রবীন্দ্রনাথের গ্রাম ভাবনা

 

সৌমিত্র দেব Soumitra dev

গ্রামকে খুব বড় করে দেখতেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। যদিও তাঁর পরিবারে বাবা ও অন্যান্য ভাই-বোনেরাও গ্রামের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তবু তিনি এক নতুন মাত্রায় গ্রামকে নিয়ে ভেবেছেন। গ্রামের উন্নয়নের কথা চিন্তা করেছেন। গ্রাম্য দর্শনকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরেছেন। পাশ্চাত্যের শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত হয়েও গ্রাম নির্ভর প্রকৃত শিক্ষা খুঁজতে তিনি চলে গেছেন বোলপুরের শান্তি নিকেতনে। কৃষকদের অর্থনৈতিক ভিত্তি দেয়ার জন্য তিনি ক্ষুদ্র ঋণের কথা ভেবেছেন। ১৯০৫ সালের সেই ভাবনা বাস্তব রূপ লাভ করে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর। নোবেলের প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তিনি কৃষকদের জন্য পতিসরে তৈরি করেন প্রথম কৃষি ব্যাংক।

 

১৮৭৫ সালে ১৪ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ প্রথম বাবার সঙ্গে গ্রামে গিয়েছিলেন। তাঁর গ্রাম ভাবনা নিয়ে আবদুশ শাকুর লিখেছেন : ‘মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রত্যক্ষভাবে জমিদারি দেখাশোনা ছেড়ে দিলে, তাঁর প্রতিভূ নিযুক্ত হন জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ। মহালে গিয়ে তিনি গ্রামের দুরবস্থা দেখেই পিতাকে তার করেন ‘সেন্ড ফিফটি থাউজেন্ড’ এবং উত্তর পান ‘কাম ব্যাক্’। অতঃপর তাঁর বড় ছেলে দ্বিপেন্দ্রনাথ প্রমুখের ব্যর্থতার পরে ১৮৯০ সালে ব্যবস্থাপক হন রবীন্দ্রনাথ। তিনি অবশ্য গোড়ায় পান কেবল জমিদারি পরিদর্শনের ভার। সফল শিক্ষানবিশির পরে রবীন্দ্রনাথ ‘পাওয়ার অফ এটর্নি’র মাধ্যমে পিতার কাছ থেকে সমগ্র সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের সর্বময় কর্তৃত্ব পান ১৮৯৬ সালের ৮ই আগস্ট।

 

দেখার বিষয়, জমিদারির ম্যানেজারিতেও তিনি এগোলেন প্রথা ভাঙার কঠিন রাস্তায়। তাঁর ওপর ন্যস্ত দায়িত্বের অতিরিক্ত বেশ কিছু করণীয় কর্মের সাধনকল্পে। রবীন্দ্রনাথের অন্তরের কথা ছিল- ‘ফিরে চল্ মাটির টানে’। তিনি জানতেন ‘বিদেশী রাজা চলিয়া গেলেই দেশ যে আমার স্বদেশ হইয়া উঠিবে, তাহা নহে।’ তিনি বুঝেছিলেন, গ্রামই দেশের প্রাণ; গ্রামের উন্নতি ছাড়া দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই নিজের জমিদারিতে পল্লী উন্নয়নের প্রয়োজনের তিনি বলেন : ‘আমি একলা সমস্ত ভারতবর্ষের দায়িত্ব নিতে পারব না। আমি কেবল জয় করব একটি বা দু’টি ছোট গ্রাম। এদের মনকে পেতে হবে, এদের সঙ্গে একত্র কাজ করবার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। সেটা সহজ নয়, খুব কঠিন কৃচ্ছ্রসাধন। আমি যদি কেবল দু’টি তিনটি গ্রামকেও মুক্তি দিতে পারি অজ্ঞতা অক্ষমতার বন্ধন থেকে, তবে সেখানেই সমগ্র ভারতের একটি ছোট আদর্শ তৈরি হবে।’

 

