আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়

index3শাশ্বতী দাস

মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা

প্রাথমিক শিক্ষা যেকোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক শিক্ষা অনেক শিশুর জন্য প্রান্তিক শিক্ষা। তাই প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে যথাযথ ভূমিকা পালনের জন্য বাংলাদেশের সকল শিশুদের জন্য যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম তৈরি করা হয়েছে। এই যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের আওতায় প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে গ্রহণ করা হয়েছে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে বিদ্যমান বিভিন্ন ধরনের সমস্যার কারণে কর্মসূচিগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।                                                                                                                                                                                                                          সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশুদের মধ্যে বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া প্রায় শতভাগ শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। ভর্তিকৃত সকল শিশুদের হাতে বছরের প্রথম দিনে নতুন পাঠ্যপুস্তক তুলে দেওয়া হয়।  স্থানীয়ভাবে বিভিন্নমুখী চাপের মাধ্যমে একটি বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকার সকল শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পাঠ্যপুস্তক গ্রহণ করে কিছুদিন বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসা যাওয়া করেছে ঠিকই, কিন্তু চরম দরিদ্র পরিবারের শিশু তার পরিবারের খাবার জোগাড় করতে গিয়ে আবারও চলে গেছে ইটের ভাটায় কিংবা চায়ের স্টলে। বিদ্যালয়ের মাসিক ১০০ টাকার শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি তাকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে পারেনি। মা ও ছোট ভাইবোনের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য তার চাহিদা যে আরো অনেক বেশি। ফলে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবী শতভাগ শিক্ষিত জাতি গঠন আমাদের জন্য অনেক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
আমাদের দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশুদের অধিকাংশই আসে নিন্ম আয়ের পরিবার থেকে। নিম্ন আয়ের পরিবারে জন্ম নেওয়া শিশুরা সাধারণত অপুষ্টির শিকার হয়ে জন্মগ্রহণ করে । জন্মের পরও এই সব শিশুরা প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে অপুষ্টির শিকার হওয়া এসব শিশু বিভিন্ন ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়। পুষ্টিহীনতার কারণে তাদের মেধাশক্তি ধীরে ধীরে  হ্রাস পেতে থাকে । ফলে তারা বিভিন্ন শ্রেণিতে পুনরাবৃত্তি শিক্ষার্থী হিসেবে থাকে। এর ফলে একটা বড় অংশ প্রাথমিক শিক্ষাচক্র সমাপনের আগেই ঝরে পড়ে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পরিচালনার জন্য সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যালয় এলাকার স্থানীয় জনগণকে নিয়ে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোকে স্থানীয় জনগণের অংশীদারিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য এই কমিটি গঠন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের স্থানীয় পর্যায়ে সকল প্রকার উন্নয়ন কার্যক্রম এই পরিচালনা কমিটি কর্তৃক পরিচালিত হয়। জনগণ বিদ্যালয়কে নিজের মনে করে তাকে আর্থিকভাবে, শারীরিক শ্রম দিয়ে একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যালয় পরিচালনায় বিভিন্নমূখী সমস্যার সৃষ্টি হয়। প্রতিটি বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের বেতন বিল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কর্তৃক অনুমোদন করার বিধান থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে আশানুর“প ফল পাওয়া যায় না। বিষয়টি একইসাথে শিক্ষকদের জন্য অবমাননাকরও। কারণ প্রতিটি শিক্ষককে নিজের যোগ্যতার পরিচয় প্রদান পূর্বকই শিক্ষকতা পেশায় আসতে হয়েছে।
মানসম্মত শিক্ষার সবচেয়ে গুর“ত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শিখন শেখানো কাজের মান উন্নয়ন করা। এক্ষেত্রে শিক্ষকরাই মূল ভূমিকা পালন করেন। সেজন্য সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন। দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষাউন্নয়ন কর্মসূচি শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বাংলা, গণিত, ইংরেজি, পরিবেশ পরিচিতি সমাজ ও পরিবেশ পরিচিতি বিজ্ঞান এই পাঁচটি বিষয়ে বিষয় ভিত্তিক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু প্রশিক্ষণ এর পর প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাথীদের শিখন কাজের মান উন্নয়নে সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। এর প্রধান কারণ শিক্ষকদের গতানুগতিক পাঠদান পদ্ধতিতে পাঠদান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারা। অনেক শিক্ষকই নতুন শিখন শেখানো কৌশল ও তার প্রয়োগে আগ্রহী নন। তাদেরকে শিক্ষাক্ষেত্রে যুগোপযোগী ও আধুনিক ধ্যান ধারণার প্রতি নিজের তাগিদেই দৃষ্টি দিতে হবে। নিজের পেশাগত দক্ষতার উন্নয়নে আত্মবিশ্বাসী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
যেকোনো কাজে সফলতা অর্জনের প্রথম শর্ত হচ্ছে কাজের প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেকড় ছিলো পন্ডিতমশাইদের পাঠশালা। তারা তাদের আর্থিক দৈন্যতার মাঝেও কখনো শিক্ষকতা পেশার প্রতি আস্থা হারাননি। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানকারী কিছু সংখ্যক শিক্ষকের শিক্ষকতার প্রতি আস্থা, ভালোবাসা বা শ্রদ্ধাবোধ কোনোটাই নেই। তারা আসলে শিক্ষকতা করতে আসেন না, চাকুরী করতে আসেন। তারা যদি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টিয়ে শিক্ষকতার পেশাকে ভালোবেসে ছোট শিশুদের শিক্ষাদানে এগিয়ে আসেন তবে প্রাথমিক শিক্ষাএগিয়ে যাবে।

সিলেট বিভাগের অনেক উপজেলায় এখনো অনেক বিদ্যালয় তিন শিক্ষক বিশিষ্ট। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক সহ সকলকে দুই শিফট মিলিয়ে সারাদিন একটানা পাঠদান করে যেতে হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষকদেরকে যন্ত্রের মত একটানা বিভিন্ন শ্রেণিতে পাঠদান করে যেতে হয়। একই গতিতে প্রধান শিক্ষককেও তার প্রশাসনিক কার্যকর্মের পাশাপাশি একটানা পাঠদান করতে হয়। ফলে তার পক্ষে অন্য কোন শিক্ষকের শ্রেণি পাঠদান মনিটরিং করার সুযোগ থাকে না। সে সমস্ত বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন বা শিখন শেখানো কাজের উন্নয়নের বিষয়টা অবহেলিত থেকেই যায়।
উন্নত বিশ্বে বাধ্যতামূলক শিক্ষার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা নেওয়ার পদ্ধতি অনেকটাই শিথিল করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্লাস পরীক্ষা ও  রেকর্ড সংরক্ষণের মাধ্যমে তাদের মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে প্রথম শ্রেণি থেকে বছরব্যাপী তিনটি আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা চালু থাকা এবং এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হওয়ায় অনেক শিশুই ভীতিগ্রস্থ থাকে। অনেক শিশু আনুষ্ঠানিক ভাবে বিষয়বস্তু প্রকাশ করতে পারে না। অনেকে শিশুই স্বেচ্ছায় পরীকক্ষা প্রদানে রাজি থাকে না। শিক্ষক ও অভিভাবকদের চাপে তারা পরীক্ষা দেয়। ধীরে ধীরে তাদের পরীক্ষাভীতি স্কুলভীতিতে পরিণত হতে থাকে এবং এই পরীক্ষাভীতির কারণে কিছু শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। ২০০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক শিক্ষাকে একটি অভিন্ন রূপ দেওয়ার প্রেক্ষোপটে দেশব্যাপী অভিন্ন প্রশ্নপত্রে প্রাথমিক শিক্ষাসমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়েছে। উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উৎসব মুখর পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও পরীক্ষা পরিচালনা পদ্ধতি এবং ১০ বছর বয়সে একটি পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টা কতটা মনোবিজ্ঞান সম্মত সে বিষয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে অনেকটা আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন ক্ষত্রে সফলতা অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দ্বিতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বর্তমানে তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির কার্যক্রম শুর“ হয়েছে। আমরা আশা করি, তৃতীয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা বর্তমান বিবেচনায় সীমাবদ্ধতা সমূহ দূরীকরণসহ আগামীদিনে নতুন নতুন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনে সম্পূর্ণ সফল হব।

