শিরিন ওসমান এর অনুগল্প

শাবানা

বলা নেই কওয়া নেই একদিন বেলা এগারোটায় দুইটি ফুটফুটে ছেলে নিয়ে শাবানা আমার বাসায় এসে হাজির। বড় ছেলের বয়স বছর চারেক ছোটটির দেড় বছর হবে। এখনো বুকের দুধ খায়।

শাবানাক প্রথম যখন দেখি, তার বয়স ১০/১১ হবে। কালো গায়ের রং মাথায় চুল ছোট করে কাটা। সারাক্ষন মুখে হাসি। ফকফকে দাঁত। ঢাকার জিঞ্জিরায় তার জন্ম। বাবা মারা গেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা আবার বিয়ে করে স্বামীর সাথে গ্রামে থাকে। শাবানা খালার কাছে রয়ে যায়। খালা আমার বাসায় কাজে দিয়ে যায়।

ওর মুখে ঢাকাইয়া বুলি সারাক্ষন বাজতে থাকে। বাসায় আমার শ্বাশুরীর সাথে তার বিশেষ ভাব। তিনি তাকে সাথে সাথে রাখতেন। সে তার এলাকা জিঞ্জিরার গল্প করতো খুব করে। আমাদের সাথে টিভি দেখতো পা ছড়িয়ে। মনে হতো টি ভির ভেতরে ঢুকে গেছে। এমন মনযোগে দেখতো যে মাঝে মাঝে হাহা করে হেসে ওঠলে পর চমকে ওঠতে হতো।

অনেকদিন ছিল। ১৬/১৭ বছর বয়স হবে তখন শাবানার খালা এসে ওকে নিয়ে যায়। আর খোঁজ নাই। মনে মনে ধরে নেই ওর নিশ্চয় বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্য, আমাদের বলবে না? ওর বিয়েতে কতকি দেবো ভেবে রেখেছিলাম। সময়ে শাবানাকে সবাই ভুলে যায়। দুই বাচ্চার মা শাবানাকে দেখে আমার শ্বাশুরীমা যারপরনাই বেজায় খুশী।

ও বলতে থাকে, তার স্বামী তাদের খাবার খরচ দেয় না। নেশাভাঙ করে। তার অনেক কষ্ট করে চলতে হয়। সে হাতে তৈরী বিভিন্ন রকম চিপস্ বানায়। দোকানে সাপ্লাই দেয়। ওই থেকে কিছু আয় হয়। খুব ভোরে উঠে পাইকারিদের থেকে শাক তরিতরকারী এনে বাজারে বিক্রি করে। কোলের ছেলেটা সবসময় সাথে থাকে। কানলে বাজারেই শাড়ীর আঁচল দিয়ে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ায়। তার স্বামী ষাটোর্ধ। আমার মনে হয় তার খালা টাকা নিয়ে এই বুড়ার কাছে বিয়ে দেয়। তাই আমাদের জানায় নাই।

শাবানা আমাদের জন্য তার বানানো চিপস নিয়ে আসে। নানী,আপনেরে দেখবার লাইগ্যা ছুইট্টা আইছি। পরান চিলবিল করতে আছিল। পোলাপান লইয়া আইয়া পরলাম। অগোর বাপরে খেদাইয়া দিসি। বুড়া একনম্বর পাজি। এলাকার হক্কলে আমার দিকে খেয়াল করে।তাগোরে কইছি আমার ঘরে যেন পোলার বাপরে আইতে না দেয়। মুরোদ নাইক্কা আইয়া বারতি প্যাঁচাল পারে।

আমি অবাক হয়ে দেখি শবানাকে। যেন কত বড় হয়ে গেছে। নিজর সন্তানদের নিয়ে স্ট্রাগল করছে। কত অভিজ্ঞতা তার। নিজের স্বাধীন জীবন বেছে নিতে পেরেছে। এরপর থেকে শাবানা প্রায় আসতো। আমার শ্বাশুরীমা তার জন্য টাকা রেখে দিতেন। ঈদ আসলে সবাই মানে আমার ননদ, জা সবাই জাকাতের কাপড দিত।

একদিন দেখি কোলে একটি মেয়ে। বছর দুই হবে। কে রে মেয়েটা? উত্তর দেয় আমার মেয়ে। তোর মেয়ে? হ, ওর মায় মারা গেছে। যাওনের সময় আমার কাছে তুইলা দিছে। আমারে বড় ভালা জানত ওর মায়। এখন অয় আমার মাইয়া।

আমি বলি,তুই এত কষ্ট করিস আবার ওকে পালবি কি করে?
আল্লায় দেখব মামী। অর ভাইয়েরা জব্বর আদর করে। খালি হাতে ঘরে ঢুকে না।

মেয়েটি দেখতে বেশ মিষ্টি। শাবানা মেয়েটিকে পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছে। ততোদিনে ওর বড় ছেলেকে একটি মেশিন টুলস্ ফেক্টরিতে কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ছোট ছেলে সিক্সে পড়ে। শাবানার ব্যবসা,তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে স্বামীহীন সংসার নিয়ে সে খুশী। হাসি মুখ। দু্খ্য-তাপ নাই।

আমাগো জীবন তো এমনেই কাইট্টা যায় মামী। দুনিয়ার ব্যাকতের জীবন তো সমান না। আপনেগো কাছে আছিলাম বইলা আহি আপনেগো মায়ায়। আপনারা আমারে সাহায্য করেন।

শাবানার জীবন নিয়ে তার য়ুক্তি শোনে আমি ওর মুখের পানে তাকাই। জীবন থেকে শাবানা কতো কিছু শিখে গেছে।

যথারীতি শাবানার আসা যাওয়া চলে ।মাঝ খানে তাকে আর আসতে দেখি না। অনেকদিন পর শাবানা লম্বা সালোয়ার কামিজ পড়ে হাজির।

কি রে? ওর মন বেশ ভার।
বলে,মাথা ব্যথা । ডাক্তারে কয় অপারেশন করন লাগবো।

আমি বলি ভাল ডাক্তার দেখা। টিউমার নাও হতে পারে। গরীব শাবানা যদি অপারেশন লাগে, এতো টাকা পাবে কোথায়?

অষুধ দিছে ডাক্তার। যদি ভাল হয়? মামী দোয়া করবেন। আমি কিছু টাকা দেই হাতে। শাবানা চলে যায়।

আমার শ্বাশুরী ইন্তেকাল করেছেন। শাবানা অনেক বছর হয় আসে না। ওর কোন কন্ট্রাক নাম্বার নাই আমার কাছে। কেমন আছে শাবানা কে জানে? মাঝে মাঝে ওর কথা মনে পড়ে। ওর মেয়েটা কত বড় হলো? শাবানা বেঁচে আছে তো?



এই প্রতিবেদন টি 353 বার পঠিত.