৪ বছরে গণজাগরণ মঞ্চ ও প্রাণের বলীদান

“৪ বছরে গণজাগরণ মঞ্চ ও প্রাণের বলীদান”-সুমন দে

মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ।
এই রক্তমাখা মটির ললাট ছুঁয়ে একদিন যারা বুক বেঁধেছিলো।
জীর্ণ জীবনের পুঁজে তারা খুঁজে নেয় নিষিদ্ধ আধাঁর,
আজ তারা আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে জেগে থাকে রাত্রির গুহায়।
এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আরষ্ট কুমারী জননী,
স্বাধীনতা – একি হবে নষ্ট জন্ম ?
একি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল ?
জাতির পতাকা খামচে ধরেছে আজ পুরোনো শকুন।

বাতাশে লাশের গন্ধ
নিয়ন আলোয় তবু নর্তকীর দেহে দুলে মাংসের তুফান।
মাটিতে রক্তের দাগ –                  -রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

২০১৩ সালে ফেসবুকে ব্লগার এবং অনলাইন এক্টিভিস্টগণ ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে কবিতাটি পোস্ট করেন। কয়েক ঘন্টার ভেতর ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের সকল বাঙালির চেতনায়-৭১ এর কাছে। জানানো হয় পরের দিন ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ চত্তরে বিকেল বেলায় মিলিত হওয়ার জন্যে। রাতের মধ্যেই লক্ষ শেয়ার পড়ে।২০১৩ সালের ৫ ফেব্রয়ারি এ সংগঠনের যাত্রা শুরু। কতিপয় সচেতন-সংগ্রামী তরুণই গড়ে তোলেন গণমানুষের এ সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত মানুষ দলে দলে অংশ নেয় এ সংগঠনের আন্দোলন-মিছিল ও স্লোগানে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবিতে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় এ সংগঠনটি। শুধু তাই নয়; তনু হত্যার বিচারের দাবি ছাড়াও বিভিন্ন অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদে রাজপথ কাঁপিয়ে তুলেছে এ সংগঠনের অকুতোভয় কর্মীরা। বাংলাদেশে রূপ ধারণ করে অহীংস চেতনার ও আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে। 

গণজাগরণ মঞ্চের অনলাইন এক্টিভিস্ট ও ব্লগার গত ৪বছরে বলী হোনঃ ১/ আহমেদ রাজিব হায়দার ( ১৫/২/২০১৩) ২/ শাফিউল ইসলাম ( ১৫/১১/২০১৪) ৩/ অভিজিত রায় ( ২৬/২/২০১৫) ৪/ ওয়াশিকুর রহমান বাবু (৩০/৩/২০১৫) ৫/ অনন্ত বিজয় দাস (১২/৫/২০১৫) ৬/ নিলয় নীল (৬/৮/২০১৫) ৭/ নিজামুদ্দিন সামাদ (৬/৪/২০১৬)। আরো আছেন।

৫ই ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টি হওয়ার ১০ দিন পর রাজিব হায়দার যখন নিজ বাসার সামনে চাপাতির আঘাতে নিহত হলেন তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর রাজিব হায়দারের বাসায় যান এবং খুনিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন বলে তারা প্রতিশ্রুতি দেন। রাজিব হায়দার খুন হওয়ার পরই ‘আমার দেশ’ পত্রিকা ও ডানপন্থী পত্রিকাগুলো ব্লগার বিভিন্ন লেখা কাটছাঁট করে পত্রিকায় প্রকাশ করে ব্লগারদের বিরুদ্ধে একটা জনমত গঠন করতে সক্ষম হয়। রাজীব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘ফেসবুকে ও ব্লগে রাজীবের লেখায় ধর্মের এতো অবমাননা হয়েছে তা বলার মতন না। তাদেরই প্ররোচনায় হেফাজত ইসলাম মাঠে নামে। হেফাজতে ইসলাম সৃষ্টি হইছে ২০১০ সালে নারী নীতির প্রতিবাদে, ২০১৩ তে ব্লগার ইস্যুতে লাইমলাইটে আসে। ব্লগারদের গ্রেফতারের দাবী তোলে বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠন। তাদের দাবীর প্রেক্ষিতে সরকার ধর্মঅবমাননাকারী বিশেষ করে ইসলাম অবমাননাকারী ব্লগারদের লিস্ট জমা দিতে আদেশ দেয়। ৩১ মার্চ ২০১৩তে ডিজিএফআই ও ওলামালীগের নেতারা বসে ব্লগারদের নিয়ে একটা লিস্ট তৈরি করে। যা ৮৪ ব্লগার লিস্ট হিসেবে পরিচিত। গত ২৪ মে ২০১৫ তে হেফাজত ইসলামের মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফী বলেন- হেফাজতে ইসলাম ধর্ম অবমাননার ঘটনায় কোনো ব্লগারের তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেয়নি। এছাড়া ২০১২ সালে ‘ধর্মকারী’, ২০১৩-এর মার্চ মাসে ‘নবযুগ’ ব্লগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া ২০১১/১২ সালে জামাতপন্থীদের ‘সোনার বাংলা’ ব্লগ বন্ধ করে দেয় সরকার।। ২০১৩ এর সেপ্টেম্বর থেকে সরকারী বিটিসিলে “আমার ব্লগ” বন্ধ আছে।

২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন (অন্যান্য নাম: শাহবাগ গণদাবিশাহবাগ আন্দোলনশাহবাগ গণ-অবরোধগন জাগরন) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার শাহবাগে ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ শুরু হয়। এদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত আসামী আব্দুল কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষণা করে। কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা, আলুব্দি গ্রামে ৩৪৪ জন মানুষ হত্যা সহ মোট ৬টি অপরাধের ৫টি প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু এতোগুলো হত্যা, ধর্ষণ, সর্বোপরী গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ মেনে নিতে পারেনি। রায়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকার শাহবাগে জড়ো হতে শুরু করে এবং এর অনুসরণে একসময় দেশটির অনেক স্থানেই সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। ২৫শে মার্চ রাতে ও ২৬শে মার্চ ভোর রাত জুড়ে পাকিস্তানী বাহিনী বাংলাদেশের নিরস্ত্র মানুষের উপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। ২৬শে মার্চ বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত এবং প্রচুর নারীর ধর্ষণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ যুদ্ধে জয়লাভ করে। তবে বাংলাদেশেরই কিছু মানুষ স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানী বাহিনীকে বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে সক্রিয়ভাবে সহায়তা প্রদান করেছিল, যার মধ্যে ছিল গণহত্যা, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ইত্যাদি। যুদ্ধকালীন সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য ১৯৭৩ সালে একটি আইন তৈরি করা হয় যা ২০০৯ সালে কিছুটা সংশোধন করা হয়। এ আইনের আওতায় ২০১০ সালের ২৫শে মার্চ এ সকল অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ২০১৩ সালের ২১শে জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে আবুল কালাম আযাদ (বাচ্চু রাজাকার)-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

এরপর ৫ই ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় রায়ে কাদের মোল্লাকে ৩টি অপরাধের জন্য ১৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ২টির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু এতো বড় সব অপরাধের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে যারা মেনে নিতে পারেননি তারা শাহবাগে অহিংস বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করে। একসময় তা দেশব্যাপী বিক্ষোভে রূপ নেয়। দেশের অন্য যেসব স্থানে উল্লেখযোগ্য বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চট্টগ্রামের প্রেসক্লাব চত্বর, রাজশাহীর আলুপট্টি মোড়, খুলনার শিববাড়ি মোড়, বরিশালের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বগুড়ার সাতমাথা, যশোরের চিত্রা মোড়, কুমিল্লার কান্দিরপাড়া, কুষ্টিয়ার থানা মোড় ইত্যাদি। শাহবাগের অনেকে বলেন তারা মৃত্যুদণ্ডের রায় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চত্বর ছেড়ে যাবেন না। অন্যদিকে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আনিসুল হক বলেন “কাদের মোল্লার সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে”।

আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি দাবি করে সারা বাংলাদেশে আন্দোলন শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হলেও শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। এর বিরুদ্ধে ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা শাহবাগে এই আন্দোলন শুরু করলেও খুব দ্রুতই এই আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং এই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ, সাংসদ, মন্ত্রী ও সেলিব্রিটিরাও সংহতি প্রকাশ করে। পরে এটি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নোয়াখালী, কুমিল্লা, রংপুর প্রভৃতি শহরে ছড়িয়ে পরে।

রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতিক্রিয়াঃ আওয়ামী লীগ এই রায়ে অসন্তুষ্ট হয়। তাদের নেতারা শাহবাগে আন্দোলনকারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন। জামাত-শিবির বাদে প্রায় সব রাজনৈতিক দল সংহতি প্রকাশ করলেও বিএনপি এ নিয়ে প্রথম দিকে কোনো মন্তব্য করে নি। তবে আন্দোলনের অষ্টম দিন, ১২ ফেব্রুয়ারিতে এসে বিএনপি শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে অবস্থান কারী তরুন সমাজকে স্বাগতম জানায়। সাথে সাথে বিএনপি এই আন্দোলন দলীয়করণের আশঙ্কাও করে।

সারা বিশ্বেঃ বাংলাদেশের আন্দোলনকারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডায় ও অস্ট্রেলিয়াতেও আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রী এবং প্রবাসীরা এই আন্দোনলের সাথে একাত্ততা জানায়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীগণ “শাহবাগ চত্বর” এর আদলে একত্রিত হয়।

শাহবাগের অন্দোলন নিয়ে রচিত কিছু উল্লেখযোগ্য গানঃ একাত্তরের হাতিয়ার (কথা,সুর ও কণ্ঠ- প্রীতম আহমেদ)

একাত্তরের হাতিয়ার
গর্জে উঠুক আরেকবার
রাজাকারের ফাঁসি হোক
শহীদরা পাক ন্যায় বিচার
ফাঁসি পাক রাজাকার
শহীদরা পাক ন্যায় বিচার
গন মিছিলে দামাল ছেলে মেয়ের দল
মুছিয়ে দেবে বিরাঙ্গনার চোখের জ্বল
এই প্রজন্ম গড়তে জানে জনস্রোত
নেবেই নেবে একাত্তরের প্রতিশোধ

শাহবাগের এই আন্দোলনকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সংগীত শিল্পী কবীর সুমন, বাংলাদেশের শিল্পী প্রীতম আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্রের পারমিতা মুমু , লস এঞ্জেলসের আল আমিন বাবু, ব্যান্ড চিরকুটসহ আরও অনেকে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে গান রচনা এবং প্রকাশ করে।

জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরঃ পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামী এবং ১৯৭১ সালে তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ পাকিস্তানী বাহিনীকে সমর্থন করেছিল। পরবর্তীতে ছাত্রসংঘ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির নাম ধারণ করে। একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ভূমিকা ছিল যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তে এবং তাদের আটককৃত ব্যক্তির তালিকা থেকে প্রমাণিত হয়। প্রথমে যে ৯ জনের বিচার করা হয় তাদের অধিকাংশই জামায়াতে ইসলামীর সদস্য। জামায়াত এবং শিবিরের নেতাকর্মীরা ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে থাকে। শাহবাগ আন্দোলনকে বানচাল করতে তাদের কিছু চেষ্টাও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই রায় ঘোষণার দিন ও রায় ঘোষণার পরের দিনই রায় বাতিলের দাবিতে সারা দেশে হরতাল পালন করে। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকেই শিবির ও জামায়াত কর্মীরা ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে শাহবাগ আসতে থাকা মানুষকে বাঁধা দিতে চেষ্টা করে। রামপুর, মগবাজার এবং মালিবাগে শিবিরকর্মীরা অহিংস আন্দোলনকারীদের লাঠি দিয়ে ধাওয়া করে। তবে তাদের বাঁধা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি।

শাহবাগ আন্দোলনের সমর্থনে ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে যে বাংলাদেশী বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়েছিলেন তারাও জামায়াতের বাধার সম্মুখীন হন। পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কের ভাষা শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে সমাবেশ করার সময় স্থানীয় জামায়াত সমর্থকেরা সমাবেশকারীদের ঘেরাও করে। জামায়াতের এই সমর্থকেরা পুরো বিচার প্রক্রিয়াটিই বন্ধের দাবী জানায়।

বিক্ষোভকারীরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের জন্য সরকারের উপর চাপ দিতে থাকে যাতে যুদ্ধঅপরাধীরা “দোষী সাব্যস্ত হলে দ্রুত মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা যায়”। এরপর এই কেস চলমান রাখতে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিস্পত্তির বিধান রেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনীর প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রীসভা। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩-এর সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাশ হয়। এতে একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের যেকোনো রায়ের বিরুদ্ধে আসামির পাশাপাশি সরকারেরও আপিলের সমান সুযোগ রাখা হয় সংশোধিত আইনে। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে খুন এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের জন্য আব্দুল কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। ১২ ডিসেম্বর ২০১৩, কাদের মোল্লাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে তার শাস্তি কার্যকর হয়।

২০১৩র ৫ ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে জড়ো হয়েছিল লাখো মানুষ, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে ঢাকার শাহবাগে গড়া ওঠা দীর্ঘস্থায়ী একটি স্বত:স্ফূর্ত আন্দোলনের চার বছর পূর্তি হল রোববার ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭। দিনের পর দিন ধরে চলা শাহবাগ আন্দোলনের সেই সময়ের সামনের সারির অনেককেই আজও দেখা যায় বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে শাহবাগে একজোট হতে। যদি ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের সাথে তুলনা করলে এদের সংখ্যা নিতান্তই ক্ষীণ।

দেখা যাচ্ছে শাহবাগের এই আন্দোলনকারীদের মূল যেসব দাবিদাওয়া ছিল তার প্রায় সবটাই পূরণ হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য করা একটি আইনে পরিবর্তন আনা থেকে শুরু করে বেশির ভাগ শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীরই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে গেছে এরই মধ্যে। কিন্তু এখনও কি এই শাহবাগ আন্দোলনের আর প্রাসঙ্গিতকতা আছে? ২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি বিকেল। একদল তরুন তরুনী প্ল্যাকার্ড হাঁতে দাঁড়িয়ে গেল শাহবাগে জাতীয় যাদুঘরের সামনে। এরা মূলত ব্লগার এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট। এরা বিক্ক্ষুব্ধ, রাগান্বিত। সকালবেলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তর সালের একজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই বিক্ষোভকারীরা তার ফাঁসি চান। অথচ আইনটিই এমন, তাকে ফাঁসি দেবার দাবি নিয়ে উচ্চতর আদালতে যাবার সুযোগ আর নেই।

গণজাগরণ মঞ্চের নেতা ইমরান এইচ সরকার ও তার সতীর্থরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল নিয়ে একের পর এক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এসে যোগ দিতে থাকে, আস্তে আস্তে শাহবাগ হয়ে ওঠে লাখো মানুষের গণ্তব্য, যা অব্যহত থাকে পরের দিন, তার পরের দিন, এবং বহু দিন পর্যন্ত।

ওই আন্দোলনের সূত্র ধরেই পরবর্তীতে আইন পরিবর্তন করা হয় এবং পরিবর্তিত আইনে উচ্চতর আদালত কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, এবং আরো বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীকেই ফাঁসি দেয়া হয়। গণজাগরণ মঞ্চে শুরু থেকেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক সংগঠন শ্লোগান একাত্তরের নেতা দেলোয়ার হোসেন রনি। তিনি সেসময় ছাত্র ছিলেন, এখন তিনি পেশাজীবনে প্রবেশ করেছেন।

শাহবাগের আন্দোলনে স্বত:স্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছিল লাখো মানুষ।

তিনি বলছিলেন, “গণজাগরণ মঞ্চের শুরুতে যেমন লাখো জনতার জমায়েত হয়েছিল, পরে যখন সংখ্যালঘু নির্যাতন বা তনু-হত্যার মতো অন্যান্য ইস্যুতে আমরা আন্দোলন করেছি তখন হয়তো সব সময় অত লোকসমাগম হয়নি। কিন্তু মানুষের সাড়া যে আমরা পরেও পেয়েছি তাতে কোনও ভুল নেই।” তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়া ব্যতিরেকে অন্য কোন দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনে গণজাগরণ মঞ্চের বিশেষ সাফল্য দেখেন না সাংবাদিক ও গবেষক আফসান চৌধুরী। অথচ  চৌধুরীর মতে এই মঞ্চটির একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবার সুযোগ ছিল।

তার কথায়, “গণজাগরণ মঞ্চের যে আদর্শ-বিশ্বাসগুলো ছিল তা একটি রাজনৈতিক দলে পরিণত করা গেলে খুব ভাল হত। কারণ আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে তো কোনও রাজনীতি হচ্ছে না। হয় আওয়ামী লীগ হতে হবে কিংবা বিএনপি – এটা তো কোনও ভাল কথা নয়। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চ সেই বিকল্প রাজনীতির মঞ্চ হয়ে উঠতে পারল না।” আফসান চৌধুরী আরো বলছেন, এই মঞ্চটি একসময় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিল বটে, কিন্তু শেষমেষ তাতে তারা সফল হয়নি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

আর ইমরান এইচ সরকারের ভাষায়, তারা রাজনৈতিক দল নাহলে, রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের মঞ্চ বটে, এবং জনগণ চাইলে ভবিষ্যতে এই মঞ্চকে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করবার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেন না তিনি।

তিনি বলছেন, “আমাদের মঞ্চটা ছিল যুদ্ধাপরাধ-বিরোধী একটা মঞ্চ। ফলে যতদিন না দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপর্ব শেষ হবে ততদিন আমার মনে হয় এই মঞ্চর কাজ চালিয়ে যাওয়াই উচিত হবে।” অবশ্য শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র, যিনি এই মঞ্চটির প্রধান নেতা বলেই পরিচিত, সেই ইমরান এইচ সরকার বলছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির পাশাপাশি তাদের আরেকটি মূল দাবি ছিল সমাজে সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সরকারের ভাষায় সেই দাবি এখনও অর্জিত হয়নি, ফলে গণজাগরণ মঞ্চের প্রাসঙ্গিতকতা এখনো রয়ে গেছে, এবং এই মঞ্চ ‘মৃত্যু বরণও করেনি’।

সন্ধ্যে নাগাদ বিক্ষোভকারীরা এসে শাহবাগ চত্বর দখল করে, বন্ধ হয়ে যায় যানবাহন চলাচল। কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা ‘ফাঁসি’র দাবীতে ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে জড়ো হয় অনলাইন এক্টিভিস্ট ও ব্লগার কমিউনিটি। ফাঁসির দাবীতে শাহবাগ যখন তুঙ্গে, মিডিয়ায় কল্যাণে ব্লগার নামটি যখন জনপ্রিয়তা পায় ঠিক তখন খুন হোন রাজীব হায়দার। ১৫ ফেব্রুয়ারি, জঙ্গিদের হাতে খুন হওয়ার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর রাজীবের বাসায় যান। রাজীব হায়দার শাহবাগে জড়ো হওয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষের মতন শাহবাগের একজন সমর্থক ও কর্মী ছিলেন। শাহবাগ আন্দোলনের সময় শুধু রাজীব হায়দার নন পরবর্তীতে খুন হোন আরও অনেকে। এর মধ্যে রাজাকার গোলাম আযমের সাক্ষী গীতিকার ও গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ভাই মিরাজ আহমেদ হত্যা অন্যতম। প্রাথমিকভাবে রাজীব হায়দার খুনের ঘটনায় জামাত-শিবিরের সম্পৃক্ততা মনে করা হলেও পরবর্তীতে দেখা গেল তিনি খুন হয়েছেন তার নিজের লেখালেখির কারণে। খুনিরা আনসার বাংলা নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু নিহত রাজীব হায়দারকে দেখতে গিয়েছেন এবং ব্লগার পরিচয়টি যখন মানুষের মনে নতুন জনপ্রিয় শব্দ তখন বিএনপির মুখপত্র ‘আমার দেশ’ পত্রিকাসহ আরও অনেক ডানপন্থী পত্রিকা রাজীবের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ‘নাস্তিক’ পরিচয়টি হাইলাইট করে তার লেখালেখি পত্রিকা ও অনলাইনে প্রকাশ করে। এখানে স্মরণ রাখা প্রয়োজন; শাহবাগ সৃষ্টি হওয়ার পরপর-ই জামাতের সাথে বিএনপির সম্পর্ক থাকায় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ব্লগারদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। ব্লগার রাজীব হায়দার খুন, শাহবাগে রাজীবের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর হেফাজত ইসলাম নাস্তিক ও ব্লগ ইস্যুকে সামনে রেখে রাস্তায় নামে। ইসলামপন্থী দল গুলোসহ অন্যরা পেছনে থাকলেও মূল ভূমিকায় থাকে হেফাজতে ইসলাম। ২০১০ সালে নারী নেতৃত্বের প্রতিবাদে হেফাজত ইসলামের সৃষ্টি। ২০১৩ সালে ব্লগার ইস্যুতে তারা মাঠে নামে। হেফাজত অভিযোগ করে শাহবাগের ব্লগাররা ইসলাম ও নবীর বিরুদ্ধে লেখালেখি করে। এক দিকে শাহবাগ অন্যদিকে হাটহাজারির হেফাজতের আন্দোলন সৃষ্টি হওয়ার ফলে ঢাকার রাজাকারের ফাঁসির ইস্যুটি চট্টগ্রামে নাস্তিক ফাঁসির ইস্যুতে রূপ নেয়। জাতির মধ্যেও স্পষ্টভাবে বিভক্তি হাজির হয়।

বিবিসি প্রকাশ করেঃ (১ মে ২০১৬) বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রপন্থিদের হামলার শিকার হয়েছেন এমন মানুষের তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার, শিক্ষাবিদ, এলজিবিটি কর্মী, শিয়া, সুফি আহমাদিয়া মুসলিম, খ্রিস্টান ও হিন্দু সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগকেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। টাঙ্গাইলে নিখিল জোয়ারদার নামে একজন দর্জিকে গতকাল কুপিয়ে হত্যার পর এসব কথা লিখেছে অনলাইন বিবিসি।  এতে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসরকে হত্যা করা হয়েছে। তার পরিবার বলছে, তিনি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করতেন। তাকে হত্যার ঘটনায় এটা পরিষ্কার যে, যারা এমন হত্যার ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় আছেন তার ক্রমশ বিস্তার ঘটেছে। এসব হামলার নেপথ্যে কে বা কারা তা রয়েছে অস্পষ্ট। বাংলাদেশে রয়েছে অনেক উগ্রপন্থি গ্রুপ। এসব হামলায় খুব কমই শাস্তি দেয়া হয়েছে। হামলার দায় স্বীকার করেছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আল কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলো। কিন্তু দায় স্বীকার নিয়ে আপত্তি আছে বাংলাদেশের। এর পরিবর্তে দেশটি এসব হত্যার জন্য বিরোধী দল ও স্থানীয় ইসলামি গ্রুপগুলোকে দায়ী করেছে। কিন্তু হত্যাকা- বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সরকারকে অভিযোগ মোকাবিলা করতে হবে যে, তারা সংখ্যালঘুদের রক্ষায় যথেষ্ট করছে না।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, টাঙ্গাইলে হিন্দু একজন দর্জি নিখিল জোয়ারদারকে গতকাল তার দোকানের বাইরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রপন্থিরা যেসব হামলা চালাচ্ছে তিনি তার সর্বশেষ শিকার। পুলিশ বলছে, তিনি ইসলাম সম্পর্কে এর আগে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন বলে ২০১২ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। গতকাল বিকেলে তাকে হত্যার পর ইসলামিক স্টেট এর দায় স্বীকার করেছে। তবে কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব হত্যাকা-  হয়েছে তার দায় স্বীকার করেছে কতগুলো ইসলামী উগ্রপন্থি গ্রুপ। এর আগে দেশের একমাত্র এলজিবিটি বিষয়ক ম্যাগাজিনের একজন সম্পাদক জুলহাজ মান্নানকে ও তার এক বন্ধুকে তার ঢাকার বাসায় হত্যা করা হয়েছে।  আল কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন বাংলাদেশী উগ্রপন্থি গ্রুপ আনসার আল ইসলাম এ হত্যার দায় স্বীকার করেছে। চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গত বছর হত্যা করা হয়েছে চারজন ব্লগারকে। ‘নাস্তিক ব্লগারের’ ৮৪ জনের হিটলিস্টে তাদের নাম ছিল। এ তালিকা ২০১৩ সালে ইসলামি গ্রুপগুলো প্রচার করেছিল।

