পথে চলার গল্প

পথে চলার গল্প
রোকসানা লেইস

পথের দুপাশে উঁচু উঁচু দালানের সারি রাস্তায় ভিড়। ব্যাস্ত পদচারণা পথচারীর। আজ আমার হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে জেগেছে। সকাল থেকে পথ চলছি। আর মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছি চেনা শহরের অচেনা গলিতে। ভাগ্য কখনো আমাকে নিরাশ করে না। যেতে যেতে পেয়ে গেলাম হ্রদের দেখা। সেখানে সূর্য আলো ফেলে আমাকে নষ্টালজিক করে দিল। শচিন কর্তা আমার কানে সুর বাজাতে থাকলেন। আমি সেই সুর আওড়াতে আওড়াতে ভাটির গাঙ্গে বাওয়া কোন মাঝির দেখা পেতে চাইলাম। সময়টা অনুকুল নয়। কোন মাঝির দেখা পেলাম না যাকে ডেকে বলব আমার ভাইধনরে কইও নাউয়র নিত বইলা।
মাঝি নেই তো কি শুনতে পেলাম অদ্ভুত এক মায়াবি যন্ত্রের তরঙ্গ্ বাতাসে ভেসে এসে আমাকে, হাতছানী দিয়ে ডাকছে। অচেনা সে সুর আমাকে আচ্ছন্ন করে বাদকের দিকে ধাবিত করল। পথের মাঝে আসন পেতে সে আপন মনে বাজিয়ে যাচ্ছে তার চেনা সুর। কিন্তু মায়াবি লহর শুধু আমি নই অনেককে আকৃষ্ট করছে। যেতে যেতে থমকে থেমে শুনে যাচ্ছে আমার মতন কেউ কেউ। দিয়ে যাচ্ছে কিছু খুচরো আর নোট।
এমন বাজনা বাজাতে প্রথম দেখেছিলাম অক্সফোর্ডের রাস্তায় একটি অল্প বয়সি ছেলেকে। শুনেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র এ ভাবে টাকা রোজগার করে বিদেশে। সেই অনেক দিন আগের ছেলেটার মুখ এখনও মনে তেমনি আছে।
আরেকবার দেখেছিলাম সুদূর কানাডার পূবের শেষ প্রান্ত শহর হ্যালিফ্যক্সে। মায়াবী মুখের ছেলেটি মনে হয় স্কুল যায়। গ্রীষ্মর সময়টা তার গিটারটি বাজিয়ে মুখর করছে নদী পাড় । পর্যটকদের মন ভরিয়ে দুপয়সা আয় করে নিচ্ছে। উদাস করা এক অচেনা ভাটির গানের সুর ছিল সেই কান্ট্রি মিউজিকে।
এখানে সুযোগ পেলেই আমি রাস্তায় হাঁটি গান বাজনার কারিগরদের সাথে দেখা হলে খানিক অন্য জগতে বিচরণ করা যায়। যারা খ্যাতিমান নয় কিন্তু অসাধারন গুনের অধিকারি। এভাবেই তারা সংসার চালায় অথবা বাড়তি কিছু আয় করে পথে গান করে।
কয়েক বছর আগে আমেরিকার টিভিতে বর্ষসেরা হওয়ার প্রতিযোগিতায় একটি কালো মেয়ের গান শুনেছিলাম। আহা সে গান আর কখনো শুনি নাই কিন্তু এখনও আমার মনের দরজা খুলে সে মেয়ে আমার কানে কানে গান গায় মাঝে মাঝে। বিচারকরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল খানিক সময় তার কণ্ঠের লহরী তোলা খেলায়।
এবং তারা খুব আশ্চর্য হয়ে ছিল এমন ঐশ্বর্যময় গলা থাকার পরও। পঁতাল্লিশ বছরের এই মেয়েটি সাবওয়ের ভীড়ে গান করে এসেছে এতদিন ধরে। এছাড়া সে আর কোথাও কোন সুযোগ পায়নি গান গাওয়ার । ওরা তাকে একটি সুযোগ করে দিয়েছিল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করার।
ভীড়ের ভিতর আনাচে কানাচে কত রত্ন অবহেলায় হারিয়ে যায়।
আজ এই অচেনা বাদ্য যন্ত্রের সুরটাও মাথায় গেঁথে গেলো। এবার ফিরতে হবে একটা কাজ সেরে নিতে হবে। আমি ফিরে চললাম ভুল পথ থেকে। পথটা এখন নিরব। আমি হাঁটছি একাকী। এক সময় মনে হলো কেউ আমার পাশে হাঁটছে।
মুখ ঘুরিয়ে তাকাতেই সুদর্শন এক যুবক হাসল নীল চোখ মেলে। পাত্তা না দিয়ে নিজের মতন চলতে লাগলাম। একটু পরে সে জানতে চাইল তোমার কি খুব তাড়া আছে?
