বঙ্গবন্ধুকে বিনিময় প্রথায় লেনদেন করতে হয়েছিল

“রিজার্ভ শুন্য, তাই বঙ্গবন্ধুকে বিনিময় প্রথায় লেনদেন করতে হয়েছিল”DSC_0223

কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, “১৬ই ডিসেম্বরের আগ মুহূর্তে শত্রুরা এই মতিঝিলেই ব্যাংকের সব টাকা পুড়িয়ে দিয়েছিল। ব্যাংকে টাকা নেই, গুদামে চাল নেই, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল যেতে ছোট বড় মিলিয়ে ৩২ টি ব্রীজ ভাঙ্গা- এমনইভাবে সারা দেশে ছিল ভয়াবহ চালচিত্র। রিজার্ভ একেবারে শুন্য। বঙ্গবন্ধুকে প্রাচীন বিনিময় প্রথায় বহির্বিশ্বের সাথে লেনদেন করতে হয়েছিল। এমন শুন্য হাতে বঙ্গবন্ধু দেশ পরিচালনার ভার নিয়েছিলেন। কোনো আবেদন, আন্দোলন, শ্লোগান ছাড়াই একসাথে ৪২ হাজার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষককে সরকারি মর্যাদা দেন, কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ  করে দেন, পাকিস্তান আমালের সব ঋণ মাফ করে দেন। জ্বালানী ও সেচের ব্যবস্থা সরকারের কাঁধে তুলে নেয়াসহ অন্যের জন্য, মানুষের জন্য এমন অসংখ্য দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নেয়া শুধু তার পক্ষেই সম্ভব।”
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০তম শাহাদত বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস-২০১৫ উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক এমপ্লয়ীজ এসোসিয়েশন (সিবিএ) এর উদ্যোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২য় সংলগ্নী ভবনের ব্যাংকিং হলে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায়  কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চেীধুরী এম, পি, প্রধান অতিথি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