তিনি নিজে ধনকামী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও বলতে পেরেছিলেন : ‘ধনের ধর্ম অসাম্য। ধনকামী নিজের গরজে দারিদ্র্য সৃষ্টি করিয়া থাকে।’ জমিদারি ব্যবসা সম্পর্কে তাঁর যত বিতৃষ্ণাই থাকুক, রবীন্দ্রনাথ কিন্তু দেশকে চিনেছিলেন এই জমিদারি পরিচালনা করতে এসেই। তাঁর জীবনে নতুন মোড় ফিরেছিল ১৮৯১ সালে। তখনই তাঁর মাটিসংলগ্ন জীবনটির গোড়াপত্তন।
১৯০৬ সালে কৃষিবিদ্যা ও গোষ্ঠবিদ্যা শেখাতে তিনি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বন্ধুপুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে পাঠালেন আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯০৭ সালে কনিষ্ঠা কন্যা মীরার বিবাহের পর জামাতা নগেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীও বিদেশে প্রেরিত হন কৃষিবিদ্যা পড়ার জন্য। যে-যুগে সন্তানদের আই.সি.এস বা ব্যারিস্টার বানানো ধনী বাঙালি পরিবারের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, সে-সময় জনৈক ধনী জমিদারের পুত্র, জামাতা ও বন্ধুপুত্রকে চাষাবাদ শিখতে বিদেশ পাঠানোর মতো একটা বিপ্লবাত্মক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন একমাত্র রবীন্দ্রনাথের মতো একজন দায়বদ্ধ স্বদেশভাবুকের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল।

 

ব্যতিক্রমধর্মী এই উদ্যোগটির পেছনে কাজ করেছে গ্রামবাংলার জনসাধারণের উন্নতিবিধান এবং বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষ ও ফসল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার তাগিদ। ১৯০৯ সালে রথীন্দ্রনাথরা বিদেশ থেকে ফিরে কবির তত্ত্বাবধানে শুরু করেন বৈজ্ঞানিক প্রথায় চাষ, সার, বীজ, সেচ ইত্যাদির ব্যবহার। আজ যে-পন্থায় উপমহাদেশে চাষবাস করা হয় সে-প্রক্রিয়া রবীন্দ্রনাথ শুরু করেন শতবর্ষ পূর্বে। শিলাইদহের কুঠিবাড়ি সংলগ্ন ৮০ বিঘা খাস জমিতে চালু হয় সুদূর ভবিষ্যৎমুখী সেই আধুনিক কৃষি খামার, যার আদলে পুরো গ্রামেই গড়ে উঠবে এর রক্ষাকবচ সমবায়ী খামার।

 

১৯২১ সালে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা, শান্তিনিকেতনে। পরের বছর পাশেই এর পরিপূরক প্রতিষ্ঠান শ্রীনিকেতনের সৃষ্টি। পল্লী-সংগঠনের অনেক পরিকল্পনা পতিসর থেকে স্থানান্তরিত হল শ্রীনিকেতনে। এল্মহার্স্ট সাহেব ও কালীমোহন ঘোষ নিলেন তার ভার। লক্ষণীয় যে, ১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথ শেষবার যান শিলাইদহে। সে বছরই বোলপুরে শুরু হয় শ্রীনিকেতনের নতুন কর্মযজ্ঞ। জমিদারি পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে পল্লী সংগঠনের আদিপর্বে বাংলাদেশের মরা গাঙে আদি জোয়ারটি এনেছিলেন রবীন্দ্রনাথই। ১৮৯১ সালে জমিদারির শিক্ষানবিশি করতে এসেই রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমান-ব্রাহ্মণ-চণ্ডালের ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দিয়ে তাঁর কর্মক্ষেত্রে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন নতুন সংঘাতের অমোঘত্বের কথা জেনেও। সংঘাতের মোকাবিলায় কর্মসূচি ঘোষণা করে প্রথমেই তিনি তাঁর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা প্রকাশ করলেন, ‘সাহাদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাতে হবে।’ এই সাহা-শেখ কোনো সাম্প্রদায়িক অর্থে নয়; যথাক্রমে ‘আমলা’ আর ‘চাষা’ অর্থে। এই কর্মসূচির বাস্তবায়নে বহু ‘আমলা’র চাকরিও গিয়েছে।

 