দুই বছরে নয় ব্লগার হত্যাঃ দুই বছরে প্রকাশ্যে ও গোপনে নয়জন ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে।  হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক বা টুইটারে হত্যাকারীরা হত্যার দায় স্বীকার করে স্ট্যাটাসও দিয়েছে। এসব স্ট্যাটাসে প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে ইসলাম ধর্মকে নিয়ে কটূক্তি অথবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনার অভিযোগ দেখানো হয়েছে।

ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত যে কয়েকজনকে আটক করা গেছে তাদের বেশিরভাগের সঙ্গে কোনো না কোনো জঙ্গি সংগঠনের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগে মুক্তচিন্তার লেখক ও ব্লগারসহ নতুন প্রজন্মের তরুণরা গণজোয়ার গড়ে তোলেন। সেই আন্দোলনকে প্রতিহত করতে প্রথম আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামের একটি সংগঠন ‘হিট লিস্ট’ শিরোনামে ৮৪ জন ব্লগার ও আন্দোলনকারীর তালিকা প্রকাশ করে।

তালিকায় নাম প্রকাশের বিষয়ে বলা হয়েছিল ‘এরা সবাই ইসলামের দুশমন।’ ব্লগার এবং আন্দোলনকারীদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল, এরা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)- কে কটূক্তি করে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। তালিকা অনুযায়ী একে একে ব্লগারদের হত্যা করা হবে বলে হুমকিও দেওয়া হয়।

৮৪ জনের তালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, আসিফ মহিউদ্দিন, অভিজিৎ রায়, আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন, মারুফ রসুল, আরিফ জেবতিক, ইব্রাহীম খলিল, আরিফুর রহমান, অনন্য আজাদ, মাহামুদুল হক মুন্সি বাঁধনের নাম শীর্ষে ছিল।

২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ১২ মে পর্যন্ত সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক, ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশসহ নয়জন ব্লগার নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। ইতোপূর্বে ৮ ব্লগার হত্যার কোনো ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুজে বের করতে সবধরনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানায় পুলিশ।

সর্বশেষ খুনের শিকার হন মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে সিলেটের সুবিদবাজারে সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক, ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ। মুক্তমনা ব্লগার হওয়ায় একাধিকবার তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। মৌলবাদীরা টার্গেট করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে তার সহযোগীরা দাবি করেন।

গণজাগরণ মঞ্চ সিলেটের মুখপাত্র দেবাশীষ জানান, অনন্ত বিজয়  মুক্তমনা ব্লগের একজন নিয়মিত লেখক ছিলেন। এ ছাড়াও বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতার ছোট কাগজ `যুক্তি`র সম্পাদক ছিলেন। একুশে বইমেলায় তার একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি পূবালী ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন।

তিনি আরো জানান, সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হন অনন্ত। বাসার সামনে ওৎ পেতে থাকা কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ। ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গত ৩০ মার্চ  সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বেগুনবাড়ি দিপীকার ঢাল এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে অফিসে যাওয়ার পথে ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে ফেরার পথে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিজ্ঞানমনষ্ক লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ব্লগার ‍অভিজিৎ রায়কে টিএসসি এলাকায় কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। ওই দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিজিৎ। তিনি মুক্তমনা ব্লগ চালাতেন।

আজ রোববার ২৬ ফেব্রূয়ারি ২০১৭, মুক্তমনা লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়সহ মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত সহযোদ্ধা ও ব্লগারদের স্মরণে রোববার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করবে গণজাগরণ মঞ্চ। অভিজিৎ রায় হত্যার দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে এদিন বিকেল ৩টায় শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে অস্থায়ী প্রতিকৃতিতে অভিজিৎ রায়সহ নিহত সব সহযোদ্ধার উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন মঞ্চের কর্মীরা। বিকেল ৪টায় হবে ‘মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও সামাজিক ন্যায়বিচার: কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?’ শীর্ষক আলোচনা সভা। এরপর সন্ধ্যায় আলোক প্রজ্জ্বলন ও শাহবাগ থেকে অভিজিৎ চত্বর অভিমুখে বের করা হবে আলোর মিছিল।

শনিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) মঞ্চের কর্মী রিয়াজুল আলম ভূঁইয়ার পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ন্যায়বিচার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বাংলাদেশ বিনির্মাণের লড়াইয়ে সবাইকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ত্রি-স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই জনাকীর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে খুন হন ড. অভিজিৎ রায়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের দুই বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও বিচারকাজে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ করে আসছে গণজাগরণ মঞ্চ।

মুক্তমনা লেখক অভিজিৎ রায় হত্যাসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার গতি আনার দাবি জানিয়েছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। মুক্তমনা লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়সহ মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত সব সহযোদ্ধা ও ব্লগারদের স্মরণে শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানান তিনি। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলার সোহরাওয়াদী উদ্যান অংশ থেকে বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় উগ্রপন্থিদের হামলায় খুন হন বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ত্রিস্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে অভিজিৎকে খুন করা হয় মন্তব্য করে বিবৃতিতে ইমরান বলেন, “নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের দুই বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও বিচারকাজে নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি। আজ দেশে এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই। “মতপ্রকাশ করলে জীবনের নিরাপত্তা নেই, আবার খুন হয়ে গেলে বিচার পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।” অভিজিৎ রায়সহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রমকে গতিশীল করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মঞ্চের আন্দোলন শুরুর পর চার বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে বিভিন্ন মৌলবাদী ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর হাতে নিহত হয়েছেন বাইশ জনেরও অধিক মঞ্চের কর্মী। “এই হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার না হওয়ায় একদিকে যেমন নিহতের পরিবার ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে খুনিরা হয়েছে বেপরোয়া। তারা নির্বিঘ্নে ঘটিয়ে চলেছে একের পর এক নির্মম হত্যাকাণ্ড।” দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া গেলে ‘লাশের মিছিল এত দীর্ঘ হতো না’ বলে মন্তব্য করে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের এই মুখপাত্র বলেন, “স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরে এসেও তাই মুক্তবুদ্ধির চর্চা অরক্ষিত, উপেক্ষিত সামাজিক ন্যায়বিচার।”

লেখক অভিজিৎ রায়ের স্মরণে রোববার বিকাল ৩টার দিকে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে অস্থায়ী প্রতিকৃতিতে অভিজিৎ রায়সহ নিহত সব সহযোদ্ধার উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে বলে বিবৃতিতে জানান ইমরান। বিবৃতিতে জানানো হয়, শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিকাল ৪টার দিকে অনুষ্ঠিত হবে ‌‘মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও সামাজিক ন্যায়বিচার: কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?’ শীর্ষক আলোচনা সভা। আর সভা শেষে সন্ধ্যায় আলোক প্রজ্জ্বলন ও শাহবাগ থেকে অভিজিৎ চত্বর অভিমুখে আলোর মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।

২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কবি নজরুল ইসলাম হলে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপকে।

২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি অগ্রণী ব্যাংকের কর্মী ও ব্লগার জাফর মুন্সিকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে  হত্যা করা হয়।

২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তা ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনকে বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর পল্লবীর কালশীর পলাশনগরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্লগার মামুন হোসেন, ২ মার্চ ব্লগার জগৎজ্যোতি তালুকদার ও ব্লগার জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে হত্যা করা হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ২০১৬সাল, বুধবার ( ৬ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৮টার পরে রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকায় অজ্ঞাত দুবৃত্তদের চাপাতি ও গুলির আঘাতে নিহত হন নিজামুদ্দিন সামাদ। তাকে হত্যা করার সময় খুনিরা “আল্লাহু আকবর” বলে স্লোগান দেয় বলে এলাকাবাসি জানিয়েছিলেন। সামাদ প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মধ্যম ফেসবুকে ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি।

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার তিলপাড়া ইউনিয়নের বড়াউট গ্রামে বুধবার রাতে ঢাকায় খুন হওয়া নাজিমুদ্দিনের সামাদের বাড়ি। সামাদকে কেউ হত্যা করতে পারে এলাকার লোকজনও তা বিশ্বাস করছেন। গ্রামের সবার সাথেই সুসম্পর্ক ছিল তাঁর। সিলেট স্কলারসহোম ও লিডিং বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নাজুমুদ্দিন সামাদের জন্য গ্রামের লোকদের গর্বও ছিল। ৫ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে নাজিম চতুর্থ। বড় ভাই জুলহাস উদ্দিন ও বাবা আব্দুস সামাদ আগেই মারা গেছে। তাঁর বড়  ভাই শামীম উদ্দিন ও ছোট ভাই জসিম উদ্দিন থাকেন লন্ডনে। আর মেঝভাই সুনাম উদ্দিন থাকেন ফ্রান্সে।
আর ছোট ভাই থাকেন ফ্রান্সে। বড় বোন পারুল বেগম বিবাহিত। ছোট বোন ও মা তইরুন্নেছাকে নিয়েই দেশে পরিবার ছিল সামাদের।

১৯৬৩ সালের শেষদিকে দু’জন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়াল আলমন্ড ও সিডনি ভার্বার যৌথ প্রয়াসে ‘দ্য সিভিক কালচার’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে একটি জাতিরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সুনির্দিষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। কিছু ইস্যুতে দ্বিমত থাকলেও গ্রন্থটি থেকে ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ শব্দযুগলের একটি আপাত পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করা যায়। যদিও যে পাঁচটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রেক্ষণে রেখে এ গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশ নেই; তবুও তাদের আলোচনায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে ধারণাপত্র নির্মিত হয়েছে তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্বন্ধে নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনার একটি সাধারণ রূপ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠিত হলেও, জাতি হিসেবে বাঙালির ইতিহাস সুপ্রাচীন। এই সুপ্রাচীন ইতিহাস অনুসৃত দর্শনই বাংলার মানুষকে নিয়ে গেছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পথে। সুতরাং স্বাধীন বাংলাদেশ কেবল একটি যুদ্ধজয়ী রাষ্ট্রমাত্রই ছিল না; তার করতলে ছিল হাজার বছরের অসাম্প্র্রদায়িক ও মানবতার দর্শন। পাকিস্তানের তীব্র সাম্প্রদায়িক অপ-দর্শনকে পরাজিত করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বরূপও নির্ধারিত হয়েছে একই পথে। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রকে সে অর্থে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। ইতিহাস পড়লে বোঝা যায়, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ন্যায়বিচারের বাণী উচ্চারিত হয়েছে বারবার। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই ‘৭২-এর ১০ জানুয়ারি জাতির জনক তার ভাষণে সুস্পষ্টভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তার সরকারের আমলে এই বিচারের উদ্যোগও গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শক্তি আমাদের অগ্রযাত্রার ইতিহাসকে থামিয়ে দেয় ‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট। জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে আমাদের টেনে নেওয়া হয় মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দিকে। মোশতাক-জিয়া সরকারের জারিকৃত দায়মুক্তি অধ্যাদেশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায় শুরু হতে থাকে। তার পরবর্তী সরকারগুলো নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দেয়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসে এবং বিচারহীনতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে।
১৯৭৫ থেকে ২০১৩- এই ৩৮ বছরের ব্যবধানে বেড়ে উঠেছে কয়েকটি প্রজন্ম। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ‘৯০-এর গণআন্দোলনের শেষদিকে যাদের জন্ম; যারা বেড়ে উঠেছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, একই সঙ্গে শিকার হয়েছে পাঠ্যপুস্তকে ভয়াবহ ইতিহাস বিকৃতির, তাদের কাছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংজ্ঞাটি আলাদা। যারা স্বাধীনতাবিরোধী, তাদের বিচার তো দূরের কথা, আমরা তাদের সংসদে বসতে দেখেছি। ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর বীভৎস সাম্প্র্রদায়িক সন্ত্রাস দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জামায়াত-শিবিরের আস্ফালন দেখেছি। দীর্ঘদিন নির্বাচন না থাকায় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কোনো ধারণাই তৈরি হয়নি আমাদের মধ্যে। ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রজন্ম বা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী প্রজন্মের মতো আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি নিজেদের মনোজগতের ঐক্যবদ্ধ শক্তিটি অনুধাবন করার। শাহবাগ আন্দোলন আমাদের সেই শক্তির নির্ণায়ক। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় প্রদানের পর তা প্রত্যাখ্যান করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ, তা প্রমাণ করে- শহীদ জননীর আন্দোলন কী প্রগাঢ় তীব্রভাবে কাজ করেছে আমাদের মনোজগতে! ইতিহাস বিকৃতিতে ঠাসা পাঠ্যপুস্তকের আবর্জনা যে আমাদের মগজে পচন ধরায়নি- তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ গণজাগরণ মঞ্চ।

গণজাগরণ মঞ্চ তার প্রতিবাদের পথ হিসেবে অহিংস আন্দোলনের ধারা গ্রহণ করেছিল। গণমানুষের স্বতঃস্টম্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ আন্দোলন তার পথ তৈরি করেছে। আন্দোলনের অহিংস বোধ প্রজন্ম চত্বরের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সজাগ ছিল সচেতনভাবেই। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের সচেতনতাই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছে সামনের দিকে। এই প্রথম সারা পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে- অহিংস আন্দোলনের ধারাতেও বাংলার মানুষ তার দাবি আদায় করতে পারে। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে প্রতিটি বিবৃতি-বক্তব্যে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই এ আন্দোলনের মূল প্রেরণা। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের মানবিক হতে শেখায়, ন্যায়বিচার প্রশ্নে আপসহীন হতে শেখায়। উল্টোদিকে ২০১৩ সালেই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির জ্বালাও-পোড়াও, সহিংসতার দানবীয় রূপ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে সারাদেশে তারা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ছড়িয়েছে। একের পর এক হত্যা করেছে আমাদের সহযোদ্ধাদের। নানাবিধ উস্কানি সত্ত্বেও গণজাগরণ মঞ্চ তার আন্দোলনকে কখনোই সহিংস হতে দেয়নি। কারণ ওই মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্রে উলি্লখিত সূর্যমুখী শব্দমালা- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। স্বাধীনতাবিরোধীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র চায়নি। তাই রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করাই তাদের রাজনীতি। কিন্তু স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির উদ্বোধন মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শপথ; সাম্য ও ন্যায়বিচারের দাবিতে অটল প্রত্যয়। গণজাগরণ মঞ্চের এই প্রত্যয় আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন এনেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস বা জনজীবনকে বিপন্ন করার মতো কর্মসূচি কখনোই রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না। যদি হয়, তবে তা বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি। বাংলাদেশের রাজনীতি হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপ্রসূত অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি। লক্ষণীয়, ২০১৫ সালে অবরোধের নামে বিএনপির বীভৎস জ্বালাও-পোড়াও আর ধ্বংসের রাজনীতিকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে ন্যায্যতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ অহিংস আন্দোলনে জনমানুষের সমর্থন পেয়েছেন ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা।

মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী স্লোগান- ‘তুমি কে আমি কে/ বাঙালি, বাঙালি।’ প্রজন্ম চত্বর থেকেও উচ্চারিত হয়েছে এই স্লোগান। কিন্তু মানুষ থেকে মানুষে নির্ধারিত আন্দোলনের গতিপথে এই স্লোগানে সচেতনভাবে পরিবর্তন আনে গণজাগরণ মঞ্চ। ইতিহাসের জাতীয়তাবাদকেন্দ্রিক বয়ানের পরিবর্তনের জন্যই শাহবাগ নতুন স্লোগান দেয়- ‘তুমি কে, আমি কে/ আদিবাসী, বাঙালি।’ রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সব নাগরিকের সম্বন্ধ স্থাপিত না হলে সেটা মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র হতে পারে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই স্থানে শাহবাগ তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ধর্মের নামে গণহত্যা, নারী নির্যাতন চালিয়েছে। সেই একই পদ্ধতির পুনরাবৃত্তি তারা ঘটিয়েছে শাহবাগ আন্দোলনে। ধর্মের ধুয়া তুলে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে চেয়েছিল। ধর্মকে বর্ম বানিয়ে তারা একের পর এক হত্যা করেছে রাজীব হায়দার, আরিফ রায়হান দীপ, অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয়সহ আমাদের অনেক সহযোদ্ধাকে। যারা ইতিহাসের দায়মোচনের জন্য, জাতির ললাট থেকে বিচারহীনতার কলঙ্ক মোছার জন্য রাজপথে, ব্লগে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছেন; তাদের হত্যাকাণ্ডের পর আজ আবার বিচারহীনতার কলঙ্ক আমাদের ঘিরে ধরেছে। সহযোদ্ধাদের হত্যাকাণ্ডের বিচার আমরা পাইনি। এমনকি পাচ্ছি না নূ্যনতম তদন্তের অগ্রগতিও। রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু করেছিল শাহবাগ আন্দোলন, তাকে আবার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে পাঠানোর ষড়যন্ত্র চলছে। কারণ, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বসে নেই; এখনও নিষিদ্ধ হয়নি জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি। উল্টো ক্ষমতাসীন দলে চলছে তাদের পুনর্বাসন। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থেকে তারা ছড়িয়ে দিচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প। মালোপাড়া, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ- ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বুকে একেকটি অমোচনীয় ক্ষত।

ঐতিহাসিকভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে, গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শহীদ জননীর আন্দোলনেরই একটি পরিপূর্ণ বিকশিত রূপ। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শহীদ জননী যখন জামায়াতের তৎকালীন আমির রাজাকার গোলাম আযমের ‘মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ’ ঘোষণা করছেন; তখন আমার মতো অনেকে ব্যাগ কাঁধে স্কুলে যাচ্ছি। ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চ যখন শাহবাগে শপথ নিচ্ছে, তখনও শিশুরা বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রজন্ম চত্বরে এসে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে কণ্ঠ মিলিয়েছে। ব্যাগ কাঁধে স্কুলে যাওয়া সারাদেশের এই শিশুরা একদিন বড় হবে। দেশের প্রয়োজনে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রয়োজনে, সময়ের প্রয়োজনে তারাও তাদের পথটি তৈরি করে নেবে। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস বিকৃতি আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি; আজকের সাম্প্রদায়িকীকরণ তাদেরও ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। গণজাগরণ মঞ্চের একজন কর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, একটি গণআন্দোলনের এর চেয়ে ফলপ্রসূ কোনো প্রভাব থাকতে পারে না।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার করে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয় পায় আওয়ামী লীগ। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়। এক বছরের মাথায় গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে প্রথম রায় আসে ট্রাইব্যুনাল থেকে, ফাঁসি হয় আবুল কালাম আযাদের। কিন্তু পালিয়ে যাওয়া ওই অপরাধীর ফাঁসির রায় চার দশক ধরে বিচারের অপেক্ষায় থাকা মানুষের মনের সন্দেহ দূর করতে পারেনি। উল্টো সন্দেহ আরো গাঢ় হয়, যখন এক মাস পরই আরেকটি রায় আসে। দ্বিতীয় রায়ে মিরপুরের কসাই নামে কুখ্যাত কাদের মোল্লার জঘন্যতম অপরাধগুলো প্রমাণিত হওয়ার পরও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়টি ছিল প্রত্যাশা থেকে অনেক দূরে, পুরো জাতি স্তম্ভিত ও হতবাক হয়ে পড়ে। বাতাসে ছড়ায় আঁতাতের গন্ধ।

দিনটি ছিল ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। দিনের মধ্যভাগে যখন কাদের মোল্লার ফাঁসি না হওয়ার খবর এলো, তখনই শুরু হলো সরকারের সমালোচনা। ফেসবুকসহ সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্লগে সরাসরি বলা হলো, এটি আঁতাতের রায়। মানুষ কসাই কাদেরের যাবজ্জীবন মানতে প্রস্তুত ছিল না। জনমনে ক্ষোভ দানা বেঁধে ছিল। প্রয়োজন ছিল শুধু একটি ডাকের। সেই ডাক এলো কিছু তরুণের কাছ থেকে, যারা ফেসবুক-ব্লগে সক্রিয় ছিল। ফেসবুকেই তারা সহযোদ্ধাদের শাহবাগে আসার আহ্বান জানায়। এভাবেই গণজাগরণের বীজটি মাটি আর পানির ছোঁয়া পায়, যা পরে পরিণত হয়েছিল মহিরুহে।

কাদের মোল্লার অপ্রত্যাশিত রায় প্রকাশের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল সংগঠনের পক্ষ থেকে রায় প্রত্যাখ্যান করে মিছিলের আয়োজন করা হয়। আমি খবরটি পাই দুপুর নাগাদ। এরপর আমাকে জানানো হয়, বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল হবে। সন্ধ্যায় হবে মশাল মিছিল। আয়োজনে ছিল ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র ফেডারেশনসহ কিছু প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন। ততক্ষণে খবর এসেছে, প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন শাহবাগ অবরোধ করেছে। কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার করছে। মনে হলো, কিছু একটা হতে যাচ্ছে। পরের কয়েক দিন বাংলাদেশ দেখল এক নজিরবিহীন গণজাগরণ, যার তুলনা এই ভূখণ্ডের কোনো ঘটনার সঙ্গেই সম্ভব নয়। দিনের পর দিন লাখো মানুষ স্লোগান তুলে, গান গেয়ে, মিছিল করে, মোমবাতি জ্বালিয়ে একটি দাবিই জানাল—ফাঁসি চাই।

৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া আন্দোলনের বাস্তবে কোনো নাম ছিল না। ক্রমেই সেটি ‘গণজাগরণ’ নামে জোরদার হতে থাকে। এই আন্দোলনের শুরুতে কোনোভাবেই সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কোনো ভূমিকা ছিল না। তবে যত দিন যেতে থাকে, ততই মঞ্চটি ক্রমে সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ও সরকার সমর্থক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মঞ্চে পরিণত করার চেষ্টা হতে থাকে।যাঁরা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তাঁরা সক্রিয় ছিলেন শুধু প্রথম এক সপ্তাহ পর্যন্ত। পরে মঞ্চের কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের ডাকা হয়নি বলেও তাঁরা অভিযোগ করেন। দলীয়করণের চেষ্টা এমনভাবে করা হয় যে মঞ্চের অন্যতম কর্মী লাকি আক্তারের ওপর পর্যন্ত হামলা হয়েছে। তবে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয় ২১ ফেব্রুয়ারির সমাবেশে। এদিন গণজাগরণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে ডা. ইমরান এইচ সরকার যখন কর্মসূচি পড়ছিলেন, তখন তাঁর বাঁ পাশে ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, তাঁর পাশে ছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর শরীফ। এদিন বামপন্থী ছাত্রনেতাদের মঞ্চের পেছনে রাখা হয়েছিল, দেখা যায়নি আন্দোলনের শুরুতে যাঁরা ছিলেন তাঁদের কাউকে। ওই দিন ডা. ইমরান তিন পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য পড়ছিলেন, তখন পাশ থেকে বেশ জোরে জোরে নাজমুল নির্দেশ দিচ্ছিলেন তাঁকে। এমনকি ‘একটু আবেগ দিয়ে কর্মসূচি পড়া’র জন্য ডা. ইমরান এইচ সরকারকে নির্দেশ দেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল।