মন্ত্রী আরো বলেন, “বঙ্গবন্ধুই প্রথম শ্রমিক-কৃষক থেকে কৃষক-শ্রমিক অর্ডারে ডাকার প্রবর্তন করেন। কৃষক সাধারণ মানুষকে এমনই ভালবাসতেন বঙ্গবন্ধু।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, “বঙ্গবন্ধু সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে স¦াধীনতা-আন্দোলনকে পরিচালনা করেই তিনি তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সোনার বাংলা গড়ার সংগ্রামে নিয়োজিত হয়েছিলেন। তাঁর কৃষকদরদী নীতির ফলে কৃষিতে অগ্রগতির যে ধারা সূচিত হয়েছিল তার ফলে আজ দেশের কৃষি খাত শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীর নেতৃত্বে কৃষকবান্ধব কৃষি উৎপাদন ও সহযোগী কৃষি ঋণ, কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালা প্রয়োগের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটে গেছে। কয়েক বছর আগে যেখানে ১ বিলিয়ন ডলারের খাদ্য আমদানি করতে হতো, সেখানে এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি প্রথমবারের মত চাল রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। সরকারি গুদামে চাল ভর্তি। পরিকল্পনা চলছে কিভাবে কৃষকদের সর্বোচ্চ সাবসিডি/সুবিধা প্রদান করা যায়। বঙ্গবন্ধুর কৃষি-ভাবনার আলোকে বর্তমান সরকারের গৃহীত কল্যাণধর্মী ও কৃষকবান্ধব উন্নয়ন নীতি-কৌশলের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রকৃত কৃষক, বর্গাচাষি ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ সেবাসহ আধুনিক ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।”
তিনি আরো বলেন, “ গত ছয় বছরে আর্থিক খাতেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি মন্দার মধ্যেও গড়ে ৬.২ শতাংশেরও বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সতর্ক, সংযত কিন্তু উৎপাদনবান্ধব মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিম্নগামী, টাকার মূল্যমান স্থিতিশীল ও জোরালো রাখা সম্ভব হয়েছে। ছয় বছরে আমদানি বেড়েছে ৭৫ শতাংশ, রপ্তানি দ্বিগুণ হয়েছে, রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫০ শতাংশ। বিদেশি মুদ্রার মজুদ সাড়ে তিনগুণ বেড়ে ২৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার এই শক্তির জোরেই আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প হাতে নিতে পেরেছি। মাথাপিছু আয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১৪ ডলার। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের ধারা অক্ষুণœ রেখে আমরা নিম্ন আয়ের মানুষকে আর্থিক সেবায় অন্তর্ভুক্তির কৌশল গ্রহণ করেছি। আজকের অনুষ্ঠানে উপস্থিত দেশের সফল কৃষিমন্ত্রীর পরামর্শে ছয় বছর আগে কৃষক ও অন্যান্যদের নামে খোলা দশ টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংখ্যা বর্তমানে দেড় কোটিতে উন্নীত হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট রয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতিদিন ৪০০ কোটি টাকার মতো লেনদেন হচ্ছে। এ টাকার অধিকাংশই শহর থেকে গ্রামে যাচ্ছে। দারিদ্র্য চব্বিশ ভাগে নেমে এসেছে। এই হার আগামী দিনে আরও দ্রুত কমবে বলে আশা করা যায়। এই সময়ে ব্যাংক শাখার সংখ্যা ২৬ শতাংশ, ব্যাংকের আমানত ১৩৫ শতাংশ, ঋণ ১০২ শতাংশ এবং মূলধন ১৬৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি এক লাখ লোকের জন্য ব্যাংক শাখার সংখ্যা ৭টির জায়গায় বেড়ে হয়েছে ৮টি আর এটিএম চারগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৩৩টিতে। দেশের অর্থনীতি এসব আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সুফল পেতে শুরু করেছে। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়েছে। কর্মসংস্থান হয়েছে ঊর্ধ্বমুখী। দেশের ষাট ভাগ মানুষ এখন বিদ্যুৎ পাচ্ছে। সত্তর ভাগ মানুষ টেলিফোন সুবিধা পাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দ্রুতই উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে আমাদের প্রিয় এই বাংলাদেশ।
জাতির পিতা আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে, তিনি অমর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে তিনি আছেন চিরজাগ্রত। ছিলেন দেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক। আমাদের চেতনার অগ্নিমশাল। তাঁর আদর্শ চিরঅমøান। সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করে, তাঁরই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে দৃঢ় শপথ গ্রহণ করাই হবে আমাদের প্রথম দায়িত্ব। তাঁর অর্থনৈতিক ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে দেশের প্রত্যেকটি নাগরিককে প্রকৃত দেশপ্রেমিক, সৎ, নিষ্ঠাবান, সাহসী ও ত্যাগী দেশকর্মী হতে হবে। তাঁর সংগ্রামী জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাইকে কাজ করতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ হয়ে উঠবে সত্যিকারের ‘ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা’, যেমনটি বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন। আশার কথা, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণে বাংলাদেশের তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার জনহিতৈষী পদক্ষেপ, উন্নত রাষ্ট্রচিন্তা, স্থিতিশীল অর্থনীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উজ্জীবিত করার মাধ্যমে দেশকে জোরকদমে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের ‘ভিশন’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নিরন্তর সক্রিয় থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।”
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মোঃ আবুল কাসেম, আবু হেনা মোহাঃ রাজী হাসান, এস.কে. সুর চৌধুরী ও নাজনীন সুলতানা। সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সিবিএ সাধারণ সম্পাদক মন্জুরুল হক; সভাপতিত্ব করেন সিবিএ সভাপতি মোঃ কামাল মিয়া। এসময় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকবৃন্দ, মহাব্যবস্থাপক, বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।



এই প্রতিবেদন টি 728 বার পঠিত.