তৃণমূল পর্যায়ে লক্ষ নেতা প্রয়োজন//প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক

inamul hoq
বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে শেরে বাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই চার বড় নেতা। শেরে বাংলা (১৮৭৩-১৯৬২) কলকাতার প্রথম মুসলিম মেয়র, এবং বৃটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তিনিই ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে ‘লাহোর প্রস্তাব’ উত্থাপন করেন, যা’তে বলা হয়, ‘উপমহাদেশের যেসকল এলাকা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট সেসকল এলাকা একত্রিত করিয়া স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠন করিতে হইবে। এই রাষ্ট্রসমূহের অন্তর্ভুক্ত অংশগুলি হইবে স্বায়ত্বশাসিত এবং সার্বভৌম’। কিন্তু ১৯৪৬ সালের ৮ এপ্রিল দিল্লীতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সভায় বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯২-১৯৬৩) মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট বাংলা, সিন্ধু ও পাঞ্জাব একত্রিত করে ‘পাকিস্তান’ গঠনের প্রস্তাব করেন। স্বাধীন পাকিস্তানে শেরে বাংলা পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এবং পরে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর হন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্ত্র এঁরা স্বাধীন পাকিস্তানে পূর্ব বাংলার মানুষের আশা আকাঙ্খা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের সময় পূর্ব পাকিস্তানে ‘যুক্তফ্রন্ট’ এর বড় নেতারূপে উঠে আসেন। তিনি লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি সমাজে ন্যায়বিচার ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ‘ছয় দফা’ কর্মসূচী দিয়ে পূর্ব বাংলার প্রধান নেতা হয়ে যান। স্বাধীন বাংলাদেশে মওলানা ভাসানীর (১৮৮৫-১৯৭৬) ভূমিকা অনেকটা গৌন হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলে ১৯৭৫ সালে দেশে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করেন। এরপর এক ষড়যন্ত্রে নিহত হলে তিনি তাঁর শাসনের সুফল দিয়ে যেতে পারেননি। এরপর দেশের নেতা হন দুই সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তারপর জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। জিয়াউর রহমান দেশে মুক্ত বাজার  অর্থনীতি চালু করেন, তবে তিনিও এক ষড়যন্ত্রে নিহত হন। পরবর্তী জেনারেল এরশাদ তাঁর স্বেচ্ছাচারিতার জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন ও তাঁর বিরুদ্ধে গণ অভ্যুত্থান ঘটে। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নেতা হন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া এবং তারপর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এঁরাও সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্খা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

বাংলার নেতারা কি হিন্দু কি মুসলমান হয় জাতিয়তাবাদী ছিলেন নয় কমিউনিস্ট ছিলেন। এঁরা অনেকেই কৃষক নেতা বা শ্রমিক নেতা হিসেবে মাঠে কাজ করেছেন। বৃটিশ আমলে এঁরা অনেকেই স্বাধীনতার লক্ষে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন। পাকিস্তান আমলে যাঁরা সন্তুষ্ট হননি তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। এর বিপরীতে ধর্মরাজ্য বা ইসলাম কায়েমের মাধমে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে বলে যাঁরা বিরোধিতা করেছেন তাঁরা ইতিহাসের খলনায়ক হয়েছেন। তাই আজ স্বাধীনতার ৪৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার ধারক কারা তা’নিয়ে নতুনভাবে বিতর্ক হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান সমগ্র বাঙালীর হলেও একে দলীয়করণ করার প্রচেষ্টা রয়েছে। বলাই বাহুল্য, বঙ্গবন্ধূ পরবর্তী আমলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শ্লোগান প্রবর্তন এদেশের মানুষকে দু‘টি বিপরীত ধারায় প্রবাহিত করে বাংলাদেশের জনগণকে দ্বিধাবিভক্ত করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সময়ে কোনো নেতৃত্বই সর্বজনের আস্থা সৃষ্টি করতে পারছে না। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান যুবসমাজের কাছে কোন আদর্শ নেই।

বাংলাদেশের যুবসমাজের যে পরিণতিই হোক, এর সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায়, তথ্য ও প্রযুক্তিতে এবং শহরের দালান কোঠায় বাংলাদেশের আনাচে কানাচে উন্নতির ঢেউ বয়ে চলছ্।ে বলাই বাহুল্য, এইসব উন্নতির সাথে সাথে উন্নতি হচ্ছে একটি বিশেষ মহলের যারা সরকার দলীয় রাজনীতির সাথে জড়িত। এরা ছাত্র নেতা হলে ছাত্রাবস্থাতেই শত শত কোটি টাকার মালিক, যুব নেতা, কৃষক নেতা, শ্রমিক নেতা, ইত্যাদি হলে তো কথাই নেই। মাধ্যম দুর্নীতি। দলীয় পরিচয়ে সরকারী ও সেরকারী ব্যাংক, বিদ্যালয়, কর্পোরেশন, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, জেলা পরিষদ ইত্যাদির চেয়ারম্যান বা পরিচালক হয়ে চলছে যথেচ্ছ লুটপাট। এই লুটপাটের একটি অংশ তারা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিনিয়োগ করছে, ফলে সেগুলিরও উন্নতি হচ্ছে, বেড়ে চলছে ধর্মচর্চা। তবে এসব ধর্মচর্চা আনুষ্ঠানিক ও ভন্ডামিপূর্ণ বিধায় ধর্মীয় নেতাদের উপর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কোন আস্থা নেই।

বাংলাদেশে মূল নেতাদের অবর্তমানে চলছে গদ্দীনশীন নেতাদের গলাবাজি। এসব নেতারা কেউ পীরজাদা, কেউ সাহেবজাদা কেউ শেখজাদা। এঁরা কেউ মাঠ থেকে উঠে আসেননি, তাই এঁরা সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট বোঝেন না। এঁরা সুবিধাভোগী পন্ডিত আর চাটুকারদের নিয়ে লক্ষ কোটি আম জনতার ঘাড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এঁরা আম জনতার ঘাড়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ চাপিয়ে দলবল নিয়ে নিজেরাই সেসব লুটপাট করছেন। এঁদের বাইরে নানা দলের যেসব নেতাদের গলা শোনা যায় তাঁরা সব ‘টক শো’র বা কাগুজে নেতা; তাঁরা লুটপাটের সামান্য কিছু উচ্ছিষ্ট পেলেই লেজ গুটিয়ে সরে দাঁড়াবেন।

বাংলাদেশ কোন মহল বা দল বা এলাকার মানুষের সম্পত্তি নয়। এই দেশ সাত কোটি মানুষের মুক্তিযুদ্ধের ফসল। এই স্বাধীন দেশে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারসমূহ সর্বাগ্রে বিবেচ্য। এই অধিকারসমূহ জানা এবং বাস্তবায়ন করা কোন গদ্দীনশীন নেতার মিথ্যা গলাবাজিতে হবে না, তৃণমূল পর্যায়ে লক্ষ নেতার প্রয়োজন হবে।



এই প্রতিবেদন টি 410 বার পঠিত.