কিন্তু তখন গণজাগরণ মঞ্চের ইতিবাচক সমালোচনা করার মতো পরিস্থিতি ছিল না। যেকোনো সমালোচনাকে তখন চিহ্নিত করা হচ্ছিল এর বিরোধিতাকারী হিসেবে। দিনভর টেলিভিশনে ইতিবাচক কথা বলা হতো, আর পরদিন পত্রিকার প্রথম পাতা জুড়ে থাকত গণজাগরণের সংবাদ। কালের কণ্ঠ ওই আন্দোলন সমর্থনে, তাকে এগিয়ে নিতে কোনো দ্বিধা তো করেইনি, বরং ছিল অগ্রগামী। কিন্তু ভেতরে ভেতরে গণজাগরণ আর জনতার হাতে না থেকে সরকারি দলের হাতে যাচ্ছিল। সে কথা বলার মতো কেউ ছিল না। সাহস দেখাল শুধু কালের কণ্ঠ। অফিসের সম্মতিতে আমি একটি প্রতিবেদন লিখলাম, সেটি ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ ‘গণজাগরণ মঞ্চ আওয়ামীকরণ!’ শিরোনামে ছাপা হয়। ওই প্রতিবেদনে মানুষকে জানানো হলো, কিভাবে ছাত্রলীগ ও সরকারঘনিষ্ঠরা এটি দখলের চেষ্টা করছে। ১৭ মার্চ ‘গণজাগরণ মঞ্চ শক্তি হারিয়েছে বিভক্তি আর দলীয়করণে’ শীর্ষক আরেকটি প্রধান প্রতিবেদন ছাপা হলো। তাতে বলা হলো, দলীয়করণ ও আন্দোলনে বিভক্তির কারণেই আন্দোলনটি পথ হারাতে বসেছে। আর এই সুযোগে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে নেমেছে বিভিন্ন গোষ্ঠী।

২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির বদলে যাবজ্জীবন রায় ঘোষণার পর ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়েছিলেন কাদের মোল্লা। গণজাগরণের পর সরকার বাধ্য হয় আইন পরিবর্তন করতে। আপিল বিভাগের রায়ে কাদের মোল্লার ফাঁসি হয় এবং ফাঁসি কার্যকরও করা হয়। তারপর আরো তিনজন মানবতাবিরোধী অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চের মতো আন্দোলন বাংলাদেশে আর কখনো হয়নি। সেই আন্দোলনের দলীয়করণের প্রতিবেদনও মূলধারার পত্রিকার মধ্যে শুধু কালের কণ্ঠই ছাপাতে পেরেছিল। দুটি প্রতিবেদন ছিল গণজাগরণ মঞ্চের জন্য এক ধরনের আলোকবর্তিকা।

এই প্রতিবেদনের পর গণজাগরণ মঞ্চের সরকারপন্থী ও প্রকৃত আন্দোলনপন্থীদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়। ছাত্রলীগ ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। তারা গণজাগরণ মঞ্চকে নিজেদের পক্ষের কিছু নেতাকর্মী দিয়ে এ সময় ভাঙারও চেষ্টা করে। তবে মূল অংশটি ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বেই থেকে যায়। গণজাগরণ মঞ্চ ফাঁসির পক্ষে, ন্যায়বিচারের পক্ষে দেশের মানুষের কত বড় সমর্থন আছে, তা জানান দিয়েছিল ক্ষমতাসীনদের।

৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭-তে গণজাগরণ মঞ্চের চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীঃ ২০১৩ সালের এই দিনে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল বাংলাদেশ, দ্রোহের চেতনায় সুস্পষ্ট করেছিল ইতিহাসের দায়মুক্তির প্রত্যয়। গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্বোধনে শাহবাগ হয়ে উঠেছিল গোটা ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল। প্রজন্ম চত্বর থেকে বারবার উচ্চারিত হয়েছিল এই শাশ্বত সত্য যে, একাত্তরের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধই এই আন্দোলনের মূল প্রেরণা। প্রজন্ম চত্বর শহীদজননীর সন্তানদের বিদ্রোহের আকাশ। সুনির্দিষ্ট ছয় দফা দাবি সামনে রেখে চলমান এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতেই ট্রাইব্যুনালের আইন সংশোধন হয়েছে। তবে এখনও নিষিদ্ধ হয়নি জামাত-শিবিরের রাজনীতি। সাম্প্রদায়িক ও উগ্র ধর্মীয় অপগোষ্ঠী তাদের পাকিস্তানি অপদর্শনের চাষাবাদ করে যাচ্ছে সারাদেশের নানা প্রান্তে। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে, ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপতৎপরতা চালাচ্ছে। গণজাগরণ মঞ্চ শুরু থেকেই তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই আন্দোলন একটি দর্শনভিত্তিক আন্দোলন। মুক্তিযুদ্ধের যে অমিত দর্শন; স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে সাম্য ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দর্শন, তার ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়েই গণজাগরণ মঞ্চ এখনও আন্দোলন করে যাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির এক সম্পূর্ণ সংজ্ঞায়ন। তবে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নানা ক্ষেত্রে যে হারে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ শব্দদ্বয় উচ্চারিত হয়, সে হারে তার অর্থ খোঁজার চেষ্টা করা হয় না। বিভিন্ন মানুষের কাছে এর অর্থ বিভিন্ন রকমের হবে; কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় গণজাগরণ মঞ্চ তার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এই বোধটুকু অবলম্বন করেছে যে, এই শব্দ-যুগল আসলে বাঙালির সমস্ত কিছুর সংজ্ঞায়ন। আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি; এমনকি আমাদের ব্যক্তিগত-পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলোরও একটি পরিপূর্ণ সংজ্ঞায়ন এই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’।

এটি বলার মূল কারণ হল, মুক্তিযুদ্ধ কেবলই নয় মাসের একটি সশস্ত্র যুদ্ধ নয়; বরং হাজার বছরের বাংলার ইতিহাসের যে ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও একই সঙ্গে রক্তস্নাত পথপরিক্রমা, তা-ও মুক্তিযুদ্ধেরই আখ্যান দলিল। বাংলার ইতিহাস পড়লে বোঝা যায়, কেবল বর্বর পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনামলেই নয়, বরং ব্রিটিশ বা তারও আগে বিভিন্ন সময়ে বাঙালি তার অধিকারের প্রশ্নে গর্জে উঠেছে, রক্ত দিয়েছে। এই মহাসংগ্রামের মহাবাদলে ভেসে গেছে বহু অত্যাচারী নিপীড়ক শাসক আর তাদের তাঁবেদাররা। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানুষের অধিকার; হয়তো আবার তা বেহাতও হয়ে গেছে। কিন্তু দীর্ঘ সংগ্রামের পরিক্রমায় বাংলার মানুষ ক্লান্ত হননি কখনও; বরং সহযোদ্ধার লাশ কাঁধে নিয়ে সে মিছিলে নেমেছে, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্লোগান দিয়েছে।

সেই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিটি অণু-পরমাণু আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণ করেছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে রক্ত দিয়েছে বাংলার মানুষ, ভাষা আন্দোলনে রক্ত দিয়েছে, দিয়েছে তৎপরবর্তী প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে। এই মাটি থেকেই জন্ম নিয়েছেন ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারসহ সারাদেশের ভাষা শহীদগণ। আবার এই মাটিরই সন্তান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা– একাত্তরে যাঁদের অবিনাশী কণ্ঠে গান গেয়ে উঠেছিল সাড়ে সাত কোটি বিপন্ন কোকিল। সুতরাং দীর্ঘ ইতিহাসে বাংলার লড়াই সংগ্রাম থামেনি, বরং চেতনার প্রবহমানতা ছিল মানুষ থেকে মানুষে– কণ্ঠ থেকে কণ্ঠে– মুক্তিযুদ্ধ থেকে গণআদালতে, গণজাগরণে।

বাঙালির আন্দোলন ও যূথবদ্ধতা বিভ্রান্ত করার চক্রান্ত ছিল সেই শুরু থেকেই। সাতচল্লিশে ধর্মের ভিত্তিতে দ্বি-জাতিতত্ত্বের আফিম খাইয়ে বাংলা ভাগ করা হল। পাকিস্তান তৈরির পরই তারা বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর ন্যাক্কারজনক আগ্রাসন শুরু করে। বুকের রক্তে বাঙালি মাতৃভাষার অধিকার আদায় করে। তেইশ বছরের পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাঙালি প্রতি মুহূর্তে মেলে দিয়েছে নিজের আত্মজ সংস্কৃতির ডানা। তাতেই বিশ্বাস রেখেছে সে এবং স্বাধীন বাঙলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে।

সুতরাং মুক্তিযুদ্ধ কেবলই একটি ‘যুদ্ধ’ নয়; এর একটি দার্ঢ্য দার্শনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস আছে। মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ইতিহাসটি বিভিন্ন সময় আলোচিত হলেও, এর দার্শনিক ইতিহাস আলোচিত হয়েছে খুব কমই; সত্যি বলতে, ওই অর্থে হয়ওনি। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত গণমানুষের চোখ দিয়ে না দেখে অধিকাংশ সময়ই দেখা হয়েছে রাজনৈতিক দলের চোখ দিয়ে। সে কারণেই, মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পরও আমরা দেখছি, বাঙালির আলোকোজ্জ্বল আন্দোলন ও লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস গণমানুষ বিচ্যুত হয়ে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বক্তৃতা-বিবৃতিতেই আটকে আছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও দৃশ্যপট একই। তিনি যে কোনো বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের নেতাই কেবল নন; বরং গণমানুষের প্রাণের নেতা এবং অন্য সব কিছুর চেয়ে এটাই শাশ্বত সত্য, তা আমাদের ইতিহাসে উচ্চারিত হয়েছে খুব কমই। মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিটি মানুষের এক মিলিত মহীরূহ রূপই হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের এক অপূর্ব সমার্থক হয়ে উঠেছেন তাঁর ত্যাগ আর চিন্তার অনন্যতায়। ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের অনন্য স্লোগান; সে কারণেই বাংলার সর্বকালের সর্বজনের প্রাণের স্লোগান এটি। মুক্তিযুদ্ধের এই অচর্চিত দার্শনিক ভিত্তির পাটাতনেই দাঁড়িয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। তৈরি করেছে তার আন্দোলনের রূপরেখা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের যে দার্শনিক ভিত্তি, স্বাধীন বাংলাদেশে তার অনেকাংশই প্রতিফলিত হয় বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্য দিয়ে। স্বীকার্য, পুরোটা তখনও হয়নি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের দর্শন কতটা মূর্ত হয়েছিল, সে প্রশ্ন আজও থেকে যায়। দেশ স্বাধীন হয়েছিল, কিন্তু সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশটি গড়ে তোলার কাজে যারা নিয়োজিত হয়েছিলেন, তাদের মাঝে তখনও পাকিস্তানি ভূত-দর্শন ছিল প্রকট। বস্তুত সে কারণেই স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় জাতির জনককে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট একই সঙ্গে বাঙলাদেশের ইতিহাসের এক ট্র্যাজিডি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পথ-হারানোর এক বেদনাবিধুর এলিজি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে পদস্খলনের শুরু। ইতিহাসের এ পর্যায়েই আমরা বুঝতে পারি, স্বাধীন দেশে বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা মানুষগুলোর মগজে ক্যান্সারের জীবাণুর মতো তখনও ছিল পাকিস্তানি অপদর্শন। পঁচাত্তর-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে আমরা বুঝতে পারি, কীভাবে তা ছড়িয়ে গেছে সর্বত্র এবং সে সুযোগেই যুদ্ধাপরাধীরা তাদের হিংস্র থাবা বসাতে থাকে শ্যামল বাংলার মাটিতে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ‘পাকিস্তানি দর্শন’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা মানুষ হত্যা করেছে, নারী নির্যাতন করেছে; মূলত ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে এরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করে।

যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান সংগঠন জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির সব সময় মুক্তিযুদ্ধে তাদের বিরোধিতাটি আদর্শিক বিরোধিতা হিসেবে প্রকাশ করেছে এবং এখনও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করার অপচেষ্টা করেই চলছে। তারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আর এর মূল প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুদণ্ডহীনতা। কিন্তু মানুষ তার প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত গণআদালত ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তৎকালীন বিএনপি সরকার নানাভাবে সেই আন্দোলন নস্যাৎ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইতিহাস তো সাক্ষী– গণমানুষের ন্যায্য দাবির আন্দোলন কোনো শাসকগোষ্ঠী কখনও দমন করতে পারে না।ইতিহাসের এই সত্য গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিটি মুহূর্তে মনে রেখেই সকল সঙ্কট-শঙ্কার কালগুলো অতিক্রম করেছে; এখনও করছে।

বাংলাদেশের তেতাল্লিশ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধের দর্শন গুরুত্ব পায়নি কখনও। এর মূল কারণ সম্ভবত এই যে, পঁচাত্তর-উত্তর রাজনীতির একটি সময় জনগণের চেয়ে বন্দুকের নল ক্ষমতার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে; আর বাকি সময়টাতে আদর্শের রাজনীতির চেয়ে ভোটের রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। আর সে কারণেই তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ একটি সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও বাহাত্তরের সংবিধান ফিরে আসেনি, রাষ্ট্রধর্ম বাতিল হয়নি এবং এখনও জামাত-শিবির নিষিদ্ধের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্টো হয়েছে। সুনিশ্চিতভাবেই আদর্শের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ভোটের রাজনীতি। আদর্শহীন রাজনীতির কোনো চরিত্র থাকে না। আর রাজনৈতিক এই চরিত্রহীনতার সুযোগেই জামাত-শিবির তাদের ধর্মীয় রাজনীতির মোড়কে পাকিস্তানি অপদর্শনের বিষবৃক্ষ বপন করে চলছে।

একটি গণআন্দোলনের বিষয়ে সার্বিক মন্তব্যের ক্ষেত্রে চার বছর উল্লেখযোগ্য সময় নয়। তারপরও সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর এবং একাত্তর থেকে চলমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাবর্ণনায় গণজাগরণ মঞ্চের একজন কর্মী হিসেবে এই আন্দোলনের অবস্থানটি পুনর্ব্যক্ত করা প্রয়োজন। ‘মুক্তিযুদ্ধের দর্শন’ই গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন পরিচালনার দার্শনিক ভিত্তি। একাত্তরে পাকিস্তানি অপদর্শন মোকাবেলার জন্যেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে, তা কেবল মুক্তিযুদ্ধের দর্শনের রাজনৈতিক বাস্তবায়নেই সম্ভব। এই রাজনৈতিক লড়াইয়ের উৎসবিন্দু মুক্তিযুদ্ধের দর্শন এবং তার হাতিয়ার গণমানুষের সাংস্কৃতিক উদ্বোধন। আর এ কারণেই গণজাগরণ মঞ্চ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে যারাই রাজনীতি করুন না কেন, মুক্তিযুদ্ধের কিছু মৌল প্রশ্নে তাদের একমত হতে হবে। সরকারি কিংবা বিরোধী দল যা-ই হোক না কেন, তাকে হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। এটি বাস্তবায়নে মুক্তিযুদ্ধের দর্শনের প্রশ্নে সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। আমরা যেন কখনও ভুলে না যাই যে, রাজনীতি ঠিক ততটা পথই চলে, দর্শন যতটা পথ নির্মাণ করে দেয়। চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই শপথই পুনরুচ্চারিত হোক।


ডাঃ ইমরান এইচ সরকারের পরিবর্তন ডট কমের একটি স্বাক্ষাৎকার উল্লেখ করা হলঃ গণজাগরণ মঞ্চ কোনো রাজনৈতিক দল নয়; একটি সংগঠন মাত্র। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রয়ারি এ সংগঠনের যাত্রা শুরু। কতিপয় সচেতন-সংগ্রামী তরুণই গড়ে তোলেন গণমানুষের এ সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লালিত মানুষ দলে দলে অংশ নেয় এ সংগঠনের আন্দোলন-মিছিল ও স্লোগানে। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের দাবিতে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় এ সংগঠনটি। শুধু তাই নয়; তনু হত্যার বিচারের দাবি ছাড়াও বিভিন্ন অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদে রাজপথ কাঁপিয়ে তুলেছে এ সংগঠনের অকুতোভয় কর্মীরা। দীর্ঘ চার বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে এ সংগঠনের পথচলা। এ সংগঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সংগঠনটির মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের সঙ্গে কথা বলেন পরিবর্তন ডটকমের নিজস্ব প্রতিবেদক জিনাত জান কবীর। এই আলাপচারিতার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো পরিবর্তনের পাঠকদের জন্য।

আপনারা যে গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেছেন এর উদ্দেশ্য কী? আন্দোলন নাকি বিপ্লব? 

ইমরান এইচ সরকার : দুটোই বলতে হবে। কারণ এটার একটা ধারাবাহিক বিষয় ছিল যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবে, মুক্তিযুদ্ধের একটা আকাঙ্ক্ষা, অসাম্প্রদায়িক একটা বাংলাদেশ বিনির্মাণ হবে। এটাতো আজকের লড়াই না। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই লড়াইতে পরবর্তী কালে একটা স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বাধীনতা অর্জন, স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা, বাহাত্তরের সংবিধান, এবং সেই আদলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা। সেই আদলে বাংলাদেশ বিনির্মাণ না হওয়ার কারণে ২০১৩ সালে মানুষকে রাস্তায় আসতে হয়েছে, তাদের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে হয়েছে, তাদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের কথা বলতে হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলতে হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনের লড়াইটা অনেক পুরোনো, এটা একটা লড়াই এবং একটা আন্দোলন। সেই আন্দোলনের আরেকটা প্রতিফলন বা রূপ হচ্ছে শাহবাগের আন্দোলন বা গণজাগরণ মঞ্চ। সেই কারণে এটা একটা আন্দোলন।

ডাঃ ইমরান এইচ সরকারের পরিবর্তন ডট কমের একটি স্বাক্ষাৎকার উল্লেখ করা হলঃ

এটা একটা বিপ্লব যে, তরুণ প্রজন্ম যারা সচরাচর রাজপথে থাকে না, যারা সচরাচর আন্দোলন-সংগ্রাম করে না, যাদের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে, কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে। দেশ যখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চিন্তায় পরিচালিত হচ্ছিল তখন তারা বাংলাদেশকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য একটা বিদ্রোহ করেছে। পুরোনো আন্দোলন, পুরোনো ব্যবস্থার কারণে কিন্তু বিচার করা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা বিনির্মাণ করতে পারেনি বলেই পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে বিদ্রোহ করে রাস্তায় দাঁড়াতে হয়েছে। এবং আমরা কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়েই বলেছি, আঁতাতের যে রায় সেই রায় আমরা মানি না। পুরোনো বিচার ব্যবস্থায় জামায়াতসহ যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে একটা অলিখিত সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, সেটার সঙ্গে বিদ্রোহ করে তরুণরা রাজপথে নেমে এসেছে। বিদ্রোহ করেছে। পুরোনো যে সমঝোতা তা আমরা মানি না। আমরা ন্যায়বিচার চাই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে এবং ন্যায়ের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে।

আপনি বলছেন এর প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য আন্দোলন এবং বিপ্লবতাহলে আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী আর বিপ্লবের আদর্শ কী?

ইমরান এইচ সরকার : ন্যায়বিচারের মাধ্যমে একটা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে সকল মানুষ সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে বাঁচবে। সকল শ্রেণির মানুষের সমান অধিকার থাকবে।

এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা একটা ন্যায়ের বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলাম, এ দেশের মানুষ পুরোনো রাজনীতির নেতৃত্বকে অনাস্থা জানিয়েছে। সুতরাং বিপ্লবের আদর্শটা হলো তরুণ প্রজন্ম একটা সুন্দর বাংলাদেশ নির্মাণ করবে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে স্বাধীনতার পর ঝড় ওঠেতারপর স্তিমিত হয়ে যায়- এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

ইমরান এইচ সরকার : স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফেরেন তখনই কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সদস্য, নির্যাতিতরা রাস্তায় মিছিল করেন এবং তারা দাবি তোলেন যেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়। সেই বিচার প্রক্রিয়া শুরুও হয় এবং সেই বিচার প্রক্রিয়া এক সময় গিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। এক সময় বিচারের দাবিটা স্থবির হয়ে পড়ে। পরে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এ দাবিতে আন্দোলন করে বিচারের ইস্যুটা জনগণের সামনে নিয়ে আসেন। আবারও আন্দোলনের সূচনা হয়। সেটা ১৯৯২ সালে। শহীদ জননী মারা যাওয়ার পর সেই আন্দোলনও এক সময় স্তিমিত হয়ে পড়ে। সর্বোপরি, আন্দোলন-সংগ্রাম হলেও কিছু সময় আন্দোলন গতিশীল ছিল কিছু সময় স্তিমিত ছিল। বিচারের দাবির পর ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলেও বিচারটা জনগণ পাচ্ছিল না। আমরা না পাওয়ার প্রতিফলন দেখি ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লার রায়ের মধ্য দিয়ে। কেননা সেই রায়টা পুরোপুরি একটা মীমাংসিত বা আপসের রায় ছিল। সেই রায়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে সর্বোচ্চ দণ্ড পাওয়ার কথা, বিচারের রায়ে তা প্রতিফলন ঘটেনি। সুতরাং সেই রায় আমি মনে করি স্তিমিত জায়গা থেকে তরুণ প্রজন্ম যখন দেখল বিচার কররার যে প্রয়াস সেটা ভুল পথে চলে যাচ্ছে, তখন তরুণ প্রজন্ম সেই বিচারের যে আন্দোলন তার হাল ধরে রাজপথে লক্ষ লক্ষ জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করে জনতার সামনে তুলে ধরে।

অনেকে মনে করেন গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের ফলে বিচার ব্যবস্থায় এর প্রভাব ফেলেছেএ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন?

ইমরান এইচ সরকার : বিচার ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেনি। তবে ন্যায়বিচারের জন্য যে জনমত দরকার সেটা কিন্তু এ আন্দোলন তৈরি করেছে। দেখিয়েছে যে এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ যুদ্ধাপরাধ বিচারের পক্ষে রয়েছে। যুদ্ধাপরাধী যে গোষ্ঠী এবং তাদের দেশি-বিদেশি যে সমর্থক রয়েছে তারা নানাভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছিল যে যুদ্ধাপরাধের বিচার বেশির ভাগ জনগণ চায় না। শাহবাগের গণজাগরণের ফলে বিশ্বব্যাপী কোটি জনতা রাজপথে নেমে এলো, তখন আবারও এ দাবিটা প্রতিষ্ঠিত হলো যে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ চায়, যুদ্ধাপরাধীধের যেন উপযুক্ত শাস্তি হয়। সেই কারণে আইন সংস্কার করা সরকারের পক্ষে সহজ হলো। যে আইনে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল-সে আইন দুর্বল ছিল। রাষ্ট্রপক্ষের আপিল করার কোনো সুযোগ ছিল না। ত্রুটিযুক্ত পুরোনো আইন নিয়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। অপরাধীরা আপিল করার সুযোগ পাবে আর যারা ভিকটিম তারা আপিলের সুযোগ পাচ্ছে না। এই ব্যাপারটা আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। সামগ্রিকভাবে গণজাগরণ মানেই হচ্ছে মানুষের জাগরণ। মানুষের জাগরণ প্রমাণ করেছে যে, যুদ্ধাপরাধের বিচারের মধ্য দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক একটা বাংলাদেশ নির্মাণ করা বাংলাদেশের জনগণের দাবি, বাংলাদেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের দাবি। এ অন্দোলনের ফলে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পেরেছে।

গণজাগরণ আন্দোলনের পেছনে অনেকের ভূমিকা ছিলএখন অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছেএ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

ইমরান এইচ সরকার : গণজাগরণ মানেইতো সবার জাগরণ। সেখানে সবার ভূমিকা আছে। ছিল বলে কথা নেই। সেই ভূমিকা দেখানোর জন্য প্রতিদিন রাস্তায় বের হওয়া কি সম্ভব? বাংলাদেশের মানুষে যে, ইতিহাস বিনির্মাণ করেছে, সেটা সারা দুনিয়াতে নেই। ১৭ দিন টানা একটা দাবিতে রাজপথে থাকা কোনো আন্দোলনের ইতিহাসের নেই। ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস হচ্ছে ১০ দিনের। সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপ্লব। সেটা টানা ১০ দিন ছিল তারপর কিন্তু তারা আর থাকতে পারেনি। ১৭ দিন রাজপথে থেকে মানুষ প্রমাণ করেছে, দেশে কোন ধরনের অন্যায়-অবিচার হচ্ছে, তখন মানুষকে ডাক দেওয়া হচ্ছে-তখন কিন্তু মানুষ আবার রাজপথে চলে আসছে। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী যখন সারাদেশে তৈরি হয়েছিল ভয়ানকভাবে তখন লাখো জনতা আবার রাজপথে এসেছে, তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে, তার বিচারের দাবিতে আবারও যখন রাজপথে এলাম তখনও কিন্তু লাখো জনতা রাজপথে নেমে এসেছে। যখন সংকট তৈরি হয়েছে তখনই জনগণ রাজপথে এসেছে। এবং তারা প্রমাণ করেছে তাদের ন্যায্য দাবিতে তারা কখনো আপস করে না। আমি মনে করি সেটা স্তিমিত হয়নি, মানুষ ঘরে ফিরে গেছে। কারণ তাদের দাবি অনেকাংশে পূরণ হয়েছে, যেগুলো পূরণ হয়নি সেগুলো নিয়ে কোনোভাবে সংকট তৈরি হলে, কোনো অন্যায় আপস করলে প্রয়োজনে জনগণ আবারও রাস্তায় নেমে আসবে। তারা সেটা প্রমাণ করেছে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন করেছেন তা কি সফলতা অর্জন করেছে বলে মনে করেন?