কৃষিবিদ শাইখ সিরাজের মতে, ‘সাহিত্য সৃষ্টি যেমন ছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনের সোনালি অধ্যায়, একইভাবে গ্রাম উন্নয়ন, সমবায়, দারিদ্র্য বিমোচন, প্রান্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সাংগঠনিক চেতনা সর্ব ক্ষেত্রেই হাতে-কলমে পরীক্ষাভূমি ছিল এটিই। বিশেষ করে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ি ও এর সংলগ্ন এলাকা, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, নওগাঁর পতিসর ও শ্বশুরালয় খুলনার দক্ষিণডিহি। এসব এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে এখনো রবীন্দ্রনাথ এক অন্য মানুষ। শুধু কবি নন, একজন প্রজাদরদি জমিদার, উন্নয়নের এক পথ-প্রদর্শক, একজন দার্শনিক, একজন সংগঠক ও একজন প্রকৃত নেতা। আমি ২০০৫ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথের কৃষি, সমবায়, পল্লী উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে খোঁজ-খবর করার জন্য একাধিকবার শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরে গেছি। সেখানকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছি। দেখেছি, অনেক কৃষকও পূর্বপুরুষের মুখে এক প্রজাদরদি জমিদারের কথা শুনেছেন যিনি কৃষকের, জেলের, কামারের, কুমারের জীবনকে উন্নত করার জন্য ছিলেন দারুণ আন্তরিক।

 

সমাজ ভেদ’ প্রবন্ধে তিনি বলেন : ‘দেশের অন্নে টোলের আর পেট ভরিতেছে না; দুর্ভিক্ষের দায়ে একে একে তাহারা সরকারি অন্নসত্রের শরণাপন্ন হইতেছে; দেশের ধনী মানীরা জন্মস্থানের বাতি নিবাইয়া দিয়া কলিকাতায় মোটর গাড়ি চড়িয়া ফিরিতেছে। তাই দেশের জমিদারদিগকে বলিতেছি, হতভাগ্য রায়তদিগকে পরের হাত ও নিজের হাত হইতে রক্ষা করিবার উপযুক্ত শিক্ষিত সুস্থ ও শক্তিশালী করিয়া না তুলিলে কোনো ভালো আইন বা অনুকূল রাজশক্তির দ্বারা ইহারা কদাচ রক্ষা পাইতে পারিবে না। ইহাদিগকে দেখিবামাত্র সকলেরই জিহ্বা লালায়িত হইবে। এমনি করিয়া দেশের অধিকাংশ লোককেই যদি জমিদার মহাজন পুলিশ কানুনগো আদালতের আমলা, যে ইচ্ছা সে অনায়াসেই মারিয়া যায় ও মারিতে পারে, তবে দেশের লোককে মানুষ হইতে না শিখাইয়াই রাজা হইতে শিখাইব কেমন করিয়া?’ রাশিয়ার চিঠিতে তিনি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন জমিদারি পরিচালনার সময় তাঁর অভিপ্রায় কী ছিল : ‘চাষীকে আত্মশক্তিতে দৃঢ় করে তুলতে হবে, এই ছিল আমার অভিপ্রায়। এ সম্বন্ধে দুটো কথা সর্বদাই আমার মনে আন্দোলিত হয়েছে, জমির স্বত্ব ন্যায়ত জমিদারের নয়, সে চাষীর। দ্বিতীয়ত, সমবায়নীতি অনুসারে চাষের ক্ষেত্র একত্র করে চাষ না করতে পারলে কৃষির উন্নতি হতেই পারে না। মান্ধাতার আমলের হাল লাঙল নিয়ে আল-বাঁধা টুকরো জমিতে ফসল ফলানো আর ফুটো কলসীতে জল আনা একই কথা।’

 