কেনো? কফি খাবে? না। একটু কথা বলবে?
কি কথা?
তাইতো কি কথা তাহার সাথে। অচেনা যুবকের সাথে পথের মাঝে । অচেনা কারো গান শুনা যায় পথে দাঁড়িয়ে কিন্তু কথা বলা যায় না কেনো? মনে হলো গল্পের গন্ধ পেলাম।
বেপোরোয়া আমি তো! জানতে চাইলাম বলে ফেলো কি বলবে। কিছুদিন আগেও এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল জার্মানির কলনে। শহরটায় কেবল পৌঁছালাম, কিছুই দেখা হয়ে উঠেনি। গাড়ি থেকে বেরুতেই লাল রঙের একটা গাড়ি সামনে এসে দাঁড়াল। সাজগুজ করা কিন্তু একটু বিদ্ধস্ত একটি যুবক গাড়ি থেকে নেমে সামনে এলো। কিছু সাহায্য চাইল। অবাক কাণ্ড এখানে দেখি গাড়ি চড়ে ভিক্ষা করে! কিন্তু না ভাবনাটা এগুতে না দিয়ে ছেলেটি জানাল। সে স্কটল্যান্ডে থেকে এসেছে বেড়াতে কিন্তু র‌্যাব্ড হয়ে গেছে ওর ইউরো, ক্রেডিড কার্ড, ফোন। এখন সে কিছু অর্থ তুলছে, কিছু খাবে আর গাড়িতে তেল ভরে বাড়ি ফিরবে।
বেড়াতে এসে কি ভয়ানক দূর্দশা। সে তার গাড়ির লাইসেন্স প্লেটটি দেখালো ওটা স্কটল্যান্ঢের এবং সে স্কটল্যান্ডের নাগরিক বোঝানোর জন্য। আমি অল্প কিছু সাহায্য করেছিলাম।
আজ এখানে আবার কি সমস্যা কে জানে। বড়বড় অট্টালিকার পাশে সিমেন্টের বেঞ্চি পাতা। গ্রীষ্মের সময়ে সেখানে বসা যায় কিন্ত এ সময়ে নয়। যদিও আজ তেমন ঠান্ডা নেই। উপরের শহরের নিচে আরেক ঝকমকে শহর মাটির গহ্বরে। থরে থরে সাজানো দোকান পাট। খাবার ব্যবস্থা এবং রাস্তা। শহরের অনেকটা এই মাটির নিচের পথ ধরে চলে যাওয়া যায়।
তারও নিচে রেলপথ অন্ধকারের গুহা বেয়ে চলে যায় এঁকে বেঁকে। সেই ছোটবেলায় পড়েছিলাম টেমস নদীর তল দিয়ে টিউব রেলওয়ে চলে। ভাবনায় আসত না, কি এই টিউব রেলওয়ে। অথচ এখন দেখলাম পৃথিবীর অনেক মাটির নিচের রেল ট্রেনের চলা। তবে সবচেয়ে প্রথম ভূগর্ভস্থ রেলে চেপেছিলাম কলকাতায়। মেট্রো রেল যখন বানানো হচ্ছিল তখন গল্প, প্রবন্ধে কত যে তাকে নিয়ে