টেক্সাসের এক লাইব্রেরিতে

দিলরুবা আহমেদ

পাবলিক লাইব্রেরিতে বরের সঙ্গে প্রায়ই আসতে হয় মিলাকে ।
বর পড়াশোনা করছেন ইউনিসার্ভিটি অফ টেক্সাসে। লেখাপড়া আর লাইব্রেরিতে যেন জীবনটা গেথে গেছে মানুষটার। মিলা প্রায়ই ভাবে এতো বই পড়ে কি লাভ যদি না নিজেই দশ বারোটা লিখে ফেলতে পারলো। কয়েকবার সাদিকে সে কথাটা বলেছেও। সাদি বলেছে, সময় হলেই লিখবে। সময়টা কখন যে হবে আর সে সেই বই হাতে ঘুরে বেড়াতে পারবে কে জানে।  সাদি প্রায়ই তাকে বই, থিসিস, পেপার, রিপোর্ট খুজে বের করতে লাগিয়ে দেয়। আজ অবশ্য মাস্টার মশাই তাকে কোনো কাজ দেয়নি। লাইব্রেরিতে এসেই দৌড়ে ওপরের তলায় চলে গেছে। দ্রুত কি যেন কি খুজে দেখতে হবে।
ঢাকাতেও লাইব্রেরিতে এক সঙ্গে আসা-যাওয়া করতো। তখন অবশ্য চলছিল প্রেম পর্ব। ছাত্র জীবনের অনাবিল আনন্দে গা ভাসিয়ে বেড়ানো যাকে বলে তাতেই ব্যস্ত ছিল। মনে হতো জীবনের দরজা-জানালা সব খোলা। হু হু করে বাতাস বইছে। কি বাতাস! বাতাসে বাতাসে ভরা একটা জীবন ছিল তখন।এ জন্যই কি মুরব্বিরা বিরক্ত হয়ে প্রেমিক যুগলের উদ্দেশে বলেন, আরে, ওরা তো বাতাসে উড়ছে! হাওয়া, হাওয়া। এখন মনে হচ্ছে আসলেই বাতাসে ওড়ার সময় ছিল সেটা।
সাদি তার থেকে মাত্র বছর তিনেকের বড়। সে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। স্কলারশিপ নিয়ে এ মহাদেশে চলে এসেছে। দ্রুত ভালো রেজাল্টসহ এমএস শেষ,পিএইচডি শুরু করবে করবে করছে। এখনো ফান্ড পায়নি। ৬০ দিনের মধ্যে কোথাও ভর্তি হয়ে যেতে না পারলে বিপদ।  ইললিগাল হয়ে যাবে।
এ দেশে প্রচুর ইললিগাল রয়েছে।
এতোই মধু এ দেশে যে, বেআইনিভাবেও মানুষ থাকছে। অথচ  মিলা প্রায়ই ভাবে এ কেমন ধারার জীবন যাপন। আত্মীয়স্বজন নেই। রিকশার টুংটাং নেই। বাংলা কথা নেই। মিছিল নেই। কোনো অফিসে কোনো পরিচিতজন নেই।  বনবাস যেন।
বনের মাঝে কেউ কেউ বড় গাছের মগডালে থ্রী-হাউস বেধে সুখে থাকছে, বা ভাবছে সুখে আছে। ভাবখানা অন্তত সুখে থাকার, আর দোল খাচ্ছে। নাকি খাবি খাচ্ছে!
অক্ট্রেলিয়ায় হানিমুনে গিয়েছিল, ছিল মাস দুয়েক। তখন জানতো দেশে ফিরে যাবে, তাই সে যাওয়ায় আনন্দ ছিল। এবারের পরিকল্পনা ভিন্ন। সাদি এখানেই শিকড় গেড়ে মহীরুহ হবে ভাবছে।
মিলার অবশ্য বিষয়টা ভালো লাগছে না। সে দেশে ফিরে যেতে পারলেই বাচে।
অনার্সটাও কমপ্লিট করে আসতে পারেনি। বিয়ে করে ঝুলে পড়েছে। বরের গলা ধরে ঝুলছে। মনে হচ্ছে বাদুড় ঝোলা, দুল দুল দুলনি, রাঙা মাথায় চিরুনি।
প্রায় আধঘণ্টার ওপর হলো সাদি উপরে গেছে, এখনো ফেরার নাম নেই। নিশ্চয়ই কোনো বইতে বুদ হয়ে বসে আছে।
সে নিচের তলায় বসে জার্নালগুলো উল্টেপাল্টে দেখছে। তার ডান পাশের ফ্লোরটা বাচ্চাদের লাইব্রেরির অংশ। রূপকথার মতো করে সাজানো। এখনো বাচ্চা নেয়া হয়নি। একটা বাচ্চা থাকলে ভালোই হতো, সময় কেটে যেতো। লাইব্রেরিতে ছুটে বেড়াতো।
হঠাৎ দেখলো, পাশেই একটা ফুটফুটে বাচ্চা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এতো ছোট বাচ্চা লাইব্রেরিতে কি এতো জ্ঞান অর্জন করতে এসেছে? বাবা! কী নাদুস নুদুস। বয়স  বছর দেড়েক।  বই গোছাচ্ছে এক মেক্সিকান লোক, সেই মাঝে মাঝে এসে বাচ্চাটাকে দেখে যাচ্ছে। বাচ্চাটা এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে। লোকটা বারবার ধরে এনে বসিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
এ লাইব্রেরিতে বাচ্চাদের ডে কেয়ার-এর ব্যবস্থাও আছে নাকি? অনেক লাইব্রেরিতে রয়েছে। কিন্তু যতোদূর জানে এখানে নেই। মেক্সিকান লোকটাকে কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় ডাক দিল।
শোনো, তুমি কি এখানে কাজ করো?
লোকটা মাথা দোলায়, কাজ করে।
কাজটা কিভাবে পেলে?
লোকটা শুধু তাকিয়ে থাকলো, কোনো উত্তর দিল না। এ কথা এভাবে এ দেশে জিজ্ঞাসা করার রেওয়াজ নেই। এতোটা খোলামেলা হওয়া যায় না। কিন্তু মিলা অদম্য। তাকে জানতে হবে। সম্ভবত লোকটার হাবভাব, চালচলনই এমন যে, মনে হয় একে জিজ্ঞাসা করা যায়।
আমি লাইব্রেরিতে একটা চাকরি পেতে চাই। তাই জানতে চাচ্ছি। ঐবষঢ় সব, ঢ়ষবধংব। আমি খুব খুজচ্ছি একটা চাকুরি।
এবার বোকা বোকা চেহারাটার মধ্যে হাসি ফুটলো। মেক্সিকানদের দেখলেই সাদি চিনতে পারে। মিলা এখনো অতোটা ওস্তাদ হয়ে ওঠেনি। তবে একে দেখেই বুঝতে পারা যাচ্ছিল। কেন তা জানে না।
সে ইংরেজি খুবই কম জানে। তাদের অধিকাংশেরই ভাবখানা এমন, সবার স্প্যানিশ না জানাটাই একটা দোষের ব্যাপার। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললো, পুলিশ আমাকে চাকরি দিয়েছে। মিলা যথার্থই অবাক হয়। এবার কি চাকরির জন্য পুলিশের কাছে ধরনা দিতে হবে?এই ছিল কপালে! এতোদিন তো চোর-ডাকাতের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক ছিল, এখন চাকরি-বাকরিতেও?
কেন?
কথাটা না জিজ্ঞাসা করে মিলা পারলো না।
গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করেছিলাম, ইনশিওরেন্সও ছিল না। তিন মাস এখানে কাজ করবো। পয়সা পাবো না। পয়সাটা সোজা পুলিশের কাছে চলে যাবে।
বলে সে হাসতে লাগলো, যেন খুবই হাসির কথা।
মিলা জানে, আমেরিকায় ট্রাফিক আইন খুবই কড়া। ভালোই অর্থদণ্ড হয়েছে বোধহয় । তবে এ কতটা সত্যি না মিথ্যা বলছে কে জানে। যাচাই করারও উপায় নেই।
বাচ্চাটা কার?
আমার।
সঙ্গে নিয়ে আসো?
হাসলো আবারও। বেকুবের হাসি। এখানকার কিছু মেক্সিকানকে দেখলে মনে হয়
গ্রাম থেকে উঠে এসেছে। জগতের কিছুই জানে না। সম্বল শুধু সরলতা।
বাচ্চা অ্যালাউ করে?
করে না, তারপরও নিয়ে আসি, ৩০ মিনিট -ই তো। ১৫ মিনিটের মধ্যেই আমার বৌয়ের কাজ শেষ হয়, সেও এখানে কাজ করে। ও বাচ্চা নিয়ে চলে যায়।
তোমার বৌও ট্রাফিক টিকেট খেয়েছে?
মেক্সিকানটা ঘাড় দুলিয়ে হাসতে লাগলো। বললো, না।
সুন্দর হাসি। বিশ্বময় সব মানুষের হাসিই বোধহয় খুব সুন্দর।