রবীন্দ্রনাথের মতে ‘গ্রামের কাজের দুটো দিক আছে। কাজ এখানে থেকে করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাও করতে হবে। এদের সেবা করতে হলে শিক্ষা লাভ করা চাই।’ মানে, এদের থেকে আগে শিক্ষা নেওয়া চাই। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য যে উল্লিখিত সমাজতত্ত্বের মৌল সত্যগুলিকে রবীন্দ্রনাথ ভাষায় প্রকাশ করার পরে বাস্তবেও প্রমাণ করেছেন বিশ শতকের শুরুতে। সেসব এড়িয়ে গিয়ে আমরা কেবল তাঁর কাব্য পড়েছি আর গান গেয়েছি। প্রতিপক্ষে একই বাণী পঞ্চাশ বছর পর মাও সে তুং প্রচার করামাত্রই তাঁর কাছ থেকে আমরা তা কোরানের বাণীর মতো শ্রদ্ধাভরেই গ্রহণ করেছি। পল্লী সংগঠনের প্রথম পর্যায়েই রবীন্দ্রনাথ চালু করেন হিতৈষীবৃত্তি ও কল্যাণবৃত্তি। সংগৃহীত সব টাকাই ব্যয় হতো জমি ও প্রজার উন্নয়নে। প্রজাদের কাছ থেকে হাল-বকেয়া খাজনার টাকা-প্রতি তিন পয়সা হিসাবে হিতৈষীবৃত্তি আদায় হতো। জমিদারি সেরেস্তা থেকে মোট সংগৃহীত টাকার সমপরিমাণ দেওয়া হতো। পরবর্তীকালের সরকারি ‘বেনিভোলেন্ট ফান্ড’ বা হিতৈষী তহবিলের ‘একুইটি গ্রান্ট’ বা সমহারিক দান হিসেবে। সেই টাকা খরচের ব্যবস্থা করত প্রজাদের দ্বারা নির্বাচিত হিতৈষী সভা। কল্যাণবৃত্তিও টাকায় তিন পয়সা। তার জন্যে আলাদা রসিদও দেওয়া হতো এবং আদায়ের সমপরিমাণ টাকা দিতেন জমিদার নিজে। এইভাবে বছরে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা সংগৃহীত হতো। তাছাড়া সায়রাত-মহাল বন্দোবস্ত হলে মোট নজরের শতকরা আড়াই টাকা ও নাম খারিজের নজরানা সরকারি আইনে শতকরা পাঁচ টাকা আদায় হতো। এই টাকাই ব্যয় হয়েছে রাস্তাঘাট নির্মাণে, মন্দির-মসজিদ সংস্কারে, স্কুল-মাদ্রাসা স্থাপনে আর চাষীদের বিপদ-আপদের সাহায্যে।

 

শিলাইদহে স্থাপিত হয় মহর্ষি দাতব্য চিকিৎসালয়। পতিসরে বসানো হয় বড় হাসপাতাল এবং কালীগ্রাম পরগণার তিনটি বিভাগে নিয়োজিত হন তিন জন ডাক্তার। ‘হেলথ্ কোঅপারেটিভ্’-এর মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা ভারতবর্ষে প্রথম চালু করেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর নিজ জমিদারিতে। এই প্রজাহিতৈষী জমিদার কুষ্টিয়া থেকে শিলাইদহ পর্যন্ত ছয় মাইল রাস্তা তৈরি করিয়ে দেন এই শর্তে যে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে স্থানীয় গ্রামবাসী। কুয়ো খোঁড়ার দায়িত্ব দেন গ্রামবাসীকে আর তিনি দায়িত্ব নেন এস্টেট থেকে কুয়ো বাঁধানোর। পুকুর সংস্কারও চলে একই রীতিনীতিতে। রবীন্দ্রনাথের অংশীদারি-ভিত্তিক উন্নয়নের কার্যকর এই নীতিটিকে তাঁর স্বকালে কেউ আমলে নেয়নি। কিন্তু একই জিনিস ‘পার্টিসিপেটরি ডেভেলপমেন্ট ফরমুলা’ নামে পশ্চিম থেকে নাজেল হওয়ামাত্রই তার ওপর পিএইচ.ডি. অর্জনের জন্যে দলে দলে লাইনে দাঁড়িয়েছেন এদেশের মেধাবীগণও। পতিসরে কবি একটি ধর্মগোলাও বসান, সেখানে এবং শিলাইদহে স্থাপন করেন আদর্শ কৃষিক্ষেত্র যেখানে সুদূর অতীতের সেই ১৯১০ সালেই ব্যবহৃত হয় ট্রাক্টর, পাম্পসেট আর জৈব সার এবং চাষ হয় তখনকার উচ্চফলনশীল ফসল। নৌকো বোঝাই নষ্ট ইলিশ সস্তায় কিনে তাতে চুন দিয়ে মাটিতে পুঁতে তৈরি হয় এই জৈবসার। অধিক ফলনের জন্যে প্রতিষ্ঠিত হয় কৃষি ল্যাবরেটরি। কালীগ্রামে চাষ সম্পর্কে এক চিঠিতে কাব্যরসের কারবারী তাঁর জনৈক কর্মীকে লিখছেন : ‘প্রজাদের বাস্তুবাড়ি, ক্ষেতের আইল প্রভৃতি স্থানে আনারস কলা খেজুর প্রভৃতি ফলের গাছ লাগাইবার জন্য তাহাদের উৎসাহিত করিও। আনারসের পাতা হইতে খুব মজবুত সুতা বাহির হয়। ফলও বিক্রয়যোগ্য। শিমুল, আঙ্গুর গাছ বেড়া প্রভৃতির কাজে লাগাইয়া তার মূল হইতে কিরূপে খাদ্য বাহির করা যাইতে পারে তাহাও প্রজাদিগকে শিখানো আবশ্যক। আলুর চাষ প্রচলিত করিতে পারিলে বিশেষ লাভের হইবে।’