বিরক্তি পড়েছি। কলকাতাবাসী আটকে আছে ভীড়ে, কারণ রাস্তা বন্ধ করে কাজ চলছে মেট্রো বানানোর। এখন যেমন আমাদের দেশে বলা হয় ডিজিটাল হচ্ছে দেশ। কিন্তু প্রথম মেট্রোতে চেপে কিযে ভালো লেগেছিল আমার। কালিঝুলিওলা এ্যাম্বেসেডরগুলোর চেয়ে অনেক ভালো মেট্রোয় পথ চলা কলকাতায় কিন্তু খুব বেশী দূর যাওয়ার সুযোগ হয়নি তখনও।
এক্সেলেটর বেয়ে নেমে আমরা ফুডকোর্টের টেবিল দখল করে বসলাম। ছেলেটা কথা না শুনে একগাঁদা খাবার কিনে আনল। বলল, তুমি খাও না আমার সাথে। আমার খুব ইচ্ছে করছে আজ কারো সাথে বসে খাই। বাহ চেনা নাই জানা নাই কারো সাথে বসে খাই কি আব্দার। আমি সকালের লেট নাস্তা করেছি একটু আগে অলডে ব্রেকফাস্টের দোকানে। এখন কিছু খাওয়া সম্ভব নয়। তারপরও যখন বসেছি ওর সাথে, তবে বোঝার উপর শাকের আঁটি নিতেই হবে। একটা দুটো ফ্রাঞ্চ ফ্রাই মুখে চালান করেতে থাকলাম। তুমি কি একসাথে খাবে বলে আমাকে ডেকেছো?
না কিছু কথা বলব তোমাকে। মুখ ভর্তি বার্গার গিলে বলল।
এতক্ষণে খেয়াল করলাম ওর সাদা রঙটা বড় ফ্যাকাসে। গায়ের ভাড়ী জ্যাকেটটা খুলে রাখাতে চিকন একটা কাঠামো হালকা নীল সার্টে জড়ানো মনে হলো। জিন্সটা কোমরে বেশ ঢিলা হয়ে আছে। তবে পাছা বেয়ে পরা ফ্যাশনের মতন নয়। ওর শুকনো কাঠামোর জন্য এমন মনে হচ্ছে। বেশ ভদ্রগোছের বেশবাস। অনেক দামী ব্যাণ্ডের কাপড়ে কেমন জীর্ণ মনে হলো। মাথা ভর্তি চুল গুলো সুন্দর এবং ঝাকড়া তাই প্রথমে খুব একটা শুকনো মনে হয় নাই। আর আমি তো ভালো করে তাকাইওনি। একটু বিরক্তি একটু অলস সময়ের কৌতুহলে খানিকের জন্য থেমেছি।
বার্গার শেষ করে হাসল আমার দিকে চেয়ে। আজ আমার খুব ভালোলাগছে।
কেনো? এই যে তোমার সামনে বসে খেলাম তাই।
কেনো আমি আবারও প্রাণহীন প্রশ্ন করলাম।
অনেকদিন কারো সামনে খাইনা। আমাকে কেউ খাবার খেতেও বলে না বেড়েও দেয়না।
হোয়াট এ্যবাউট ইউর ফ্যামেলি? কেউ নেই আর আমিও থাকব না।
মানে কি?
