ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং আমাদের গণমাধ্যম

 

হাসানুল হক ইনু

আমরা এমন একটা যুগ অতিবাহিত করছি যে যুগে কম্পিউটারের একটা মাউসের টোকায় দুনিয়াটা হাতের মুঠোয় চলে আসে। নিজেকে অনেক ক্ষমতাশালী মনে হয়। আগে ক্ষমতা উৎসারিত হতো বুলেটের মাধ্যমে। তারপর ক্ষমতা উৎসারিত হয় ব্যালটের মাধ্যমে। আর এখন ক্ষমতা উৎসারিত হয় বা প্রবাহিত হয় কম্পিউটারের মাউসের একটা টোকায়।

দুনিয়াটা পাল্টে যাচ্ছে। এমন একটি দুনিয়া যেখানে তথ্য-প্রযুক্তি একটা সমতল দুনিয়া তৈরি করছে। একটা সমতল ভূমি আর কী। যেখানে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ নেই। সুতরাং, আমরা কঠিন একটা নূতন জগতে প্রবেশ করছি।

আমরা শিল্প-বিপ্লবের পর প্রযুক্তির দিক থেকে এই নতুন একটা বিপ্লবের যুগে আছি। সেটাকে তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লবের যুগ বলে। আর বিপ্লবের ভেতর পৃথিবী প্রবেশ করেছে বেশ কিছু বছর আগে। আজ আমাদের বাংলাদেশকে শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ-এর ঘোষণার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশকে সেই বিপ্লবের ভেতর প্রবেশ করতে সাহায্য করার একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা নিয়েছেন। সেজন্য আমার মনে হয়, শেখ হাসিনাকে আমাদের সবার তরফ থেকে ধন্যবাদ জানানো উচিত।

তরুণ প্রজন্মকে দেখুন- ‘হাতে মোবাইল, কোলে ল্যাপটপ আর চোখে স্বপ্ন- নতুন প্রজন্ম, সার্থক শেখ হাসিনার জন্ম।’ আমি মনে করি যে, বাংলাদেশের যে যুব সম্প্রদায় এই সম্প্রদায় চিরদিন শেখ হাসিনাকে ভোট দেওয়ার দরকার। কারণ, তিনিই ওদেরকে এই তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছেন। আর তাতে করে ওদের দুনিয়াটাই পাল্টে গেছে। দেখবেন, পোষাক কারখানায় চাকুরী করে এমন একটি মেয়ে কানের মধ্যে তার লাগিয়ে বেশ মনের আনন্দে কাজ করছে আর হাসছে, তাইনা! সুতরাং, গরিব হোক, ধনী হোক কিংবা কর্মজীবী হোক, বেকার হোক, হাতে মোবাইল আছে কিন্তু। সোজা কথা নয় এটা। এটা একটা বিরাট ব্যাপার।

আজ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে, এ বিপ্লবকে আমি তিন পর্বে ভাগ করি।

-প্রথমে মনজয় পর্ব।
-এরপর উত্থান পর্ব।
-আর তারপর অগ্রযাত্রা পর্ব।

তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লবে আমরা মনজয় পর্বের শেষদিকে আছি। সুতরাং, মনজয় পর্ব মানে কী? আমাদের ব্যবসাদারদের মনজয় করতে হচ্ছে। রাজনীতিবিদদের মনজয় করতে হচ্ছে। আমাদের প্রশাসনের আমলাদের মনজয় করতে হচ্ছে। আর সর্বশেষ জনগণের মনজয় করতে হচ্ছে। আপনি দেখবেন যে, গত পাঁচবছর যাবৎ তথ্য-প্রযুক্তি উৎসারিত হওযার আগে জনগণ থেকে শুরু করে আমলা পর্যন্ত এবং ব্যবসাদার থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত যুক্তি সম্পর্কে জানতেন না এবং তাদের মনে দাগ কাটতো না। সুতরাং, এই পাঁচ বছরে ক্রমাগত সবার মনটা আমরা জয় করছি। সুতরাং, মনটা জয় করার পর এখন মানুষ বুঝতে পারছে যে, তথ্য-প্রযুক্তি ছাড়া সে অচল, তাকে ইন্টারনেট শিখতে হবে।

এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, সরকারি-বেসরকারি কাজ করতে হলে আমাকে কম্পিউটার চালানো শিখতে হবে। এজন্য আগামী বছর থেকে ক্লাস নাইনে তথ্য-প্রযুক্তি বা কম্পিউটার সায়েন্স একটা কম্পালসারি সাবজেক্ট বা মূল বিষয় হিসেবে ঘোষণা হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয় যে, আর দু-তিন বছরের ভেতর সরকারের কোনো চাকরি পিয়ন হোক আর সচিব থেকে হোক কেউ পাবেন না যদি আপনি কম্পিউটার না চালাতে পারেন। এমন কি বিদেশে আপনি যেতে পারবেন না যদি আপনি কম্পিউটার না চালাতে পারেন। আপনার জীবনটাই অচল হয়ে যাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি যদি না আয়ত্ব করতে পারেন এবং উন্নয়নের মহাসড়ক থেকে আপনি ছিটকে বেরিয়ে যাবেন। সুতরাং, শেখ হাসিনা তেমন একজন রাজনৈতিক নেত্রী, যে নেত্রী বাংলাদেশকে পৃথিবীর উন্নয়নের মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করতে “ডিজিটাল বাংলাদেশ”-এর ঘোষণা দেন।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিপ্লবে আমরা এখন মনজয় পর্বের শেষ পর্যায়ে, তার মানে এবার উত্থান পর্ব। তারপর অগ্রযাত্রা পর্ব। আমরা মনজয় যদি কিছুটা করে থাকি, তাহলে এ ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়বে, জনগণ উৎসাহ দেখাবেন এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আয়ত্ত করে তার পক্ষে অবস্থান নিবেন। এই মনজয় পর্বের পরেই উত্থান পর্ব শুরু হবে। আর উত্থান পর্বটা ২০২১ সাল পর্যন্ত যাবে। তারপর আপনার অগ্রযাত্রা পর্ব। অর্থাৎ তারপর তীব্র গতিতে এগিয়ে চলা এবং উন্নত বিশ্বের মতো দক্ষতা প্রদর্শন।

সুতরাং, এখন থেকে ’২১ সাল পর্যন্ত আমাদেরকে উত্থান পর্বে প্রবেশ করার প্রস্তুতি নিতে হবে। এরজন্য আমি বলবো যে, যে রাজনৈতিক ক্ষমতা, যে সরকার ক্ষমতায় আছে, যে সরকার তথ্য-প্রযুক্তি বোঝে, তথ্য-প্রযুক্তি কোথায় প্রয়োগ করবে যে সরকার তা বোঝে, সেই সরকারের মতো সরকার ক্ষমতায় যদি না থাকে, তাহলে বাংলাদেশ বিশাল একটা হোঁচট খাবে এবং মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে। যারা তথ্য-প্রযুক্তি বোঝে না, যারা জঙ্গিবাদের বন্ধু, তারা যদি বাংলাদেশকে দখল করে নেয়, তাহলে বাংলাদেশের তথ্য-প্রযুক্তির যে অগ্রযাত্রা হচ্ছে তা হোঁচট খাবে। ফলে এটা বাংলাদেশের জনগণের জন্য এবং দেশের জন্য সবচে’ ক্ষতিকারক কাজ হবে।

দেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটা চ্যালেঞ্জ আছে। একটা হচ্ছে বাংলাদেশকে দারিদ্রমুক্ত করা। অর্থাৎ দারিদ্র উচ্ছেদের চ্যালেঞ্জ। আর একটা হচ্ছে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার চ্যালেঞ্জ। আর একটা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার চ্যালেঞ্জ। এই তিনটা চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে আমাদের এগোতে হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ হলে দারিদ্র্য উচ্ছেদ সহজ হবে। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে তথ্য-প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে হবে। আর অসাম্প্রদায়িকতা একটা রাজনৈতিক বিষয়। কিন্তু, সেদিক থেকে আমি বলবো, তথ্য-প্রযুক্তি যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ হয়, তাহলে জঙ্গিবাদ আর অসাম্প্রদায়িকতা কী, গণতন্ত্র কী আর স্বৈরতন্ত্র কী, সেটাও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অর্থাৎ তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সেই জ্ঞানও অর্জন সম্ভব, যে জ্ঞান সঠিক ইতিহাস চর্চা করায় সাহায্য করে। সেই জ্ঞান, যে জ্ঞান দিয়ে বাংলাদেশের সঠিক তথ্যের উপর দাঁড়ানো যায়।