 

কুটিরশিল্পের উন্নয়নেও হাত দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বয়নশিল্প শেখাতে শ্রীরামপুরে নিয়ে যাওয়া হলো একজন তাঁতীকে। স্থানীয় একজন মুসলমান জোলাকে পাঠানো হলো শান্তিনিকেতনে তাঁতের কাজ শিখতে। তিনি এসে খুললেন তাঁতের স্কুল। পটারির কাজেও হাত দেওয়া হলো একই সময়ে। রবীন্দ্রনাথ পুত্র রথীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে লেখেন : ‘বোলপুরে একটা ধানভানা কল চলচে, সেই রকম একটা কল এখানে (পতিসরে) আনতে পারলে বিশেষ কাজে লাগবে। এখানকার চাষীদের কোন industry শেখানো যেতে পারে সেই কথা ভাবছিলুম। এখানে ধান ছাড়া আর কিছু জন্মায় না। এদের থাকবার মধ্যে কেবল শক্ত এঁটেল মাটি আছে। আমি জানতে চাই Pottery জিনিসটাকে Cottage industry- রূপে গণ্য করা চলে কিনা। একবার খবর নিয়ে দেখিস ছোটখাট furnace আনিয়ে এক গ্রামের লোক মিলে এ কাজ চালানো সম্ভবপর কিনা। আরেকটা জিনিস আছে ছাতা তৈরি করতে শেখানো। সে রকম শেখাবার লোক যদি পাওয়া যায় তাহলে শিলাইদহ অঞ্চলে এই কাজটা চালানো যেতে পারে। নগেন্দ্র (রবীন্দ্রনাথের শ্যালক) বলছিল খোলা তৈরি করতে পারে এমন কুমোর এখানে আনতে পারলে বিস্তর উপকার হয়। লোকে টিনের ছাদ দিতে চায় পেরে ওঠে না; খোলা পেলে সুবিধা হয়।’

 

দয়ালু জমিদার সাজার বদলে স্বাবলম্বী প্রজা বানাবার ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগী জমিদার রবীন্দ্রনাথের প্রজাসাধারণের সামাজিক অস্তিত্বের সার্বিক দিকে মনোযোগ দেবার প্রক্রিয়ায় সালিশির দিকেও নজর পড়েছিল। তিনি প্রজাদের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা চালু করে দিলেন। তাঁর আমলে জমিদারির মধ্যে কোনো বিবাদ নিয়ে প্রজারা আদালতে যেত না। প্রত্যেক গ্রামের লোকেরা তাঁদের ভিতর থেকে একজনকে প্রধান মনোনীত করতেন। ওই গ্রামপ্রধানরাই পরে আবার পরগণার সব প্রধানদের মধ্য থেকে পাঁচজনকে মনোনীত করতেন। তাঁদের বলা হতো পঞ্চপ্রধান। বিবাদ ও বিরোধ পঞ্চপ্রধানরাই মিটিয়ে দিতেন। শেষ আপীল রবীন্দ্রনাথের কাছে। এই বিচারে অসন্তুষ্ট হয়ে কোনো পক্ষ আদালতে নালিশ করলে গ্রামের লোকেরা তাঁকে সমাজচ্যুত করে দিতেন। রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত এই বিচার ব্যবস্থায় মামলার কোনো খরচ লাগত না, বিচারে বিলম্বও হতো না। এই ব্যবস্থা কালীগ্রাম পরগণায় রবীন্দ্রপ্রয়াণের পরেও দেশবিভাগ পর্যন্তই চালু ছিল।

 