ইমরান এইচ সরকার : এটাতো শুধু দাবির বিষয় না, এটা মানুষের ভেতরের জাগরণ, ভেতরের পরিবর্তন- সেটা আমরা বুঝতে পারি, অন্যায়- অবিচার হলে বাংলাদেশের তরুণরা যারা কোনো দিন মিছিল করেনি, তারাও রাজপথে নেমে আসে। যখন ব্যাংক থেকে ৮০০ কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেল তখন তরুণরা রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ করল, তনুকে যখন ধর্ষণ করে হত্যা করল, স্কুলছাত্রী রিশাকে যখন হত্যা করা হলো, যখন শিশু রাজনকে হত্যা করা হয়, তখন তরুণরা রাস্তায় এসে প্রতিবাদে, বিচারের দাবিতে রাস্তা কাঁপিয়ে দিয়েছে। কোনো রাজনীতিবিদ কিংবা কোনো সংগঠনের দরকার পড়ে না, জনগণ নেমে আসে। গণজাগরণ মঞ্চের অর্জন হচ্ছে এ জায়গাটা। বাংলাদেশের তরুণরা প্রতিবাদ করতে শিখেছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখেছে। এ অর্জনটা খাতা-কলমে কিংবা মাপকাঠিতে মাপা সম্ভব না। কিন্তু আমরা যদি খাতা-কলমে যাই, ৬ দফা দাবির দিকে তাকাই, সেটা কতটুকু পূরণ করা সম্ভব হয়েছে, অবশ্যই সেটা অনেকখানি সম্ভব হয়েছে। আমরা জানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত হচ্ছে, রায় কার্যকর হচ্ছে, জামায়াত নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া চলছে, তাদের আর্থিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ চলছে। আইন সংশোধনের যে দাবি ছিল সেসব কিন্তু পুরোপুরি পূরণ হয়ে গেছে। ৬ দফা দাবি অনেকখানি পূরণ হয়েছে। আবার আমাদের হতাশাও রয়েছে। একদিকে যেমন আমরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করছি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করছি আরেক দিকে আমরা দেখছি দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব, সারাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাসহ সাম্প্রদায়িকরণ। এটা কিন্তু আমাদের জন্য হতাশা, আশঙ্কা। আমরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চেয়েছি, সেই বাংলাদেশ এখন সাম্প্রদায়িক হচ্ছে। তার মানে এটা আমাদের বড় ব্যর্থতা। ২০১৩ সালের পর বাংলাদেশ তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। যেমন বাংলাদেশের হিন্দুদের এ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু তাদের প্রতিদিন যেতে হচ্ছে; সুতরাং এটা আমাদের একটা ব্যর্থতা ও হতাশা। কিন্তু আমরা অনেকখানি অর্জন করেছি। আমরা মনে করি আন্দোলনকে গতিশীল করতে পারলে নতুন করে আন্দোলনকে ঢেলে সাজাতে পারলে সেটাও হয়তো অর্জন করা সম্ভব।

সিলেবাসের অনেক পরিবর্তন হয়েছেবর্তমানের শিক্ষামন্ত্রী আপনার শ্বশুরএ কারণে অনেকেই মনে করেন শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আপনাকে আন্দোলন-সংগ্রামে আর দেখা যাচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও দেখা যাবে না-এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন

ইমরান এইচ সরকার : সম্পর্কটা এখানে বড় ব্যাপার নয়, ব্যাপারটা হচ্ছে গণজাগরণ মঞ্চ কখনো আন্দোলনে কারো সঙ্গে আপস করে না। গণজাগরণ মঞ্চের যে স্পিড সেই স্পিড নিয়ে সে কাজ করে যাচ্ছে। গণজাগরণ মঞ্চ মানে শুধুই একজন ইমরান এইচ সরকার না, আমার মতো হাজারো মানুষ আছে, লাখো মানুষ আছে, এখানে গণজারণ মঞ্চের আমিও একজন কর্মী। গণজাগরণ মঞ্চের সামগ্রিক বিষয়ে একটা ভাটা পড়েছে। মূলত শেষ তিন মাস যাবৎ আমাদের আন্দোলনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তারপরও আমাদের সাধারণ সভা হয়েছিল। সাধারণ সভা থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, পুরনো আন্দোলনকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাবো। এখানকার নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সামগ্রিক দাবি-দাওয়া এবং সামগ্রিকভাবে ৬ দফা দাবি গণজাগরণ মঞ্চের ২০১৩ সালের। তার বাইরে ১৪ সাল থেকে অন্যান্য দাবি, যেমন সমাজের অন্যায়–অনাচারের বিরুদ্ধেও আমরা দাঁড়িয়েছি। এগুলোকেও আমাদের দাবির মধ্যে সংযুক্ত করতে চাই। নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর কারণে আমরা একটু সময় নিচ্ছিলাম। ৫ তারিখে আমাদের গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সেখান থেকেই আমরা নতুন কর্মসূচি, নতুনভাবে ঘোষণা করব। সেখান থেকেই আন্দোলন গতিশীল হবে। কোনোভাবেই গণজাগরণ মঞ্চের চেতনার বিরুদ্ধে সরকার কিংবা অন্য কারো সিদ্ধান্ত নেয়, গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে যায় সেটাকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ ব্যাপারে গণজাগরণ মঞ্চ আপসহীন। যেভাবে আগেও ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে সরকারের পৃষ্ঠপোষক রয়েছে বলে অনেকে দাবি করেন এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী? 

ইমরান এইচ সরকার : গণজাগরণ মঞ্চ সরকারের পক্ষে কাজ করে এটা সাধারণ জনগণ কোনোদিন মনে করেনি। কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবির-জামায়াত ৫ ফেব্রয়ারি ২০১৩ সাল থেকেই মনে করে আসছে। যদিও গণজাগরণ মঞ্চ ৪ বছরে সরকারের কাছে সবচেয়ে নিপীড়িত গোষ্ঠী। ২০১৩ সালের পর এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমরা বাধাপ্রাপ্ত হইনি। ২০১৩ সালে লাখো জনতা ছিল তখন সরকারের পক্ষে বাধা দেওয়া সম্ভব ছিল না। কৌশলগত কারণে সরকার বাধা দেয়নি। গণজাগরণ মঞ্চের কারণে না। কিন্তু যখন আমরা চট্টগ্রাম যেতে চেয়েছি, তখন থেকেই সরকার আমাদের বাধা দিয়েছে। সরকার এমন কোনো প্রক্রিয়ায় নেই যে বাধা দেয়নি। নানাভাবে কর্মীদের হয়রানি করা, মামলা দেওয়া, টিয়ার শেল ছুড়ে দেওয়া, গরমপানি নিক্ষেপ করা, কর্মীদের টর্চার করা, কোনোটাই সরকার বাদ দেয়নি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ায় ব্যক্তি আক্রোশ থেকে এ ধরনের অপপ্রচার শুরু থেকে চালাচ্ছে। আমি মনে করি ১৬ সালেও তনু হত্যার আন্দোলন করলাম তখন সরকার আমাদের গৃহবন্দি করেছে। কেননা আর কোনো সংগঠন রাস্তায় দাঁড়িয়ে এভাবে প্রতিবাদ করেনি। অনেক রাজনৈতিক দল আছে যাদের গরম পানি নিক্ষেপ করলে সারা জীবনেও রাস্তায় বের হবে না। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চ সেটা করেনি। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা যখন গুলশান হাই-কমিশনার অফিস ঘেরাও করতে গেছে তার আগের দিন পুলিশ বেধড়ক পিটিয়েছে। এর পরদিন আবারও গেছে। পুলিশ আবারও পিটিয়েছে। কর্মীদের তো আগের দিনের পিটুনি খেয়ে ঘরে থাকার কথা ছিল। কারণ তারাতো জানে পরদিন গেলে পুলিশ মারবে। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা তারপরও আন্দোলনে নেমেছে। সরকার যতবারই থামানোর চেষ্টা করেছে গণজাগরণ মঞ্চ তত আপসহীনভাবে আন্দোলন চালিয়েছে। তারা রাস্তায় আরো স্বোচ্চার হয়েছে। হামলা-মামলা উপেক্ষা করে তারা আন্দোলন করেছে। গণজাগরণ মঞ্চ গণমানুষের শক্তি। গণজাগরণ মঞ্চের সবাই কর্মী। তাদের একজন মুখপাত্র আছে। যে সবার কথা বলে। সেও কিন্তু নেতা না। গণজাগরণ মঞ্চ একটা সংগঠন না হয়েও ৪ বছর ধরে মানুষকে নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন করছে। আমরা ৫০ জনও যখন মিছিল করেছি তখনো কিন্তু আমরা রাস্তা থেকে চলে যাইনি। রোদ-বৃষ্টি ঝড় উপেক্ষা করেই কিন্তু রাস্তায় চলেছি। গণজাগরণ মঞ্চ সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেই রাজপথে থাকবে।

তনু হত্যার বিচারে গণজাগরণ মঞ্চ সোচ্চার নয় বলে সাধারণ জনগণ মনে করেএ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

ইমরান এইচ সরকার : তনু হত্যার বিচারে গণজাগরণ মঞ্চের চেয়ে কে বেশি সোচ্চার হয়েছে? মাসের পর মাস প্রতিবাদ করেছি। তনু হত্যার পর যখন রিশাকে হত্যা করা হলো তখন আমরা প্রতিবাদ করেছি। নারী নিপীড়ন নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত প্রটেস্ট করেছি। তনু একটা সিমবোলিক নাম। যখন আমি রিশাকে নিয়ে প্রতিবাদ করছি তখন কি আমি তনুকে ভুলে গেছি। তনুর কথা আমি রিশার প্রতিবাদে বলছি না? ব্যাপারটা সামগ্রিক একটা প্রতিবাদ। যখন যাকে নিপীড়ন করা হচ্ছে, আক্রমণ করা হচ্ছে, যৌন নিপীড়ন হলে, শিক্ষার্থী হত্যার শিকার হলে আমরা সেটার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছি। যেখানে কেউ আন্দোলন করছে না, সেখানে গণজাগরণ মঞ্চ আন্দোলন-প্রতিবাদ করছে। কেউ অন্যায়ের শিকার হলে গণজাগরণ মঞ্চ তার পাশে দাঁড়াচ্ছে। গণজাগরণ মঞ্চের কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা। যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো কথা বলছে না, সে কারণে সাধারণ মানুষ গণজাগরণ মঞ্চের কাছে প্রত্যাশা করে। এ প্রত্যাশাকে আমরা অসম্মান করি না। আমরাও চাই মানুষ আমাদের কাছে প্রত্যাশা করুক। আমরা মানুষের পক্ষে কথা বলতে চাই। সীমাবদ্ধটাও মানুষকে বুঝতে হবে। একটা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পক্ষে চাইলেও সব কিছু একসঙ্গে পরিবর্তন করা সম্ভব না। পরিবর্তনটা ধীরে ধীরে হবে। সব জায়গায় গণজাগরণ মঞ্চের ব্যানারে প্রটেস্ট করা হয়নি। আমরা বলেছি, যে যে জায়গায় আছেন সেখান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আমরা কর্মসূচি দিয়েছি সারা দেশব্যাপী। আমরা তার জায়গা থেকে কাজ করতে বলেছি। সারাদেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সকলে দাঁড়িযেছে।

বিচার না হওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে বলে মনে করেন?

ইমরান এইচ সরকার : আমাদের যারা শাসক, যারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত, তারা জনগণের দাবি, জনগণের চাওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। রাজনৈতিক দলগুলো এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না- সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে জনগণের কাছাকাছি যাওয়া যায় সেটা রাজনৈতিক দলগুলো মনে করেন না। শুধু সাধারণ জনগণের পক্ষে দাবি আদায় করা কঠিন। রাজনৈতিক দলগুলো যে চাপ তৈরি করতে পারেন সাধারণ জনগণের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিগত বিষয়ের বাইরে বের হচ্ছে না। ক্ষমতায় থাকার জন্য এবং ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যও তারা জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। সিভিল সোসাইটিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন রাজনৈতিক দলগুলো। সাধারণ জনগণকে একত্রিত হয়ে সোচ্চার হয়ে উঠতে হবে। তাহলে সকল অধিকার আদায় করা সম্ভব। 

কথা উঠেছিল আপনার দাদা শান্তি কমিটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন- এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

ইমরান এইচ সরকার : আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। আমার দাদা যে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সেটা ১৬ কিংবা ১৭ সালে সার্টিফিকেট নেওয়া নয়। ৭২ সালে জাতির জনক দেশে ফিরে যেসব শহীদ পরিবারকে লিখিত স্বীকৃতি দেন। আমরা হলাম লিখিত শহীদ পরিবারের মধ্যে অন্যতম। প্রথম পর্যায়ে শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি দেওয়া পরিবার। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছি তখন ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করতে চেয়েছে কেউ কেউ। তখন তারা ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে না পেরে পারিবারিকভাবে আক্রমণ করেছে। এক ধরনের অপপ্রচার চালিয়েছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে।

অনেকেই মনে করেন গণজাগরণ মঞ্চ মিডিয়ার কল্যাণে ব্যাপকতা পেয়েছে, এ ব্যাপারে কী বলবেন? 

ইমরান এইচ সরকার : ২০১৩ সালে যখন আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়েছি তখন কিন্তু কোনো গণমাধ্যম ছিল না। যখন আমরা রাস্তা ব্লক করেছি তখনও কোনো গণমাধ্যম ছিল না। যখন রাস্তা ব্লক করে হাজারো মানুষের ঢল নেমেছে তখনই বিভিন্ন মিডিয়া গণজাগরণ মঞ্চের সামনে এসেছে। সুতরাং এটাও একটা অপপ্রচার। এ অপপ্রচারটা মৌলবাদীরা করে। ৫ কিংবা ৬ তারিখে তো লাইভ ব্রডকাস্ট করেনি। সমাজের কাছে নিজেদের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই অনেক গণমাধ্যমকর্মীও পেশাগত দায়িত্বের বাইরে এসে গণজাগরণ মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়েছেন, স্লোগান দিয়েছেন, গণজাগরণ মঞ্চেচের চেতনাকে ধারণ করেছেন। গণমাধ্যম সুনির্দিষ্টভাবে আলাদা করে কোনো ভূমিকা রেখেছে সেটা আমি বলব না।

আজকের ইমরান এইচ সরকার আর ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারির আগের ইমরান এইচ সরকারের মধ্যে তফাৎ কতটুকু? 

ইমরান এইচ সরকার : ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রয়ারির আগে ইমরান এইচ সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই ধারণ করতো কিন্তু সেটা সব মানুষ জানতো না। সাধারণ পেশাজীবী মানুষ ছিলাম। ঢাকা মেডিকেলে ডিউটি করতাম, আড্ডা দিতাম, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম। এখন যেমন সারাদেশের মানুষ চিনেছে, জেনেছে আবার আরেকদিকে দায়বদ্ধতাও অনেক বেড়েছে। আমি এখন আর সাধারণ জীবন-যাপন করতে পারি না। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারছি না। চেম্বার করবো, ডিউটি করবো সেটা পারছি না। এখন অনেক চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করতে হয়। স্বাভাবিক চলাফেরায়ও অনেক নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে পারছি না। আবার কথা বলার ক্ষেত্রেও অনেক চিন্তা ভাবনা করে বলতে হয়। একদিকে যেমন স্বাধীনতা হরণ হয়েছে আরেকদিকে দেশের মানুষের অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। একজন চিকিৎসক হিসেবে অনেক কিছু করতে পারতাম কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চের একজন কর্মী হিসেবে আমি অনেক গর্ববোধ করি। এগুলো যেমন সুখের কথা তেমনি আমার অনেক সহযোদ্ধাকে কিন্তু চোখের সামনে হারিয়েছি। যাদের সঙ্গে আমি স্লোগান দিয়েছি, তাদের লাশ বহন করতে হয়েছে। একে একে ২০ জনের লাশ বহন করাও কম কষ্টের কথা নয়। এ কষ্ট আমাকে বইতে হচ্ছে যা কোনো মানুষের পক্ষে সহজ নয়। 

নাদিয়া নন্দিতা ইসলামের সঙ্গে আপনার কীভাবে পরিচয় এবং পরিচয় থেকে কীভাবে পরিণয় ঘটে সে সম্পর্কে জানতে চাই 

ইমরান এইচ সরকার : গণজাগরণ মঞ্চের আগেই নাদিয়া নন্দিতার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। ঘনিষ্ঠ হয়েছে অনেক পরে। আমরা একসঙ্গে গণজাগরণ মঞ্চে কাজ করেছি। কাজ করতে করতে আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এভাবেই সুসম্পর্ক তৈরি হলো। আমরা একে-অপরকে পছন্দ করতাম এবং করি। আমাদের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া ছিল। কিন্তু বিয়েটা পারিবারিকভাবে হয়েছে।

আপনাদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা জানতে সাধারণ মানুষের অনেক কৌতূহল থাকেসেই কৌতূহলের জায়গা গণমাধ্যম পূরণ করার চেষ্টা করেকিন্তু গণমাধ্যমকে এড়িয়ে কেন বিয়ে করলেন, সে ব্যপারে জানতে চাই? 

ইমরান এইচ সরকার : আমরা এখনো অনুষ্ঠান করিনি। যখন অনুষ্ঠান করব তখন পরিকল্পনা ছিল সবাইকে আমরা জানাব। আমার সহযোদ্ধা, বন্ধু সবাইকে নিয়ে আমরা কাজ করি, সকলের প্রত্যাশা আছে, বিয়ে করলে নিশ্চয়ই আমরা সবাইকে জানাব। তারপরও তো জেনেছে সবাই।

গণজাগরণ মঞ্চে যখন কাজ শুরু করেন তখন আপনি অবিবাহিত ছিলেন কিন্তু আপনি এখন বিবাহিতএ পরিবর্তনের ফলে কী কাজের গতির পরিবর্তন হবে বলে মনে করেন? 

ইমরান এইচ সরকার : বিয়ের বাইরে আমরা কিন্তু সহযোদ্ধা। একই চেতনায় বিশ্বাস করি। দীর্ঘদিন যাবৎ একসঙ্গে আন্দোলন করি। পরিচয়টাও সেই সূত্র ধরেই। আমি মনে করি, কাজে কোনো ভাটা পড়বে না। বরং সহযোগিতাই পাব। আগেতো সার্বক্ষণিক পাওয়া যেত না। সহযোদ্ধাকে এখন সারাক্ষণ পাওয়া যাবে। কাজের ক্ষেত্রে পরামর্শ পাচ্ছি, সেক্ষেত্রে আন্দোলনকে গতিশীল করার জন্য সুবিধা হবে।

৫ ফেব্রুয়ারি আপনার নতুন একটা আউটলাইন দেবেন বলে শোনা যাচ্ছেএ আউটলাইন কী তা জনগণ জানতে চায়? 