শিশুবান্ধব বিদ্যালয় পরিবেশ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুরা ভর্তি হয় ৫/৬ বছর বয়সে। তারা আসে মায়ের সান্নিধ্য থেকে। এই বয়সের অনেক শিশুই মাকে ছাড়া থাকতে পারে না। তাই তাদেরকে বিদ্যালয়ের পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য শিক্ষককে মায়ের মতো মমতা দিয়ে, বন্ধুর মতো ভালোবাসা দিয়ে বিদ্যালয়ে আপন করে নিতে হবে। কোনো শিশু কোনো পরিবেশে এসে প্রথমে যদি ভালোবাসার ছোঁয়া পায় তাহলে তার পক্ষে সে পরিবেশে মানিয়ে নেয়া সহজ হয়। কাজেই শিশুরা বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় যদি ভালোবাসার ছোঁয়া পায়, তবে সে বিদ্যালয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে, তার মনে বিদ্যালয় ভীতি থাকবে না এবং তার ফলে সে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়বে না। বিদ্যালয়ে শিশু ভর্তি করার দিনে নবাগত শিক্ষার্থীকে  যদি আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে নেওয়া হয়, বিদ্যালয়ে যদি সাজানো থাকে শিশুর খেলার বিভিন্ন উপকরণ, শিশু যদি বুঝতে পারে তার জন্যই এই আয়োজন তাহলে শিশু বিদ্যালয়কে তার নিজের বাড়ির মতোই ভাবতে পারবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে এই শিশুদের সাথে নিজের সন্তানের মতোই আচরণ করতে হবে।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শৌচাগার ও পানীয় জলের সুবিধা ইত্যাদি বিষয়ে শিশুর বয়স ও র“চির প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা যদিও সরকারের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী করা হয়েছে, তথাপি প্রধান শিক্ষকের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা , কৌশল ও মেধার সমন্তয়ে নিজ বিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে  বিদ্যালয় পরিবেশ সজ্জিত করতে পারেন।

শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে উপকরণের ব্যবহার

শিক্ষা একটি মৌলিক মানবাধিকার। বাংলাদেশে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষাই হচ্ছে শিক্ষার প্রথম সোপান। এ শিক্ষা একদিকে শিশুকে উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা দান করে, অন্যদিকে শিশুকে তার অর্জিত শিক্ষার মাধ্যমে পরিবারের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সহায়তা করে। এ জন্য প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের প্রধান শর্ত হলো বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশু ভর্তির হার বৃদ্ধি, শিশুদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, সর্বোপরি শ্রেণিকক্ষে আন্তরিক ও মানসম্মত পাঠদান। শিশুদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা ও মানসম্মত পাঠদানের জন্য উপযুক্ত শিক্ষোপকরণ প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের অধিকতর অংশগ্রহণমূলক এবং তাদের কাছে পাঠদানকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য পাঠ সংশিলিষ্ট উপকরণ ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। খুব সহজেই অল্প ব্যয়ে অনেক আকর্ষণীয় উপকরণ তৈরি করা যায়।

শিশুর মেধা বিকাশে সৃজনশীলতা

প্রতিটি স্বাভাবিক শিশুই সৃজনশীল। সৃজনশীলতা হলো নতুন কোনো কিছু সৃষ্টি করা। আবার কোনো কাজ নতুনভাবে করাটাও সৃজনশীলতা। সৃজনশীলতা হলো নিজের মতো করে কিছু করা, সবার চেয়ে আলাদা কিছু করা। কাজেই নতুন কোনো কিছু তৈরি করা, যা ভালো কাজে লাগতে পারে বা কোনো কাজ নতুনভাবে করা সৃজনশীলতা হিসেবে পরিগণিত হয়। আমাদের সকলের মধ্যেই সৃজনশীলতা রয়েছে। অর্থাৎ আমরা সকলেই কোনো না কোনো ভাবে সৃজনশীল। সৃজনশীলতা একেক জনের ভেতরে একেক ভাবে, একেক রূপে থাকে। কাজের মাধ্যমে তাদের সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে। শিশুদের ভেতরে সৃজনশীলতা লুকানো অবস্থায় থাকে। বর্তমানে পাঠ্যপুস্তকগুলোর বিষয়বস্তু নির্বাচন ও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে শিশুর সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ সাধনের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সচরাচর আমরা দেখি কোনো শিশু ছবি আঁকতে পছন্দ করে, কোনো শিশু গান শুনতে বা গাইতে পছন্দ করে, কোনো শিশু নৃত্য দেখলে মনোযোগী হয়, কোনো শিশু লিখতে পছন্দ করে, কোনো শিশু গুছিয়ে সুন্দরভাবে কথা বলতে পারে, কোনো শিশু সকল বিষয়ে প্রশ্ন করতে চায়, আরো জানতে চায়,  কোনো শিশু দলে কাজ করার সময় নেতৃত্ব দিতে পারে, কোনো শিশু প্রকৃতির ক্ছাাকাছি থাকতে চায়। এই যে শিশুদের কাজ করার মধ্যে এত বৈচিত্র্য- এই বৈচিত্র্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর, সঠিকভাবে বিকশিত করার দায়িত্ব শিক্ষকের। শিক্ষককে খুঁজে বের করতে হবে কোন শিশু কীভাবে  নিজেকে প্রকাশ করতে চায়? কীভাবে তার মনের কথাগুলো ব্যক্ত করতে চায়? আর এজন্য শিক্ষকের সৃজনশীলতা বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। তাকে কৌশলী হতে হবে শিশুর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের জন্য। শিশুদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হবে। তাহলে শিশু ধৈর্য্য সহকারে যেকোনো কাজ করার প্রেরণা পাবে এবং কাজে সফলতা পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হবে। শিশুর মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। ছোটখাটো ঘটনায় শিশুর আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করতে পারলে সে অন্যকে সম্মান করবে, কাউকে কষ্ট দেবে না, ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হবে না, মারামারি করবে না, মিথ্যা কথা বলাসহ যেকোনো অন্যায় কাজ করা থেকে বিরত থাকবে। অর্থাৎ শিশুটি একজন উন্নত চরিত্রের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।
লেখার ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশুদের নিজের চিন্তা ও চেতনার দ্বারা সৃষ্ট রচনাকে ‘সৃজনশীল রচনা’ বলা হয়। শিশুর সুকুমার বৃত্তির বিকাশের ক্ষেত্রে শিশুদের চিন্তা, চেতনা ও মেধার উপর ভিত্তি করে তাদেরকে সেই রকম করে গড়ে তুলতে হবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো সম্ভব। শিশুর সমস্ত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার জন্য সৃজনশীল রচনা প্রয়োজন। শিশু এ কাজে অভ্যস্ত হলে শিশু তার নিজের মনোভাব সুন্দরভাবে ব্যক্ত করতে পারবে এবং লিখে প্রকাশ করতে পারবে। শিশু আত্মপ্রকাশের শক্তি অর্জন করবে। শিশুর মধ্যে সাহিত্যানুরাগের সৃষ্টি হবে। শিশু আত্মপ্রত্যয়ী হবে এবং তার নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটবে। শিশু মুক্তচিন্তা ও মুক্তমনের অধিকারী হবে। সৃজনশীল রচনার গতিশীলতায় শিশুর লেখার জড়তা কেটে যাবে। বিষয়বস্তু মুখস্থ করার একঘেয়েমি দূর হবে এবং শিশু মানসিক জড়তা থেকে মুক্তি পাবে। বর্তমান যোগ্যতাভিত্তিক  শিক্ষাক্রমে শিখনফল ভিত্তিক শিখন শেখানো কার্যক্রম পরিচালনায় লেখার ক্ষেত্রে শিশুদের সৃজনশীলতা বা নিজস্বতা একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। শিশুদের জ্ঞান ছাড়া অন্য যে কোনো ডোমেইন ভিত্তিক অভীক্ষাপদের উত্তর করার জন্য সৃজনশীলতার তথা নিজস্বতার পরিচয় দিতে হয়। শিশুর নিজস্বচিন্তা ধারা, সাবলীল প্রকাশ ভঙ্গী  বিষয়বস্তু সম্পর্কে তার ধারণা প্রকাশ করে। কাজেই বলা যায় বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে পাঠদানের জন্য শিক্ষককে সৃজনশীলতা ও তার প্রকাশে সম্পর্কে সম্যক ধারণা পোষণ করতে হবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা

শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া যার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিটি শিশুকে তার ব্যক্তিজীবনে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। প্রতিটি শিশুই অনন্ত সম্ভাবনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। শিশুদের এই সুপ্ত সম্ভাবনা বিকশিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন সৃষ্টিধর্মী নির্দেশনা ও সহযোগিতা।

শিশুর বিদ্যালয় পরিবেশ যত সুন্দর হবে শিশু শিক্ষা গ্রহণের প্রতি তত আগ্রহী হবে। শিশুরা যতক্ষণ শ্রেণিতে থাকে ততক্ষণ ভালো চিন্তা ও কাজে ব্যস্ত থাকে। বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার গঠনের মাধ্যমে শিশুরা সহজেই তাদের সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটাতে পারবে। বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার গঠন খুব কঠিন কাজ নয়। বিদ্যালয়ে একটি অতিরিক্ত কক্ষ থাকলে তাতে কয়েকটি সেলফে বই রাখা যায়।বিদ্যালয় এলাকার প্রাক্তন শিক্ষার্থী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করা যায়।পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় কিছু প্রয়োজনীয় বই কেনাও যায়।  প্রশ্ন কক্ষ হলে তাতে রিডিং কর্ণার, রাইটিং কর্ণার, ড্রইং কর্ণার, গেম কর্ণার করা যায়। শিশুরা তাদের বুদ্ধিমত্তা অনুসারে তার পছন্দের জায়গায় বসে সৃজনশীল কাজে মেতে উঠবে। এতে সে সুন্দর ও সৃষ্টিধর্মী অভ্যাসের অনুশীলনের মাধ্যমে একজন আলোকিত মানুষে পরিণত হবে। যদি বিদ্যালয়ে লাইব্রেরী গঠনের জন্য আলাদা কক্ষ না থাকে তবে যেকোনো একটি বড় শ্রেণিকক্ষে বা অফিসকক্ষে কয়েকটি সেলফে বই রাখা যায়। একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দিয়ে সুষ্ঠুভাবে শিক্ষার্থীদের বই বিতরণ করে কাজটি করা যায়।
শিশুরা সবসময় কিছু করতে চায়। বিদ্যালয়ে লাইব্রেরী থাকলে তারা তাদের অবসর সময়ে তাদের নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন কাজে যেমন – বই পড়া, লেখা, ছবি আঁকা , বিভিন্ন নকশা আঁকা ও কাটা ইত্যাদি সৃজনশীল কাজে মেতে উঠলে বিদ্যালয়ের পরিবেশ যেমন শান্ত ও প্রাণবন্ত  থাকবে তেমনি শিক্ষকদের জন্যও সহায়ক একটি পরিবেশের সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে সেসব বিদ্যালয়ে স্বল্প সংখ্যক শিক্ষক দ্বারা শিখন শেখানো কার্যাবলি পরিচালনায় শিশিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনেক সহায়তা পাওয়া যাবে।

প্রাথমিক শিক্ষাসমাপনী পরীক্ষা

দেশের বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের শিশুদের মধ্যে বৈষম্য দূর করে সমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে সারাদেশে একযোগে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যযনরত ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। শহর থেকে শুরু করে গ্রামে পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২০১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দেশব্যাপী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা দেশের প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সহযোগিতায় উপজেলা শিক্ষা অফিসের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণত উপজেলা শিক্ষা অফিসের অধীনে একটি উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সমস্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। উপজেলার সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের বেতনভাতা প্রদান, বদলী, টাইমস্কেল, বিভিন্ন ধরনের ছুটি অনুমোদন সহ যাবতীয় কার্যক্রম উপজেলা শিক্ষা অফিসারের অধীনে সম্পন্ন হয়। ফলে উপজেলা শিক্ষা অফিসের নিয়মিত কার্যক্রম সম্পাদনের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা পরিচালনা, ফলাফল তৈরি, ফলাফল অধিদপ্তরে প্রেরণ খুবই কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষার অনেকগুলো কেন্দ্রের হল সুপার, হল পর্যবেক্ষক, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষক নিয়োগ করতে হয় বিধায় সকল ক্ষেত্রে যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন কক্ষে একযোগে বিভিন্ন বিষয়ের সকল পরীক্ষক একই সাথে পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন বিধায় অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষার গোপনীয়তা নষ্ট হয়, যা অভিভাবকদের মনে পরীক্ষার প্রতি বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি করে। স্বল্প সময়ে অধিক সংখ্যক উত্তরপত্র মূল্যায়ন করার ফলে অমেক সময় মেধাসম্পন্ন অনেক শিক্ষার্থী তাদের প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত হয় ,আবার অনেক নিম্ন মেধার শিক্ষার্থীও অনেক বেশি নম্বর পেয়ে যায়। সাধারণত বাংলাদেশের বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষাগুলো যেমন-এস.এস.সি. , এইচ. এস. সি. পরীক্ষা নির্দিষ্ট শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাই দেশের সর্ববৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা। তাই এই পরীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি পৃথক বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন। তাহলে এই পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনাসহ পরীক্ষাটির গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে।