সুতরাং, মিথ্যাচার থেকে, গুজব থেকে, কূপমন্ডুকতা থেকে, কুসংস্কার থেকে এবং খন্ডিত তথ্য থেকে অথবা তথ্য ধামাচাপা দেওয়া থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ দরকার। সেদিক থেকে আমি বলবো, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে হলে, বাংলাদেশকে আপনি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে নেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির স্বচ্ছ বাংলাদেশে কোনো কুসংস্কার থাকবে না, কূপমন্ডুকতা থাকবে না, সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না এবং ভেদবুদ্ধি থাকবে না।

সেদিক থেকে আমি মনেকরি যে, ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রস্তাবনা দারিদ্র্য উচ্ছেদের জন্য, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জন্ম-নিবন্ধন, ভর্তির ফরম্ থেকে গ্রামের কৃষকের জন্য জমির উর্বরতা সম্পর্কে তথ্য নিতে আমরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। তাছাড়া টাকা পাঠানোর ব্যাপারটা তো আছেই। এসব জিনিস বাদে ছোটোখাটো জিনিস রয়েছে যা আপনার দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করছে। এটা কীভাবে হচ্ছে তার উত্তরে আমি এভাবে বলবো যে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অর্থাৎ ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি এককথায় আমরা যাকে তথ্যপ্রযুক্তি বলছি, নিজেদের দেশে যাকে আমরা “ডিজিটাল বাংলাদেশ” বলছি, সেই ডিজিটাল বাংলাদেশ বা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করে, প্রশাসনকে স্বচ্ছ করতে সাহায্য করে, প্রশাসনকে জনগণের কাছাকাছি নিতে সাহায্য করে, সময় কমাতে সাহায্য করে, ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে সাহায্য করে।

এগুলো হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির কিছু সুফল। আরো বহু ফিরিস্তি আমি দিতে পারি। তবে এ প্রযুক্তি দু’টি মানুষকে কাছাকাছি আনতেও সাহায্য করে। সুতরাং, মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের যে বন্ধন, সামাজিক যে বন্ধন, রাজনৈতিক বন্ধন আরো ঘনিষ্ঠ হবে এবং দৃঢ় হবে যদি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আপনি আয়ত্ত করতে পারেন।

সুতরাং, এ প্রযুক্তি পুরো দুনিয়াটাকে হাতের ভিতর নিয়ে আসে। আপনি ঘরে বসে পুরো দুনিয়াটাকে দেখতে পারেন। আর পুরো দুনিয়াটাকে টেনে নিয়ে আপনি হাতের মুঠোয় বন্দি করতে পারেন। এমন এক অস্বাভাবিক এবং অদ্ভূত একটা প্রযুক্তি যে-প্রযুক্তির যারা আবিস্কারকরা জানতেন না যে, এ-কাজ দুনিয়াকে এভাবে বদলে দেবে। ইন্টারনেটের আবিস্কারকর্তা জানতেন না যে, তা এতো দ্রুত দুনিয়াটাকে এভাবে বদল করে দেবে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট মিসেস দিলমা সাওপাওলোতে ২০১৪ সালে একটা সম্মেলন ডেকেছিলেন। সেখানে নয়শ’ প্রতিনিধি ছিল। সেই সম্মেলনটা ছিল “ইন্টারনেটের উপর কর্তৃত¦ কে করবে?” তার ওপর। এই মুহূর্তে ইন্টারনেটের উপর কর্তৃত্ব করে আমেরিকা এবং আমেরিকার একটা কোম্পানী যেটা লস এঞ্জেলেসে আছে। তাদের এ-কর্তৃত্ব হচ্ছে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব। আজ দীর্ঘ দশবছর ধরে সারা পৃথিবীতে একটা আন্দোলন চলছে যে, আমেরিকার এ-কর্তৃত্ব খর্ব করতে হবে। ইন্টারনেট হচ্ছে জনগণের সম্পদ। সুতরাং, জনগণের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে হবে। তার মানে জাতিসংঘের সদস্যভূক্ত রাষ্ট্র তাদের গণতান্ত্রিক শাসন এই ইন্টারনেটের উপর স্থাপন করবে। এই প্রস্তাবটা দু’দিনের সম্মেলনে বহু আলোচনার পর আমরা ওখানে অনুমোদন পেতে সক্ষম হয়েছি। আমেরিকা পিছু হঠেছে এবং সেই আইকান (ওঈঅঘঘ) কোম্পানীর সিইও তিনি পিছু হঠে ঐ সম্মেলনে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ইন্টারনেটের উপর কর্তৃত্ব আর আমেরিকার একচ্ছত্র থাকবে না। তা গণতান্ত্রিক প্রশাসনের কাছে থাকবে। এটা বিশাল একটা অগ্রগতি। একটা ছোটখাটো বিপ্লবের মতো।

