রাষ্ট্রের স্বার্থ উপলব্ধি করতে হবে: নাহিম রাজ্জাক

২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল যার মাঝে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করা ছিল মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও সময়োপযোগি নেতৃত্বের বিকাশ প্রাধান্য পেয়েছে কাউন্সিলে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জনাব ওবায়দুল কাদেরকে নির্বাচিত করার মধ্য দিয়ে। কাউন্সিল পরবর্তী প্রথম বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৭ সালের ২০ মে যেখানে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসন্ন নির্বাচনের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ, সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার জন্য নির্দেশনা ও প্রধান প্রস্তাবগুলো পেশ করেন। যুদ্ধাপরাধীদের দীর্ঘসময় পর বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার ও জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস-দূর্নীতি দমন করা ছাড়াও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির পরিবর্তন, আভ্যন্তরিণ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, শিল্প নিরাপত্তা, শিক্ষা নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী নিরাপত্তা ছাড়াও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও সংবিধানের মৌলিক শর্ত পূরণের দায়ভার বহন করতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬৬, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ এর ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র যেমন ১৯৭৫ সালেও আওয়ামী লীগের পিছ ছাড়েনি তেমনিভাবে আজও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্র হচ্ছে অপপ্রচার পরিচালনা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক শরিয়তপুর-৩ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব নাহিম রাজ্জাকের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ২০ মে ২০১৭ সালের বর্ধিত সভার পর যোগাযোগ করেছেন আওয়ামী লীগের অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে। নাহিম রাজ্জাক দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পিতা আব্দুর রাজ্জাকের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা চলমান রেখেছেন। আব্দুর রাজ্জাক ১৯৭১ সালে জেনারেল ওবানের তত্ত্বাবধানে মুজিব বাহিনী গঠিত হলে চার শীর্ষ নেতার অন্যতম একজন নেতা হিসেবে দেশ মাতৃকার জন্য বীরত্বের ভূমিকা পালন করেছেন।
পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত করার জন্য তিনি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন দলের জন্য। আওয়ামী লীগের মনস্তাত্ত্বিক শক্তি ফিরিয়ে আনার পেছনে আব্দুর রাজ্জাক দলের ঐতিহ্য ও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাকেই ফুয়েল ট্যাংকার মনে করেছিলেন। যেখানে তিনি প্রতিস্থাপিত করতে চেয়েছেন সর্বস্তরের নেতা কর্মীদের। রাষ্ট্র, সংবিধান ও গণতন্ত্রের মূল্যবোধ শুধুমাত্র বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বার মূল শক্তি তারই ধারক বাহক আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর সেই দর্শনের সুযোগ্য উত্তরসুরি আজ আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে নাহিম রাজ্জাক। তাঁর দৃপ্ত উচ্চারণ ও কণ্ঠে আজ দলের বিরাট একটি অংশ উজ্জীবিত ও উদ্যোমি হয়ে নতুন নেতৃত্বের জয়গান গাইছে বাংলাদেশে। তাঁর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যায় বাংলাদেশ বুঝতে শিখছে ভবিষ্যত স্বপ্নের জয়যাত্রার শ্লোগানটি বাংলাদেশকে কোথায় পৌঁছাবে। লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীর রেকর্ডিং রুম থেকে পাঠকের জন্য আজ কিছুক্ষণের জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন নাহিম রাজ্জাক। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মুজিব বাহিনীর শীর্ষ চার নেতার একজন আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে নাহিম রাজ্জাকের রাজনৈতিক থিসিসের সারসংক্ষেপ এখানে প্রকাশ করা হলো।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ অনেক প্রশ্নের ভীড় থেকে প্রথমেই আপনার কাছে জানতে চাই গতকাল ২০ মে গণভবনে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় কি দিক নির্দেশনা পেয়েছেন?