সীমাবদ্ধ আমি

শিক্ষক হিসেবে যোগদান করার পর আমার  নিজের উপর আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। একটি প্রত্যš— গ্রামের একটি স্কুলে যোগদান করার ফলে মনে হয়েছিল এবার গ্রামের সাধারণ ও অসহায় শিশুদের জন্য কিছু কাজ করতে পারবো। প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর সেই সুযোগ আরেকটু অবারিত হলো। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করে বেশিদিন থাকা গেল না । আমার এই আত্মবিশ্বাস ভঙ্গের  কারণ পারুল, রাব্বী, সুমা, চয়ন, আফজল, শান্ত নামের কয়েকটি শিশু। পারুল, রাব্বী, সুমা, চয়ন, আফজল, শান্ত -এরা অন্য সকল শিশু থেকে একটু আলাদা। এদেরকে আমরা সাধারণত বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু হিসেবে অভিহিত করে থাকি। আমাদের সমাজে এখনো এদেরকে বোঝা হিসেবে দেখা হয়। এদের জন্ম অসচ্ছল পরিবারে হওয়াতে এরা আরো বেশি অসহায়। এরা বড় হচ্ছে অনাদরে, অবহেলায়।
২০০৮ সালে পার“লের বয়স যখন ৬ বছর, তখন তার পরিবার পার“লের অসামর্থ্যতার জন্য বিদ্যালয়ে পাঠাতে অসম্মতি জানালেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী  চরমমাত্রায় প্রতিবন্ধী ছাড়া সহনশীল মাত্রার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সকল শিশুকে সাধারণ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে এনে শিক্ষাদান করতে হবে।। তাই পারুলের পরিবারকে অনেক বুঝিয়ে পারুলের ৭ বছর বয়সে পারুলকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করা হলো। কয়েকদিনের মধ্যেই পার“ল আমাকে অতি আপনজন হিসেবে মেনে নিল। বিদ্যালয়ে আসার পর থেকে সে কয়েক দফায় আমার সাথে দেখা করে  আমার কাছে নানা আবদার করতো , আমাকে আদর দিত। তার দাদী ছিলেন তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাই সে তার দাদীর সাথে আমার দেখা হওয়া মাত্রই তার দাদীকে আবদার জানাতো আমাকে আদর করার। বিদ্যালয়ে আসার সুবাদে তার কিছু কিছু সামাজিকীকরণও হচ্ছিল। কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্য শিখন শেখানো কার্যাবলি বাস্তবায়নের  ক্ষেত্রে দেখা গেলো-পুরো বছরে তাকে মাত্র কয়েকটি বর্ণ শেখানো সম্ভব হলো। আমি আশাবাদী ছিলাম, হয়তো পরের বছর তাকে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে অনেকটাই অভ্যস্ত করে তোলা সম্ভব হবে। কিন্তু পরের বছর তার মধ্যে আরো বেশি অস্বাভাবিক আচরণ পরিলক্ষিত হলো। সে নিজের বই-খাতা ছিঁড়ে ফেলার পাশাপাশি অন্যের বই-খাতাও ছিঁড়তে শুর“ করল।। অন্যান্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের চাপে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত পারুলের পড়ালেখার পাট এখানেই চুকে গেল। পারুলের এই দেড় বছর স্কুল জীবনে আবেদন করেও তার জন্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু হিসেবে কোন আর্থিক সাহায্য পাওয়া যায় নি , যার দ্বারা তার চিকিৎসা করা সম্ভব। তাই পার“লের জন্য কিছু করার কোন সাধ্যই আমার ছিল না।

বুদ্ধির স্বল্পতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা রাব্বী চার বছর ধরে প্রথম শ্রেণিতে পড়ার পর ২০১৩ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। সে যখন প্রথম স্কুলে এসে ভর্তি হয়, তখন সে স্কুলে আসার রাস্তা থেকেই কান্না শুরু করতো। ধীরে ধীরে তাকে চকলেট, চানাচুর ইত্যাদি খাইয়ে খাইয়ে  প্রথমে স্কুলে অভ্যস্ত  করতে হয়েছে। তারপর বছরে আট/দশটি বর্ণ শেখার মাধ্যমে তার   প্রথম শ্রেণির শিক্ষাকাল অতিক্রম হয়েছে। আসলে এসব শিশুদের আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে রেখে নির্দিষ্ট সময়সীমায় নির্ধারিত যোগ্যতাসমূহ  অর্জন করানো সম্ভব নয়। তাদের জন্য প্রয়োজন তাদের উপযোগী অবকাঠামোগত পরিবেশ এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক। শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করার জন্য তাদেরকে বিদ্যালয়ের ভর্তিকৃত শিশু হিসেবে দেখানোর যে প্রচেষ্টা আমরা করছি তাতে তাদের আসলে তেমন লাভ হচ্ছে না।তাদের জন্য প্রয়োজন তাদের উপযোগী শিশিক্ষার মাধ্যমে তাদের কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করা।
এদের বাইরে আমাদের বিদ্যালয় সমূহে ক্ষীণ দৃষ্টি সম্পন্ন ও ক্ষীণ শ্রবণ শক্তি সম্পন্ন কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে যাদের জন্য সামান্য কিছু চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করলে
আমাদেরকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তথ্য দেওয়া হয় যে, খুব দ্রুতই আমরা আমাদের বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাগ্রস্থ  শিশুকে রেফারেল ফরমসহ চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের কাছে পাঠালে তারা বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পাবে। দিনের পরে দিন যায়, বছরের পরে বছর যায়, আমাদের বাছাইকৃত সমস্যাগ্রস্থ শিশুরা বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু তাদের চিকিৎসার জন্য বিদ্যালয়ে রেফারেল ফরমও আসেনা, তাদের চিকিৎসাও হয়না।  উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে আমার বিদ্যালয়ের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী চয়ন, আফজল ও শান্ত হয়তো চিরদিনের জন্য দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলবে। আর আমি বসে বসে তাদের আশার কথাই শুধু শুনিয়ে যাব, বা্স্তবে তার কিছুই হবেনা।
উন্নত দেশে সাধারণ বিদ্যালয় সমূহে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের শিক্ষার জন্য পৃথক অবকাঠামোগত ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষক আছেন। তাই তারা শতভাগ ভর্তি নয়, শতভাগ শিশুর শিক্ষালাভ নিশ্চিত করতে পারছে। আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থা কবে হবে? আমি কী পারবো আমার সীমাবদ্ধতার গন্ডী থেকে বেরিয়ে আসতে।