ইন্টারনেটের মধ্য দিয়ে যে তথ্যপ্রবাহ হচ্ছে তা কোটি কোটি তথ্য। সুতরাং, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব সবকিছু এই তথ্য-প্রবাহের সাথে সম্পৃক্ত। আমি সেই সম্মেলনে ছিলাম। গত পাঁচবছর ধরে এটা নিয়ে আমি আন্তর্জাতিক মহলে লড়াই করছি। আমি মনেকরি, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ এই সিদ্ধান্তর ভিত্তিতে অনেক উপকার পাবে এবং তার তথ্যের উপর নিজস্ব কর্তৃত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে দুনিয়াটা কীভাবে বদলে যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের, সমাজবিদদের, বুদ্ধিজীবীদের সেই ব্যাপারটা বুঝতে ও জানতে হবে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কাঁচের ঘর তৈরি করে। যেখানে সবকিছু দেখা যায়। কিন্তু, এখানে শিশু বসবাস করে, নারী বসবাস করে, রাষ্ট্র থাকে, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকে। সেজন্য কী করতে হবে? কাঁচের ঘর আমি তৈরি করবোই। কিন্তু, সেই কাঁচের ঘরের ভেতর এমন প্রযুক্তি কিংবা এমন রাজনীতি আয়ত্ত করতে হবে যাতে শিশুর নিরাপত্তা, নারীর সম্মান, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো রাজনীতি, আইন-কানুন ও প্রযুক্তি আমরা আয়ত্ত করতে পারি।

আজ বাংলাদেশে যখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটছে, তখন ফেসবুক, টুইটারে এবং গণমাধ্যমে এমন কিছু করা যায়না যেখানে শিশুর নিরাপত্তা বিঘিœত হয়। এমন কিছু সেখানে লেখা যায়না কিংবা এমন ছবি ছাপা যায়না যাতে নারীর সম্মানহানি হয়। এমন কিছু করা যায়না যাতে ব্যক্তির স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হয়। এমন কিছু করা যায়না যাতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় বিঘœ ঘটে কিংবা সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়।

সেজন্য কেউ ইয়ার্কি করে নবী করীম (সঃ) এর উপর কুরুচিপূর্ণ ছবি ছেড়ে দেবে আর সেটা আমাদের চোখ বুঁজে দেখতে হবে, তা হতে পারেনা। ঠিক তেমনি কেউ কা’বা শরীফের গিলাফ কোনো এক যুদ্ধাপরাধীর মুক্তির শ্লোগান হিসেবে চালিয়ে দেবে আর সরকার বা আমরা চোখ বুঁজে বসে থাকবো তা হবেনা। আর তথ্যপ্রযুক্তির সেই উৎশৃঙ্খল বাজে প্রয়োগের জন্য সেই ব্যক্তিকে যখন কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়, তখন কতিপয় সাংবাদিক বন্ধু তার মুক্তির দাবিতে মিছিল করবেন তা হতে পারেনা। দেশ, শিশু, নারী ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সম্মান বিঘœকারী কোনো তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ কী সাংবাদিকতায় কী গণমাধ্যমে সেটা রাষ্ট্র সহ্য করবে না।

