পাহাড়ে ধসে মৃত ১৩২ জন: আরো বৃদ্ধির শঙ্কা

এখন পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী রাঙামাটিতে ৮৮ জন, চট্টগ্রামে ৩০ জন এবং বান্দরবানে সাতজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।সোমবার রাত থেকে ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। অতিবর্ষণের কারণে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং স্থানীয়রা সকাল থেকে উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত রয়েছে। তবে যেসব এলাকায় ধসের ঘটনা ঘটেছে এর বেশ কয়েকটি দুর্গম হওয়ায় উদ্ধারকাজ পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাঙামাটিতেই মৃতের সংখ্যা ৮৮ঃ আমাদের রাঙামাটি প্রতিনিধি হিমেল চাকমা জানান, রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসে চারজন সেনা সদস্যসহ ৭৫ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে রাঙামাটি শহর এলাকায় ৪৫ জন, কাউখালীতে ২৩ জন, কাপ্তাইয়ে ১৬ জন, জোড়াছড়িতে ২ জন এবং বিলাইছড়িতে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন দেড় শতাধিক। নিখোঁজ রয়েছে অনেকে। নিখোঁজদের উদ্ধাদের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরা। উদ্ধার কাজ করছেন স্থানীয়রাও। প্রশাসন বলেছে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সমন্বয়ক সহকারী কমিশনার ইফতিখার উদ্দিন আরাফাত মঙ্গলবার রাত দশটায় ৮৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

রাঙামাটি সিভিল সার্জন শহীদ তালুকদার বলেন, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ২৫টি মরদেহ আনা হয়েছে। বাকিদের আনা হয়নি। এই ঘটনায় শুধু রাঙামাটি শহরে থেকে আসা ৭৭ জনকে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। ভর্তি আছেন ৩৬ জন। হাসপাতালে জায়গা না হওয়ায় আহতদের মেঝেতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে রাঙামাটি সদর বাদে বাকি ৯টি উপজেলা থেকে আহত-নিহত কাউকে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়নি। আহতদের স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী সূত্র জানা, সোমবার ভোর থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত টানা প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে জেলায় বিভিন্ন এলাকায় সোম ভোর থেকে পাহাড় ধস শুরু হয়। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় সকালে এটি প্রবল আকার ধারণ করে। ঘুম থেকে উঠে মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ হয়নি। ফলে হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়।

রাঙামাটি শহরের সবচেয়ে বেশি পাহাড় ধস হয় ভেদেভেদি, রাঙ্গাপানি, যুব উন্নয়ন এলাকা, টিভি স্টেশন, রেডিও স্টেশন, মানিকছড়ি ত্রিমৌহনী, শিমুলতলি, রাজমনি পাড়া, রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি এলাকায়। এ ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর নষ্ট হয়।

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি: টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে রাঙামাটিতে সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যসহ ৯৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটি শহরে চার সেনা সদস্যসহ ৫৩ জন, কাউখালী উপজেলায় ২৩ জন, কাপ্তাই উপজেলায় ১৬ জন, জুড়াছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলায় দুজন করে নিহত হয়েছে। এ ছাড়া কাপ্তাইয়ে পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে একজন ও গাছচাপায় একজন নিহত হয়েছে।

উদ্ধার কাজে কর্মকর্তাসহ চার সেনার মৃত্যুঃ এদিকে রাঙামাটি শহরের মানিকছড়ি এলাকায় রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ধসে পড়া মাটি সরাতে গেলে সেখানে ১০ সেনা সদস্যের উপর বড় একটি পাহাড় ধসে পড়লে ঘটনাস্থলে চারজন মারা যান। নিহতরা হলেন, মেজর মাহফুজ, ক্যাপ্টেন তানভীর, ল্যান্স করপোরাল আজিজুল এবং সিপাহী শাহিন। আহতদের হেলিকপ্টারে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেয়া হয়। এদিকে পাহাড় ধসের ঘটনার পর রাঙামাটি শহরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এছাড়া রাঙামাটি-চট্টগ্রাম, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি কাপ্তাই-বান্দরবান সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আছে।

মঙ্গলবার বিকাল চারটার দিকে জেলা প্রশাসক সম্মেলনকক্ষে জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নান জানান, এ পর্যন্ত রাঙামাটি জেলায় ৩৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত পরিবারকে ২০ হাজার ২০ কেজি করে জরুরি ভিত্তিতে চাল দেয়া হয়েছে।

ডিসি বলেন, ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কট্রোল রুম খোলা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন। এই মুহূর্তে কী পরিমাণ পাহাড় ধসে ঘটনা ঘটছে বলা যাচ্ছে না। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক প্রকাশ কান্তি চৌধুরী বলেন, রাঙামাটি বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও অনেকগুলো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। সেসব এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছে। আগামীকাল (বুধবার) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর রাঙামাটিতে আসবেন বলে তিনি জানান।

চট্টগ্রামে ২৭ জনের প্রাণহানিঃ ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন স্থানে মোট ৩০ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় এই ঘটনা ঘটে। এর মধ্য রাঙ্গুনিয়েতেই নিহত হয় ২১ জন। চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোরশেদুল আলম এ হতাহতের ঘটনা নিশ্চিত করেছেন। উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামাল হোসেনও এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

বান্দরবানে সাতজনের মৃত্যুঃ আমাদের বান্দরবান প্রতিনিধি মং খিং জানিয়েছে, এই পাহাড়ি জেলায় এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। ভারী বর্ষণে সোমবার দিবাগত রাতে জেলার কালাঘাটা, আগাপাড়া ও জাইল্লাপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। বান্দরবান ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা স্বপন কুমার ঘোষ গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহতদের মধ্যে আছে শহরের আগাপাড়ার একই পরিবারের শুভ বড়ুয়া, মিঠু বড়ুয়া, লতা বড়ুয়া ও কালাঘাটা কবরস্থান এলাকার রেবি ত্রিপুরা। জাইল্লাপাড়ায় একই পরিবারের মা কামরুন্নাহার ও মেয়ে সুফিয়া। অন্যদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি।



এই প্রতিবেদন টি 241 বার পঠিত.