ইমরান এইচ সরকার : বেলা ২টা থেকে কর্মসূচি শুরু হবে। সেখানে আলোচনা সভার মধ্যে সামগ্রিক সমস্যা তুলে আনা হবে। এ আন্দোলনকে গতিশীল করার জন্য আলোচনা এবং আলোচনা থেকে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি। এবং গণমানুষের দাবিকে গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে কাজ করব।

পরিবর্তন ডটকমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

ইমরান এইচ সরকার : আপনাকেও ধন্যবাদ।


যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন পাঁচ বছরে পা রাখছে। কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদ-ের রায়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহ্বানের মধ্য দিয়ে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর থেকে আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়, যা একপর্যায়ে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও মঞ্চের সমর্থনে পালিত হয় নানা কর্মসূচী। আগামী রবিবার চার বছরপূর্তি হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অহিংস এ গণআন্দোলনের। মঞ্চের চার বছরপূর্তিতে দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। শুক্রবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকার বলেন, গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন সে ইতিহাসেরই গর্বিত উত্তরাধিকার, যে ইতিহাস হাজার বছরের বাঙালীর হার না মানার দৃঢ় সংগ্রামের চিরন্তন ইতিহাস, যে ইতিহাস মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বের ইতিহাস। গণজাগরণ মঞ্চ যে মিলনের মোহনায় এনে দাঁড় করিয়েছে এ দেশের সর্বস্তরের মানুষকে, মুক্তির চিরন্তন আকাক্সক্ষার যে শপথে লাখ লাখ মানুষের শোণিতধারায় বাজিয়েছে যে মহাসঙ্গীত, সেই সঙ্গীতের সুরে বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়েছে ভূগোলকের এই ক্ষুদ্র অথচ আত্মমর্যাদায় সূর্যপ্রতিম এ জনপদটির দিকে।

তিনি বলেন, ইতিহাসের কলঙ্ক মোচনের আকাক্সক্ষার শাহবাগ মুক্তির চেতনার যে ফল্গুধারা বইয়ে দিয়েছে, তাতে অবশ্যম্ভাবীভাবে ধুয়ে যাবে পৃথিবীর ইতিহাসের নিকৃষ্টতম কিছু জীব, যারা ঘৃণ্যতম গণহত্যার খলনায়ক হিসেবে আমাদের জাতীয় লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কাদের মোল্লা থেকে শুরু করে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের ঔদ্ধত্যের জবাব দিয়েছে শাহবাগ, মুক্তিকামী বাঙালীর হাতে তুলে দিয়েছে বিজয়ের স্মারক। গণমানুষের ঐক্যের শক্তি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে দৃপ্ত শপথে এগিয়ে চলছে গণজাগরণ মঞ্চ।

চার বছরপূর্তির বার্তায় ইমরান এইচ সরকার বলেন, সকল মানুষের সমান অধিকার, সকল মত-পথের মানুষের মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার, বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ গড়ার পবিত্র প্রত্যয়ে প্রাণ দিয়েছেন এ দেশের ৩০ লাখ মুক্তিকামী মানুষ। সেই শত বছরের সোনার বাংলার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গণজাগরণ মঞ্চ তার আন্দোলন চালিয়ে যাবে। আর এ আন্দোলনের চালিকাশক্তি হচ্ছে এ দেশের সর্বস্তরের সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষ, যারা জন্মভূমির প্রয়োজনে প্রাণ দিয়েছে বারবার।

আমরা বর্তমানে এমন এক সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যখন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্তম্ভ অসাম্প্রদায়িকতার মূলে বারবার আঘাত করে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকীকরণের মাধ্যমে কলুষিত করা হচ্ছে শিক্ষাঙ্গন। অত্যন্ত সচেতনভাবে শিক্ষার্থীদের মনে মৌলবাদের বিষবাষ্প প্রবেশ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রশাসন এবং সরকারের প্রত্যেক স্তরে সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারের নীলনকশা বাস্তবায়িত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে প্রগতিশীল এবং মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে।

ইমরান বলেন, শিক্ষাঙ্গন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামোতে পাকিস্তানীকরণের এ অপতৎপরতার বিরুদ্ধে গণজাগরণ মঞ্চ সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের আরেকটি গৌরবময় মাইলফলক স্থাপিত হতে যাচ্ছে। এ আন্দোলনে যে তাজা প্রাণগুলো ঝরে গেছে, তাদের প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে আমরা আবারও মিলব গণজাগরণের মিলনমেলায়। যারা এ দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়ে গেছেন, তাদের রক্ত বৃথা যেতে না দেয়ার প্রত্যয়ে আমরা আরও একটিবার শপথের বজ্রমুষ্টি তুলে ধরব, যে বজ্রমুষ্টি একাত্তরের পরাজিত হায়েনাদের অন্তরে আবারও কাঁপন ধরাবে। ৫ ফেব্রুয়ারি আমরা আবারও মিলব সেই স্মৃতিময় প্রজন্ম চত্বরে। আমাদের মেলবন্ধনে ঘোষিত হবে সামনের বন্ধুর পথ অবলীলায় অতিক্রম করার অঙ্গীকার।

গণজাগরণ দিবস উপলক্ষে কর্মসূচী ॥ ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ‘রঙ তুলিতে স্বপ্নের বাংলাদেশ’ শীর্ষক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। বিকেল ৩টায় গণজাগরণ দিবসের র‌্যালি জাগরণযাত্রা, সাড়ে ৩টায় সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন, ‘উগ্র মৌলবাদ ও ৭২-এর সংবিধান : কোন পথে বাংলাদেশ?’ শীর্ষক আলোচনা সভা। এছাড়া সন্ধ্যা ৬টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াত-শিবিরমুক্ত মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার বৈষম্যহীন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।


৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, আর ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখের মধ্যে পার্থক্য অনেক। চার বছর আগের এ দিনে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে যে গণবিস্ফোরণের সূচনা হয়েছিল সেটা ছিল অভাবিত এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্যে প্রেরণাদায়ক।

যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়ের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা সে গণজাগরণ ও ফাঁসির দাবি কেবল ঢাকার শাহবাগকেই উত্তাল করেনি, উত্তাল করেছিল সারাদেশকে, আর বাংলাদেশি বাঙালিরা যে যেখানে আছে তাদেরকে। ওই গণজাগরণ মানুষের অন্তর্গত এক শক্তি যা ঠিক সময়ে বিস্ফোরিত হয়েছিল, দাবি আদায়ে নেমেছিল মাঠে; আর এর ফল নিয়েই ফিরেছে ঘরে। সারা দেশ কাঁপানো গণজাগরণ আন্দোলন-২০১৩ শুরু হয়নি কোন রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর হাত ধরে। কিন্তু এর মধ্যে ছিল এক প্রবল রাজনৈতিক চেতনা যা দেশকে ধারণ করে। অরাজনৈতিক মানুষের দেশপ্রেম, রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা দিয়ে এই আন্দোলন হুট করে রাস্তায় নেমে আসেনি। এর আগ থেকে বছরের পর বছর ধরে সাইবার বিশ্বে এ নিয়ে তুমুল আন্দোলন চলছে। অনলাইন বিশেষ করে ব্লগে এ নিয়ে অনেক আগে থেকেই লেখালেখি চলছে। অনেকেই করে চলছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা। এই লেখালেখি-গবেষণা করছে তারা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি কিন্তু অন্তরে ধারণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যার বীজ বপন করেছিলেন একজন জাহানারা ইমাম।

জাহানারা ইমাম নিজে কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। তিনি ছিলেন নির্দলীয় রাজনীতি সচেতন এক ব্যক্তিত্ব। ১৯৯২ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারি দল জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে তাদের আমীর নিয়োগ দেয় তখনই তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এক প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তুলেন। তাঁর এই আন্দোলনে যারা সহযাত্রী ছিলেন তাদের সবাই-ই ছিলেন স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। আন্দোলনের এক পর্যায়ে তিনি গণআদালত গঠন করেন এবং এই গণআদালতের রায়ে গোলাম আযমসহ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির আদেশ দেন এবং প্রতীকী ফাঁসি দেওয়া হয় দ্ধাপরাধীদের। জাহানারা ইমামের এই গণআদালত এবং ফাঁসির রায় যদিও ছিল প্রতীকী এক আয়োজন তবুও এই আন্দোলন এবং রায় সাড়া পড়ে সমাজের সর্বত্র। প্রবল বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশ থাকায় সে আন্দোলন আর এগুতে পারেনি এবং বিচারের মুখোমুখি হয়নি যুদ্ধাপরাধীরা।
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনিত ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবার পরও তার শাস্তি দেওয়া হয় যাবজ্জীবন। এটা অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয় ছিল দেশবাসীর কাছে। এই রায় হতাশার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়-কাদের মোল্লাকে যেখানে ‘কসাই’ নামে চিনতো একাত্তরের মিরপুর সেখানে তার শাস্তি কিভাবে হয় মাত্র যাবজ্জীবন? তাহলে কত লোককে হত্যা করলে ফাঁসির আদেশ হতে পারে? কত মা-বোনকে অসম্মান করলে শাস্তি হতে পারে মৃত্যুদণ্ড? নতুন প্রজন্ম মনে করেছে সুবিচার হয়নি এবং হয়ত ভিন্ন কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে এগুচ্ছে কেউ রাজনৈতিকভাবে। সে থেকে শুরু! ঢাকার শাহবাগে রাস্তায় নেমে আসে কয়েকজন অনলাইন এক্টিভিস্ট ও ব্লগার। তারা হাতে হাত ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যায় এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। আস্তে আস্তে এক সময়ে কয়েকজন মানুষের এই লাইন হয়ে যায় হাজার মানুষে। হাজার থেকে লক্ষ। ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র!

কসাই কাদেরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হবার পর সবাই অনুধাবন করতে পারে এ নিছক এক মস্করা হয়েছে জনমানুষের সঙ্গে, প্রতারণা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে এবং সম্ভ্রম হারানো আমাদের আত্মজদের সঙ্গে। তাই আমরা যারা অনলাইন এক্টিভিস্ট-ব্লগার এবং যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মনে-প্রাণে ধারণ করি তারা বসে থাকতে পারিনি। চেতনার ডাকে আমরাও সাড়া দিয়েছি স্ব স্ব অবস্থান থেকে। এখানে আমাদের কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং পরিচয় নেই-খুব সরল-সহজ অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নতুন প্রজন্ম। সিদ্ধান্ত নিই আমাদের কিছু একটা করতেই হবে।

কাদের মোল্লার রায়ের দিন সিলেটের প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মীদের আয়োজনে আমরা সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মিলিত হই। রাজাকারের ফাঁসিতে আনন্দ মিছিল হওয়ার কথাই ছিল যেমনটা আমরা করেছিলাম বাচ্চু রাজাকার ওরফে আবুল কালাম আযাদের রায়ের দিন। কিন্তু যখন রায় ঘোষণা করা হয় তখন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাই। তৎক্ষণাৎ এক প্রতিবাদ সভা হয়। বরাবরের মত কিছু বক্তা ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাদের বক্তৃতার মাধ্যমে। কেউ কেউ আবার স্বাভাবিকভাবেই খেয়াল রাখছিলেন প্রতিবাদী কোন কর্মসূচি যেন সরকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু না হয়!

বিক্ষুব্ধ, হতবিহবল এই উপস্থিতির মধ্যে অনেকেই তাৎক্ষণিক মিছিলের প্রস্তাব করেন। আমরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি। তবে এই আলোচনা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক স্বরে হচ্ছিল না। আমাদের নিজেদের অনলাইন অবস্থান, পরিচিত গণ্ডি এবং বিগত কিছু ইস্যুতে রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিলাম। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করি বিক্ষিপ্তভাবে। উপস্থিতির অনেকেই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে নিজ নিজ সার্কেলের সবার সঙ্গে আলোচনা করছিল। আমাদের বিক্ষুব্ধ একটা অংশ সিনিয়রদের সঙ্গে আলোচনা করতে যাই এবং প্রস্তাব করি প্রতিবাদী বিক্ষোভ মিছিলের। সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু জায়গা থেকে ”না, না” রব ওঠে। অনেকে আবার বলে ওঠেন মিছিল করে কী হবে? আমি, দেবু, বিনয়, একুশ, নাজিম, বাতিন, অসীম একমত হয়ে যাই মিছিল করতে। বিক্ষোভ সমাবেশের শেষ বক্তা যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন দেবু অসীমকে বলে বক্তব্য শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই কেউ যেন স্লোগান ধরে। আমাদের মধ্যকার কেউ স্লোগানে পারদর্শী কেউ ছিল না। অসীম-পাপলুকে গিয়ে বলে স্লোগান ধরতে। পাপলু বিক্ষোভ সমাবেশ শেষ হবার আগেই স্লোগান ধরে। শহীদ মিনারের ভেতরে থাকাদের কয়েকজন বাদে সবাই নেমে আসে রাস্তায়। সিলেটের রাজপথ কাঁপিয়ে মিছিলটি শহীদ মিনার থেকে শুরু করে কোর্ট পয়েন্ট হয়ে আবারও শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়। প্রাথমিক বিক্ষোভ আর প্রতিবাদ পর্বের সমাপ্তি টেনে সবাই চলে যায় স্ব-স্ব ঠিকানায়!

শহীদ মিনার থেকে ফিরে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ রাতে আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করি। ফেসবুক চ্যাটে একে অন্যের সঙ্গে নিজেদের ক্ষোভের কথা জানাই। ব্যক্তিগত স্ট্যাটাসে আমাদের অনেকেই তাদের প্রতিবাদী লেখনি অব্যাহত রাখে। টিভি চ্যানেল মাধ্যমে জানা যায় শাহবাগে লোক জড়ো হচ্ছে রায়ের প্রতিবাদে। আমাদের কেউ কেউ সে রাতেই সিলেট শহীদ মিনারে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তাব দেয় কিন্তু সে পথে রাতেই পা বাড়াই না।

ব্যক্তিগত আলাপচারিতা শেষে অনলাইনে বিস্তর আলোচনা করি। আমি, দেবাশীষ দেবু, বিনয় ভদ্র, রাজীব রাসেল, একুশ তাপাদার, আবদুল বাতিন, অসীম দাস, শুভ, পাপলু বাঙালি, ন. নাজিম, সৈয়দ রাসেল নিজেদের মধ্যে। আমাদের মধ্যকার গ্রুপ আলোচনা অব্যাহত ছিল বেশ কয়েকদিন ধরেই কারণ পাকিস্তানে ক্রিকেট দল পাঠাবার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদসহ বেশ কয়েকটি কর্মসূচি আমরা নিয়েছিলাম এভাবে ফেসবুকে আলোচনার মাধ্যমেই। এই গ্রুপ আলোচনা শুধু এই কর্মসূচির জন্যে কয়েকজনকে সংযুক্ত করেছিলাম যাতে করে বিভিন্ন মহলে এই কর্মসূচিকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। আমাদের ক্ষুব্ধ তারুণ্যদীপ্ত মন কোনক্রমেই মেনে নিতে পারছিল না এই রায়। সিদ্ধান্ত নিই কিছু একটা করতেই হবে। সে হিসেবে সিদ্ধান্ত হলো রাস্তায় অবস্থান নেব। এমন কর্মসূচি সবাইকে জানাতে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ফেসবুকে ইভেন্ট। বিনয় ভদ্র সঙ্গে সঙ্গেই ফেসবুকে ইভেন্ট প্রস্তুত করে ফেলেন। শুরু হলো ইনভাইট এবং একই সঙ্গে নিজেদের ক্ষোভের প্রকাশ। মানুষদের জড়ো করতে এবং ফেসবুকের বাইরের লোকদের জানাতে বিশেষ করে সিলেটের নাট্য, সংস্কৃতিকর্মী, সাহিত্যকর্মী এবং সর্বস্তরের ছাত্র-শিক্ষক-জনতাকে এই কর্মসূচি সম্পর্কে অবগত করতে। ফোনে, মোবাইল মেসেজে এ বার্তাটি পৌঁছে দিই শহীদ মিনারে আমরা প্রতিবাদী অবস্থান নেব। মুহূর্তেই সংবাদটি ছড়িয়ে যায়। সবাই যার যার অবস্থান থেকে স্ব স্ব উদ্যোগে একে অন্যকে জানাতে থাকে। আমি নিজেও একাধিক মেসেজ পেয়েছিলাম একাধিকজনের কাছ থেকেও।

রাতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি পরের সকালে আমাদের একটি টিম শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) যায়। সেখানে আমরা কথা বলি অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, শাবি শিক্ষক সমিতি, চোখ ফিল্ম সোসাইটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট শাবি শাখা এবং শাবির সর্বস্তরের শিক্ষক এবং ছাত্রদের সঙ্গে। আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শাবির ছাত্র-শিক্ষকেরা তাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচির (শাবিতে রায়ের প্রতিবাদে কর্মসূচি ছিল) পরিবর্তন করে আমাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। আমরা যখন শাবিতে যাই তখন সেখানে দেখি জাফর স্যারের নেতৃত্বে অগুনতি শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে স্লোগান আর জাগরণের গানের মাধ্যমে। জাফর স্যারকে যখন আমাদের অবস্থান কর্মসূচির কথা জানাই তখন তিনি বলেছিলেন- তোমরা ইয়াংম্যান তোমরাই বলো কী করতে হবে। আমি তোমাদের সঙ্গে আছি এবং যেভাবে বলবে সেভাবেই কাজ করবো। শাবিতে অবস্থান নেওয়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আমাদের পক্ষে বক্তব্য রাখে একুশ তপাদার। আমরা শাবি পরিবারের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম ভাস্কর্য নির্মাণের স্বপক্ষে কাজ করার সুবাদে এবং তারা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছিল রাজাকারদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া আর পূর্ববর্তী কিছু কর্মসূচির কারণেও।

আমাদের অন্যান্য টিমগুলো এম.সি কলেজ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি কলেজ, মদনমোহন কলেজ, নর্থ-ইস্ট মেডিকেল কলেজ, রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ, লিডিং ইউনিভার্সিটি, ওসমানী মেডিকেল কলেজসহ সিলেটের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করতে থাকে। সবাই একাত্ম হয় যে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় হতাশাজনক এবং মেনে নেবার মত না। তাই তারা সবাই নিজেদের মধ্যে সংঘটিত হয়ে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার আমন্ত্রণে সাড়া দেয় এবং মিছিল সহকারে উপস্থিত হবার নিশ্চয়তাও দেয়।

আমরা সিলেটের সর্বস্তরের নাট্য এবং সংস্কৃতিকর্মী ও গ্রুপদের আমন্ত্রণ জানাই যুদ্ধাপরাধী কসাই কাদের ওরফে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে রাস্তায় নামতে। তারাও প্রস্তুত ছিলো। আমন্ত্রণে সবাই নিজ উদ্যোগে নেমে পড়ে প্রচার-প্রচারণায়।
ফোনে-ফেসবুকে-মেসেজের মাধ্যমে একে অন্যকে জানাতে থাকে প্রতিবাদী অবস্থানের কথা। সিদ্ধান্ত নিই আমাদের এই কর্মসূচি যেহেতু জনমানুষের কথা বলছে, মানুষের মনের দাবিকে প্রতিনিধিত্ব করছে তাই এখানে কোনও ধরণের ব্যানার যা কোনও-না কোন সংগঠনকে প্রতিনিধিত্ব করে তা থাকবে না। এই আয়োজন হবে সর্বস্তরের জনসাধারণ যেখানে আছেন ছাত্র-শিক্ষক, পেশাজীবী, সংস্কৃতি- নাট্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষ। তাই খুব প্রথম থেকেই সচেতন থাকা যাতে করে জনসাধারণ নিজেদের প্রতিবাদটুকু জানাতে পারে অবলীলায়।

রায় ঘোষণার পরের দিন আমরা সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রতিবাদী অবস্থানের আয়োজন করি। সময় নির্ধারণ করি বিকেল তিনটা। কিন্তু ঘড়িতে তিন বাজার আগেই লোকে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুরো শহীদ মিনার এবং তার আশপাশকার রাস্তাগুলো। মনে হচ্ছিল যেন সিলেটের সবগুলো রাস্তা এসে শেষ হচ্ছে শহীদমিনারে। এই প্রতিবাদী অবস্থান এবং প্রতিবাদের গানের সঙ্গে চলে মুহুর্মুহু স্লোগান যা কসাই কাদের ওরফে কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নয়, ফাঁসির দাবিতে। সেই সঙ্গে বাকিসব যুদ্ধাপরাধী যাদের রায় এখনও আসেনি তাদের ফাঁসির দাবিতে।

সিলেটের সবগুলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক, নাট্য সংগঠন ছাত্র-শিক্ষক-জনতা নিজেরা নেমে আসে পথে। মুহুর্মুহু স্লোগান আর প্রতিবাদী সংগীত-স্লোগানে কাঁপতে থাকে সিলেটের শহীদমিনার এলাকা। প্রতিবাদী গণসংগীতে নেতৃত্ব দেয় প্রগতিশীল নাট্য-সংগঠন নগরনাট। একই দিন এবং পরে অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নেয়।

সিলেটের ইতিহাসে একটানা এমন দীর্ঘদিনের আন্দোলন কখনোই হয়নি। এটা সম্ভব হয়েছে সিলেটবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতার কারণে। এটা সম্ভব হয়েছে সর্বস্তরের ছাত্র-শিক্ষক, সংস্কৃতি ও নাট্যকর্মীদের কারণেই। এই আন্দোলনে কেউ নেতা হতে আসেনি। কাউকে নেতা বানানো হয়নি বলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। তাই একটানা আন্দোলনে কেউ বিরক্ত হয়নি বরং দ্বিগুণ উৎসাহে আবারো রাস্তায় নেমে স্লোগান, গণসংগীতে মাতিয়ে রেখেছিল পরিবেশ।

গণজাগরণের চার বছর পূর্তিতে জাগরণের অংশীদাররা কেউ ব্যক্তিগতভাবে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে চলে গেছে। তারুণ্যের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সে আন্দোলনে ভাটা পড়েছে ঠিক কিন্তু চেতনা রয়ে গেছে অবিনশ্বর হয়ে। এখন হয়ত কেউ আর সেভাবে মাঠে দাঁড়াচ্ছে না, কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি মানুষের যে ক্ষোভ আর বিচারের দাবি সেটা রয়ে গেছে।

শীর্ষ অনেক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হয়েছে, আরও অনেকের চূড়ান্ত বিচারের পথে। গণজাগরণ আন্দোলন যে দাবিতে শুরু হয়েছে, সেটা সফল হয়েছে। সে হিসেবে আন্দোলনকারীরা প্রকৃতই ফিরেছে ঘরে। কারণ মাঠের আন্দোলন ছাড়া এদের সুপ্ত ও পাহারাদার হিসেবে টিকে থাকা দরকার। এ আন্দোলনকারীদের যেখানে নেতানেত্রী হওয়ার বাসনা নেই, কিংবা ছিল না সেক্ষেত্রে মাঠে থাকার প্রয়োজনীয়তাও নেই মোটেও। যখনই দরকার তখনই নেমে আসবে পথে এমন অবস্থায় রাখা দরকার এ শক্তিকে।


একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ নতুন এক আন্দোলন শুরু করে। দিনটিকে জাগরণ দিবস হিসেবে পালন করে গণজাগরণ মঞ্চ। চতুর্থ বর্ষপূর্তিতে শাহবাগে র‌্যালির আয়োজন। রাজনীতিবিদ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘সারাদেশে যে ঢেউ ছড়িয়ে দিয়েছিল আজকে তার চেয়ে শক্তিশালী জাগরণ প্রয়োজন। কারণ এখন শুধু ’৭১ এর ঘাতকদের বিচারের প্রশ্নেই নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যার যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে সেখান থেকেও দেশকে উদ্ধার করতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন,‘ তরুণ প্রজন্মকে যদি বাংলাদেশের মুক্তির চেতনার মধ্যে রাখতে হয় তাহলে জাগরণের একটি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। আমার মনে হয় এখন পর্যন্ত জাগরণের এই প্রক্রিয়া উজ্জীবিত রেখেছে গণজাগরণ মঞ্চ।’ মঞ্চের মুখপাত্র ডাক্তার ইমরান এইচ সরকার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে সামনের দিনগুলোতে আরো সুসংহত আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

পরে চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি দাবিতে যে গণজাগরণ তা ছড়িয়ে পড়ুক সব ইস্যুতেঃ যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরেও তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি না দিয়ে ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দিয়েছিল, তারপরে যা হয়েছিল তা ইতিহাস। কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার পরেই তার ফাঁসির দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ চত্ত্বরে বসে পড়েছিলেন একদল তরুণ ব্লগার ও সাধারণ সাংস্কৃতিক কর্মী। ক্ষোভে-দ্রোহে তাদের দেয়া শ্লোগান ছড়িয়ে পড়েছিল রাজধানী থেকে সারাদেশে। জনস্রোত পরিণত হয় গণজাগরণে। কোনো সহিংস আন্দোলন ছিল না সেই গণজমায়েত। শান্তিপূর্ণ অবস্থানের মাধ্যমে তারুণ্যের ক্ষোভ ও জোরাল দাবি যে গোটা দেশকে বেঁধে ফেলতে পেরেছিল, সেটাই ছিল তারুণ্যের বড় অর্জন। যদিও এ জন্য প্রাণহানি আর অসংখ্য হামলাসহ নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয় মঞ্চের আদর্শ ও সাংগঠনিক কর্মসূচির সঙ্গে থাকা অনেককে। তারপরেও কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে জমায়েত হওয়ার পর থেকে প্রতিটি যুদ্ধাপরাধীর সর্ব্বোচ শাস্তির দাবি থেকে রায় কার্যকর হওয়া পর্যন্ত মাঠে থেকে জনতার শক্তির প্রকাশ ঘটছে সেই ২০১৩ সাল থেকেই। স্বাধীনতার ৪৫ বছরে নানা চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে বিভক্তি আর ঘৃণার রাজনীতির কারণে অনেকসময় দেশের প্রয়োজনেও আমরা এক হতে পারছি না। এই প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি আর দলেই বাইরে গিয়ে বৃহত্তর জনদাবি যে জাগরণে পরিণত হতে পারে তা ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বিভিন্ন রকম মূল্যায়ন থাকলেও, দেশের সমসাময়িক রাজনীতি আর বিভিন্ন প্রয়োজনে এধরণের একাত্বতা আমাদের বহুল প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। জনদাবির অংশ হিসেবে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচি ও জমায়েতের প্রতি সরকারের যে শ্রদ্ধা ও সমর্থন ছিল, তাও গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আমরা চাই, দেশের অন্যান্য গণদাবি ও আন্দোলনের প্রতিও গণজাগরণ মঞ্চের মতো সম্মান দেখাক সরকার, গণজাগরণ মঞ্চের মতো বিভিন্ন গণদাবি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরো এগিয়ে নিতে সাহায্য করুক।