আমেরিকান পুলিশেরও বাহারি কাণ্ড। গাড়ির ইনশিওরেন্স নেই দেখে ফাইন করেছে। ফাইন দেয়ার মতো পয়সা নেই কারণ চাকরি নেই। তাই তিন মাসের জন্য কাজও জুটিয়ে দিয়েছে। শুধুই তিন মাসের জন্য।
পালাবি কোথায়! কাজ করিয়ে পয়সা উসুল করে নিচ্ছে। ঞযরং রং অসবৎরপধ.
সাদি উপর থেকে নামতেই মিলা বললো,
গাড়ির চাবি আমাকে দাও।
কেন?
অ্যাকসিডেন্ট করবো।
মানে?
তাহলে একটা চাকরি জোগাড় হবে। ঘরে বসে বোর হয়ে গেলাম।
পুরো ঘটনা  বলতেই সাদি হাসতে হাসতে বললো,
সব মেঘে বৃষ্টি হয় না। দেখা যাবে হাত পা ভেঙ্গে হসপিটালাইজ তুমি, আর হাসপাতালের বিল দিতে দিতে আমার জীবন যাচ্ছে, বাকি পুরো-টা জীবন শুধু বিলই দিচ্ছি। হা, হা, হা।



এই প্রতিবেদন টি 3207 বার পঠিত.