প্রকৃতি কন্যা জাফলং (ভিডিও)

সুমন শুদ্ধ : কথিত আছে,  পান, পানি, নারী তিনে মিলে জৈন্তাপুরি । ওপারে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়, এপারে নদী । পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলছে ঝর্ণা, আর নদীর বুকে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর । দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড় । পাহাড়ের গায়ে নরম তোলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি । প্রকৃতির এই অপরুপ সৌন্দর্য আর কোথায় পাবেন, জাফলং ছাড়া ? এখানেই শেষ নয় সমতল চা বাগান, খাসিয়া পল্লী, পানের বরজ কী নেই জাফলংয়ে ! সিলেটের জাফলংকে তাই বলা হয়ে থাকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি । প্রকৃতি কন্যা নামেও রয়েছে আলাদা পরিচিতি । প্রকৃতি যেনো নিজ হাতে সাজিয়েছে ভারতের সীমান্তঘেঁষা দেশের উত্তরপূর্ব অঞ্চলের এই জনপদকে । জাফলংয়ের সৌন্দর্য্য দেখতে তাই প্রতিবছরই প্রচুর সংখ্যক পর্যটক ভিড় করেন এখানে । ঋতুবৈচিত্র্যের সাথে জাফলংও তার রূপ বদলায় । সৌন্দর্য্যে আসে বৈচিত্র্যতা । বর্ষায় গেলে এখানে দেখা যাবে ওপারের পাহাড় থেকে নেমে আসা অগনিত ঝর্ণা । সবুজের বুকে নেমে আসা ঝর্ণাধারায় সূর্যের আলোর ঝিলিক ও পাহাড়ে ভেসে বেড়ানো মেঘমালা মন্ত্রমূগ্ধ করে রাখে পর্যটকদের । আবার শীতে অন্য রূপে হাজির হয় জাফলং । চারিদেকে তখন সবুজের সমারোহ, পাহাড় চূড়ায় গহীন অরণ্য । ফলে শীত এবং বর্ষা সব সময়েই বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে জাফলং । জাফলংয়ের বুক চিড়ে বয়ে গেছে দুই নদী । ধলাই ও পিয়াইন । এই নদী দুইটি অন্যন্যতা এনে দিয়েছে জাফলংকে । ধলাই ও পিয়াইনের স্বচ্ছ জলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় নানা জাতের ছোট মাছ । দুই নদীর পানির নিচ থেকে ডুব দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের পাথর উত্তোলনের দৃশ্যও মুগ্ধ করে পর্যটকদের ।  সীমান্তের ওপারে ডাউকি নদীর উপরে দুই পাহাড়ের মধ্যখানে ঝুলন্ত সেতু বাড়িয়ে তুলেছে জাফলংয়ের সৌন্দর্য।