জামায়াত নিষিদ্ধে গণজাগরণ মঞ্চের দাবি, আইনী প্রক্রিয়ায় সম্ভব বলেছে আওয়ামী লীগ

জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সব সংগঠনের রাজনীতি দ্রুত নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। জামায়াত নিষিদ্ধ করা সময়ের ব্যাপার উল্লেখ করে তা আইনী প্রক্রিয়ায় সম্ভব বলেছেন আওয়ামী লীগ নেতা এবং সরকারের মন্ত্রীরা।মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির প্রতিবাদে জামায়াতের হরতালের প্রতিবাদে শাহবাগে অবস্থান নেয় গণজাগরণ মঞ্চ। হরতালবিরোধী মিছিল করে তারা। সেখানে মঞ্চের মুখপাত্র জামায়াতের অর্থের সকল উৎস বন্ধের দাবি জানান।

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, মতিউর রহমান নিজামীর রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে জামায়াতের রাজনীতি করার অধিকার সাংগঠনিকভাবে সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গেছে। তাই সরকারের কাছে আহ্বান আর কোনো সময় নষ্ট না করে এই খুনিবাহিনী, একাত্তরের ঘাতকবাহিনী অবিলম্বে জামায়াত-শিশিবের রাজনীতি নিষিদ্ধ করুন। হরতালের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ ও মিছিল করেছে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন। সমাবেশে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, জামায়াত একটি সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধী দল, তাই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এবং যথাসময়েই আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে। এছাড়া সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ করা সংগঠন জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য গড়ে বিএনপিও অপরাধ করেছে।


০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, প্রথম আলোকে দেয়া স্বাক্ষাৎকারে ইমরান এইচ সরকার।
চার বছর পূর্ণ করল গণজাগরণ মঞ্চ। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে ব্লগারস অ্যান্ড অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্কের আহ্বানে আর সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে শাহবাগে এ আন্দোলন শুরু হয়। সংগঠনটির মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। মঞ্চের নানা দিক নিয়ে মুখপাত্রের সঙ্গে কথা বলেছেন মোছাব্বের হোসেন।

প্রথম আলো: গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের চার বছর হলো, কতটুকু সফল হয়েছে?
ইমরান এইচ সরকার: এখানে কাগজে-কলমে দাবি আদায়ের হিসাব করা কঠিন। এখানে দুই ধরনের সফলতা আছে। একটি হচ্ছে মানুষের কতটুকু জাগরণ হলো আর দ্বিতীয়টি হলো কাগজে-কলমে কতটুকু দাবি আদায় হলো। যদি প্রথমটি বলি, তাহলে বলব, অনেকটাই সফল হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ৪৫ বছর পরেও মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান একটি দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় ব্যর্থতা হলো মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় বৃত্তের বাইরে রাখা। সে ক্ষেত্রে গণজাগরণ মঞ্চ মুক্তিযুদ্ধকে ও এর স্লোগানগুলোকে দলীয় বৃত্তের বাইরে আনতে পেরেছিল। দ্বিতীয় হচ্ছে মানুষের চেতনার পরিবর্তন করা। এ ক্ষেত্রে গণজাগরণ মঞ্চের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে তরুণদের প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে। এখন দেখবেন, দেশের যেকোনো স্থানে কোনো অন্যায় সংগঠিত হলে তার প্রতিবাদ করতে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন পড়ে না। যেমন তনু হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশের তরুণেরা এই হত্যার প্রতিবাদে সারা দেশ অচল করে দিয়েছে। যে তরুণেরা কোনো রাজনৈতিক দলের না। তরুণেরা অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদে আপসহীন হয়ে গেছে। গণজাগরণ মঞ্চ তৈরির পর এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। যদি দাবির প্রশ্ন করি, তাহলে দেখবেন ছয় দফা দাবির অনেকগুলো পূরণ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের আইন সংশোধন হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় হয়েছে, রায় কার্যকর হয়েছে। বিচারকে গতিশীল করার দাবিও পূরণ হয়েছে। জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়টি অনেক এগিয়েছে। চার বছরে এতগুলো দাবি পূরণ হওয়াও একটি বিরাট সফলতা।
প্রথম আলো: ব্যর্থতার জায়গাটা কোথায়?
ইমরান এইচ সরকার: আমরা বেশ কিছু জায়গায় ব্যর্থ হয়েছি। একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করা হচ্ছে, মেয়েদের স্কুলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো মৌলবাদী, উগ্রবাদী দলগুলোর সঙ্গে আপস করছে। তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এটি একটি বিরাট ব্যর্থতা। আরও একটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির মূল উৎপাটন করা। বাংলাদেশের রাজনীতি বলতে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরন করা। মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে রাজনীতি করা। সেটা বিরোধী দল হোক বা সরকার হোক। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি।
প্রথম আলো: আপনি জানেন যে পাঠ্যবইয়ে এমন একটা পরিবর্তন এসেছে, যা গণজাগরণ মঞ্চের মূল চেতনার সঙ্গে যায় না। অনেকে বলছেন হেফাজতে ইসলামের দাবিকে মেনে নেওয়া হয়েছে। এটিকে কীভাবে দেখছেন?
ইমরান এইচ সরকার: যেটি করা হয়েছে, তা হেফাজতে ইসলামের দাবি মেনে নেওয়া নয় বা আপস করা নয়, বরং আমি বলব, সরকার হেফাজতে ইসলামের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং তাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সাংসদেরা বলেছিলেন, তাঁরা গণজাগরণ মঞ্চের ছয় দফা দাবি মেনে নেবেন। সেখান থেকে সরে গিয়ে সরকার এখন হেফাজতে ইসলামের সব দাবি অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করছেন। হেফাজতের ২৯টি দাবির দু-একটি না মানার কারণে যে বই ছাপা হয়েছিল, তা ঠিক করার জন্য কোটি কোটি টাকা গচ্চা দিয়ে বই বাতিল করে সরকার নতুনভাবে বই ছাপিয়েছে। কতটা আত্মসমর্পণ করেছে এতেই বোঝা যাচ্ছে। সরকারের এই বইয়ের পরিবর্তন ও সামগ্রিক সাম্প্রদায়িকীকরণ ও রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বিরোধী এবং মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনার বিরোধী। রাষ্ট্র এমন আচরণ করছে যে তারা মৌলবাদীদের পক্ষে ও তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে না। সেই লক্ষণ হিসেবেই কিন্তু বইয়ের এই পরিবর্তনগুলো এসেছে। গণজাগরণমঞ্চ এই চেতনার বিরুদ্ধে।
প্রথম আলো: সামনে কি চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
ইমরান এইচ সরকার: দেখবেন, যখনই মঞ্চ গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আন্দোলন করার চেষ্টা করে, তখন আমাদের আন্দোলনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধার চেষ্টা হয়। যেমন তনু হত্যার পর গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনকে দমানোর জন্য মঞ্চকে গৃহবন্দী করার চেষ্টা হয়েছে। এই চেষ্টাকে মোকাবিলা করে গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই মঞ্চের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী দিনেও আমরা সব রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে রাজপথে আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাব।

http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/1074749/সরকার-হেফাজতে-আত্মসমর্পণ-করেছে-ইমরান।


২০০৯ সালে নির্বাচনের পূর্বে খেলাফত মজলিসের সাথে আওয়ামী লীগের চুক্তি। সেখানেও ধর্মের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে বলে আওয়ামী লীগ প্রতিজ্ঞা করে।

হেফাজত ইসলাম ব্লগারদের লিস্ট জমা না দিলেও ১৯ এপ্রিল ২০১৪ সালে ব্লগারদের হত্যা ওয়াজীব ঘোষণা, ৮ এপ্রিল ২০১৬ তে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে মুমিনদের জিহাদ করার জন্যে প্রস্তুত হওয়ার ঘোষণা দিলেও সরকার হেফাজতের এসব বক্তব্যের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো ব্লগার হত্যার পর সরকার ও রাষ্ট্রের অঙ্গ-সংগঠনগুলো ব্লগারদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করার একটা চেষ্টা চালায়। এই ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী’ও বেশ এগিয়ে। ৩ জুলাই ২০১৫, লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় বলেছিলেন- ব্লগার হত্যায় সরকারের প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে। এছাড়া ব্লগার ও জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপন খুন হওয়ার পর তার পিতা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেনহত্যাকারীদের প্রতি আমার কোনও অভিযোগ নেইআমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই নাকেননা বিষয়টি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিকআমি জানি, বিচার চেয়ে কোনো প্রতিকার হবে না বিষয়টি স্পষ্ট সরকার ব্লগার হত্যাকারীদের ধরার জন্যে আন্তরিক নয়। উল্টো ব্লগারদের অপরাধী হিসেবে দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করে হীন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টায় লিপ্ত আছে। ৫৭ ধারা নামক কুখ্যাত আইন সংশোধন করে সামান্য ব্লগ পোস্ট কিংবা ফেসবুক পোস্টের কারণে ৭-১৪ বছরের জেল ও ১ কোটি টাকা জরিমানা শাস্তি হিসিবে কার্যকর করা হয়েছে। ফলে অনলাইনে শুধু ধর্ম নয় সরকারের সমালোচনা করার জায়গাটিও ছোট হয়ে গেছে। ব্লগার হত্যায় দিন শেষ ইসলামিক দলগুলো ও সরকারই লাভবান হচ্ছে। এছাড়া ব্লগারদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয় তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের পত্রিকা আমার দেশ। ১৫ মার্চ (২০১৩) খালেদা জিয়া বলেন-“শাহবাগে আন্দোলনকারীদের নাস্তিক, নষ্ট ও আওয়ামী ঘরানার।অবিলম্বে মঞ্চ-ফঞ্চ বন্ধ করুন।” তিনি আরো বলেন-“শাহবাগে এরা কারা? এরা নিরপেক্ষ নয়। এরা সব আওয়ামী ঘরানার আর নাস্তিক। যারা মুসলিম-হিন্দু-খ্রিস্টান কোনো ধর্মে বিশ্বাস করে না। নাস্তিকদের নিয়ে বিচার বিচার খেলা শুরু হয়েছে। এরা বিচার মানে না, আইন মানে না। রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে আন্দোলন করছে। তিনি আরো বলেন-মসজিদের গেট তালাবন্ধ করে শাহবাগিদের পাহারা দেবেন, এটা হতে পারে না।” ৪ মে (২০১৩) শাপলা চত্বরে ১৮-জোটের সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, “আর জেল-জুলুম , নবীর (সাঃ) অবমাননা সহ্য করব না।…(শেখ হাসিনার উদ্দেশ করে) তিনি সৌদি আরবে গেলে জোব্বা পরেন, তজবি টিপেন আর ভারতে গেলে তিলক আঁকেন। তাঁর বেশভূষার ঠিক নেই। তাঁকে বিশ্বাস করা যায় না।..পরেরদিন ছিল ৫ শে হেফাজতের সমাবেশ। তাই এর আগের দিন বেগম জিয়া ব্লগারদের বিরুদ্ধে উস্কানির সাথে সাথে সমাবেশে সাম্প্রদায়িক উস্কানিও দেন। জাতীয় পার্টির সাবেক স্বৈরাচার এরশাদ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা হেফাজতের পক্ষে অবস্থান নেয়। সুতরাং স্পষ্ট রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে ব্লগারদের বিরুদ্ধে মানুষকে উস্কিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে। পরোক্ষভাবে খুনিদের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছে।

সূত্র:বাংলা ট্রিবিউন ডট কম


মুক্তমনাদেরও দুষলেন আইজিপি
০৬ অগাস্ট, ২০১৬

জঙ্গিবাদের বিস্তারের কথা বলতে গিয়ে ধর্ম নিয়ে কথা বলাকেও দায়ী করেছেন পুলিশ প্রধান এ কে এম শহীদুল হক। তিনি শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “অতিরিক্ত মুক্তচিন্তা করতে গিয়ে ব্লগাররা আবার বিপদ ডেকে আনছে। “ব্লগাররা ধর্মকে-ইসলামকে তারা তাদের মুক্তচিন্তার বিষয় হিসেবে নিয়ে যেভাবে ধর্মের বিরুদ্ধে এবং নবীজীর বিরুদ্ধে কটূক্তি, কদাচার… যেগুলো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, পড়া যায় না, এগুলো তারা করছে।”একটি সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রেস ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক আইজিপি শহীদুল বলেন, “ব্লগাররা লেখনীর মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানছে, আর জঙ্গিরা মানুষ হত্যা করে সমাজের, রাষ্ট্রের, মানবতার ক্ষতি করছে।”

সূত্র-বাংলা বিডিনিউজ২৪.কম


মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়েছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদের। তিনি মুঠোফোনে বলেছিলেন, প্রিয় ছোট্ট ভাগ্নের জন্য সাইকেল কিনে রাত পোহালেই বৃহস্পতিবার বাড়ি আসবেন। এ খবরে ভাগ্নের খুশিতে বাড়ির সবার মধ্যেই ছিল অন্যরকম এক আনন্দ। কিন্তু মামার কাছ থেকে সাইকেল পাওয়ার অপেক্ষা আর ফুরাবে না ভাগ্নের, ঘাতকদের ধারালো অস্ত্র সে অপেক্ষার সমাপ্তি টেনে দিয়েছে নিদারুণভাবে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সামাদের পরিবারে এখন কান্নার সুর, বিষাদের ছাপ।
এই বিষণ্ন পরিবারের মতো অবস্থা প্রায় প্রতিটি নিহত ব্লগার পরিবারের। এ পরিবারের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। দুর্বৃত্তদের হাতে অকালে প্রাণ দিচ্ছেন মুক্তচিন্তার মানুষ। ঘটনার পর নিয়ম করে মামলা হচ্ছে, আটকও হচ্ছেন দু-চার জন সন্দেহভাজন। কিন্তু বিচার হচ্ছে না কোনো ঘটনারই। এসব মামলার অগ্রগতিসংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি বলছে, গত তিন বছরে সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন আটজন ব্লগার, যার মধ্যে গত ১৪ মাসে হত্যা করা হয়েছে ছয়জনকে। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি আহমেদ রাজীব হায়দারকে দিয়ে এ হত্যাকা-ের শুরু। আর গত বুধবার রাত ৯টার দিকে বাসায় ফেরার সময় ঢাকার সূত্রাপুরের একরামপুরে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় আইন বিভাগের সান্ধ্যকালীন বিভাগের ছাত্র ২৭ বছর বয়সী নাজিমুদ্দিন সামাদকে। খুনিরা এতটাই ভয়ঙ্কর— কখনো ছদ্মবেশে, কখনো দীর্ঘ সময় ধরে ওত পেতে থেকে, কখনো টার্গেটে থাকা ব্লগারের বাসার গেটের সামনে অস্ত্র নিয়ে বসে থাকে। বাসার সামনে, রাতে দিনে প্রকাশ্যে তারা খুন করে পালিয়ে যাচ্ছে। বাসার বেডরুমে ঢুকে খুন করেও তারা লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। আবার অফিসে ঢুকে খুনের পর বাইরে থেকে তালা মেরেও গাঢাকা দিচ্ছে খুনিরা। একের পর এক এমন নৃশংস খুনের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ব্লগাররা। মৃত্যু যেন তাদের তাড়া করে ফেরে প্রতিনিয়ত। এতে পাল্টে গেছে তাদের চলার রুটিন। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখেন সব সময়। ব্লগে লেখালেখি ও ঢাকার গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকায় তারা বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। এ মুহূর্তে আতঙ্কিত ব্লগার ও তাদের উদ্বিগ্ন স্বজনদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে এর পরের টার্গেট কে?
নিহত পরিবারদের অভিযোগ, এসব হত্যাকা-ের প্রতিটির জন্যই কোনো না কোনো ধর্মীয় ও মৌলবাদী সংগঠন দায় স্বীকার করেছে। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোই পুলিশের সন্দেহের তালিকায়। সরকার ও আইনশৃক্সখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বার বার ‘তদন্ত চলছে, আসামি ধরা পড়বে, বিচার হবে’ এমন বক্তব্যই আসছে। কিন্তু বাস্তবে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা আর নতুন খুনের ঘটনা একটি আরেকটিকে চাপা দিচ্ছে। ফলে কোনো ব্লগার হত্যার বিচারই এখনো আলোর মুখ দেখেনি বলা যায়। পুলিশ ও গোয়েন্দারা বলছেন, এসব খুনের সঙ্গে ধর্মান্ধ ইসলামী মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন জড়িত। অনেককেই গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি করা হয়েছে। যাদের এখনো গ্রেফতার করা যায়নি, তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
অভিজিৎ হত্যার তদন্তে নেই অগ্রগতি : গেল বছর ২৬ ফেব্র“য়ারি রাতে একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়কে, মারাত্মক আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা হয়। মামলার সন্দেহভাজন আসামি আটজন। হত্যাকা-ে জড়িত থাকার অভিযোগে ২ মার্চ যাত্রাবাড়ী থেকে শফিউর রহমান ওরফে ফারাবী নামের একজনকে গ্রেফতার করে ডিবিতে হস্তান্তর করে র‌্যাব। কিন্তু এ মামলার আর অগ্রগতি নেই। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের কেউই এখনো আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। পুলিশ জানিয়েছে, অভিজিত হত্যাকা-ের পর ঘটনাস্থল থেকে ১১টি আলামত এফবি আই নিয়ে যায় পরীক্ষার জন্য। তাদের ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট এখনো হাতে না পাওয়ায় অভিজিৎ হত্যার তদন্ত ধীরগতিতে চলছে।
দীপন হত্যার তদন্তে ভাটা : ৩১ অক্টোবর রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার ১৩২ নম্বর দোকানে জাগৃতি প্রকাশনার স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই দিনে তারা হত্যার চেষ্টা চালায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর মালিক টুটুল, লেখক রণদীপম বসু ও কবি তারেক রহিমকে। এসব ঘটনার মামলা তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই।
ওয়াশিকুর হত্যা বিচারের গতি শ্লথ : অভিজিৎ হত্যার এক মাসের মধ্যেই গত বছর ৩০ মার্চ রাজধানীর তেজগাঁওয়ে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে। ঘটনার পর পালানোর সময় কয়েকজন হিজড়া, স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ মিলে জিকরুল্লাহ ও আরিফুল ইসলাম নামের দুজনকে ধরে ফেলেন। এদের একজন পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ মামলায় পাঁচজনকে আসামি করে ১ সেপ্টেম্বর পুলিশ অভিযোগপত্র জমা দেয়। যাদের তিনজন বর্তমানে কারাগারে আটক, বাকি দুজন পলাতক রয়েছেন।
সিলেটের বিজয় হত্যা মামলার শুনানিই শুরু হয়নি : গত বছর ১২ মে সকালে সিলেটের সুবিদবাজারের নুরানি আবাসিক এলাকায় খুন হন ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ। এ ‘মুক্তমনা’ ব্লগার সিলেট থেকে প্রকাশিত বিজ্ঞানবিষয়ক একটি পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। ঘটনার দিন রাতে এলাকার বিমানবন্দর থানায় হত্যা মামলা হয়। সপ্তাহ তিনেক পর মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তর করা হয়। তদন্তে নেমে সিআইডি ইদ্রিস আলী নামের স্থানীয় এক ফটোসাংবাদিককে আটক করে রিমান্ডে নেয়। তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
চাপা পড়ছে নীলাদ্রি হত্যা মামলা : গত বছরের ৭ আগস্ট রাজধানীর খিলগাঁওয়ে খুন হন ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় ওরফে নিলয় নীল। এ মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে আটক চারজনের মধ্যে দুজনকে গত ২৭ আগস্ট পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি মামলাটির। যেন একের পর এক ব্লগার হত্যার ঘটনায় চাপা পড়েছে নিলয় হত্যা মামলা। তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বলেও জানান তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান।
বিচারাধীন আরও দুই মামলা : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আরিফ রহমান হত্যা ও ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন হত্যাচেষ্টা মামলায় করা দুটি মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। ২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরায় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। পরের পছর ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর মামলাটির অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। তার পর থেকে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন। একই বছরের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আরিফ রহমানকে হত্যা করা হয়। ২০১৪ সালের ১৬ মার্চ অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তিকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া মামলাটিও এখন আদালতে বিচারাধীন।
রাজীব হত্যার রায় প্রত্যাখ্যান : যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালের ফেব্র“য়ারিতে যখন উত্তাল শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ, ঠিক তখনই ১৫ ফেব্র“য়ারি দুর্বৃত্তের চাপাতির আঘাতে পল্লবীতে নিজ বাসার সামনে খুন হন আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মী আহমেদ রাজীব হায়দার। ব্লগে তিনি ‘থাবা বাবা’ নামে লিখতেন।
ব্লগার ও প্রকৌশলী রাজীবকে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করার কথা স্বীকার করে আসামিরা আদালতে জবানবন্দি দিলেও সব আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- দেওয়া হয়নি। এ কারণে রায় প্রত্যাখ্যান করেছে রাজীবের পরিবার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। ব্লগার হত্যাকা-ের মামলায় গত ৩১ ডিসেম্বর প্রথম রায় ঘোষণা করা হয়। নিহত রাজীবের বাবা বলেছেন, এ রায় প্রভাবিত। তিনি বলেন, ‘সব আসামি মিলে পরিকল্পনা করে হত্যা করেছে আমার ছেলেকে। প্রত্যেকের কেন ফাঁসি হবে না?’ মামলায় আট আসামির মধ্যে দুজনকে ফাঁসির দ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এক আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ- ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়েছে।
বিচারহীনতায় হতাশ স্বজনরা : ব্লগার বা মুক্তমনের লেখক হত্যার বিচারের এ দশা পরিবার ও স্বজনদের মাঝে হতাশাই ছড়াচ্ছে। যে কারণে প্রকাশক দীপন হত্যার পর তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছিলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না।’ এ একই কথা বলেছেন নিহত ব্লগার অভিজিতের স্ত্রীও। তিনি ব্লগে লিখেছেন, ‘দীপনের বাবার মতো আমিও বিচার চাই না।’
দেশত্যাগ : রাজীব, অভিজিৎ রায়, অনন্ত বিজয়, ওয়াশিকুর বাবুসহ ব্লগাররা একের পর এক খুনের পর দেশত্যাগ করতে শুরু করেন ব্লগাররা। জানা গেছে, এ পর্যন্ত ৩০ জনের বেশি ব্লগার দেশ ছেড়েছেন। তাদের মধ্যে ২০ জন যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেনসহ ইউরোপের দেশগুলোয় রয়েছেন। বাকিরা পাড়ি জমিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়। নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানান, অভিজিৎ রায়ের হত্যার পর শুরু হয় ব্লগারদের দেশছাড়ার প্রক্রিয়া। সুত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন


আনসারুল্লাহর হিটলিস্টে ৮৪ জন ব্লগার

প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০১৫

আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) হিটলিস্টে রয়েছে সরকারের কাছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের জমা দেয়া ৮৪ জন ব্লগার। এসব ব্লগারের বিরুদ্ধে রয়েছে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত একটি তালিকা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এবিটির প্রধান কারাবন্দি মুফতি জসিম উদ্দিন রাহমানী সব ধরনের কলকাঠি নাড়ছেন। আর এর সঙ্গে এবিটির ১৫ থেকে ২০ সদস্যের একটি অপারেশনাল টিম কাজ করছে, যারা রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে অপরাধ করে থাকে।

মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে ৮৪ ব্লগারের তালিকা ছিল তারা সবাই নয়টি ব্লগে লেখালেখি করতেন। এর মধ্যে ড. অভিজিৎ রায়ের মুক্তমনা ব্লগ তালিকায় তিন নম্বরে ছিল। অন্য ব্লগগুলো হচ্ছে সামহোয়ার ইন ব্লগ, আমার ব্লগ, নাগরিক ব্লগ, ধর্মকারী ব্লগ, নবযুগ ব্লগ, সচলায়তন ব্লগ, চুতরাপাতা ব্লগ ও মতিকণ্ঠ ব্লগ।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ ব্লগারদের তালিকা দেয় হেফাজতে ইসলাম। ওই বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের অন্যতম সদস্য ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনকেও ধর্ম নিয়ে কটূক্তির জন্য প্রাণ দিতে হয়। গত মাসের ২৬ ফেব্রুয়ারি মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানমনস্ক লেখক মার্কিন নাগরিক ড. অভিজিৎ রায়কে টিএসসির জনবহুল এলাকায় হত্যা করে উগ্রপন্থীরা। আর এ খুনে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখছে গোয়েন্দারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও জামায়াতকে নিষিদ্ধের দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের প্রতিবাদ মঞ্চ (গণজাগরণ মঞ্চ) তৈরি হয়। পরে এই আন্দোলনে যুক্ত হয় বিভিন্ন ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। শাহবাগে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর পর হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি ইসলামী সংগঠন মাঠে সক্রিয় হয়। তখন থেকে কিছু ব্লগারকে কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়।

গোয়েন্দাদের একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নতুন কৌশলে মাথা চাড়া দিয়েছে। এই উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্যরা ধর্ম অবমাননাকারী ব্লগারদের তালিকা হাতে নিয়ে তাদের হিটলিস্টে রেখেছে। এরা রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে নাশকতার চেষ্টা বা নাশকতা করে থাকে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে থাকা সেই ৮৪ ব্লগারের মধ্যে কয়েকজন এবিটির হত্যা তালিকার অন্যতম। এর মধ্যে অভিজিৎ তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল। তালিকায় থাকা ৮৪ ব্লগার হচ্ছে- আরিফুর রহমান, মনির হাসান, বৃত্তবন্ধি, সবাক, শয়তান, মনজুরুল হক, কখগ, রাসেল, নাস্তিকের ধর্মকতা, দূরের পাখি, আরিফুল হক তুইন, তিতি আনা, নাজিম উদ্দিন, আলমগীর কুমকুম, ফরহাদ উদদিন স্বপন, দুস্যবনহুর, ফারহানা আহমেদ, ঘনাদা, রাহান, অন্যকেউ, পাপী ০০৭, হোরাস, প্রশ্নোত্তর, ভালমানুষ, ভন্ডপীর, বৈকুণ্ঠ, সত্যান্বেষী, পড়ুয়া, হাল্ক (সানাউল), বিপ্লব ০০৭, রাস্তার ছেলে, ঘাতক, বিশাল বিডি, সাহোশি ৬, লাইট হাউজ, মমতা জাহান, রাতমজুর, কৌশিক, মেঘদূত, স্বপ্নকথক, প্রায়পাস, আহমেদ মোস্তফা কামাল, লুকার, নুহান, সোজাকথা, ট্রানজিস্টার, দিওয়ান, রিসাত, আমি এবং আধার, অরন্যদেব, কেল্টুদা, আমি রোধের ছেলে, ভিন্নচিন্তা, আউটসাইডার, প্রণব আচার‌্যা, আসিফ মহিউদ্দিন, আবুল কাশেম, আলমগীর হোসেন, অন্যআজাদ, অনন্ত বিজয় দাস, আশীষ চ্যাটানজি, অভিজিত রায়, বিপ্লব কান্তি দে, দাঁড়িপাল্লা ধমা ধম (নিতাই ভট্টাচার্য), ইব্রাহীম খলিল সবাগ, (সুমন সওদাগর) কৈশীক, আহমেদ, নুরনবী দুলাল, পারভেজ আলম, রাজিব হায়দার শোভন (থাবাবাবা), রতন (সন্যাসী), সৈকত চৌধুরী, শর্মী আমিন, সৌমিত্র মজুমদার (সৌম্য), আল্লামা শয়তান (বিপ্লব), শুভজিদ ভৌমিক, সুমিত চৌধুরী, সৈকত বড়ুয়া, সুব্রত শুভ ও সুসান্ত দাস গুপ্ত, সৈয়দ কামরান মির্জা, তাহসিন, তন্ময় এবং তালুকদার ও জোবায়েন সন্ধি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে উগ্রপন্থীরা নাশকতার চেষ্টা করে থাকে। বিশেষ কী ধরনের অপরাধ করলে তা প্রচার পাবে সে কৌশলও নেয় উগ্রপন্থীরা। তিনি বলেন, যারা ব্লগে কটূক্তিমূলক লেখা পোস্ট করে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার বিধান আছে। গোয়েন্দা পুলিশ অতীতেও এ ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় এনেছে। এখনও তাদের পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি) শেখ নাজমুল আলম যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন সময় গোয়েন্দা পুলিশ বেশ কয়েকজন ব্লগারকে সতর্ক করে। পাশাপাশি ওই তালিকায় থাকা পাঁচ ব্লগারকে গ্রেফতারও করা হয়। কটূক্তির অভিযোগে তাদের গ্রেফতারের পর এ ধরনের লেখা পোস্ট না করতেও বলা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিজিৎ রায় খুনের পর সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে গোয়েন্দাদের কিছু ব্লগ নজরদারির নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এমনকি উপযুক্ত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এসব ব্লগারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি অভিযান চালাতেও বলা হয়েছে গোয়েন্দাদের।

সুত্রঃ http://www.jugantor.com/old/news/2015/03/07/230871


২৯ মাসে ১০ ব্লগার হত্যা, কিনারা হয়নি একটিরও

একের পর এক হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে ব্লগার। গত ২৯ মাসে এই হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা দশে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ আজ রাজধানীর গোড়ানে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ব্লগার নিলয় চ্যাটার্জি।
এসব হত্যাকাণ্ডের কোন ক্লু খুঁজে পায় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশের আশ্বাস বাণীতেই সীমাবদ্ধ থাকে এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য। হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারের আক্ষেপ- ঘাতকরা কি এতটাই শক্তিশালি যে এর কোনো হদিসই পায় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (মিডিয়া) মুনতাসিরুল আলম বলেন, ব্লগার নিলয় চ্যাটার্জি নীলের হত্যার ঘটনা ফৌজদারি অপরাধ। এটা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সকল হত্যাকাণ্ডই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করি। অনেকটাতে দ্রুত সফল হই। অনেক ঘটনার রহস্য উন্মোচনে সময় লাগে। তবে আপনাদের সাদা চোখে এগুলোর ফলাফল দেখা না গেলেও সকল হত্যাকাণ্ডেরই জট খুলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
গত ২৯ মাসে প্রকাশ্যে ও গোপনে ১০ জন ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক বা টুইটারে হত্যাকারীরা হত্যার দায় স্বীকার করে স্ট্যাটাসও দিয়েছে। এসব স্ট্যাটাসে প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে ইসলাম ধর্মকে নিয়ে কটূক্তি অথবা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনার অভিযোগ দেখানো হয়েছে।
ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত যে কয়েকজনকে আটক করা গেছে তাদের বেশিরভাগের সঙ্গে কোনো না কোনো জঙ্গি সংগঠনের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগে মুক্তচিন্তার লেখক ও ব্লগারসহ নতুন প্রজন্মের তরুণরা গণজোয়ার গড়ে তোলেন। সেই আন্দোলনকে প্রতিহত করতে প্রথম আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামের একটি সংগঠন ‘হিট লিস্ট’ শিরোনামে ৮৪ জন ব্লগার ও আন্দোলনকারীর তালিকা প্রকাশ করে।
তালিকায় নাম প্রকাশের বিষয়ে বলা হয়েছিল ‘এরা সবাই ইসলামের দুশমন।’ ব্লগার এবং আন্দোলনকারীদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছিল, এরা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)- কে কটূক্তি করে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। তালিকা অনুযায়ী একে একে ব্লগারদের হত্যা করা হবে বলে হুমকিও দেওয়া হয়।
৮৪ জনের তালিকায় প্রথম ১০ জনের মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, আসিফ মহিউদ্দিন, অভিজিৎ রায়, আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন, মারুফ রসুল, আরিফ জেবতিক, ইব্রাহীম খলিল, আরিফুর রহমান, অনন্য আজাদ, মাহামুদুল হক মুন্সি বাঁধনের নাম শীর্ষে ছিল।
২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট পর্যন্ত গণজাগরণ মঞ্চেরকর্মী ব্লগার নিলয় নীলসহ ১০জন ব্লগার নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। ইতোপূর্বে ৯ ব্লগার হত্যার কোনো ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে সবধরনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে জানায় পুলিশ।
সর্বশেষ খুনের শিকার হন গণজাগরণ মঞ্চেরকর্মী, ব্লগার নিলয় নীল। মুক্তমনা ব্লগার হওয়ায় একাধিকবার তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এজন্য তিনি থানায় সাধারণ ডায়রি করতে গেলে পুলিশ তা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মুনতাসিরুল আলম বলেন, ‘এ বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
নিলয় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুস্তাফিজ ভূঁইয়া বলেন, খিলগাঁও গোড়ানের একটি বাড়ির পঞ্চম তলার বাসায় স্ত্রী ও বোনকে নিয়ে থাকতেন নিলয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কয়েকজন যুবক বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে ওই বাড়িতে ঢুকে পড়েন। তাঁরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিলয়কে আঘাত করতে থাকেন। ঘটনাস্থলেই নিলয় মারা যান। পরে যুবকেরা পালিয়ে যান। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
মৌলবাদীরা টার্গেট করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে তার সহযোগীরা দাবি করেন। এ ব্যাপারে গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, নিলয় গণজাগরণ মঞ্চের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনি ব্লগে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখি করতেন।
গত ১২ মে সিলেটের সুবিদবাজার এলাকায় মুক্তমনার ব্লগার ও সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক অনন্ত বিজয় দাশকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার দিনগত রাতে নিহতের বড়ভাই রত্নেশ্বর দাশ অজ্ঞাতনামা চারজনকে আসামি করে বিমান বন্দর থানায় মামলা করেন।
গত ৩০ মার্চ সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বেগুনবাড়ি দিপীকার ঢাল এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে অফিসে যাওয়ার পথে ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে ফেরার পথে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিজ্ঞানমনষ্ক লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ব্লগার ‍অভিজিৎ রায়কে টিএসসি এলাকায় কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। ওই দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিজিৎ। তিনি মুক্তমনা ব্লগ চালাতেন।
২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কবি নজরুল ইসলাম হলে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপকে। ২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি অগ্রণী ব্যাংকের কর্মী ও ব্লগার জাফর মুন্সিকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে এবং পিটিয়ে  হত্যা করা হয়।
২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তা ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনকে বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর পল্লবীর কালশীর পলাশনগরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্লগার মামুন হোসেন, ২ মার্চ ব্লগার জগৎজ্যোতি তালুকদার ও ব্লগার জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে হত্যা করা হয়।

সুত্রঃ http://www.famousnews24.com/bangladesh/articles/22885/২৯_মাসে_১০_ব্লগার_হত্যা_কিনারা_হয়নি_একটিরও


ব্লগার হত্যা ও হিট লিস্টে উদ্বেগ

৮ নভেম্বর, ২০১৫

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ব্লগার হত্যাকান্ড এখন বাংলাদেশে সবচাইতে আলোচিত ঘটনা। একের পর এক ব্লগারদের খুন করা হচ্ছে ধর্মের দৃষ্টিকোন থেকে বেরিয়ে এসে দ্বিতীয় মত প্রকাশের কারনে, যা এই দেশটির আইন শৃংখলা পরিস্থিতিতেকে আরো বেশী ঘোলাটে করে তুলেছে। ২০১৩ সালের ১৫-ই ফেব্রুয়ারী শাহবাগ মুভমেন্টের সময় ব্লগার রাজীব হায়দার যিনি ব্লগে থাবা বাবা নামে পরিচিত ছিলেন তাঁকে খুন করবার মধ্যে দিয়ে এই বীভৎস প্যাটার্নে খুনের বিস্তার লাভ করে। পরবর্তীতে আমেরিকান নাগরিক ও লেখক ডক্টর অভিজিৎ রায়কে একুশে ফেব্রুয়ারীর বই মেলার কাছাকাছি স্থানে প্রকাশ্যে কুপিয়ে সন্ত্রাসীরা চলে যায়। এই ঘটনায় মারাত্নক জখম হন তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা।

অভিজিৎ রায়ের খুনের কিছুদিন পর পরই ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে ৩০ শে মার্চ তাঁর বাড়ীর সামনেই কুপিয়ে হত্যা করা হয় একই কায়দায় যদিও সে ঘটনায় দুইজনকে সেই ঘটনাস্থল থেকেই গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনার এক মাস না যেতেই ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে তার বাসার সামনে কুপিয়ে হত্যা করে। পরবর্তীতে ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নীলকে তার ঘরে ঢুকে হত্যা করে ইসলামি মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা।

এইসব ঘটনার রেশ না যেতেই সাম্প্রতিক সময়ে গত ৩১ শে অক্টোবর অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক আরেফিন দীপনকে তার কার্যালয়ে ঢুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একই দিনে আরেক প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলকে, কবি তারেক রহিম ও লেখক ও ব্লগার রণদীপম বসুকে ঢাকাস্থ লালমাটিয়ার কার্যালয়ে চাপাতি দিয়ে নির্মম ভাবে কোপানো হয়। উল্লেখ্য যে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া প্রকাশক ও ব্লগার আহমেদুর রশীদ টুটুল ছিলেন শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কর্ণধার। আহত বাকী দুইজনই সচলায়তন ব্লগের ব্লগার হিসেবে অনলাইনে লেখালিখি করতেন।

যাদের যাদের খুন করা হয়েছে তাদের প্রত্যেকেই ছিলেন মুক্তমনা এবং ব্লগার কিংবা লেখক। বাংলাদেশে বাক স্বাধীনতার উপর এই রকমের আঘাত এই দেশটির স্বাধীনতার পর লেখালেখির ও মত প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

অত্যন্ত উদ্বেগের কথা হচ্ছে এই খুনগুলো করা হচ্ছে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের নাম দিয়ে প্রকাশ্যে অনলাইন ও অন্যান্য জাতীয় দৈনিকগুলোতে চিঠি পত্র দেবার মাধ্যমে। দৈনিক প্রথম আলো ও বিডি নিউজের মাধ্যমে জানা যায় এরই মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামক এই নিষিদ্দগ দলটি নতুন করে আরো ১৫ জনের নামে হিট লিস্ট করেছে যারা সকলেই বাংলা ভাষাভাষী এবং দেশ ও দেশের বাইরী অবস্থান করছেন। এই নামগুলোর মধ্যে আনসারুল্লাহ প্রখ্যাত ও পরিচিত ব্লগারদের নাম উল্লেখপূর্বক তাদের যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই হত্যার হুমকি দিয়েছে।

এইসব নামগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন, ব্লগার আরিফুর রহমান, অমি রহমান পিয়াল, মোঃ শরিফুল ইসলাম, তানিয়া ইসলাম চৌধুরী, জিয়াউল হক, রাসেল পারভেজ, শুব্রত শুভ, জুলিয়াস সিজার, ওমর ফারুক লুক্স, মোঃ আব্দুর রহমান, ইমরান এইচ সরকার, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, তসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার,রুজভেল্ট হালদার, নুরুন নবী, তুরিন আফরোজ, শাম্মী হক প্রমুখ এর নাম।

এই প্রসঙ্গে, বাংলাদেশে থাকা ব্লগার অমি রহমানের পিয়ালের সাথে কথা বলে যানা যায় যে এই ধরনের হত্যার হুমকি তিনি নানান সময়েই পেয়ে আসছেন এবং এটা তার জন্য নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ সরকার তার জন্য একজন গানম্যান নিয়োগ দিয়েছেন এবং সব সময় আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তাঁর খোঁজ রাখছেন।

বাংলাদেশ পুলিশের মহা পরিচালক বেনজীর আহমদের সাথে এই বিষয়ে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন পুলিশ এই ধরনের হত্যাকান্ডে যথাযথ যা ব্যাবস্থা নেবার তা নিচ্ছে ও নেবে। ধর্মীয় মৌলবাদীদের স্থান বাংলাদেশে হবে না। তিনি বাংলাদেশে আই এস আছে কিনা এই প্রসঙ্গে কোন মন্তব্য করবেন না বলে আমাদের প্রতিবেদককে জানান।

বাংলাদেশের এই চরমম অস্থিতিশীল মুহুর্তে বাংলাদেশের ব্লগারদের সংগঠন BOAN মনে করে সরকারকে আরো বেশী যত্নশীল হতে হবে এই ধরনের অপরাধকে কমাতে এবং এর জন্য চাই দুরত বিচার ট্রাইবুনালে অপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করা। সুত্রঃ http://bangladeshchapter.com/country/9490


বাংলাদেশে উগ্রপন্থিদের হামলার শিকার মানুষের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে

মানবজমিন ডেস্ক | ১ মে ২০১৬, রবিবার |

বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রপন্থিদের হামলার শিকার হয়েছেন এমন মানুষের তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার, শিক্ষাবিদ, এলজিবিটি কর্মী, শিয়া, সুফি আহমাদিয়া মুসলিম, খ্রিস্টান ও হিন্দু সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগকেই কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। টাঙ্গাইলে নিখিল জোয়ারদার নামে একজন দর্জিকে গতকাল কুপিয়ে হত্যার পর এসব কথা লিখেছে অনলাইন বিবিসি।  এতে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসরকে হত্যা করা হয়েছে। তার পরিবার বলছে, তিনি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করতেন। তাকে হত্যার ঘটনায় এটা পরিষ্কার যে, যারা এমন হত্যার ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় আছেন তার ক্রমশ বিস্তার ঘটেছে। এসব হামলার নেপথ্যে কে বা কারা তা রয়েছে অস্পষ্ট। বাংলাদেশে রয়েছে অনেক উগ্রপন্থি গ্রুপ। এসব হামলায় খুব কমই শাস্তি দেয়া হয়েছে। হামলার দায় স্বীকার করেছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আল কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলো। কিন্তু দায় স্বীকার নিয়ে আপত্তি আছে বাংলাদেশের। এর পরিবর্তে দেশটি এসব হত্যার জন্য বিরোধী দল ও স্থানীয় ইসলামি গ্রুপগুলোকে দায়ী করেছে। কিন্তু হত্যাকা- বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সরকারকে অভিযোগ মোকাবিলা করতে হবে যে, তারা সংখ্যালঘুদের রক্ষায় যথেষ্ট করছে না।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, টাঙ্গাইলে হিন্দু একজন দর্জি নিখিল জোয়ারদারকে গতকাল তার দোকানের বাইরে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামী উগ্রপন্থিরা যেসব হামলা চালাচ্ছে তিনি তার সর্বশেষ শিকার। পুলিশ বলছে, তিনি ইসলাম সম্পর্কে এর আগে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন বলে ২০১২ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। গতকাল বিকেলে তাকে হত্যার পর ইসলামিক স্টেট এর দায় স্বীকার করেছে। তবে কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব হত্যাকা-  হয়েছে তার দায় স্বীকার করেছে কতগুলো ইসলামী উগ্রপন্থি গ্রুপ। এর আগে দেশের একমাত্র এলজিবিটি বিষয়ক ম্যাগাজিনের একজন সম্পাদক জুলহাজ মান্নানকে ও তার এক বন্ধুকে তার ঢাকার বাসায় হত্যা করা হয়েছে।  আল কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন বাংলাদেশী উগ্রপন্থি গ্রুপ আনসার আল ইসলাম এ হত্যার দায় স্বীকার করেছে। চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গত বছর হত্যা করা হয়েছে চারজন ব্লগারকে। ‘নাস্তিক ব্লগারের’ ৮৪ জনের হিটলিস্টে তাদের নাম ছিল। এ তালিকা ২০১৩ সালে ইসলামি গ্রুপগুলো প্রচার করেছিল।

সুত্রঃ http://mzamin.com/article.php?mzamin=12230


১৯ জনের তালিকা পাঠিয়ে হত্যার হুমকি

সৌজন্যে,  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম 2015-08-12

সরকারের মন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী, গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও ব্লগারসহ ১৯ জনকে হত্যার হুমকি দিয়ে ‘ইত্তেহাদুল মুজাহিদিন’ নামের এক কথিত সংগঠনের নামে সংবাদপত্র কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কার্যালয়ে আসা ওই চিঠি বা খামে সংগঠনটির কোনো পরিচয় বা ঠিকানা দেওয়া হয়নি। তবে খামের ওপর সিলেট পোস্ট অফিসের সিল ও ১০ অগাস্টের তারিখ রয়েছে। ২০ জনের নামের তালিকার প্রথমেই থাকা নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নামটি লাল কালি দিয়ে কাটা।

এরপর ধারাবাহিকভাবে ব্লগার আরিফ জেবতিক, সুশান্ত দাশ গুপ্ত, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাফর ইকবাল, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, আব্দুর রহমান, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মকবুল হোসেন ও সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম দেওয়া হয়েছে।

তালিকায় এরপর রয়েছে ব্লগার আরিফুর রহমান, অমি রহমান পিয়াল, হুমায়ুন আজাদের ছেলে অনন্য আজাদ, গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক মাহমুদুল হক মুন্সি, মারুফ রসুল, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আরাফাত রহমান, ব্লগার নির্ঝর মজুমদার, ড. আতিক, আশফাক আনুপ ও নূর নবী দুলালের নাম।

এরপর লেখা হয়েছে- “মরন একদিন হবেই বন্ধু, আজ নয়তো কাল/খোদার লাগি খোদার দুশমনের লইবো তাহার প্রাণ…/

“নবীর অপমানে কাদে না তোমার মন!/ কি তোমার পেহচান?

“মরন একদিন হবেই বন্ধু…/লও জালিমের জান…”

যাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে, চিঠির শুরুতে তাদের আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘ইসলাম ও মাদ্রাসা শিক্ষার দুশমন, নাস্তিক, সিলেটবিদ্বেষী, সিলেটের কলঙ্ক, স্যাটানিক ব্লগার হিন্দুস্তানি দালাল ও মুসলিম নাম সর্বস্ব মুনাফিক’ হিসেবে।

এই চিঠির সত্যতা কোনো সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

চিঠি পাওয়ার পর জানানো হলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম কার্যালয়ের উপ কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিষয়টি আমরা জানতাম না। আপনার কাছেই জানলাম, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।”

গত শুক্রবার ঢাকার গোড়ানে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয়ের বাসায় ঢুকে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

এ নিয়ে চলতি বছর চারজন ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট একই কায়দায় খুন হলেন, যারা সবাই ধর্মীয় গোড়ামীর বিরুদ্ধে লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন, যুক্ত ছিলেন গণজাগরণ মঞ্চে।

নিলয় হত্যার পর আনসার আল ইসলাম নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম কার্যালয়ে ই মেইল পাঠিয়ে দায় স্বীকার করা হয়েছিল। সেখানে আনসার আল ইসলামকে আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) বাংলাদেশ শাখা বলা হয়েছিল।এরপর সোমবার রাতে বরিশাল গণজাগরণ মঞ্চের ছয় কর্মীর ছবি দিয়ে ‘আনসার বিডি’ নামের একটি ফেইসবুক পেইজ থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।‘ইত্তেহাদুল মুজাহিদিন’ এর নামে নতুন যে তালিকা পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে অনেকেই এর আগেও বিভিন্ন সময়ে হুমকি পেয়েছেন।


আবারও নাস্তিকদের খুঁজে বের করার আহ্বান সেলিম ওসমানের
১২ নভেম্বর, ২০১৬

ধর্ম নিয়ে কটূক্তির ঘটনায় শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কানে ধরে ওঠবস করানোর রেশ না কাটতেই এবার নাস্তিকদের খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান। শনিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা প্রাঙ্গণে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

২০১৪ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেন-নাসিম ওসমানের পরিবারকে দেখাশোনা করবেন তিনি।

সূত্র:বাংলা ট্রিবিউন ডট কম

বাংলাদেশ থেকে ইস্টিশন ব্লগে প্রবেশ বন্ধ (ব্লক)
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশে বিটিআরসি ইস্টিশন ব্লগে বাংলাদেশ থেকে প্রবেশ বন্ধ (ব্লক) করে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের আইএসপি প্রোভাইডারদের সংগঠন আএসপিবিএ-এর সভাপতি আমিনুল হাকিম মঙ্গলবার ডিডাব্লিউ-কে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশন-এর (বিটিআরসি) লিখিত নির্দেশে সোমবার থেকে ইস্টিশন ব্লগ নামের ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দিয়েছি আমরা৷ ব্লগটির ওয়েব অ্যাড্রেসসহ সব ধরনের লিংক ব্লক করা হয়েছে৷ তবে বিটিআরসি আমাদের সাইটটি বন্ধ করতে লিখিত নির্দেশ দিলেও, কোনো কারণ জানায়নি৷’

সূত্র-DW.com

মুক্তমনাদেরও দুষলেন আইজিপি
ব্লগার ও জঙ্গিরা সমাজ ও মানবতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে: আইজিপি-বাংলা ট্রিবিউন
০৬ অগাস্ট, ২০১৬

জঙ্গিবাদের বিস্তারের কথা বলতে গিয়ে ধর্ম নিয়ে কথা বলাকেও দায়ী করেছেন পুলিশ প্রধান এ কে এম শহীদুল হক। তিনি শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, “অতিরিক্ত মুক্তচিন্তা করতে গিয়ে ব্লগাররা আবার বিপদ ডেকে আনছে। “ব্লগাররা ধর্মকে-ইসলামকে তারা তাদের মুক্তচিন্তার বিষয় হিসেবে নিয়ে যেভাবে ধর্মের বিরুদ্ধে এবং নবীজীর বিরুদ্ধে কটূক্তি, কদাচার… যেগুলো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, পড়া যায় না, এগুলো তারা করছে।”একটি সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রেস ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক আইজিপি শহীদুল বলেন, “ব্লগাররা লেখনীর মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানছে, আর জঙ্গিরা মানুষ হত্যা করে সমাজের, রাষ্ট্রের, মানবতার ক্ষতি করছে।”

সূত্র-বাংলা বিডিনিউজ২৪.কম

Govt blocks 2 messaging services
20 May, 2016

Bangladesh telecom regulator has blocked Threema and Wickr, two highly secured messaging services, along with some blog and Facebook links after receiving requests from intelligence agencies that claimed they spread atheism and criticise Islam.