জাপানে প্রশিক্ষণের আলোকে

ছোটবেলায় পড়েছিলাম জাপানকে “সূর্যোদয়ের দেশ” বলা হয়। কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি যে জাপানে গিয়ে এই সূর্যোদয়ের দৃশ্য নিজের চোখে দেখব। ৩১ জানুয়ারি, ২০১১ বাংলাদেশ সময় আনুমানিক রাত তিনটায় বিমানের ভেতরটা রোদের আলোয় ভরে গেল। বুঝলাম সূর্যোদয়ের দেশে পৌঁছে গেছি। আমাদের জন্য আরো চমক অপেক্ষা করছিল। বিমানের জানালা দিয়ে যা দেখা গেল তাতে মনে হলো, বিমানটা সমুদ্রের মধ্যেই নেমে যাচ্ছে। কী ঘটছে বুঝতে না পেরে অজানা আশঙ্কায় প্রাণটা ধুক্ধুক করছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের বহন করা বিমানটা জাপানের কানসাই এয়ারপোর্টে অবতরণ করলো। কানসাই এয়ারপোর্টটি সমুদ্রের মধ্যে বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়েছে। এয়ারপোর্ট থেকে সমুদ্রের মধ্য দিয়েই মহাসড়ক তৈরি করে তা ওসাকা শহরের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। আমাদেরকে পূর্বেই নির্দেশনা দেওয়া ছিল যে আমরা কানসাই এয়ারপোর্টে জাইকা কাউন্টারে সমবেত হবো। জাইকা কাউন্টারে জাইকা কর্র্তৃপক্ষ আমাদের স্বাগত জানালেন। জাইকা কর্র্তৃপক্ষের নির্ধারিত বাসে করে আমাদের ওসাকা শহরে জাইকা সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলো।
আমরা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের যৌথ সহায়তায় পনেরো জনের একটি দল জাইকার ÒTraining Program for Young Leaders on Science and Mathematics in Basic Education Course for Bangladesh  এ অংশগ্রহণের জন্য জাপানে এসেছি। আমাদের টিম লিডার জনাব কাওসার সাবিনা, সহকারী পরিচালক (প্রশিক্ষণ), প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা, বাংলাদেশ। আমরা তাঁর নেতৃত্বে জাপানের ওসাকা শহরে জাইকা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। প্রশিক্ষণ কালীন সময়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অবকাঠামোগত অবস্থান, কর্তৃপক্ষ এবং সকলের বিনয়ী ব্যবহার, আতিথেয়তা  সর্বোপরি আমাদের চলার পথে তাদের সহযোগিতা আমাদেরকে মুগ্ধ করেছে। নিচে প্রশিক্ষণের আলোকে জাপানের শিক্ষা ও প্রযুক্তি সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।
জাপানে ১৮৮৬ সালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়। প্রায় একশত বৎসর ধরে তারা ১০০% শিক্ষিত জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতি লাভ করে আসছে। অনেক ত্যাগ, পরিশ্রম আর সততার মাধ্যমে তারা এ স্বীকৃতি অর্জন করেছে। দলবদ্ধতা, সময়ানুবর্তিতা এবং নিয়ম শৃ্খংলার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তাদের শিক্ষা ও প্রযুক্তির উন্নতির মূল। জাপানে প্রতিটি শিশু জন্মের সাথে সাথে সরকারিভাবে শিশুর লালনপালনের জন্য শিশুর পরিবারকে পর্যাপ্ত আর্থিক অনুদান  প্রদান করা হয় এবং শিশুটির সুন্দর ভবিষ্যৎ গেেড় তোলার জন্য শিশুর জন্ম থেকে চৌদ্দ বছর পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট মাসিক হারে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
জাপান ভৌগোলিকভাবে অনেক প্রতিক‚লতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকা একটি দেশ। জাপানের প্রায় ২০ শতাংশ ভূমি সমতল, বাকি ৮০ শতাংশ ভূমি পাহাড়ি এলাকা। চারটি প্রধান দ্বীপ ও অনেকগুলো ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে জাপান। জাপান প্রায়ই ভূমিকম্প, টাইফুন. আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে। জাপানের অঞ্চলভেদে জলবায়ু বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। কোথাও খুব বরফ পড়ে আবার কোথাও উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করে।
জাপান রাজধানী টোকিওসহ ৪৭ টি জেলায় বিভক্ত। ২০০৭ সালের হিসাব অনুযায়ী জাপানের জনসংখ্যা ১২৭.৭৭ মিলিয়ন এবং ২০০৬ সাল থেকে তাদের জনসংখ্যা প্রায় স্থির অবস্থায় আছে। জাপানে জন্মহার হাজারে ১.২৬, যা ইতিহাসে সর্বনিন্ম এবং তা ধীরে ধীরে আরো কমে যাওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জাপানে মানুষের গড় আয়ু পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। পুরুষের গড় আয়ু ৭৯- ৮০ বছর এবং মহিলার গড় আয়ু ৮৫- ৮৬ বছর। যার ফলে জাপানের জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ২৫ ভাগই বয়স্ক এবং এ কারণে জাপানে বয়স্ক প্রজন্মের সৃষ্টি হয়েছে।
জাপানের অফিসিয়েল ভাষা জাপানিজ। তাদের দেশপ্রেম তাদের মাতৃভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় প্রকাশ পায়। ইংরেজি বর্তমান বিশ্বে আর্ন্তজাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু জাপানিরা ইংরেজি ভাষা জানা সত্তে¡ও সর্বক্ষেত্রে জাপানি ভাষা ব্যবহার করে। এবং প্রয়োজনে দোভাষীর মাধ্যমে ভাষার আদানপ্রদান করে। জাপানিরা নিয়মানুবর্তিতা ও কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জনের তুলনায় দলীয় ও সমষ্টিগত উন্নতিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাদের কাজের মূল লক্ষ্য হলো সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করা। তারা মনেপ্রাণে এটা বিশ্বাস করে যে, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন সৃষ্টিকর্তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সামিল। জাপানিদের সকল পরিবেশে সকলের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, সততা, কাজের প্রতি একাগ্রতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাপানকে বিশ্বের দরবারে শিক্ষা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, শিল্প ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই প্রথম স্থানে বসিয়েছে। জাপানে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ হিসেবে সমাজের সর্বস্তরে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। জাপানে অর্থনীতির দিকটা মেয়েরা দেখে বলে জাপানের প্রবৃদ্ধি এত বেশি।
জাপানে ৯ বছর মেযাদী বাধ্যতামূরক প্রাথমিক শিক্ষা প্রচলিত আছে, যা ৬ বছর মেয়াদী এলিমেন্টারি স্কুল ও ৩ বছর মেয়াদী জুনিয়র হাইস্কুলের আওতায় পরিচালনা করা হয় কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই ৯ বছরের মধ্যে কোনো  আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার প্রচলন নেই। এলিমেন্টারি স্কুলের শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা ছাড়াই তাদের জন্য নির্ধারিত জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হয়। ৯ বছর ব্যাপী বাধ্যতামূলক শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সিনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হয়। ৩ বছর মেয়াদী উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ শেষে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দমত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষা বা কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। জাপানে নয় বছর মেয়াদী যে বাধ্যতামূলক শিক্ষাপ্রচলিত তা সম্পূর্ণ অবৈতনিক। দুইটি এলিমেন্টারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জুনিয়র হাইস্কুল নির্ধারিত রয়েছে। ১০০% শিশু এই শিক্ষা সমাপন করে। এই শিক্ষালাভ শেষে যেকোনো শিক্ষার্থী আইনত চাকুরি করতে পারে। কিন্তু ৯৬% শিক্ষার্থীই উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাশেষে ৫০% শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে, ২৫% কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয় এবং বাকি ২৫% বিভিন্ন  চাকুরীতে যোগদান করে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য সাধারণ স্কুলে, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পরিচালিত স্কুলে অথবা তাদের জন্য তৈরিকৃত বিশেষ স্কুলে পড়ালেখা করার  ব্যবস্থা আছে। অভিভাবকের ইচ্ছা অনুযায়ী তারা এদের মধ্যে যেকোনো একটি স্কুলে পড়ালেখা করতে পারে।