পাহাড়, পানি, পান, পাথর, ঝর্ণা সবমিলিয়ে জাফলং যেনো এক রূপকথার রাজ্য । নাগরিক জঞ্জাল আর কোলাহল ছেড়ে দু’দণ্ড শান্তি খুঁজে নিতে তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, এমনকি দেশের বাইরে থেকেও দলবেঁধে জাফলংয়ে বেড়াতে আসেন পর্যটকরা । ভাড়া নৌকায় পিয়াইন ও ধলাইর বুকে ভেসে বেড়ান তারা । পাহাড় আর নদীতে সীমাবদ্ধ নয় জাফলংয়ের সৌন্দর্য্য । জাফলংয়ের সৌন্দর্য্যে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে সেখানকার আদিবাসীদের জীবনধারা । নদী পার হলেই খাসিয়াপুঞ্জি । খাসিয়াদের গ্রামকে বলা হয় পুঞ্জি । এই পুঞ্জিগুলোতে গেলে দেখা যাবে ৩-৪ ফুট উঁচুতে বিশেষভাবে তৈরি খাসিয়াদের ঘর । প্রতিটি বাড়িতে সৃজিত পানবরজ। মাতৃতান্ত্রিক খাসিয়া সম্প্রদায়ের পুরুষরা গাছ বেয়ে বরজ থেকে পান পাতা সংগ্রহ করেন । আর বাড়ির উঠোনে বসে নারী সদস্যরা পান পাতা ভাঁজ করে খাঁচা ভর্তি করেন বিক্রির জন্য। পান পাতা সংগ্রহ ও খাঁচা ভর্তি করার অভিনব দৃশ্য পর্যটকদের নজরকাড়ে । পানবরজ ছাড়াও খাসিয়া পল্লীতে দেখা যাবে কমলা বাগান । কাঁচা-পাকা কমলায় নুয়ে আছে বাগানের গাছ । সংগ্রামপুঞ্জির রাস্তা ধরে আরেকটু এগুলো দেখা যাবে দেশের প্রথম সমতল চা বাগান । ইতিহাস থেকে জানা যায়, হাজার বছর ধরে জাফলং ছিল খাসিয়া জৈন্তা-রাজার অধীন নির্জন বনভূমি । ১৯৫৪ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির পর খাসিয়া জৈন্তা রাজ্যের অবসান ঘটে । তারপরও বেশ কয়েক বছর জাফলংয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পতিত পড়ে রয়েছিল ।ব্যবসায়ীরা পাথরের সন্ধানে নৌপথে জাফলং আসতে শুরু করেন । পাথর ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকায় গড়ে উঠে নতুন জনবসতিও । আশির দশকে সিলেটের সাথে জাফলং এর ৫৫ কিলোমিটার সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় । এরপর থেকে জাফলংয়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের কথা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে । দেশী-বিদেশী পর্যটকদের পাশাপাশি প্রকৃতিপ্রেমীরাও ভিড় করতে থাকেন জাফলংয়ে । একসময় দেশের সেরা পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয় জাফলং ।

পান্থশালা

পান্থশালা

সিলেট জাফলং রোডে শারিঘাট সংলগ্ন রয়েছে প্রাচীনতম পান্থ শালা । জমিদারি প্রথার সময় জৈন্তার প্রবেশদ্বার হিসেবে বিশ্রাম ও প্রবেশের জন্য সেখানে অপেক্ষমান খাকতে হত লোক-জনদের । তার শত বছর পুরাতন নিদর্ষণ আজ সু-সংরক্ষিত না থাকলেও জির্ন অবস্হায় রয়েছে।

যেভাবে যাবেন জাফলং : সিলেট নগরী থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় জাফলং এর অবস্থান । সিলেটে থেকে বাস, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা বা লেগুনায় যাওয়া যায় জাফলংয়ে । জাফলং যেতে জনপ্রতি বাস ভাড়া পড়বে ১৫গ টাকার মত । যাওয়া আসার জন্য মাইক্রোবাসের ভাড়া পড়বে ৩০০০-৪৫০০ টাকা । সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া পড়বে ১০০০-১৫০০ টাকা । সিলেট শহরের যেকোনো অটোরিকশা বা মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে যাওয়া যাবে জাফলংয়ে । আর জাফলংমুখী বাস ছাড়ে নগরীর কদমতলি টার্মিনাল থেকে । প্রতি এক ঘন্টা পরপর পাওয়া যাবে বাস ।

থাকা খাওয়া : জেলা পরিষদের বাংলো ছাড়া জাফলংয়ে থাকার তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই । এক্ষেত্রে পর্যটককে থাকতে হবে সিলেট শহরে । আর জাফলং যাওয়ার সময় খাবার সঙ্গে করে নিয়ে গেলেই ভালো হয় । কেননা খাসিয়া আদিবাসী গ্রাম সংগ্রামপুঞ্জিতে একমাত্র ক্যাফে সংগ্রাম ছাড়া জাফলংয়ে নেই কোনো ভালোমানের খাবার রেস্টুরেন্ট । জাফলংয়ের জেলা পরিষদে থাকতে চাইলে সিলেট আসার আগে ফোনে রিসোর্টটি বুকিং নিতে হবে । তবে সিলেটে শহরে থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে । ভিডিও টি ইউটউব থেকে সংগ্রহ :



এই প্রতিবেদন টি 7463 বার পঠিত.