পাহাড়ে বিপর্যয়, নিহত ৬৯: মৃতের সংখ্যা বাড়ছে

নিম্নচাপের প্রভাবে দুই দিনের টানা বর্ষণে বিপর্যয় নেমে এসেছে চট্টগ্রাম বিভাগের তিন জেলায়; পাহাড় ধসে হতাহত হয়েছেন বহু মানুষ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে পাহাড় ধসের ঘটনায় দুই সেনা কর্মকর্তাসহ ৩৯ জনের লাশ উদ্ধারের খবর জানিয়েছেন। তবে স্থানীয় কর্মকর্তারা মঙ্গলবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত রাঙামাটিতে ৩৫ জন, চট্টগ্রামে ২৭ জন এবং বান্দরবানে সাতজন নিহতের খবর নিশ্চিত করেছেন।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে গত রোববার থেকে দেশের দক্ষিণ পূর্বের জেলাগুলোতে চলছে ভারি বৃষ্টিপাত। পাহাড়ি ঢলে সোমবার রাতে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়লে চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে বৃষ্টির পানিতে মাটি সরে গিয়ে তিন জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ে ধস নামে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা বৃষ্টির মধ্যেই উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে গেলেও এখনও অনেকে নিখোঁজ থাকায় নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দুটি দুর্গম এলাকায় পাহড়ধসের ঘটনা ঘটায় সেখানে উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছাতেও দেরি হয়েছে। এদিকে প্রবল বৃষ্টিতে বান্দরবান জেলার প্রায় ২৫টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে আড়াইশর বেশি পরিবার। পাহাড় ধসে হতাহতের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে রাঙামাটি জেলায়। জেলার মানিকছড়িতে একটি সেনা ক্যাম্পের কাছে পাহাড় ধসের ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে ফের ধসে নিহত হয়েছেন দুই কর্মকর্তাসহ চার সেনা সদস্য।

এছাড়া আরও দশজন আহত হয়েছেন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে আইএসপিআরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান জানিয়েছেন। “পাহাড় ধসের কারণে ওই এলাকায় সড়কপথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় হেলিকপ্টারও নামানো যাচ্ছে না। আপাতত স্থানীয়ভাবে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”

নিহতরা হলেন- সেনাবাহিনীর মেজর মাহফুজুল হক, ক্যাপ্টেন তানভীর সালাম শান্ত, করপোরাল আজিজ ও সৈনিক শাহীন।

বিকালে ঢাকায় সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া মানিকছড়ির নিহত সেনাসদস্যদের পরিচয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুপুর পর্যন্ত মোট ৩৯ জনের মৃত্যুর খবর মন্ত্রণালয়ে এসেছে, তাদের মধ্যে ৩৩ জন পাহাড়ে বাসবাসকারী। “অনেকেই মাটিচাপা পড়ে আছেন। সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে। ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে চার থেকে সাড়ে ৪ হাজার মানুষকে সেখানে রাখা হয়েছে।”

# ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের সাতটি স্থানে মাটিচাপায় ১২৭ জনের মৃত্যু হয়।

# ২০০৮ সালের ১৮ অগাস্ট চট্টগ্রামের লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধসে চার পরিবারের ১২ জনের মৃত্যু হয়

# ২০১১ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের টাইগার পাস এলাকার বাটালি হিলের ঢালে পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে ১৭ জনের মৃত্যু হয়

# ২০১২ সালে ২৬-২৭ জুন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও সিলেটে ৯৪ জনের প্রাণহানি ঘটে

# ২০১৫ সালের ২৬-২৭ জুন টানা বর্ষণ, ধস আর পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে ১৯ জনের মৃত্যু হয়।

রাঙামাটিঃ টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধসে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি। শহর ও তিন উপজেলায় ৩৫ জনের লাশ উদ্ধারের খবর জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নান। মঙ্গলবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, রাঙামাটি শহর ও মানিকছড়িতে ১৯ জন, কাউখালী উপজেলায় ৯ জন, কাপ্তাইয়ে পাঁচজন এবং বিলাইছড়ি উপজেলায় দুইজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মানিকছড়িতে একটি সেনা ক্যাম্পের কাছে পাহাড় ধসের ঘটনায় নিহত হয়েছেন দুই কর্মকর্তাসহ চার সেনা সদস্য। এছাড়া রাঙামাটি শহরের ভেদভেদি, মোনতলা, রাঙ্গাপানি, শিমুলতলি, সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়ানসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে বলে সদর উপজেলার চেয়ারম্যান অরুণ কান্তি চাকমা জানান।

পাহাড় ধসের কারণে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে সোমবার রাত থেকে। রাঙামাটি শহরের অধিকাংশ স্থানে ভোর থেকে বিদ্যুৎ নেই। রাঙামাটি আবহওয়া অফিসের কর্মকর্তা সুচরিতা চাকমা জানান, মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাঙামাটিতে দেশে সর্বোচ্চ ৩৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