জাপানের এলিমেন্টারি স্কুলগুলোতে ৬ বছর বয়সী শিশুরা প্রথম গ্রেডে ভর্তি হয়। এদের মধ্যে অনেকেই বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে প্রাকপ্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে আসে। শিশুরা এখানে গ্রেড ৬ পর্যন্ত শিক্ষালাভ করে। ৮ ফেব্রুয়ারি , ২০১১ আমরা “তাকাসুকি সিটি শিবো এলিমেন্টারি স্কুল” পরিদর্শন করি। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ‘মিতসুহিরো দই’ আমাদের স্বাগত জানান। স্কুলটিতে একজন প্রধান শিক্ষক, একজন সহকারি প্রধান শিক্ষক এবং ২০ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। স্কুলটিতে ৪৬৪ জন শিশু পড়ালেখা করে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক সকালে স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে সকল শিক্ষার্থীকে স্বাগত জানান। ৮:৫০ ঘটিকায় ক্লাস শুর“ হয়। প্রতিটি ক্লাস ৪৫/৫০ মিনিট সময়ের হয়ে থাকে। দুইটি ক্লাসের মধ্যে ১০ মিনিটের বিরতি থাকে। একজন শিক্ষক একটি শ্রেণির সকল বিষয় পড়ান। শুধু সংগীত শিক্ষক সংগীতের ক্লাস নেন। ৩:৩০ ঘটিকায় ক্লাস শেষ হয়। তখন একটি শ্রেণির বিভিন্ন শাখার শিক্ষকরা একত্রে পরবর্তী দিনের পাঠপরিকল্পনা ও ওয়ার্কশিট তৈরি করেন। এলিমেন্টারি স্কুলে শিশুদের ইউনিফর্ম থাকে না। শিশুরা তাদের প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্র বাড়ি থেকে নিয়ে আসে। মধ্যাহ্ন বিরতিতে শিক্ষার্থীরা সবাই মিলে বিদ্যালয় পরিষ্কার করার কাজ করে। প্রতিটি এলিমেন্টারি স্কুলে সমৃদ্ধ বিজ্ঞানাগার , সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, ক্লিনিক, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষভাবে সাজানো কক্ষ, সাজানো মিউজিক রুম, রান্নাঘর ইত্যাদি সুসজ্জিত থাকে। ক্লিনিকে প্রতিদিনই বেশ কিছু শিশু চিকিৎসা গ্রহণ করে। কম্পিউটার ল্যাবে ৪০ টি কম্পিউটার আছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিক্ষাক্রমের নির্দেশনা অনুযায়ী পাঠ্যসূচি পরিকল্পনা করেন। একটি জেলায় একই রকম পাঠ্যপুস্তক নির্ধারণ করা হয়। বিভিন্ন কোম্পানী বোর্ডের অনুমোদন সাপেক্ষে পাঠ্যপুস্তক স্কুলে পৌঁছে দেয়। চার বছর পরপর পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করা হয়। প্রতিটি স্কুল সিটি বোর্ডের আর্থিক সহায়তায় ইন্টারনেটে হোমপেজ তৈরি করে। ফলে যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো স্থান থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে স্কুলটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। শিশুদেরকে জাতির শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে গড়ে তোলার জন্য স্কুলে নৈতিক শিক্ষা, কৃষিকাজ, রান্না বান্না, খেলাধূলা, সাঁতার কাটা, বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে যেমন পাহাড়ে ওঠা, বরফের মধ্যে চলা ইত্যাদির অভিজ্ঞতা অর্জন করানো, দেশের সুরক্ষা সংক্রান্ত শিক্ষা দেওয়া হয়।
জাপানে জুনিয়র হাইস্কুল গুলোর প্রতিটির নির্দিষ্ট নম্বর আছে। ৯ ফেব্র“য়ারি, ২০১১ আমরা সুইটা সিটি দাই গো জুনিয়র হাই স্কুলে গেলাম। জাপানি ভাষায় ‘গো’ কে বলা হয় ৫, অর্থাৎ এই স্কুলটা ৫ নম্বর স্কুল। এই স্কুলে শিক্ষক কর্মচারী মিলিয়ে ৪৫ জন কর্মরত আছেন। প্রিন্সিপাল ‘হিরোউকি কানো’ আমাদের স্বাগত জানালেন। জুনিয়র স্কুলে শিক্ষার্থীদের গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন ইউনিফর্ম নির্দিষ্ট আছে। জুনিয়র স্কুলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নির্দিষ্ট আছেন। সপ্তাহে প্রতি শ্রেণির ২৯ টি ক্লাস আছে। প্রতিটি ক্লাস ৫০ মিনিটের হয়ে থাকে। দুইটি ক্লাসের মধ্যে ১০ মিনিটের বিরতি থাকে। একজন শিক্ষককে সপ্তাহে গড়ে ১৫-২০ টি ক্লাস নিতে হয়। শ্রেণিশিক্ষককে তিনটি ক্লাস বেশি নিতে হয় – নৈতিক শিক্ষা, ব্যবহার ও শারীরিক শিক্ষা। বিজ্ঞানের অধিকাংশ ক্লাস সাধারণ শ্রেণিকক্ষ হয়, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্লাস ব্যবহারিক কক্ষে হয়। বিপদজনক ব্যবহারিক গুলো শিক্ষক করে দেখান। অন্যান্য ব্যবহারিক শিক্ষার্থীরা চারজনের দলে করে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে বিভিন্ন কাজ শেখানো হয়্ তৃতীয় বর্ষের শেষ দিকে সবাইকে অনেক দূরে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিদিন ক্লাস শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দমত ক্লাবে যায়। প্রত্যেকটি জুনিয়র স্কুলে বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাব আছে। যেমন – ফুটবল, টেবিলটেনিস, বাস্কেটবল, সাঁতার, বাঁশি বাজানো, হাত দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি, নৃত্য, থিয়েটার, আর্ট ইত্যাদি। এক একটি ক্লাবের দায়িত্বে থাকেন এক একজন শিক্ষক। জুনিয়র স্কুলগুলোতে পাঠের সময়সূচি ৮:৩০ – ৩:৩০, ক্লাবের সময়সূচি ৩:৩৫ – ৫:০০। শিক্ষকরা এরপর ৫:০০- ৭:০০ পরবর্তী দিনের কর্মসূচি নির্ধারণ করেন। এই সময়কে তাদের সার্ভিস ওভারটাইম বলা হয়।
জাপানে সিনিয়র স্কুলগুলো দুইভাবে পরিচালনা করা হয়। সাধারণ উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ এবং কর্মজীবীদের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ। ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১১ আমরা ‘অতসু সিনিয়র হাইস্কুল’ ও ‘অতসু সেইরিও সিনিয়র হাইস্কুল’ পরিদর্শন করি। একই ক্যাম্পাসের ভেতরে দুই দিকে দুইটি স্কুল অবস্থিত। প্রথমে আমরা যাই অতসু সিনিয়র হাইস্কুলে। এই স্কুলে আমরা স্কুল ক্যাপ্টেনদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় যোগ দেই। তাদের সাথে কথা বলে আমরা জানতে পারি তাদের অধিকাংশের জীবনের লক্ষ্য হলো দোভাষী হিসেবে কাজ করা, নার্সিং, গার্ডেনিং, পোশাক শিল্পের কাজ করা অথবা কুকুরের শিক্ষক হওয়া। স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক মি. সাকন আমাদের বিজ্ঞানের অনেকগুলো পরীক্ষা করে দেখান। অতসু সেইরিও সিনিয়র হাইস্কুলে আমরা শিক্ষার্থীদের সাথে এক নৈশভোজে যোগ দেই। এই স্কুলটি নৈশস্কুল এবং এর শিক্ষার্থীরা কর্মজীবী এবং বিভিন্ন বয়সী। নৈশভোজের পর শিক্ষার্থীরা সাপ্তাহিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।
জাপানে যারা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিতে চায় তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা বিষয়ে ডিগ্রী অর্জন করতে হয়। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর নবীন শিক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। এই প্রশিক্ষণ নিয়োগপ্রাপ্ত বিদ্যালয় অথবা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উভয় স্থানেই গ্রহন করার ব্যবস্থা থাকে। বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক নবীন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ গ্রহণে সহায়তা করেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের বিভিন্ন মেয়াদী লাইসেন্স প্রদান করা হয়। প্রথমত ১০ বছর মেয়াদী লাইসেন্স প্রদান করা হয়। ১০ বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শিক্ষক আবার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৫ অথবা ১০ বছরের জন্য লাইসেন্স পান। শিক্ষকরা শিক্ষকতা করার পাশাপাশি অনেকেই শিক্ষামূলক গবেষণা করেন। গবেষণার মাধ্যমে অনেকে নিজের যোগ্যতায় শিক্ষক থেকে প্রমোশন পেয়ে শিক্ষাবোর্ডের প্রধানও হয়ে থাকেন। এলিমেন্টারি স্কুল ও জুনিয়র হাই স্কুলের শিক্ষকদের বেতন সমান এবং তাদের বেতন যেকোনো সরকারি কর্মকর্তার বেতনের চেয়ে বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়। ফলে জাপানের বিদ্যালয় গুলোতে যারা শিক্ষকতা করেন, তারা সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী এবং সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী।
স্কুল ছাড়াও আমরা ‘ওসাকা সায়েন্স মিউজিয়াম’ এবং ‘লেইক বিওয়া মিউজিয়াম’ দেখতে যাই। সায়েন্স মিউজিয়ামে বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলোকে মানুষের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি শুর“র সময়কাল থেকে ধাপে ধাপে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষা নিজে করে দেখার সুযোগ রয়েছে।  বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের বিভিন্ন ক্লাসের শিক্ষার্থীদের দলীয় ভাবে মিউজিয়াম পরিদর্শনে নিয়ে আসেন। ফলে শিক্ষার্থীরা পর্যবেক্ষণ করে অথবা নিজে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ পায়। লেইক বিওয়া মিউজিয়ামে ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলোকে জীবন্ত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। সতেরো দিন জাপানে অবস্থান করে আমরা অনুধাবন করতে পারলাম জাপানিদের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতির মূলে আছে প্রযুক্তিকে সকলকাজে সফলভাবে ব্যবহার করতে পারা এবং চারিত্রিক সততা ও কঠোর পরিশ্রম।