নাহিম রাজ্জাকঃ প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ। স্বাভাবিক ভাবেই আজকে সবাই উপলব্ধি করছে যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল। দক্ষ সভানেত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারা বিশ্বেই বাংলাদেশ একটি উচ্চ মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত। অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে আরও বেশী সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে সভানেত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানেই গণভবনে ২০ মে ২০১৭ বর্ধিত সভার আয়োজন করা হয়েছিল। দীর্ঘসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুভেচ্ছ বক্তব্যে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গণমাধ্যম সেখানে উপস্থিত ছিল। বর্ধিত সভা থেকে স্পষ্টভাবে একটি নির্র্দেশনা দেয়া হয়েছে যে আজকের বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগোষ্ঠির জীবিকার উন্নয়ন, অবকাঠামোর উন্নয়ন, সামাজিক বেষ্টনির ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়নসহ সার্বিক উন্নয়নগুলোকে কেন্দ্র করে দলীয়ভাবে শুধুমাত্র জেলা আওয়ামী লীগই নয়, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সহযোগি সংগঠনসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ যেন প্রচারমুখি হয়ে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে তা জনসমাজে প্রচারের প্রচেষ্টা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার বলেছেন, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দরাও বলেছেন, মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবৃন্দরাও বলেছেন আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। মানুষের কল্যাণে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের উন্নয়নকে গতিশীল করার প্রয়াস হিসেবে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এগারতম জাতীয় নির্বাচনে পূণরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার জন্য আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত হবার কথা উল্লেখ করেছেন শেখ হাসিনা। এটাতেই প্রমাণিত হয় তৃণমূলের নেতৃবৃন্দের, জনপ্রতিনিধিদের, দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের এবং মন্ত্রীবর্গকে সকলকে সম্পৃক্ত করে আমাদের আগামী নির্বাচনের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে মানুষের কাছে আমাদের প্রচেষ্টাগুলোকে তুলে ধরে জনগণের কাছ থেকে যেন প্রত্যাশিত ভোটের দাবি করতে পারি এবং নির্বাচনে যেন জয়যুক্ত হতে পারি। গতকালের বর্ধিত সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই নির্দেশনাই দিয়েছেন যা আওয়ামী লীগের আগামীর প্রচেষ্টাকে আরও উজ্জীবিত করেছে। গত বছর আওয়ামী লীগ ২০তম জাতীয় সম্মেলন করেছে। জাতীয় সম্মেলনের পর এটাই দলের প্রথম বর্ধিত সভা। বর্ধিত সভায় সকলের উপস্থিতিতে জননেত্রী শেখ হাসিনা শুধুমাত্র কার্যনির্বাহী সংসদ নয় বরং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, জাতীয় পরিষদের সদস্য, মন্ত্রীবর্গ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, দপ্তর সম্পাদক, উপ-দপ্তর সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক, সহ-প্রচার সম্পাদক ও তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদকদের কেন্দ্রীয়ভাবে সংগঠিত করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। গতকালের বর্ধিত সভার পরবর্তীকালে ২১, ২২ ও ২৩ মে পর্যায়ক্রমে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক, মাননীয় মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে কর্মশালাসহ আলোচনা সভার আয়োজনও করা হয়েছে। সভানেত্রীর কার্যালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হবে। সবাইকে সম্পৃক্ত করে প্রচারমুখি ও গণমুখি কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্যই এই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এগারতম জাতীয় নির্বাচনে জনগণের মেডেন্ট নিয়ে আওয়ামী লীগকে পূনরায় নির্বাচিত করার জন্যই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই বাংলাদেশকে স্বাধীনতামুখি করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন। অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নকে বাঙ্গালী সমাজ যেভাবে বুঝতে চেষ্টা করে সেটাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন?