তিনি জানান, রোববার গভীর রাত থেকেই রাঙামাটি জেলায় ভারি বৃষ্টি চলছে এবং মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রামঃ টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ও দেয়াল ধসে এবং বজ্রপাত ও গাছচাপায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, চন্দনাইশ, রাউজান ও বাঁশখালীতে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুকুর রহমান সিকদার জানিয়েছেন। এর মধ্যে রাঙ্গুনিয়ার দুটি এলাকা থেকে ১৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নে ১১ জন এবং রাজানগরে ৮ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। আরও ছয়জন বিকাল পর্যন্ত নিখোঁজ ছিলেন। এর মধ্যে ইসলামপুরে দুইজন ও হোসনাবাদে চারজন নিখোঁজ। “দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় উদ্ধারকর্মীদের সেখানে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়েছে। স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।”  ইসলামপুরে নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চারজনের পরিচয় জানা গেছে। এরা হলেন- নজরুল ইসলাম, তার স্ত্রী আসমা আক্তার, দুই সন্তান সাথী আক্তার ও মঞ্জুরুল ইসলাম। এদিকে চন্দনাইশের ধোপাছড়িতে পাহাড় ধসে তিন শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী জানিয়েছেন। চন্দনাইশ থানার ওসি ফরিদ উদ্দিন খন্দকার বলেন, মঙ্গলবার ভোর রাতে ধোপাছড়ি ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম পাহাড়ে দুটি ঘরের ওপর মাটি ধসে পড়লে চারজনের মৃত্যু হয়, আহত হন আরও দুইজন। ধোপাছড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ চৌধুরী বলেন, ২ নম্বর ওয়ার্ডের শামুকছড়িতে পাহাড় ধসে আজগর আলীর তিন বছর বয়েসী মেয়ে মাহিয়ার মৃত্যু হয়। আর কাছেই ছনবনিয়া এলাকায় অপর ঘটনায় কেউ লা খেয়াং (১০), মে মাউ খেয়াং (১৩) ও মোকইউ অং খেয়াং (৫০) নামে আরও তিন জনের মৃত্যু হয়। আহত দুইজন হলেন- শানু খেয়াং (২১) ও ছেলাই কেউ খেয়াং (২৮)।

এছাড়া চট্টগ্রাম শহর, রাউজান ও বাঁশখালীর বাহারছড়ায় বজ্রপাতে, দেয়াল ধসে এবং গাছচাপায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুকুর রহমান জানিয়েছেন। নিম্নচাপের প্রভাবে মঙ্গলবার বেলা ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৩১ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে। চন্দনাইশের কসাই পাড়া থেকে দেওয়ান হাট পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামের সঙ্গে বান্দরবান ও কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

ফায়ার সর্ভিস চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, রাঙ্গুনিয়ার রানীর হাট মঘাইছড়ি এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে তাদের কয়েকটি ইউনিট বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে। আর পাহাড়ি ঢলের কারণে সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুর এলাকায় আটকা পড়ে আরও দুটি ইউনিট। এছাড়া কাপ্তাই ইউনিটের সদস্যরা রড় দমদমা এলাকায় আটকে পড়ে বলে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা পূর্ণচন্দ্র জানান।

বান্দরবানে নিহত ৭ঃ বান্দরবানে বৃষ্টির মধ্যে সোমবার রাতে কয়েক জায়গায় পাহাড় ধসে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন উদয় শংকর চাকমা। এর মধ্যে শহরের কালাঘাটায় এক কলেজছাত্র, লেমুঝিরি ভিতর পাড়ায় একই পরিবারের ৩ শিশু এবং সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের গুংগুরু সম্বোনিয়া পাড়ায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বান্দরবান সদর থানার ওসি রফিক উল্লাহ জানান, শহরের কালাঘাটা কবরস্থান এলাকায় মাহমুদ মিয়ার বাড়ির ওপর পাহাড় ধসে পড়লে সেখানে রেবি ত্রিপুরা নামের ১৯ বছর বয়সী এক তরুণের মৃত্যু হয়। ওই বাড়ির মালিক মাহমুদ বলেন, রাত ৩টার দিকে হঠাৎ করেই পাহাড় ধসে পড়লে তাদের বাঁশ-টিনের ঘরের এক-চতুর্থাংশ মাটিচাপা পড়ে। রেবি বান্দরবান সরকারি কলেজের দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তারা কয়েকজন সহপাঠী মিলে ওই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভোর ৪টার দিকে মাটি সরিয়ে রেবির লাশ উদ্ধার করে এবং আরও চারজনকে হাসপাতালে পাঠায়। কাছাকাছি সময়ে শহরের লেমুঝিরি ভিতর পাড়ায় একই পরিবারের ৩ শিশুর মৃত্যু হয়। এরা হল- শুভ বড়–য়া (৮), মিতু বড়ুয়া (৬) ও লতা বড়ুয়া (৫) । তারা স্থানীয় সুমন বড়ুয়ার ছেলেমেয়ে। ওই বাড়ির ওপর পাহাড় ধসের পর স্থানীয় লোকজন মাটি সরিয়ে তিন শিশুর লাশ উদ্ধার করে।

এছাড়া বান্দরবান সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নের গুংগুরু সম্বোনিয়া পাড়ায় পাহাড় ধসে মংক্যউ খিয়াং (৫৫), ক্যসা খিয়াং (৭), নেইমাউ খিয়াং (১৭) নামে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় ইউপি সদস্য উসামং খেয়াং জানান।

সদর থানার ওসি রফিক উল্লাহ জানান, শহরের জাইল্লাপাড়ায় আরেক ঘটনায় কামরুন্নাহার নামের এক নারী ও তার ১০ বছরের মেয়ে সুফিয়া নিখোঁজ রয়েছেন। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন ইনচার্জ তারিকুল ইসলাম বলেন, “প্রবল বর্ষণের কারণে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে সমস্যা হচ্ছে। নিখোঁজ দুজনকে উদ্ধারের সব চেষ্টাই চালানো হচ্ছে।”

এদিকে তিন দিনের টানা বর্ষণে বান্দরবান জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলার প্রায় ২৫টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হওয়ায় আড়াই পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয় জনপ্রিতিনিধিরা জানিয়েছেন। পাহাড় ধস ও ঢলের কারণে বান্দরবানের সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং ঢাকা থেকে উদ্ধার তৎপরতার খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। প্রশাসনের সব কর্মচারীর ছুটিও বাতিল করা হয়েছে।

 

সুত্রঃ ভোরের কাগজ।



এই প্রতিবেদন টি 161 বার পঠিত.