একজন ভাল লেখক ঠিক ওভাবেই লেখা শুরু করেন

ফারজানা কবীর খান
ছেলেবেলায় যখন শিশুদের টিকা দেবার সময় হয়, তখন আমাকে টিকা দেয়া হয়নি। এর অনেক কারণ। প্রধান কারণ হলো, তখনকার সময় টিকা দেওয়ার গুরুত্ব না বোঝা। আর তারপর আমাকে যখন টিকা দিতে নেয়া হলো আমার জ্বর এসেছিল আর খুড়িয়ে হাটছিলাম। তাই বাপজান বলেছিলেন,- আমাদের সময় এত টিকাটুকা ছিল না, আমরা যে টিকা নিইনি, তাতে কি মরে গেছি? তবে আমার একবার হুপিং কাশি হয়েছিল। তখন বাধ্য হয়ে একটা টিকা দিতেই হয়েছিল তাও সুস্থ হবার পর।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে না গিয়ে আমি এভাবেও লিখতে পারতাম- বাংলাদেশের মানুষ একসময় টিকার নেয়ার গুরুত্ব বুঝতো না। একজন ভাল লেখক ঠিক ওভাবেই লেখা শুরু করেন। আমি ভাল লেখক নই তাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই শুরু করি।

আমি অনার্স ও মাস্টার্স করেছি সমাজকল্যাণে, তারপর আরেকটি এমবিএ করেছি বাংলাদেশে। কেন পড়ালেখার ফিরিস্তি দিচ্ছি সে প্রসংগে আসা যাক। সমাজকল্যাণে পড়ার কল্যাণে আমাকে দুটো প্রশিক্ষণমূলক, যাকে বলা যায় “লার্নিং বাই ডুইং” – মানে ইন্টার্ণশিপ করতে হয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে। একটি পিজি হাসপাতালের সমাজকল্যাণ দপ্তরে। আরেকটি করেছিলাম, যার আগে নাম ছিল- সবুজ ছাতা আর বর্তমানে সূর্যের হাসি-তে।
সূর্যের হাসিতে কাজ করার সময় দেখতাম – বেশীরভাগ নিম্নবিত্তের মানুষেরা চিকিৎসার জন্য আসতেন, তাও সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠরা ছিলেন নারীগণ। সূর্যের হাসিতে কাজ করার সুবাদে আমাদের ইন্টার্ণদের সেখানকার প্যারামেডিক কিংবা সমাজকর্মীদের সংগে বস্তি থেকে বস্তিতে, কখনো বা কোন মহিলা বিশ্ব বিদ্যালয়ে, অথবা পুরানো ঢাকার অলিতে গলিতে, বাড়ী থেকে অট্টালিকায় কাজে যেতে হতো। কখনো নব-বিবাহিত নারীদের পরিবার পরিকল্পনা সমন্ধে জানাতে, ব্যাগে থাকতো কনডম বা পিল, আর কখনোবা বিভিন্ন বাড়ীতে তলব দিতে -আপনাদের বাড়ির পাশে সূর্যের হাসি আছে যেখানে কম খরচে চিকিৎসা দেয়া হয়। মাঝে সাঝে কিছু অতিমাত্রায় খানদানী নবাবী ভিলাতে গেলে কুট্টিভাষায় আমাদের বলা হতো, আব্বে আমাগো চাকর-বাকরেরা তো ঐখানেই চিকিৎসা করবার যায়।