নাহিম রাজ্জাকঃ বাংলাদেশকে একজন রাষ্ট্রনায়ক স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। একটি স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন ছিল সেটি। সাত কোটি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়ে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙ্গালী জাতিকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্বুদ্ধ করে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন ও সম্পৃক্ত করেছিলেন। বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র যারা ভাষাকে কেন্দ্র করে জাতীয়গত যে পরিচয় সেটাকে একটি মাত্র চেতনার দ্বারা একটি রাষ্ট্রে পরিণত করতে পেরেছে। যুদ্ধকালীন সময়ে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবনতি, সামাজিক অবনতির মধ্য দিয়ে বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পূনগঠিত করার বিষয়টি বঙ্গবন্ধু গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেই বাঙ্গালী জাতিকে আবারও ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সচ্ছলতা। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধুকে হায়েনারা হত্যা করেছিল। এরপর দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নগুলো বাংলাদেশে অবহেলিত হয়ে পরে ছিল। বাঙ্গালী জাতি সকল ক্ষেত্রেই বিভক্ত হয়ে পরেছিল। জাতীয় উন্নয়নকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পরে বাংলাদেশ। তারা বাংলাদেশকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেয়নি। আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বঙ্গবন্ধুর যে স্বপ্ন ছিল একসময় সেটা বাস্তবায়িত করেছেন তাঁর কণ্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রত্যাশিত লক্ষ্যের চেয়েও বেশী উন্নয়ন ঘটেছে বাংলাদেশে। সেই খবরটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, শুধু এই উপমহাদেশেই নয় বিশ্বব্যাপি আজ সেটা স্বীকৃতি পেয়েছে। রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি জনগণকেই উপলব্ধি করতে হবে। এই অর্জন একদিনে সম্ভব ছিল না। অথবা এই অর্জন এত সহজও নয়। এটা সম্পূর্ণ নেতৃত্বের বিষয়। জনপ্রতিনিধি সকল জায়গায় রয়েছে। ওয়ার্ডগুলোতে মেম্বারদেরও আমরা জনপ্রতিনিধি বলি। ইউনিয়নে জনপ্রতিনিধি বলি আমরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের, উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান। জেলা পর্যায়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছাড়াও সংসদ সদস্যবৃন্দতো রয়েছেনই জনপ্রতিনিধিত্ব করার জন্য। নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যাদের উদ্ভাবনি চিন্তা বেশী ও উদ্যোগ বেশী এবং আধুনিকতার আশ্রয় নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছেন। বিগত সময় বাংলাদেশের অন্যান্য দলগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল। তারা ব্যাপক উন্নয়ন পরিচালিত করতে কিন্তু পারেনি। এজন্যই দেশের জনসাধারণকে উপলব্ধি করতে হবে রাষ্ট্রের স্বার্থ সম্পর্কে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সম্পর্কে জনগণকেই উপলব্ধি করতে হবে। শেখ হাসিনার চিন্তার প্রতিফলন ও দৃষ্টিভঙ্গি একটি সুষম রাজনৈতিক দর্শন। এজন্যই বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা বেড়েই চলেছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণ ইতিহাসে ষড়যন্ত্র লক্ষ্য করেছে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠি। আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের জন্য বিশ্ব ব্যাংক বাংলাদেশকে অর্থায়ন করেনি। তারা অর্থায়ন নিশ্চিত না করে অভিযোগ করেছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। দূর্নীতির অভিযোগ। কানাডার কোর্টে সেই দূর্নীতির অভিযোগটি তারা প্রমাণ করতে পারেনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে এত বড় একটি প্রকল্প আজ বাস্তবায়িত করছে। এত দ্রুত গতিতে সেতুর কাজ চলমান রয়েছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। ৪২ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে সেতুর কাজ শেষ হয়ে যাবে। সেই নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসকল বিষয় আজ সম্ভব হচ্ছে নেতৃত্বের কারণে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ আপনারা মানব সম্পদের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন বাংলাদেশে। অথচ ধর্মীয় উন্মাদনার অজুহাতে এদেশে এখনও অপশক্তিরা তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ধর্ম সেটাকে সমর্থনও করে না। এসব দৃষ্টান্ত শ্রেণী সমাজে টেকসই নয়। এসব দেখেছি ২০১৪ সালে, ২০১৫ সালে এবং এরপরও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে। জনগণতো তা সমর্থন করেই না। অপশক্তির চূড়ান্ত পরিণতি কি তাহলে?