সেকারণে তথ্যপ্রযুক্তির বাংলাদেশে বসবাস করতে সেই কাঁচের ঘরে থাকার প্রজ্ঞা আমাদের আয়ত্ত করতে হবে, যেভাবে আমরা কাঁচের ঘরে স্বচ্ছ ও সুরক্ষিত থাকবো। একটা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। আর একটা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই দুটো চ্যালেঞ্জই আমাদের মোকাবেলা করতে হবে।

বাংলাদেশে প্রযুক্তির সঙ্গে যারা জড়িত, আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তাদেরকে আহ্বান জানাবো, সেই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করুন যেখানে আমি তথ্যপ্রযুক্তিও প্রয়োগ করবো, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাও বিধান করতে পারবো, সমাজের শৃঙ্খলাও রক্ষা করতে পারবো। সেই প্রযুক্তি চাই আমাদের। একইসঙ্গে রাজনীতিবিদদের আহ্বান করবো, সেই রাজনৈতিক পদ্ধতি, সেই প্রশাসনিক পদ্ধতি, সেই রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক পদ্ধতি তৈরি করুন যা দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে পারেন এবং পরিচালনা করতে পারেন।

এ ব্যাপারে আমি আর একটা কথা বলবো যে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মানুষকে স্বাধীন করে দেয় বা মুক্ত করে দেয়। আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি আমরা মুক্তমনা মানুষ চাই। আমরা স্বাধীন মানুষ চাই। এক্ষেত্রে বলা যায় যে, সংবিধানে স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বহু অধিকার আছে। আমি মনেকরি যে, মানুষের খাওয়ার অধিকার, ধর্ম চর্চার অধিকার, বাক-স্বাধীনতা, সভা-সমিতি করার অধিকার হচ্ছে সাংবিধানিক অধিকার।

ঠিক তেমনি তথ্য-প্রযুক্তির জগতে আপনাকে বেঁচে থাকতে হলে “জরমযঃ ঃড় রহঃবৎহবঃ রং ুড়ঁৎ নধংরপ যঁসধহ ৎরমযঃং” -অর্থাৎ ইন্টারনেটের যে অধিকার তা হচ্ছে মৌলিক মানবাধিকার। আমি বহুদিন থেকে চেষ্টা করছি, আমার সহকর্মীদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, আসুন, সংবিধানে একটা পরিবর্তন করে একটা অনুচ্ছেদ যোগ করি। অনুচ্ছেদটা হচ্ছে, “ইন্টারনেটের অধিকার হচ্ছে মৌলিক মানবাধিকার”। এটা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। সবাইকে ইন্টারনেট পাওয়ার সুযোগ রাষ্ট্রকে করে দিতে হবে। তবেই কেবল সঠিক তথ্যপ্রযুক্তির বাংলাদেশ হবে।

মনে রাখতে হবে যে, আমি তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে সামাজিক বৈষম্য বাড়াবো না। সুতরাং, কোথায়, কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ হবে তার ওপর সমাজের স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে। সুতরাং, রাজনৈতিক নেতাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে যে, তথ্যপ্রযুক্তি এমনভাবে প্রয়োগ করতে হবে যাতে সামাজিক বৈষম্য কমে এবং ডিজিটাল বৈষম্য কমে। এজন্য দেখবেন যে, আমাদের মহাজোটের সরকার ২২ হাজার মাধ্যমিক স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব তৈরির ব্যবস্থা করেছে। তার মানে ঢাকা শহরে যেসব ছেলে-মেয়েরা পড়াশুনা করে তারা তথ্য-প্রযুক্তি আয়ত্ব করবে আর গ্রামের ছেলে-মেয়েরা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবেনা তা হতে পারেনা। সেই ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর জন্য এইযে সুযোগটা সরকার করে দিচ্ছে এটা হচ্ছে একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সুতরাং, শেখ হাসিনার সরকার একদিকে যেমন ডিজিটালবান্ধব সরকার, আর একদিকে তেমনই কৃষক ও নারীবান্ধব সরকার।

মোদ্দা কথা, দেশকে যদি সামনে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে জঙ্গিবাদ বর্জন করতে হবে এবং ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়তে হবে।



এই প্রতিবেদন টি 694 বার পঠিত.