আত্মবিশ্বাস! রীতা রায় মিঠু’র কলাম

রীতা রায় মিঠু, মিসিসিপি, যুক্তরাষ্ট্রঃ সেদিন স্যান্ডি নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণীকে দেখা মাত্র চমকে গেলাম। অনেক দিন পর দেখা, চমকে যাওয়ার মতই। ওর সাথে অনেকক্ষণ কথা বললাম।
স্যান্ডি ওয়ালমার্টে যখন কাজ শুরু করে, সে এতই মোটা ছিল যে ঘাড় নাড়াতে পারতো না। তখন ওর বয়স কতইবা ছিল, ২২/২৩ যা বয়সই হোক না কেন, স্যান্ডির হাঁসফাঁস চেহারা দেখলেই আমার খারাপ লাগতো। তবে মেয়েটার মুখে খুব সুন্দর হাসি লেগে থাকতো। ওর রেজিস্টারে চেক আউট করতে ভালো লাগতো আমার। কেমন সহজ সরল হাসিতে মুখ ভরিয়ে রাখতো, একটাই সমস্যা ছিল, মোটা বলে শরীর নাড়াতে পারতোনা, ঘাড়ও নাড়াতে পারতো না। তাই জিনিস স্ক্যান করতে একটু সময় লেগে যেত। কিন্তু ওর ব্যবহারে ছিল বিগলিত ভাব।
মনে মনে বাঙালি সেন্টিমেন্ট অনুযায়ী নিশ্চিত ছিলাম, এই মেয়ের জীবনে প্রেম বা প্রেমিক আসার সম্ভাবনা নেই। এত মোটা মেয়েকে কে বিয়ে করবে? এমন সব বাঙালি ভাবনা মাথায় রেখেই জেনেছি, ওর বয়ফ্রেন্ড থাকা দূরের কথা, এমনি ফ্রেন্ডও নেই। ও মায়ের সাথে থাকে।
স্যান্ডিকে দেখে আরেকটা ভয় লাগতো, না জানি টুপ করে মারা যায়। এমনিতেই কালোদের শারীরিক অনেক সমস্যা থাকে, হাই ব্লাড প্রেশার খুব ছোটবেলা থেকেই বাসা বাঁধে রক্তে। মাত্র কয়েক বছর আগে ওরই মত মোটা আরেক কালো তরুণী মাত্র ২৭ বছর বয়সে হার্ট ফেল করে মারা গেছে। সেই তরুণীর ছিল চার বাচ্চা, সবার ছোট বাচ্চার বয়স ছিল তিন বছর। ওর বয়ফ্রেন্ড বেশির ভাগ সময় জেলে থাকতো, ওয়ালমার্টের স্বল্প আয়ের পয়সায় কোনমতে সংসার চালাতো। সেই কালো মেয়ের মৃত্যুর পর ওর ছেলেমেয়ের কি হয়েছে কে জানে! সেই মোটা মেয়েটাও কেন জানি আমাকে খুব পছন্দ করতো। স্যান্ডিও আমাকে পছন্দ করে। মোটা মেয়েরা কি আমাকে পছন্দ করবে বলে পণ করেছে?
বছর দুই পর হঠাৎ একদিন স্যান্ডিকে দেখলাম। মোটা হলেও একটু অন্যরকম লাগছে। ওর কি ওজন একটু কমেছে?