নাহিম রাজ্জাকঃ প্রশ্নটির ব্যাখ্যা দিতে চাইলে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। জাতি হিসেবে আমরা বাঙ্গালী। নাগরিক হিসেবে আমরা বাংলাদেশী। বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ মুসলমান। জাতীয় পরিচয়বিহীন হয়ে শুধুমাত্র ধর্মকে কেন্দ্র করে কোন কোন গোষ্ঠি সমাজে যে অঘটন ঘটাচ্ছে তার প্রতিফলন সমাজে অনেকেই দেখতে পাই আজও। বিশ্বব্যাপি এই সংকট চলমান। আত্মপরিচয়ের সংকট আজ বিশ্বব্যাপি। জাতিগত ও ধর্মগত বিভেদের কারণেই এই সংকটের সৃষ্টি। বাংলাদেশের সংবিধান এই রাষ্ট্রে সকল ধর্মকেই সমর্থন করে। ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে সংকট সৃষ্টি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর নয়। বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। সংস্কৃতির চর্চা করতে যেয়ে আমরা ২১ শে ফেব্রুয়ারী যেমন পালন করি তেমনি ধর্মের চর্চা করতে যেয়ে আমরা শবে বরাত ও ঈদ পালন করি। এখানে সুপ্রাচিনকাল থেকেই কোন সংঘর্ষ ও বিভাজন নেই।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ আপনার পিতা জনাব আব্দুর রাজ্জাক মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মুজিব বাহিনীর অন্যতম শীর্ষ চার নেতার একজন হলেন আব্দুর রাজ্জাক। মুজিব বাহিনী আজও এদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি কেন?
নাহিম রাজ্জাকঃ মুক্তিযুদ্ধের অনেককাল পরে আমার জন্ম। মুজিব বাহিনীর নামের সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সংশ্লিষ্ট। ১৯৭৫ সালের পর মুজিব নামটি ঢেকে দেয়ার প্রচেষ্টা চলেছিল বাংলাদেশে। জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে রক্ষিবাহিনীকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। অফিসারদের পূনরায় সামারিক বাহিনীতে যোগদানে বাধ্য করা হয়েছিল। জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পরও মুক্তিবাহিনী নিয়ে কোথায়ও কখনও আলোচনা হয়নি। পরবর্তীকালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেও এ বিষয়টি অবহেলিত থেকেছে। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় এই বিষয়টি অবহেলিত একটি অধ্যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর লবদান ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান। মুজিব বাহিনীর চারজন নেতা ছিলেন। সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও শেখ মনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর চার নেতা। চারজনই নেতৃত্বে ছিলেন। স্বাধীনতার সময় মুজিব বাহিনীর ভূমিকা অনেক বিস্তৃত ছিল। এই বাহিনীর ট্রেনিং পরিচালিত হয়েছিল ভারতের জেনারেল ওবানের তত্ত্বাবধানে। দীর্ঘ সময় মুজিব বাহিনী নিয়ে আর কোন অগ্রসরতা লক্ষ্য করা গেল না এদেশে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সাহেব মুজিব বাহিনীর ব্যাপারে কিছুটা তৎপরতা দেখিয়েছেন। ইতিহাসে মুজিব বাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি সুস্পষ্ট আলোচনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের নতুন যাদুঘরে মুজিব বাহিনীর কর্মকান্ড ও শক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সংযোজিত হয়েছে। ইতিহাসের পর্যালোচনায় সকলেই আমরা আগ্রহি। সিরাজুল আলম কান সাহেব রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্যুত হবার পরে এবং শেখ ফজলুল হক মনি হত্যাকান্ডের শিকার হবার পরে এবং ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর গোটা পরিবার নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের পরে আওয়ামী লীগ সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ সাহেব মাঠে ঘাটে চষে বেড়িয়েছেন। ১৯৮১ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণ ও দলের ডাকে বাংলাদেশে ফেরত আসেন এবং আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের পরে আওয়ামী লীগকে পূনর্গঠিত করার বিষয়টিই বেশী গুরুত্ব পেয়েছিল শীর্ষ নেতৃত্বে। এ কারণেই মুজিব বাহিনীর তাৎপর্য ততটা গুরুত্ব পায়নি পচাত্তর পরবর্তী সময়ে। মুজিব বাহিনীর নেতারা এখনও দলের বিভিন্ন অংশে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা জীবিত রয়েছেন। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে নেতৃবৃন্দের চিন্তা ভাবনা ছিল দলটি টিকিয়ে রাখা এবং সুসংগঠিক করা।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ বাংলাদেশে বারবার মানুষ লক্ষ্য করেছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে প্রতিযোগিতা হয় সেটা শুধুমাত্র দূর্নীতি করার জন্য, লুটপাট করার জন্য ও শোষণ করার জন্য ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময় থেকে সেটাই হয়ে আসছে। বাংলাদেশের অবস্থান দূর্নীতির শীর্ষে ছিল টানা পাঁচ বছর। বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল চিন্তা করে মানুসের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা আর অন্যদিকে আরও কিছু রাজনৈতিক দল চিন্তা করে ক্ষমতায় এসে দূর্নীতি করার ও লুটপাট করার। আগামী নির্বাচনেও এই প্রতিযোগিতাই হবে। তাহলে নির্বাচনটা কিসের উপর ভিত্তি করে হবে?
নাহিম রাজ্জাকঃ আপনি যথার্থই বলেছেন বাংলাদেশে কোন কোন রাজনৈতিক দলের নৈতিকতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই তারা তাদের আদর্শ অথবা নীতিগত কোন দিক নির্দেশনা ছিল না। তারা নিজস্ব মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করাতে ব্যর্থ হয়েছিল। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় পরিচালনার দায়িত্বে জেনারেল জিয়াউর রহমান সাহেব ছিলেন এবং জেনারেল এরশাদ সাহেব ছিলেন। সেসময় মৌলবাদকে তারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। সাম্প্রদায়িক চেতনা সংযোজিত হয় রাষ্ট্র যন্ত্রে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা তাদের মাঝে লক্ষ্য করা যায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে তারা অপব্যবহার করেছে। আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সাল থেকেই নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। গণতন্ত্রের চর্চা আওয়ামী লীগের প্রাণশক্তি। আওয়ামী লীগ মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত নয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী বোধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার দ্বারা আওয়ামী লীগের নেতারা গণতন্ত্রকামী আধুনিক মানুষ। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই আওয়ামী লীগের অন্যতম মূলমন্ত্র। আগামী নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের নাগরিকরা সচেতন। ভোটারদের এক তৃতীয়াংশ তরুণ। তরুণ সমাজ অত্যন্ত সচেতন। বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারে তারা বিশ্বাস করে না। মৌলবাদকে তারা সমর্থন করে না। তাদের বিশ্বাস উন্নয়নে। তারা বিশ্বাস করে স্বচ্ছ রাজনীতি। একটি স্বচ্ছ সমাজ ব্যবস্থা। আগামী নির্বাচনে ভোটারদের অপপ্রচার থেকে মুক্ত করে রাখতে হবে। এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দল একজন ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয়। দলীয় নেতাকর্মী ও আওয়ামী লীগের সমর্থিত গোষ্ঠির বড় একটি প্রভাব আছে নির্বাচনে। নিউট্রাল ভোটারসরা অনেক সময় বিভ্রান্ত থাকে। তাদের সংখ্যা ৩০ শতাংশ। নিউট্রাল ভোটারসরা ব্যক্তির গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ করে থাকে। এসব বিষয়বস্তু আগামী নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। এক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগ এগিয়ে রয়েছে। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য মনোনিত ব্যক্তিদের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে প্রস্তুত হবে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি স্বচ্ছ গণমুখি নির্বাচনে বিশ্বাস করেন। নির্বাচনটি বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করবে।
লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরীঃ আপনাকে ধন্যবাদ।
নাহিম রাজ্জাকঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।



এই প্রতিবেদন টি 4764 বার পঠিত.