তাহলে দেখা যায় যে, গ্রামপঞ্চায়েত প্রথা প্রবর্তনেরও পূর্বসূরি সমাজতাত্ত্বিক রবীন্দ্রনাথ, রাজনীতিক ফজলুল হক ও জ্যোতি বসু প্রমুখ তাঁর দূরবর্তী ও সুদূরবর্তী উত্তরসূরিমাত্র। সমবায় সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহও তাঁর কর্ম জীবনের সেই আদি যুগের। তিনি পরিষ্কার বলেছিলেন, ‘গ্রামকে বাঁচাতে হলে সমবায়নীতি ছাড়া আমাদের উপায় নেই।’ ঐকত্রিক চাষ সম্বন্ধেও পথিকৃতের অবদান রবীন্দ্রনাথের, যিনি পতিসরে সেই ১৯০৫ সালেই কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন সমবায়নীতি বাস্তবায়নকল্পে। তিনি দেখলেন, মহাজনদের কাছ থেকে চাষীদের মুক্ত করতে না পারলে দেশের দুর্গতি দূর হবে না। কৃষি বা কুটিরশিল্পের জন্য যে মূলধন দরকার তা তারা কোনদিনই সংগ্রহ করতে পারবে না। চাষীদের অল্প সুদে ঋণ দিতে তাই খোলা হলো পতিসর কৃষি ব্যাংক। এই ব্যাংকের ঋণে প্রজাদের দারুণ উপকার হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তারা মহাজনের দেনা শোধ করে। কালীগ্রাম থেকে মহাজনরা ব্যবসা গুটিয়ে অন্যত্র চলে যায়। এই ব্যাংক চলেছিল পুরো কুড়ি বছর। লক্ষণীয় যে এ-ব্যাপারেও সমাজবিজ্ঞানী রবীন্দ্রনাথই পথিকৃৎ, নোবেলজয়ী ডক্টর ইউনূস কবির আট দশক পরের উত্তরসূরি।

 

ব্যাংকের অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ চালু করেন অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ এক ব্যবসা, ১৮৯৫ সালে কুষ্টিয়ায় স্থাপিত হয় ‘ট্যাগোর অ্যান্ড কোং’। এই ঠাকুর-কোম্পানি ন্যায্য মূল্যে চাষীদের ধান ও পাট কিনে বাজারে বিপণনের দায়িত্ব নেয়। সরাসরি বিপণনে অক্ষম প্রাথমিক উৎপাদকদের ন্যায়সঙ্গত পণ্যমূল্য পাওয়ার ব্যবস্থাস্বরূপ এটা ছিল একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উদ্যোগ। এক্ষেত্রেও জমিদার রবীন্দ্রনাথই আবির্ভূত হলেন তাঁর চাষা-ভুষা প্রজাদের আয় বাড়ানোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপকরূপে। সেটা ছিল তাঁর পল্লীমঙ্গল সাধনকল্পে এক মহতী প্রয়াস। সমাজের সামগ্রিক মঙ্গলকার্যের ধারা সম্পর্কে অতুল সেনকে কবি এক পত্রে লিখেছেন : ‘কাজের সঙ্গে সঙ্গে একটি আনন্দের সুর বাজাইয়া তুলিতে হইবে। আমাদের গ্রামের জীবনযাত্রা বড়োই নিরানন্দ হইয়া পড়িয়াছে। প্রাণের শুষ্কতা দূর করা চাই। হিতানুষ্ঠানগুলিকে যথাসম্ভব উৎসবে পরিণত করিবার চেষ্টা করিয়ো। বৎসরে একদিন বৃক্ষরোপণ উৎসব করিবে। বৈশাখের শেষে কোনো একদিন ইস্কুলের ছুটি দিয়া সব ছেলেদের বনভোজন ও বৃক্ষরোপণ করিবার আয়োজন করিলে ভালো হয়। রাস্তা প্রভৃতির কাজ আরম্ভ করিবার প্রথম দিনটায় একটু উৎসবের ভাব থাকিলে এগুলো ধর্মকর্মের চেহারা পাইবে। আরেকটি কথা মনে রাখা চাই। চাষী গৃহস্থদের মনে ফুলগাছের শখ প্রবর্তন করিতে পারিলে উপকার হইবে। প্রত্যেক কুটিরের আঙিনায় দুই-চারিটি বেলফুল, গোলাপ ফুলের গাছ লাগাইতে পারিলে গ্রামগুলি সুন্দর হইয়া উঠিবে। দেশে এই সৌন্দর্যের চর্চা অত্যাবশ্যক একথা ভুলিলে চলিবে না’।

 

তাই তো। কবিত্ব-যে এই সমাজবিজ্ঞানীর ব্যক্তিত্ব থেকে অবিচ্ছেদ্য। পর্যটক রবীন্দ্রনাথ দেশ-বিদেশ ঘুরে বাংলাদেশে গ্রামের উন্নয়নের নতুন নতুন দিক আবিষ্কার করেছেন।

 

লেখক : প্রধান সম্পাদক, রেডটাইমসবিডি২৪ডটকম



এই প্রতিবেদন টি 601 বার পঠিত.