On Monday, the Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission (BTRC) blocked the services on suspicion that they were being used by extremists in their networking.

The telecom watchdog had asked all international internet gateway (IIG) operators to block some URLs that link to Somewherein, Muktomona, Nagorik and Nobojug blogs earlier this month, said a source at the BTRC.

সূত্র-http://www.thedailystar.net/


গোয়েন্দা সংস্থার পরামর্শে ব্লগসাইটে (সামহোয়্যার ইন ব্লগ) নিয়ন্ত্রণ
১৬ মে, ২০১৬

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ব্লগ-সাইট সামহোয়্যার ইনের ওপর নিয়ন্ত্রণের আরোপের কথা স্বীকার করেছে সরকারী কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ বিটিআরসির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেছেন, বেশ কয়েকজন ব্লগারের ইউআরএল ব্লক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের লেখা পড়া না যায়। কর্মকর্তা বলেন কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা মনে করছে, কিছু কিছু লেখা বাংলাদেশের “স্বার্থ-বিরোধী এবং ধর্মীয় উস্কানিমুলক” যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি নষ্ট করতে পারে।

সূত্র-বিবিসি

Govt dislikes killings, anti-religious bloggers: Minister
5 May, 2016

Home Minister Asaduzzaman Khan today cleared that the government dislikes both “bloggers who demean religion” and the killings that are being carried out targeting them.

“Bloggers should restrain from hurting religious sentiments,” the minister said. “It is a criminal offence when bloggers hurt religious sentiments of the public.”

সূত্র-www.thedailystar.net

সমকামীদের পক্ষে লেখা-লেখি ফৌজদারি অপরাধ পর্যায়ে পড়ে-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
Kamal: Writing for unnatural sex is criminal offence
সমকামিতা ও ধর্মবিরোধী লেখালেখি ফৌজদারি অপরাধ-বাংলা মেইল
সমকামিতা ফৌজদারি অপরাধ, নিশাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-NTV News
৫ মে, ২০১৬

“Our society does not allow any movement that promotes unnatural sex. Writing in favour of it is tantamount to criminal offence as per our law.

“We do not want any killing in the country and our government has adopted every kind of measures required to stop the killings,” said Home Minister Asaduzzaman Khan Kamal.

সূত্র-http://www.dhakatribune.com/

সমকামিতা আমাদের সমাজের সঙ্গে মানানসই না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী 
২৬ এপ্রিল, ২০১৬

মার্কিন দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নানসহ দু’জন হত্যার ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, ‘আমরা যতটুকু জেনেছি জুলহাজ রূপবান নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। আর তিনি সমকামীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করতেন। এটা আমাদের সমাজের সঙ্গে মানানসই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আর আমিও আগেই বলেছি কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে বা বিশ্বাসে আঘাত দেওয়ার অধিকার অন্য কারো নেই। সবাইকে সংযত হয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করার অনুরোধ করছি ।’

সূত্র-প্রিয়.কম

ফ্যাশন দাঁড়িয়ে গেছে যে ধর্মের বিরুদ্ধে লিখলেই তারা হয়ে গেলো মুক্তচিন্তা : প্রধানমন্ত্রী

মুক্তচিন্তার নামে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বিকৃত রুচি: প্রধানমন্ত্রী-দৈনিক প্রথম আলো
১৪ এপ্রিল ২০১৬

শেখ হাসিনা বলেন এখন একটা ফ্যাশন দাঁড়িয়ে গেছে যে ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই তারা হয়ে গেলো মুক্তচিন্তা। “আমি তো এখানে মুক্তচিন্তা দেখিনা,আমি এখানে দেখি নোংরামি”। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি একজন মুসলমান হিসেবে প্রতিনিয়ত আমার ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলি। সেখানে কেউ যদি লেখে, এতে আমার নিজেরও কষ্ট হয়। আর এই লেখার জন্য কোনো অঘটন ঘটলে দোষ সরকারের ওপর আসবে কেন? সবাইকে সংযমতা নিয়ে চলতে হবে। সবাইকে একটা শালীনতা বজায় রেখে চলতে হবে। অসভ্যতা কেউ করবেন না। অসভ্যতা করলে তার দায়িত্ব কে নেবে? আমরা নেব না।’

সূত্র-বিবিসি বাংলা

নাজিমুদ্দিনের ব্লগে আপত্তিজনক লেখা লিখেছে কিনা তা সরকার খতিয়ে দেখবে-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (নাজিমুদ্দিন খুন হওয়ার পর সরকারের বক্তব্য)
৭ এপ্রিল ২০১৬

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিবিসিকে বলেছেন নিহত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র নাজিমুদ্দিন সামাদ ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর লেখালেখি করতেন কিনা তা দেখা প্রয়োজন। এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে বিবিসিকে তিনি বলেন, “কেন এটা হয়েছে, কি হয়েছে, এখনই তা বলতে পারবো না। আগে জেনে নেই।”

তবে একই সাথে মন্ত্রী বলেন, “ব্লগে আপত্তিজনক লেখা লিখেছে কিনা তা দেখার প্রয়োজন আছে”।

আপত্তিকর লেখা লিখলেই কি হত্যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এই প্রশ্নে বিরক্তি প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

“আমি সে কথা বলতে চাইনি…আগের যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়েছে তাদের ব্লগ যদি দেখেন, এভাবে মানুষের ধর্মে আঘাত দেওয়া, বিশ্বাসে আঘাত দেওয়া, পৃথিবীর কোনো দেশেই তা গ্রহণযোগ্য নয়”।

সূত্র- বিবিসি বাংলা


ইসলাম-বিরোধী কথা বলা সহ্য করা হবে না: আইজিপি
২৭ মার্চ,২০১৬

জঙ্গিবাদ একটি সামাজিক ব্যাধি উল্লেখ করে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক বলেছেন, ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলায় সেন্টিমেন্টে লাগে। তাই বলে কেউ জঙ্গিবাদের নামে ইসলামের ক্ষতি করার চেষ্টা করলে তা সহ্য করা হবে না। ব্লগার হবেন, লিখবেন। কিন্তু ইসলাম ও নবীকে নিয়ে কটূক্তি ফৌজদারি অপরাধ। তা সহ্য করা হবে না।

সূত্র-জাগো নিউজ২৪

ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিয়ে না লেখার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর
৮ নভেম্বর ২০১৫

কারও ধর্মানুভূতিতে যেন আঘাত না লাগে- লেখালেখির ক্ষেত্রে এই সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সূত্র-বাংলা বিডি নিউজ২৪ ডট কম

ভয় পাবেন না, লেখালেখি চালিয়ে যান: ইনু
২ নভেম্বর ২০১৫

লেখকদের পর প্রকাশককে হত্যা করা হলেও ভয় না পেয়ে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। এক প্রকাশককে হত্যা এবং আরেক প্রকাশককে কুপিয়ে আহত করার একদিন বাদে রোববার রাজধানীর রমনা রেস্তোরাঁয় এক প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ আহ্বান জানান তিনি।

জাসদ সভাপতি ইনু বলেন, “মানুষের জীবনে দুর্ঘটনা আছে। সভ্যতাও হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে যায়। সমাজ বিকাশের ধারায় দুর্ঘটনা আছে। এটাকে সহ্য করতে হয়। “ভয় পেলে হবে না। দুই-একটি অতর্কিত আক্রমণে ভড়কে না গিয়ে আপনারা শিল্প সাহিত্যের চর্চা করুন। এভাবেই তারা শেষ হয়ে যাবে। আপনারা ভয় পাবেন না। লেখালেখি চালিয়ে যান।”

সূত্র-বাংলা বিডি নিউজ২৪ ডট কম

Prime Minister Hasina says hurting religious sensitivities will not be accepted
3 September, 2015

After the murder of Niloy Neel, Prime Minister Hasina stated, “You can’t attack someone else’s religion. You’ll have to stop doing this. It won’t be tolerated if someone else’s religious sentiment is hurt.” She also said; “No one in this country has the right to speak in a way that hurts religious sentiment,” she said while exchanging greetings with Hindu leaders on Thursday. You won’t practise religion – no problem. But you can’t attack someone else’s religion. You’ll have to stop doing this.

সূত্র-http://bdnews24.com/

র‌্যাবের নজরদারিতে আসছে ব্লগার
২৭ আগস্ট ২০১৫

ব্লগারদের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব)। ব্লগ বা অন্য কোনো মাধ্যমে কেউ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে কিছু লিখছেন কিনা এদিকটা দেখছে র‌্যাব। একই ভাবে লেখাকে কেন্দ্র করে উগ্রপন্থীদের প্রাণঘাতি হামলা থেকেও তাদের সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করবে বিষেশায়িত সংস্থাটির সদস্যরা। দেশের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে সংস্থাটিকে এই কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও নজরদারি এবং অনুসন্ধান বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করে যে লিখবে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনীকে। সরকারের এ ধরনের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই র‌্যাবের কর্মকর্তারা এই বিষয়টি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তারা উগ্রপন্থীদের ধরতে জোরদার অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর পাশাপাশি তারা প্রয়োজনে ব্লগারদেরও আইনের আওতায় আনবেন।

সূত্র-দৈনিক যুগান্তর


ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দিলে ব্লগারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
১১ আগস্ট ২০১৫

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে ব্লগে লেখালেখি করলে দেশের সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্লগারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। মঙ্গলবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকার আঞ্চলিক কার্যালয় উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ সব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সূত্র-নয়াদিগন্ত

ধর্মের বিরুদ্ধে লিখলে গ্রেপ্তার করা হবে-আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি
১০ অগাস্ট ২০১৫

যেসব ব্লগার মুক্তমনা পরিচয় দিয়ে ধর্মের বিরুদ্ধে লেখালেখি করে তাদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ব্লগাররা ব্লগে কী লেখেন সে বিষয়ে খোঁজ রাখবেন গোয়েন্দারা। যাঁদের ব্লগে ধর্ম বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য, কটূক্তি পাওয়া যাবে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে। গতকাল রবিবার আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র- কালেরকন্ঠ

সীমা লঙ্ঘননা করতে ব্লগারদের পরামর্শ আইজিপির
৯ আগস্ট ২০১৫

ছয় মাসের ব্যবধানে চার ব্লগার হত্যাকাণ্ডের কোনোটিরই সুরাহা করতে না পারার জন্য সমালোচিত পুলিশ বাহিনীর প্রধান ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো লেখা না লেখার পরামর্শ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে কারও লেখা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো হলে সে ক্ষেত্রে পুলিশকে তা জানানোর পরামর্শও দিয়েছেন এ কে এম শহীদুল হক।

সূত্র-বাংলা বিডিনিউজ২৪ ডট কম


আমরা (আওয়ামী লীগ) নাস্তিক হিসেবে পরিচিত হতে চাই না-রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জয়
১১ মে ২০১৫

“আমরা (আওয়ামী লীগ) নাস্তিক হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। তবে এতে আমাদের মূল আদর্শের কোনো বিচ্যুতি হবে না। আমরা ধর্ম নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী।” তিনি আরো বলেন ” অভিজিৎ একজন ঘোষিত নাস্তিক ছিলেন ” তাই আমার মা (প্রধানমন্ত্রী) অভিজিৎ রায়ের বাবাকে ব্যক্তিগতভাবে সমবেদনা জানিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এতটাই অস্থির যে প্রকাশ্যে তার পক্ষে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেন জয় ।

সূত্র-রয়টার্স

হেফাজতের দাবি মানা হয়েছে, হচ্ছে (উল্লেখ্য-হেফাজতের ১৩ দফা ছিল-নারী শিক্ষানীতি বিরোধী, ব্লগাদের ফাঁসি, আহমদিয়া সম্প্রদায়কে পাকিস্তানের মতন অমুসলিম ঘোষণাসহ মধ্যযুগীয় দাবী)
৩ মে ২০১৩

ঢাকা অবরোধের ঘোষণা দেয়া হেফাজতে ইসলামের বেশিরভাগ দাবিই বাস্তবায়ন করা হয়েছে উল্লেখ করে এ কর্মসূচি বাদ দেয়ার অনুরোধ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সাভারে উদ্ধার অভিযান ও পুনর্বাসন কাজের স্বার্থে হেফজতে ইসলামের রোববারের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী হেফাজতের ১৩ দফা দাবির ১২টি পড়ে শোনান। “হেফাজতে ইসলামের নেতারা বেশ কিছু দাবি-দাওয়া পেশ করেছেন। এ ব্যাপারে আমি কিছু কথা বলতে চাই। যে দাবিগুলো তারা করেছেন তার অনেকগুলোই কিন্তু ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আমরা কিছু কিছু করেছি। কিছু দাবি বাস্তবায়নের পথে যেগুলোর যৌক্তিকতা রয়েছে। যদি কিছু থাকে, তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা যেতে পারে।” হেফাজতে ইসলামের সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপনের দাবি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম দেওয়াই আছে। এটা ইতিমধ্যেই আছে। তাছাড়া সংবিধানের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামও লেখা আছে। সুতরাং ইসলাম ধর্ম সংবিধান থেকে বাদ যায় নাই।”

আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে শাস্তির দাবিতে হেফাজতের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে শেখ হাসিনা বলেন, “ধর্মের অবমাননার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রেখে দেশে আইন কিন্তু বিদ্যমান আছে।”

সূত্র-বাংলা বিডি নিউজ২৪ ডট কম


দেশ চলবে নবীজীর দেখানো পথে, ধর্মের অবমাননা বরদাশত করব না: শেখ হাসিনা

যে কোনো ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “কোনো ধর্মের অবমাননা বরদাশত করব না।
“নবী করিম (স.)কে কটূক্তি করলে আমরা মানব না। ব্যবস্থা নেবোই।”

সূত্র-বিডিনিউজ২৪.কম


ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানলেই ব্যবস্থা
আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলন: ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারীদের শাস্তি দেবে সরকার-প্রথম আলো
০২ এপ্রিল ২০১৩

মঙ্গলবার এই সংবাদ সম্মেলনেই দুই মন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও শফিক আহমেদ বলেছেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে কেউ আঘাত হানলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেউ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানলে তার বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সরকার জানিয়েছে। ব্লগারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি ইসলামী দলের দাবির মধ্যে মঙ্গলবার সরকারের দুই মন্ত্রী একথা জানিয়েছেন।

আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেছেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী সবাইকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হবে। এ জন্য প্রচলিত দণ্ডবিধি পরিবর্তন করে সাজা বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছেন, যারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে কিছু করছে, তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের অপরাধের অভিযোগে গতকাল থেকে এখন পর্যন্ত তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

সূত্র-বাংলা বিডিনিউজ২৪.কম

ইসলাম অবমাননার অভিযোগে তিনজন ব্লগার গ্রেফতার, পরবর্তীতে আরো ১ জন গ্রেফতার হয়
১ এপ্রিল ২০১৩

ইন্টারনেটে ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর লেখালেখির অভিযোগে রাজধানীতে তিনজন ‘ব্লগারকে’ গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারের পর তাদেরকে ঢাকার মহানগর মুখ্য আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদেরকে সাত দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দিয়েছে।

সূত্র- বিবিসি

নাস্তিকব্লগারদের তওবার দাবিতে সায় কমিটির
৩১ মার্চ ২০১৩

ফেইসবুক ও ব্লগে ‘আপত্তিকর’ মন্তব্যকারীদের ‘তওবা’ করানোর সুপারিশ করেছে ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমরা, যাতে সায় জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কর্যালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি।

রোববার কমিটির সঙ্গে বৈঠকে ব্লগ ও ফেইসবুক ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলা করে কঠোর শান্তি দেয়ার সুপারিশ করেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমদের সঙ্গে বৈঠকে এ সুপারিশের প্রেক্ষিতে কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকার বলেন, “তওবা পড়ার সুযোগ দেয়া যেতে পারে, এর পরও তারা এ অপপ্রচার চালালে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

সূত্র-বাংলা বিডিনিউজ২৪ ডট কম

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ধর্মবিদ্বেষী ৮৪ ব্লগারের নথি জমা
৩১ মার্চ ২০১৩

ইসলাম ধর্ম ও মহানবী হজরত মোহাম্মদ সা. সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্যকারী ব্লগার ও ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে নয়টি ব্লগের ৮৪ জনের তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কটূক্তিকারীদের শনাক্তে গঠিত নয় সদস্যের কমিটির সঙ্গে দেশের আলেম সমাজের বৈঠকে এ তালিকা হস্তান্তর করা হয়।

সূত্র-নতুন বার্তা ডট কম


ব্লগারদের সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্যে আমার ব্লগকে সরকারের নির্দেশ
২১ মার্চ, ২০১৩

২২ মার্চ, ২০১৩ বাংলাব্লগ নিয়ন্ত্রনে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রেস বিজ্ঞপ্তি:
আমারব্লগ ডট কম (www.amarblog.com) ২১ মার্চ ২০১৩ সকালে বাংলাদেশ বিটিআরসি(www.btrc.gov.bd) থেকে একটি ইমেইল নির্দেশ পেয়েছে। সহকারী পরিচালক স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনায় আমার ব্লগকে বেশ কয়েকজনের ব্লগ একাউনট বাতিল এবং উল্লেখিত ব্লগারদের ব্যাক্তিগত তথ্যাদি- আই পি এড্রেস, লোকেশন, ইমেইল, মোবাইল নম্বর এবং ব্যাক্তিগত নাম পরবর্তী ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিটিআরসি কার্যালয়ে ইমেইলে জমা দিতে বলা হয়েছে! নির্দেশনামায় বিটিআরসির সহকারী পরিচালক কোন আইন কিংবা আদালতের আদেশের ভিত্তিতে এ নির্দেশ দিচ্ছেন তা উল্লেখ করেননি!

সূত্র-আমার ব্লগ

ইসলাম ধর্মের সমালোচনাকারীদের বিষয়ে তথ্য দিতে আহবান
১৩ মার্চ, ২০১৩

ইসলাম ধর্মের সমালোচনাকারীদের বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর জন্যে সরকার বিটিআরসির সহায়তায় মেইল-ওপেন করে।(complainmoha@gmail.com)। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকার সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি আরো বলেন-ইসলাম ধর্ম ও মহানবীকে নিয়ে যারা আপত্তিকর মন্তব্য করে তাদের বিরুদ্ধে তথ্য চাওয়া হয়েছে আলেম সমাজের কাছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে। এগুলো দ্রুত আইন সংস্থাকারীর কাছে পাঠানো হবে অনুসন্ধানের জন্যে পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ দেওয়া হবে।

সূত্র-দৈনিক যুগান্তর

১৯ ব্লগারের নিরাপত্তা দিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্লগারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও গোয়েন্দা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন । বিশেষ করে ১৯ জন ব্লগারের নাম উল্লেখ করে তাদের সার্বিক নিরাপত্তার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে নির্দেশপত্রও পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে পুলিশ প্রশাসন থেকে ব্লগারদের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ১৯ জন ব্লগারের সার্বিক নিরাপত্তার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শুক্রবার রাতে পল্লবীতে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন খুন হওয়ার পর শাহবাগের আন্দোলনকারী ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের তালিকা নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে কাজ শুরু করে। তারা ১৯ জন ব্লগারের নামের একটি তালিকা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এসব ব্লগারদের নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

জামায়াতের রাজনীতি করার অধিকার নেই (ব্লগার রাজীব হায়দার খুন হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী)
১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রাজীবকে হত্যা করে জামায়াত-শিবির প্রমাণ করেছে, ওরা একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই জামায়াতে ইসলামীর। ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানাতে গিয়ে গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, রাজীব শাহবাগ আন্দোলনের প্রথম শহীদ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শাহবাগের এই তরুণ প্রজন্ম সমগ্র বাংলায় নবজাগরণের চেতনা সৃষ্টি করেছে। তরুণ সমাজের আকুতির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে আমি জাতীয় সংসদেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে কথা বলেছি। একাত্তরের পরে আবার সমগ্র বাঙালি জাতির চেতনায় একটা উন্মেষ ঘটাতে পেরেছে আজকের তরুণ সমাজ। আবার স্বাধীনতার চেতনায় তারা জেগে উঠেছে। আর সেই চেতনায় যখন তারা জাগ্রত করল জাতিকে সে সময় প্রথম শহীদ হলো রাজীব এবং এটা সবাই ধরেই নিতে পারে কারা করেছে।’ রাজীবের মৃত্যু নিয়ে অপর এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আসলেই আমি কয়েক দিন থেকে খুব খারাপ সংবাদ পাচ্ছিলাম। যে কারণে ওদের নিরাপত্তার জন্য শাহবাগে যত রকম ব্যবস্থা করার দরকার আমি করেছি। শেষ পর্যন্ত তা-ই ঘটে গেল। তবে আমি কথা দিতে পারি, ওদেরকে আমরা ছাড়ব না।’

সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ

রাজীবের বাসায় প্রধানমন্ত্রী
১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

আততায়ীর হাতে নিহত ব্লগার রাজীব হায়দার শোভানের বাসায় গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ শনিবার বিকাল সাড়ে তিনটায় রাজীবের মিরপুরের বাসায় উপস্থিত হন তিনি। এসময় রাজীবের বাবা-মাকে সান্ত্বনা ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল শুক্রবার রাত নয়টার দিকে নিজ বাসার সামনে খুন হন রাজীব।

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

ডা: ইমরান এইচ সরকারের মন্তব্য নেয়ার জন্যে বার বার মোঠফোনে যোগাযোগ করেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।


সুত্রঃ রিতা রয় মিঠু, বিবিসি, যুগান্তর, প্রথম আলো, বিডিনিউজ24.com এবং উইকিপিডিয়া সহ অনলাইন মাধ্যম সমুহ।

 



এই প্রতিবেদন টি 1140 বার পঠিত.