ইডেন কলেজ আর গার্হস্থ্যবিজ্ঞান কলেজের আশেপাশে আজিমপুর এলাকায় যেতে হতো সপ্তাহে একবার। সেখান থেকে অনার্স বা মাস্টার্স পড়ুয়া মেয়েদের ধরে আনতে হতো, টিকা দেয়ার জন্য। তাদের বোঝাতে হতো এ টিকা ভবিষ্যতের জন্য- মানে তুমি মা হবে একসময় সেই প্রস্তুতি নেয়ার জন্য। আর তারা টিকা নিলে সূর্যের হাসির একটু রোজগার হয়। আর অফিস থাকতাম, ফিল্ডওয়ার্ক থাকতো না তখন দেখতাম, নারীরা বিভিন্ন ধরনের পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, এর মধ্যে হাতের মাংস সরিয়ে পাঁচ বছরের জন্য পাঁচটি ছোট ছোট টিউব আর নারী যোনিপথে একটি সুতো পরিয়ে দেয়া। পুরুষদেহের জন্য সে সময় কোন পরিবার পরিকল্পনার তেমন ব্যবস্থা ছিল না, এক কনডম ব্যবহার এবং আরেকটি ছিল- পুরুষাঙ্গের ছোট্ট একটি অপারেশন- যেটি করানোর জন্য পুরুষদের এই বলে উৎসাহ দেয়া হতো- এটা করানোর পর আপনার যৌণক্ষমতা বেড়ে যাবে অনেক, কিন্তু কোনদিন আর সন্তানাদি হবে না। ৫-৬ সন্তানের অধিকারী আব্বারাও তা করাতে রাজী হতেন না। জন্মনিরোধ বড়ি খেলে মেয়েদের ওজন বেড়ে যায়, তবুও বেশিরভাগ স্বামীরা কনডম ব্যবহার করতে চাইতেন না। আমরা সহপাঠীরা এসব নিয়ে হাসাহাসি করতাম। দরকার না হলে শেষ মূহুর্ত ছাড়া বাংলাদেশের নারীরা ডাক্তারের কাছে আসতে চাইতো না, এটা ছিল আমার সে সময়ের অভিজ্ঞতা।

দেশ বিভেদের পার্থক্য হলো, এখানে ২০ বছরের পর প্রতিটি নারীকে বৎসরে একবার শরীরের ক্যান্সারের সম্ভাবনা আছে কিনা তা পরীক্ষা -নিরীক্ষা করার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়। যে টিকাগুলোকে আমরা নারীর ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা বলে দেয়াতাম, সেগুলো এখানে তাদের নিজের শরীরের জন্য জরুরী বলে দেয়া হয়। নারীর বুকে টিউমার বাসা বাধলো কিনা তা বছরে একবার পরীক্ষা করে দেখার জন্য উৎসাহ দেন ডাক্তাররা। অবাক কান্ড আমার যে টিকাগুলো নেয়া ছিল না, তা আমার রক্ত পরীক্ষা করে বের করে সেগুলোও দিয়ে দিয়েছেন আমার ডাক্তার। অবশ্যই তারা টাকা কামাচ্ছেন, কিন্তু হেলথ ইন্সুরেন্স ব্যবস্থা থাকা আমরা আমাদের চিকিৎসা খরচ টের পাচ্ছি না। এখানে গরীব-ধনী একই ডাক্তারখানায় যাচ্ছে, কেউ বলছেনা- ওখানে তো আমাদের চাকর-বাকরেরা যায়। আমার পোড়া দেশে মানুষ চলে যাচ্ছে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসায়, কিন্তু সংগে তার খুলিটা পাঠাতে ভুলে যায় ডাক্তার। রোগী মারা যাবার পরও তার ভেতর শাস-সঞ্চালন করিয়ে বিল বাড়াতে থাকেন ডাক্তাররা। মানুষ চিকিৎসা করাবে কেন? ও দেশে রোগ-বালাই হওয়া মহা পাপের ফল। পরিচিত এক নারী তার ব্রেস্টক্যান্সার হয়েছে- সে কথা লজ্জায় আর ভয়ে জানায়নি পরিবারে। একদিন স্নান করতে যেয়ে তার হাতটি এমনি এমনি ক্ষয় হয়ে ভেঙ্গে যায়। চিকিৎসা করাতে গিয়ে দেখে এমন এক অবস্থায় তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছে, যখন আর কিছুই করার নেই। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আরো কত শতাব্দীর প্রয়োজন হবে বাংলাদেশে তা আমি অনুমানও করতে পারি না।



এই প্রতিবেদন টি 1540 বার পঠিত.