তিন প্রজন্ম ঘিরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সাল। দৃপ্ত অহংকার, করুণ দীর্ঘশ্বাস, নিঃসঙ্গতার হাহাকার সবকিছুর সমষ্টি। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, একাত্তরের পরে জন্ম হযেছে। তাই আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে শহিদ দাদুর স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানো, ঠাকুমার ঘুমের মধ্যে হানাদারদের বুটের শব্দে আঁতকে উঠা, বাবার নিষ্পলক দৃষ্টিতে অতীতে ফিরে যাওয়া। মুক্তিযুদ্ধের কথাগুলো আমার ঠাকুমায়ের কাছ থেকে শোনা।বাবার কাছে মুক্তিযুদ্ধ ছিলো হানাদারদের কাছে বন্দী হয়ে যাওয়ার পর দাদুর অপলক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকা, যে চাহনির অর্থ ছিলো  — “আমি যাচ্ছি! তোমার মাকে দেখো, ভাইবোনদের দেখো।” নিজের বাবার এই কর“ণ চাহনির কথা মনে পড়ার কারণে বাবা কখনোই মুক্তিযুদ্ধের কোনো কথা ভাষায় প্রকাশ করতে পারেননি, শুধু একবার “একাত্তরের স্মৃতিগুচ্ছ ” বইয়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধে তাঁর দুঃসহ স্মৃতিটুকুর বর্ণনা দিয়েছিলেন।
রাজাকারদের সাহায্যে পাক হানাদারেরা বাবাকেও লাইনে দাঁড় করিয়েছিলো। হঠাৎ কী ভেবে তারা বাবাকে ছেড়ে দিয়েছিলো, যার ফলেই আমরা পৃথিবীর আলো দেখতে পেলাম। বাবা রঞ্জিত কুমার দাস তখন মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। মৌলভীবাজারে পাক হানাদারদের আক্রমণ শুর“ হলে বাবা বাড়িতে চলে এসেছিলেন। আমাদের বাড়িটা শমশেরনগর বিমান ঘাঁটি থেকে মাত্র দুই মাইল দূরে। পাক হানাদার বাহিনী তাদের যোগাযোগের সহজ ক্ষেত্র হিসেবে এই বিমান ঘাঁটিকে ব্যবহার করতো।
আমার দাদু শহীদ রমেশ চন্দ্র দাস ছিলেন কমলগঞ্জ হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন সহকারী প্রধান শিক্ষক। তিনি আমাদের বাড়ি শ্রীসূর্য থেকে প্রতিদিন বাইসাইকেলে চড়ে স্কুলে যেতেন। সেদিন বাংলা তারিখ ছিল পহেলা জ্যৈষ্ঠ। ভোররাতে ।নেকগুলো ভারী বুটের আওয়াজ আর অপরিচিত ভাষার কথায় সবার ঘুম ভাঙল। ঘটনা আঁচ করতে পেরে ঠাকুমা আমার দুই কাকুকে পিছনের দরজা দিয়ে বের করে দিতে চাইলে  হানাদার বাহিনীর লোকদের অস্ত্র তাক করা অবস্থায় দেখতে পান। ঠাকুমা ভয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। তখন পাক হানাদাররা বাড়ির সামনের দরজায় লাথি দিতে থাকলে দাদু সবাইকে নিয়ে বাইরে আসেন। উঠানে এসে বাড়ির সবাইকে বাইরে বের হতে বলেন। হানাদাররা বাড়ির সবাইকে উঠানে লাইনে দাঁড় করায়।হানাদারদের সে দলের নেতৃত্বে যে ছিল সে দাদুকে প্রশ্ন করে দাদু কী স্কুলে যাবেন না? দাদু উত্তরে জানান যে, সকাল হলেই স্কুলে যাবেন। বাড়ির পুর“ষ সদস্যদের বাড়ির বাইরে এনে লাইনে দাঁড় করিয়ে রা্স্তা ধরে এগিয়ে যায়। সবাই অপেক্ষার প্রহর গুণছিলেন, কখন মেশিনগান গর্জে উঠবে, ঝাঁঝড়া করে দেবে সকলেন বুক।কিন্তু সৌভাগ্য তাদের সেখানে কোনো অঘটন ঘটলো না। আশেপাশের বাড়ি থেকে সবাইকে একসাথে করে পতনুষার দিঘীরপাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এখান থেকে ধরে নিয়ে যায় আমার দাদু, তাঁর কাকাতো ভাইসহ গ্রামের আরো ষোলো সতেরো জনকে। তাঁদেরকে শমশেরনগর ডাকবাংলোতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে দু’একজন করে চারপাঁচ দিনে অনেককে আবার ছেড়েও দেয়। কিন্তু আমার দাদুসহ ছয়জন আর কোনোদিন ফিরে আসেননি।ঠাকুমা এতটুকু বলেই থেমে যেতেন। আর বলতে পারতেন না।কান্নায় ভেঙে পরতেন।
ছোটবেলায় ঠাকুমার মুখে দাদুকে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত কথাগুলো শুনতে শুনতে ভাবতাম , হয়তো  কোনো একদিন দাদু ফিরে আসবেন। সেই ভাবনার আলোকে কল্পনা করতাম ,একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখবো আমার দাদু ফিরে এসেছেন। ঠিক তাঁর ছবির মতো, কুঁকড়ো কুঁকড়ো চুল, চেয়ারে বসে মিটিমিটি হাসছেন। কিন্তু বড় হওয়ার সাথে সাথে দাদুর ফিরে না আসা গল্পের বাকি অংশটুকু জানতে পারি। এখন দাদুর কথা মনে হলে কল্পনাতে রক্তাক্ত রানওয়ে ভেসে উঠে।
আমার দাদু কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। ছিলেন একজন সহজ সরল সাধারণ শিক্ষক। জীবনে কোনো উচ্চাশা ছিল না। তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলে প্রথমে বিনাবেতনে ও পরে নামমাত্র বেতনে শিক্ষকতা করেছেন। নিজে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করেছেন। ১৯৩১ সালে ১ম বিভাগে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করেছেন। সিলেট এম.সি. কলেজ থেকে আই.এ এবং বি.এ পাশ করেছেন। কিন্তু নিজের আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় নিজের সন্তানদের পড়াশুনার ভালো ব্যবস্থা কবতে পারেননি।মার্চ-এপ্রিলের উত্তাল দিনগুলোতে অনেকেই দাদুকে ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন। দাদু সবসময়ই বলতেন ,“আমরা রাজনীতি করি না। আমাদের এলাকায় মিলিটারী আসবে না। আর যদি মরতে হয় তো দেশের মাটিতেই মরবো। জন্মভূমি ছেড়ে কোথাও যাবো না। দেশের স্বাধীনতার বেদীমূলে জীবন দিয়েছেন আমার দাদু এই সরল সহজ শিক্ষক।
আর আমার বাবা শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে নিয়ে বাবার ফেলে যাওয়া সকল দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি মনে স্বপ্ন লালন করছিলেন যে, দেশে যুদ্ধপরাধীর বিচার শুরুু হয়েছে , যুদ্ধপরাধীরা যদি শাস্তি পায় তাহলে এই স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন “বাবা, তোমার আত্মত্যাগ সার্থক হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীরা শাস্তি পেয়েছে।” কিন্তু যুদ্ধাপরাধীর বিচার হওয়ার আগে আমার বাবাই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।মনে অতৃপ্ত ক্ষেভ রয়েই গেলো।
আমার ঠাকুমা সরযূ বালা দাস দীর্ঘ তেতাল্লিশ বছর ধরে একাকী নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছিলেন। আর তাঁরই চোখের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল একাত্তরের রাজাকার তথা যুদ্ধাপরাধীরা।কিছুদিন আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। আজ বাবা বেঁচে থাকলে কতো স্বতি পেতেন। এমন সময়ে রায়টা কার্যকর হয়েছে ঠাকুমাও আর পুত্রশোকে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। যে রায় আগে শুনলে আমার ঠাকুমা শান্তি পেতেন আজ সেই রায় শুনে তাঁর তেমন কোনো অনুভূতি নেই।অবশেষে গত ২৪ ফ্রেব্র“য়ারি,২০১৪ আমার দুঃখিনী ঠাকুমারও জীবন অবসান হলো। ঠাকুমা, বাবা , তারপর আমি —-আমার জীবদ্দশায় যেন সকল যুদ্ধাপরাধী শান্তি পায় – তাহলে আমার পরবর্তী প্রজন্মকে আর রক্তের দায় নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে না।

