দেশের বাইরে থেকেও অনেক কিছুই দেশের জন্যে করা সম্ভব…

মালবিকা শীলা, মন্ট্রিয়াল, কানাডাঃ একবার আমি কাজ সেরে মন্ট্রিয়াল থেকে সাউথশোর আসার পথে মেট্রোতে একটি দুইলিটারের কোকের খালি বোতল দেখে অস্থির হয়ে উঠি। সেই খালি বোতল আমার ব্যাকপ্যাকে পুরে ঘরে নিয়ে আসি, মেট্রো থেকে কুড়িয়ে খালি বোতল কেউ ঘরে আনে! আসলে আমার এই অস্থিরতার কারণ কি জানেন? সেই সময়ে কোকাকোলা কোম্পানি ওদের বোতলে বিভিন্ন ভাষায় কোকাকোলা লেখা শুরু করেছিলো। আমার ব্যাগে সযত্নে তুলে রাখা বোতলটির গায়ে বাংলায় “কোকাকোলা” লেখা ছিলো।

একবার পার্ক মেট্রোর কাছে এক বাংলাদেশি দোকানে ঢুকে একটি “মাম” পানির বোতল দেখে আমার মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়! যতো দামই হোক এই পাঁচশো মিলিলিটার পানি আমার চাই-ই চাই। দোকানি পরিচিত ভদ্রলোক, আমার উত্তেজনা দেখে হেসে ফেলে আমাকে সেই পানির বোতলটি বিনেপয়সায় দিয়ে দিলেন, তাঁর এক বন্ধু দেশ থেকে এই বোতলটি এনেছেন। সেই বোতলে তো শুধু পানি ছিলোনা, সেই বোতলের সাথে জড়িয়েছিলো একটুকরো বাংলাদেশ!

দেশে থাকলে বাসার সবাই মিলে ক্রিকেট দেখি। এখানে একা একা দেখা হয়না, ফোনে আব্বার সাথে ক্রিকেট নিয়ে কথা হয় প্রচুর। আর বন্ধুদের কাছ থেকে আপডেট যোগাড় করি। স্কোর দেখি অনলাইনে। বাংলাদেশের প্রতিটি খেলায় আমি মানসিকভাবে জড়িয়ে থাকি। বাংলাদেশের প্রতিটি খেলায়, প্রতিটি খেলোয়াড়ের অর্জনে আমি আপ্লুত হই, প্রতিটি ব্যর্থতা আমাকে কষ্ট দেয়। প্রতিটি জয়ে আমি উল্লাসে ফেটে পড়ি। বাংলাদেশ হারলে আমি পরেরবার জেতার স্বপ্ন দেখি, জিতলে আর আমাকে পায় কে! সাকিব আল হাসান আর মোহাম্মদ মাহমুদুল্লাহর সাথে পুরো টিমকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন।

দেশে না থেকেও দেশের প্রতি এই যে গভীর টান, এর সাথে প্রবাসী বেশিরভাগ মানুষই একাত্ম বোধ করবেন। যারা বলে “দেশ ছেড়ে গেলেন কেন?” অথবা “নিরাপদ দূরত্বে বসে কথা বলবেন না।” তাদের প্রতি আমার একটাই কথা, দেশে বসে কিছু না করার চেয়ে আপনি দেশের বাইরে থেকেও অনেক কিছুই করতে পারেন। বাইরে থেকে রোজগার করে দেশে টাকা পাঠানোও দেশেরই কাজ, যেটা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। দেশের মানুষের জন্যে ইতিবাচক লেখালেখিও একটা কাজ, যা অন্যকে সাহস যোগাবে, সংহত করবে, শক্তি যোগাবে। ধর্মান্ধতা আর কোনো বিশেষ দলের অথবা শক্তিশালী গোষ্ঠীর খারাপ দিকগুলোর সমালোচনাও সাধারণ মানুষ তথা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব রাখে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্বাধীনতা বিরোধীশক্তি রাজাকার আর আলবদর বাদে দেশের সাতকোটি মানুষই কি যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো? না, পড়েনি। কিন্তু তবু দেশের প্রতিটি মানুষই যুদ্ধে পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন। ভারতের সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, ভারত সরকার শরণার্থীদের জায়গা দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়েছে। বাংলাদেশের যে মাঝি সেই সময়ে নদীতে লোক পারাপার করেছেন, যাঁরা রান্না করে খাবার দিয়েছেন, যাঁরা দেশের বাইরে বসে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে লিখেছেন, যিনি দেশাত্মবোধক গান লিখেছেন, যিনি সুর দিয়েছেন, যিনি গেয়েছেন এমনকি অন্যদেশের লেখক, কবি, শিল্পীরা মিলে যখন অমেরিকার মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ করেছেন তাঁদের সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং লক্ষ্যে কাজ করেছেন। এঁদের কারো অবদান কিন্তু কারো চেয়ে কম নয়। এগুলো আপনি অস্বীকার করলে করতে পারেন, তাতে কিন্তু ইতিহাস বদলে যাবেনা।

মালবিকা শীলা



এই প্রতিবেদন টি 404 বার পঠিত.