে তখন তথ্যবঞ্চিত ও তথ্যলাঞ্ছিত নারী-পুরুষের কল্যাণে তথ্যের অবাধ প্রবাহকে কীভাবে ব্যবহার করা যায় সে বিষয়টিকেও আমাদের সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। হালে যে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের কথা বলা হয় তার মূলে কিন্তু সরকারি/বেসরকারি তথ্যে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের ‘অনিষিদ্ধ প্রবেশাধিকার’ নিশ্চিত করা Ñ যেখানে থাকবে না কোনো চাবি-আঁটা পেটিকা। তথ্যের এই অধিকার নিশ্চিত করা দরকার মানুষ হিসেবে মর্যাদাময় জীবনযাপনের জন্য। গণতন্ত্রকে ফুরফুরে সতেজ আর টাটকা রাখার জন্য।-৩

তথ্য অধিকার আইনের বাস্থবায়নের মাধ্যমে এবং তথ্য কমিশনের কারণে সরকার তার নিজের জন্য কিছু বিপজ্জনজক পদক্ষেপ নিয়েছেন। জনগণের সচেতনতার কারণে বেড়ে গেছে সরকারের জবাবদিহিতা। দিন দিন সেটা বাড়তেই থাকবে। আর সেটা প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্বলিত উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো বিনির্মাণের জন্য। সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যাবে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায়। ২০২১ সালের আগেই হয়তোবা আমরা দেখতে পাবো রূপকল্পের অনেকগুলোই বাস্তবায়িত হয়েছে।



এই প্রতিবেদন টি 460 বার পঠিত.