লেখক পরিচিতি

শাশ্বতী দাস, প্রধান শিক্ষক , আমতৈল বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তার পিতা প্রয়াত রঞ্জিত কুমার দাস এবং মাতা  সাবিত্রী দাস। জন্ম ২৫.১২.১৯৭৬ খ্রি: মৌলভীবাজারে। দাদু শিক্ষক শহিদ বুদ্ধিজীবী রমেশ চন্দ্র দাস ও পিতা শিক্ষক রঞ্জিত কুমার দাসের পদা্কং অনুসরণ করে শিক্ষকতায় আগমন। বংশ পরম্পরায় নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হিসেবে সাফল্য অর্জন করেছেন। পাঠ্যপুস্তকের উপর সুচিন্তিত মতামতের জন্য  ২০০৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ধন্যবাদ পত্র পেয়েছেন। ২০১০ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০২ সালে নোরাডের আওতায়, ২০০৬ সালে পিইডিপি-২ এর আওতায় এবং ২০১৩ সালে পিইডিপি-৩ এর আওতায় বিষয় ভিত্তিক প্রশিক্ষণ গণিত এর প্রশিক্ষক মনোনীত হয়ে উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছেন। ২০১১ সালে গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে জাপানের ওসাকা শহরে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০১৩ সালে বেগম রোকেয়া দিবসে মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় শিক্ষাও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে “জয়িতা” সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি লেখিকা সংঘ , মৌলভীবাজার জেলা শাখার সহ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তার রচিত “প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে উপকরণ তৈরি ও ব্যবহার” শীর্ষক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার রচিত বিভিন্ন গবেষণামূলক লেখা  বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তার এক মেয়ে ও এক ছেলে মাধ্যমিক স্তরে লেখাপড়া করছে। তার স্বামী একজন সরকারি চাকুরীজীবী।

রেডটাইমস বিডি ডকটম/ই এইচ/সু জ/এস ডি



এই প্রতিবেদন টি 8305 বার পঠিত.