এরপর সে যা বলল তা এমন, তার বাবা একজন মস্ত গবেষক। বিভিন্ন জটিল রোগের ম্যাডিসিনের পরীক্ষা করার জন্য জীবনের সবটা সময় ব্যায় করেছেন। যার ফলে ওর ছোটবেলাতেই মা বাবার ডিভোর্স হয়ে যায়। মার সাথেই ও থাকে কিন্তু পাগলাটে ক্ষ্যাপাটে বাবার কাছে মাঝে মধ্যে আসত। বাবার কাজের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে থাকার বিষয়টা ওকে খুব আকর্ষন করত ছোটবেলায়। এক সময় আবিস্কার করল বাবার মতন মেধাবী এবং গবেষনা করার আগ্রহ তার নিজেরও।
বাবার আবিস্কৃত ঔষধটা যখন বিশাল একটা সাফল্য নিয়ে আসে চারপাশে বাবার জয় জয়কার। ঠিক সে সময়ে বাবার হাড়ের এক ধরনের ক্ষয় রোগ দেখা দেয় । এতদিনের টেনে টুনে চলা এবং নিজের উপার্জনের সব অর্থ ঢেলে বাবা যখন সাফল্য পেলো আর অর্থ আসতে লাগল বানের জলের মতন। তখন বাবার শরীর অসমর্থ হয়ে গেলো। সে ততদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শেষ করেছে। বাবার কাছে থেকে বাবার গবেষনায় ঢুকেছে। নানা রকম ক্যামিক্যল বিকিরণের কারণে ক্যামিকেলের সংস্পর্শে থেকে এক মরণ ঘাতক ব্যাধী বাবার শরীরটাকে গ্রাস করে নেয় । মানুষের কথা ভাবেতে ভাবতে কাজ করতে করতে। মানুষের বাঁচার জন্য ঔষুধ আবিষ্কার করে নিজে চলে গেল। সেও একই রকম ভাবে অসুস্থ হয়ে গেছে। ওর প্রেমিকার সাথে অনেক আগেই ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তাতে কোন সমস্যা ছিল না। ও আরো কাজ করতে চায় গবেষনা করতে চায় অনেক কিছু নিয়ে তার জন্য সময়ের প্রয়োজন কিন্তু সে সময় সে পাচ্ছে না। ডাক্তার বলেছে ও খুব বেশীদিন আর বাঁচবে না।
ছেলেটি বলল চলো একটু আকাশের নীচে কাটাই খোলা বাতাসে। আমি তো সব সময় বন্ধ ঘরের ভিতর কাজ করি। এখন ডাক্তার দেখিয়ে আসলাম আর মনে হয় বেশীদিন নেই। আজকের পর আমি ঘরের ভিতরেই থাকব বাকি দিনগুলো একটানা কাজগুলো শেষ করে যাওয়ার চেষ্টা করব। যদি সময় পাই শেষ পর্যন্ত। হয়ত ল্যাবের ভিতর মৃত উদ্ধার করবে আমাকে। থাক সে কথা
তুমি কোন দেশের মানুষ তোমার বিষয়ে কিছু কি জানতে পারি।
সব মানুষের মধ্যে সুন্দর একটা মন থাকে এটা আমি জানি। কিন্তু আমি খুব বেশী মানুষ পাইনি আমার জীবনে। আমার সময় এবং গণ্ডি খুব সংক্ষিপ্ত।
কিন্তু তোমার কাজটা বিশাল। কোনরকমে বলতে পারলাম। মনে ভাবছি কি নিলিপ্ত ভাবে আর বেশীদিন না বেঁচে থাকার কথা বলেও কাজের জন্যই ভাবছে ছেলেটা।
আমার মনে হতে থাকল, একটি গানের কলি, আমার গল্প শুনে কারো চোখে করুণার জল যদি আসে। আর আমার চোখে জল এসে যেতে থাকল। করুণায় নয় ভালোলাগায়। যে মানুষগুলো অনেক কাজ করতে চায় ভালো কাজ করতে চায় তাদের জন্য সময় এত কম কেনো। সে সাথে আমার মনে হলো বছর দুই আগে আমার ছেলের বন্ধু এমন একটি ছেলের এবং তার বাবার গল্প বলেছিল। সে ছেলেটি ঘুরতে যাবে ইথিওপিয়ার সাদাসোনার জায়গায়। আমি বলেছিলাম ও ওখানে যেতে চায় কেনো। সস্তা ভেকেশন কাটানোর জন্য? ও বলেছিল ওর টাকা পয়সার কোন অভাব নেই। কিন্তু যেখানে কেউ যায় না তেমন বিচিত্র জায়গায় সে যেতে চায় সাথে সাদা সোনা সংগ্রহের মানুষগুলো কি রকম রোগে আক্রান্ত হয় তা জানারও ইচ্ছা। এই ছেলেটি কি সেই ছেলে, যার গল্প আমি শুনেছিলাম বছর দুই আগে। আজ যা বলল, সব মিলে গেলো এই ছেলেটির সাথে।
আমি বেশ হাঁটছিলাম নিজের মতন। হঠাৎ এই ছেলেটার সাথে দেখা হওয়ার কারণ কি। এই অসময়ে চলে যাবে যে ছেলেটা সে এসে সারা জীবনের জন্য ওর গল্পের মলাটে আমাকে জড়িয়ে দিল।



এই প্রতিবেদন টি 584 বার পঠিত.