এদেশে কাউকে যদি বলা যায়, ” তুমি কি ওয়ার্ক আউট করছো? তোমাকে অনেক স্লিম দেখাচ্ছে”, শুনে সে খুশি হয়।
আন্দাজে ঢিল ছুঁড়লাম, জিজ্ঞেস করলাম, ” স্যান্ডি, তুমি কি ওয়ার্ক আউট করছো? তোমাকে দেখে আমার তাই মনে হচ্ছে।
স্যান্ডি মুখ হাসিতে ভরিয়ে বলল, ” হ্যাঁ, আমি ব্যায়াম করা শুরু করেছি।
-মনে হচ্ছে, তোমার ওজন কমতে শুরু করেছে, দারুণ ব্যাপার।
-ওজন কমতে শুরু করেছে, প্রায় কুড়ি পাউন্ড কমেছে।
-বলো কি? দারুণ খবর। এক কাজ করো, তুমি আমাদের এখানে এক্সারসাইজ কমপিটিশনে নাম দাও। তুমি জিতে পুরস্কার নিয়ে নাও।
** আমাদের স্টোরে তখন প্রতি বছর একবার ওজন কমানো প্রতিযোগিতা হতো। যে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিবে, সে বাক্সে কুড়ি ডলারের নোট জমা দিবে এবং সেখানেই স্কেলে ওজন মেপে তা খাতায় লিপিবদ্ধ করবে। তিন মাসের জন্য সাধনা শুরু, শেষে আবার একই স্কেলে ওজন মাপা হয়। যে সবচেয়ে বেশি ওজন কমাতে পারবে, সেই বাক্সের সব ডলার পাবে। প্রতি বছর বিজয়ী যে হয়, ৭০০/৮০০ ডলার পেয়ে যায়।**
স্যান্ডি সেই বছর প্রতিযোগিতায় নাম দেয় এবং তিন মাস শেষে যখন বিজয়ীর পুরস্কার পায়, তাকে দেখে অচেনা মনে হয়। ততদিনে স্যান্ডি মায়ের সংসার থেকে বেরিয়ে এসেছে। আরেক মেয়ের সাথে একটা দুই রুমের এপার্টমেন্ট শেয়ারে ভাড়া নিয়েছে।
স্যান্ডিকে দেখে এতটাই অবাক হলাম, কী সুন্দর চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক, বেশ আত্মবিশ্বাসে ভরপুর লাগছে। জিজ্ঞেস করে ফেললাম, ” তুমি কত পাউন্ড ওজন কমিয়েছো?”
-আমি প্রথমে ছিলাম ২৬৫ পাউন্ড। এখন কত হয়েছি বলবো না। আরও ২০ পাউন্ড কমাবো।
খেয়াল করলাম, স্যান্ডির ঘাড় স্প্রিংয়ের পুতুলের মত এদিক ওদিক নড়াচড়া করে, শরীর শুকিয়ে স্বাভাবিক হয়ে গেছে, শুধু দুই হাতের বাইসেপসগুলো হাতীর কানের মত ঝুল ঝুল করছে। দেখে মায়া লাগলো।
বললাম, -স্যান্ডি, ওজন কমিয়েছো, প্রায় অসম্ভবকে মাত্র ছয় মাসেই সম্ভব করে ফেলেছো। কিন্তু হাতের মাসলের টোন চলে গেছে, জিমে গিয়ে মাসল টোন কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায় তেমন এক্সারসাইজ করো।
-জিমে যেতে পয়সা লাগবে। আমি নিজে নিজেই পারবো।
-ঠিক আছে, নিজে নিজেই করো তবে মাসলের এই ব্যাপারটা খেয়াল রেখো। নাহলে এত পরিশ্রম অপূর্ণ থাকবে।
স্যান্ডি পারবে। কারণ ও তখন ডিটারমাইনড। বান্ধবীর সাথে ভাড়া শেয়ার করে, টাকা সঞ্চয় করে। এখন একা থাকে, যখন আরও স্লিম হবে তখন বয় ফ্রেন্ড পাবে, লাইফ পার্টনারের চিন্তা করবে।
মাঝে মাঝে স্যান্ডিকে দেখি এদিক ওদিক দিয়ে আসা যাওয়া করতে। পরনে থাকে নানা ডিজাইনের পোশাক, চুলের স্টাইল বদলে গেছে, দারুণ মেকাপ করে। চলনে কেমন যেন চঞ্চলা হরিণীর ঢং। আমার ভাল লাগে। লিপস্টিক, নেইল পলিশ কি নেই সাজে! একটাই সমস্যা, হাতের মাসল হাতীর কানের মত ঝুলছে, খুবই বাজে দেখায়। অন্যেরা হাসাহাসি করে নিজেদের মধ্যে, ওর হাতের এমন ঝুলঝুলে মাসল নিয়েও ও কিভাবে এত স্টাইল করে, এই নিয়েই সবাই মুখ বাঁকায়।
সেদিন যখন দেখা হলো , হাতের মাসল ঝুল ঝুল করলেও ঝুলঝুলে অংশটাকে বিশেষ কায়দায় বগলের পাশে চেপে রাখতে শিখেছে। বিশাল দেহ থেকে চর্বি গলে গেলে, দেহের জল বেরিয়ে গেলে ওজন যেমনি কমে যায়, দেহের বিভিন্ন স্থানে শূন্য পকেট তৈরী হয়। হবেই তো, চামরার নীচে মাংস শুকিয়ে গেলে চামড়া তো ঝুলবেই।
তা চামড়া ঝুলুক, স্যান্ডিকে স্লিম দেখায়। আঁটোসাঁটো পোশাক পরলে খারাপ লাগেনা, শর্ট ড্রেস পরলে বুঝা যায়, পায়ের ঘের হাতীর পায়ের শেপ থেকে মানুষের পায়ের শেপ পেয়েছে। কোমড়ের খাঁজ টের পাওয়া যায়, ভুঁড়ি অনেক কমে গেছে। ভুঁড়ি কমে গেলেই সবাইকে অর্ধেক স্লিম দেখায়। স্যান্ডির সব কিছু কমে গিয়ে ওকে এখন অনেক সুস্থ লাগে। এখন স্যান্ডিকে দেখে আমার হাঁসফাঁস করার পরিবর্তে ‘বাহ বাহ’ আনন্দ হয়।
স্যান্ডি জানালো, এখন ওর স্টেডি বয় ফ্রেন্ড আছে, দুই বছর হলো বয়ফ্রেন্ড হয়েছে। ও এখনও ডায়েট কন্ট্রোল করে, ব্যায়াম করে। ওর বয়ফ্রেন্ড ওকে উৎসাহ দেয়, ওর সাথে সাথে বয়ফ্রেন্ডও মজাদার খানাপিনা থেকে দূরে থাকে।
স্যান্ডির বর্তমান বয়স ২৭, বয়ফ্রেন্ডের বয়স ২৪। দুজনেই কাজ করে, পয়সা জমায় ভবিষ্যতের জন্য। সাজগোজ করে মনের আনন্দে, ওর সাজ দেখে বয়ফ্রেন্ড দারুণ খুশি হয়। ওজন আরেকটু কমুক, দুজনে ভাবতে বসবে, বিয়েটা ওরা করবে কিনা।
স্যান্ডিকে একটা সত্যি কথা বললাম, ” স্যান্ডি, তুমি আমার কাছে আত্মবিশ্বাসীর রোল মডেল। তুমি পেরেছো”।
যদিও স্যান্ডি হেসেই উত্তর দিল, ” এত বড় কমপ্লিমেন্ট দিলে , তোমায় অনেক ধন্যবাদ।”
আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার পর স্যান্ডির হাসিটা মেকি হয়ে গেছে। বুঝা যায়, আয়নায় দেখে রপ্ত করা হাসি। তার চেয়ে মোটা অবস্থায় হাসিটাতে ছিল দারুণ সারল্য, দারুণ কোমলতা, ঐ যে সেই সময় যখন স্যান্ডি দেহ নাড়াতে পারতোনা, ঘাড় নাড়াতে পারতোনা।
থাক, তবুও ভাল, স্যান্ডি এখন পরিমাপ মত সাজানো হাসিতে মুখ ভরিয়ে আত্মবিশ্বাসের দৃষ্টিতে সকলের দিকে তাকাবে, যে দৃষ্টি বলে দিবে,
” আমি পেরেছি। প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছি, ওটুকু গৌরবের হাসিতো আমি হাসবোই”।

রীতা রয় মিঠু



এই প্রতিবেদন টি 349 বার পঠিত.